ঘোষণা

ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে ডেঙ্গুজ্বর, করোনা ভেবে ভুল

মুনিয়া মুন | বুধবার, ১৯ আগস্ট ২০২০ | পড়া হয়েছে 28 বার

ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে ডেঙ্গুজ্বর, করোনা ভেবে ভুল

কোনো সভ্যতাই মানুষকে দেয়নি অবিমিশ্র সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, শান্তি ও সুস্থিরতা। বর্তমান একবিংশ শতাব্দীর যান্ত্রিক সভ্যতা তার ব্যতিক্রম নয়। সেও আমাদের জীবনে প্রসারিত করেছে বহুবিধ সঙ্কটের কালোছায়া। তার মধ্যে ভয়াবহ পরিবেশদূষণ অন্যতম। এই দূষণের ফলেই নোংরা পরিবেশে জন্ম নিয়েছে এক ভয়াবহ জীবাণু বহনকারী ক্ষুদ্র পতঙ্গ এডিস মশা। এর দংশনে মানুষ ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হচ্ছে। ক্রমবর্ধমান এই জ্বরের প্রাদুর্ভাবের ভাবনায় সারা দেশের মানুষ আজ চিন্তিত, প্রতিকারের চিন্তায় উদ্ভ্রান্ত, এ নিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কত আলোচনা। তাই আমাদের পারিপার্শ্বিক পরিবেশকে কিভাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রেখে এডিস মশা তথা ডেঙ্গুজ্বরের প্রাদুর্ভাব থেকে রক্ষা পেতে পারি, তার ব্যবস্থা করতে হবে।

ডেঙ্গু প্রধানত এশিয়ার গ্রীষ্মমণ্ডলীয় এলাকার ভাইরাসঘটিত একটি সংক্রামক ব্যাধি। ডেঙ্গু ভাইরাস ঋষধারারৎরফধব গোত্রভুক্ত, যার প্রায় ৭০ ধরনের ভাইরাসের মধ্যে আছে ইয়েলো ফিভার ও কয়েক প্রকার এনসেফালাইটিসের ভাইরাস। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে কলকাতায় প্রথম ডেঙ্গুজ্বর শনাক্ত করা হয়েছিল। ১৮৮০ ও ১৯৯০ সালে মহামারী আকারে রক্তক্ষরা ডেঙ্গু ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ ও চীনে ছড়িয়ে পড়ে। রক্তক্ষরা ডেঙ্গুজ্বর ও শক-সিনড্রম ডেঙ্গু এখন এশিয়ার হাসপাতালে ভর্তি হওয়া শিশু এবং শিশু মৃত্যুর অন্যতম কারণ।

ডেঙ্গুজ্বর ভাইরাসঘটিত একটি ডেঙ্গু সংক্রামক রোগ। সাধারণত মানুষের আবাসস্থলের সাথে সংশ্লিষ্ট, দিনের বেলায় দংশনকারী অবফবং অবমুঢ়ঃর মশা এসব ভাইরাসের বাহক। কোনো কোনো অঞ্চলে অন্যান্য প্রজাতি অবফবং অষনড়ঢ়রপঃঁং,অবফবং চড়ষুহবংরবহংরং মশাও সংক্রমণ ঘটায়। রোগীকে দংশনের দুই সপ্তাহ পর মশা সংক্রমণক্ষম হয়ে ওঠে এবং গোটা জীবনই সংক্রমণশীল থাকে।

ডেঙ্গু দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রধানত শিশুদের একটি রোগ। রক্তক্ষরা ডেঙ্গু হলো ডেঙ্গুর একটি মারাত্মক ধরন। এই ডেঙ্গুজ্বরের লক্ষণগুলো বয়স নির্বিশেষে সবার ক্ষেত্রেই অভিন্ন। এই জ্বরের শুরুতে হঠাৎ দেহের তাপ বেড়ে যায় (৩৮০-৪০০ সেলসিয়াস) এবং কয়েক দিন পর্যন্ত চলে। এতে দেখা দেয় মাথা ব্যথা, ক্রমাগত জ্বর, দুর্বলতা এবং অস্থিসন্ধি ও মাংসপেশির তীব্র ব্যথা। শ্বাসযন্ত্রের ঊর্ধ্বাংশের সংক্রমণসহ রোগটি হালকাভাবে শুরু হলেও আচমকা শক ও ত্বকের অভ্যন্তরে রক্তক্ষরণ ছাড়াও কান দিয়ে রক্তক্ষরণ শুরু হয়ে যায়।

ডেঙ্গু মশা জনবসতির সাথে সংশ্লিষ্ট থেকেই বংশবৃদ্ধি করে। এদের লার্ভা বেশির ভাগই পরিত্যক্ত টায়ার, বালতি, ফেলে দেয়া নারকেলের খোল, ফুলদানি, ফুলের টবের নিচের থালায় পানিতে, এমনকি জমে থাকা গাছের গর্তের পানিতে এবং এ ধরনের অন্যান্য প্রাকৃতিক স্থানে বড় হয়। পূর্ণবয়স্ক মশা ঘরের ভেতর অন্ধকার জায়গায় আলমারি, বিছানায় বা খাটের তলায় থাকতে পারে। এই প্রজাতি দিনের বেলায় বেশি সক্রিয় থাকে। বেশির ভাগ কামড়ের ঘটনা ঘটে সকালের প্রথম দিকে বা বিকেলের শেষে। কোনো আক্রান্ত লোকের রক্ত খেয়ে থাকলেই মশা সংক্রমিত হয় এবং ১০-১২ দিনের নির্ধারিত ‘উপ্তিকাল’ যাপনের পর সংক্রমণ ক্ষমতা অর্জন করে। মশা সংক্রমণক্ষম হয়ে উঠলে শরীর থেকে রক্ত শোষণের সময়, এমনকি ত্বকে শুঁড় ঢুকালেও ডেঙ্গু সংক্রমণ ঘটতে পারে।

গত বছর ডেঙ্গুজ্বর ভয়াবহ আকার ধারণ করেছিল। তাতে প্রাণ গেছে অনেকেরই। অনেকে অবশ্য সুস্থ হয়েছিল। সবার মনেই তখন ছিল চাপা আতঙ্ক। গোটা দেশ থমকে দাঁড়িয়েছিল। সরকার নিয়েছিল নানা পদক্ষেপ। জনগণও হয়েছিল যথেষ্ট সচেতন। বেশ কিছু দিন পর ডেঙ্গুর প্রভাব কিছুটা নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছিল, এবার করোনা পরিস্থিতিতে গোটা বিশ্ব যখন ক্লান্ত তখন আমাদের দেশে আবারো হানা দিয়েছে ডেঙ্গুজ্বর। এরই মধ্যে বেশ কয়েকজন মারা গেছে ডেঙ্গুজ্বরে। প্রতিনিয়ত বেড়েই চলছে ডেঙ্গু রোগী।

অনেকে আবার ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত রোগীকে করোনা রোগী বলে ভুল করছেন। ফলে তারা উপযুক্ত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন আর পাড়ি জমাতে হচ্ছে না ফেরার দেশে। ডেঙ্গু রোগীরা পাচ্ছেন না পারিবারিক
সেবা। করোনার আতঙ্কে তাদের থেকে দূরত্ব বজায় রাখছে পরিবারের সদস্যরাও। করোনা রোগী বলে সন্দেহ করে ডাক্তাররাও দিচ্ছেন না প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা। ডেঙ্গু আর করোনার তাণ্ডবে দেশ এখন রিক্ত-শূন্য। তাই এখনই ডেঙ্গুজ্বরের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকার আর জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টা পরিহার্য।

ডেঙ্গুর কার্যকর কোনো ওষুধ বা প্রতিষেধক নেই। দেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাই কেবল এ রোগের বিরুদ্ধে লড়তে পারে। সাধারণ ‘ক্লাসিক্যাল’ ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে দেহের রোগ প্রতিরোধ সামর্থ্য থাকে; কিন্তু রক্তক্ষরা ডেঙ্গুতে বেশির ভাগ রোগীই মারা যায়। তাই মশার বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালিত হওয়া আবশ্যক। বাংলাদেশে ডেঙ্গু মশা নিয়ন্ত্রণের উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম নেই। দেশের কোনো কোনো শহরে মশক নিয়ন্ত্রণের কার্যক্রম থাকলেও তা এডিস মশার বিরুদ্ধে নয়। এ জন্য বিশেষ উদ্যোগ প্রয়োজন। এগুলো যেহেতু পানিভরা পাত্রে বৃদ্ধি পায়, তাই যত্রতত্র কীটনাশক ছড়িয়ে কোনো সুফল পাওয়া যাবে না। ঘরের চার দিকে স্প্রে করা হলে অথবা খুব সকালে বা সন্ধ্যার শেষে ঘরে বিষ ধোঁয়া বা অ্যারোসল দিলে দিনের বেলায় দংশনকারী এডিস মশা কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে।

সম্প্রতি বাংলাদেশে ডেঙ্গুজ্বরের প্রাদুর্ভাব বেড়ে গেলেও রোগটি এ দেশে নতুন নয়। ১৯৬৬ সালে প্রথম এ রোগ চট্টগ্রাম ও পরে আশপাশের থানাগুলোতে দেখা দিয়েছিল। সে সময়ে ২৫৫ জন জ্বরাক্রান্ত রোগীর মধ্যে ৩৫ জনকে ডেঙ্গু রোগী বলে শনাক্ত করা হয়েছিল। এর প্রায় এক যুগ পরে ১৯৭৭-৭৮ সালে ঢাকায় আবার ডেঙ্গুজ্বর দেখা দেয়। তবে ২০০০ সালের আগস্টে ডেঙ্গুজ্বরের প্রাদুর্ভাব মারাত্মক আকার ধারণ করে। তার পর থেকে প্রতি বছরই ডেঙ্গুজ্বর ভয়াল রূপ নিয়ে আক্রমণ করছে এবং কেড়ে নিচ্ছে শত শত নিরীহ প্রাণ। আমাদের দেশে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে এর প্রকোপ খুব বেশি।

মশার বংশবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ সহজ নয়। এ জন্য সবাইকে মশা বৃদ্ধির অকুস্থল যেমন, পরিত্যক্ত পাত্র, টায়ার, ডাবের খোসা প্রভৃতি সরিয়ে ফেলতে হবে এবং বাসস্থানের আশপাশ থেকে জমে থাকা পানি নিষ্কাশন করতে হবে। কার্যকর ও টেকসই নিবারণ ব্যবস্থার জন্য ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে অবশ্যই স্থানীয় জনগণের সম্পৃক্ততা আবশ্যক।

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ৮:৩৮ পূর্বাহ্ণ | বুধবার, ১৯ আগস্ট ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত