ঘোষণা

অন্ধকারের পথে, পরিত্রাণের সন্ধানে!

মজিবুর রহমান খোকা | মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২০ | পড়া হয়েছে 123 বার

অন্ধকারের পথে, পরিত্রাণের সন্ধানে!

২৫ শে জুলাই । রবিবার । সন্ধ্যা ও রাতের সন্ধিক্ষণ । কুমিল্লার জেলার বাঞ্ছারামপুর থানার বিষ্ণুরামপুর বাজার । একটিমাত্র মুদী দোকান ছাড়া, বাকী সব দোকান বন্ধ হয়ে গেছে । এলাকার এল. এম. এফ ডাক্তার সামসুদ্দিনের চেম্বারটি বিশেষ কারণে খোলা রয়েছে ।

তেঁজখালী, বাহেরচর (বারাইলচর), বিষ্ণুরামপুর গ্রাম থেকে কয়েকজন কিশোর ও যুবক হেঁটে এসে চেম্বারের সামনে জড়ো হয়েছে । কেউ একা । কারও সাথে বাবা-চাচা, ভাই-ভাতিজা অথবা বন্ধুরা এসেছে ! তাদের পরণে লুঙ্গি ও সার্ট । হাতে কাপড়ের পোটলা । লণ্ঠনের মিটমিট আলোয় কারও মুখ স্পষ্ট দেখা না গেলেও, অনুমান করা যায়, তাদের কারও বয়স ষোল, কারওবা আঠারো-কুড়ি ।

চেম্বার প্রাঙ্গণে বিভিন্ন পেশার মানুষজন পরস্পর পরস্পরের মধ্যে কথা বলছে । সবার বক্তব্য ঘুরে ফিরে এক জায়গায় নিবদ্ধ । কবে এই হার্মাদের দল নিপাত যাবে ! করে নারকীয় তান্ডবের অবসান হবে । কবে আসবে মুক্তিবার্তা । কবে কেটে যাবে ঘোর অমানিশা !

বয়োজ্যেষ্ঠ আত্মীয়রা কেউ কেউ দোকান থেকে চিড়া-গুড় কিনে এনে তাদের পোটলার ভিতর ঢুকিয়ে দিচ্ছেন । কেউবা যৎসামান্য টাকা-পয়সা পকেটে গুঁজে দিচ্ছেন ।

উৎফুল্ল কিশোর ও যুবকরা একে একে ডাক্তার সাহেবের কাছে গিয়ে তাদের উপস্থিতি নিশ্চিৎ করলো । ডাক্তার সাহেব ঘর ভর্তি মানুষের সামনে পুনরায় তাদের সিদ্ধান্তের কথা জানতে চাইলেন । কিশোর ও যুবকরা দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে জানিয়ে দিলো, তারা তাদের সিদ্ধান্তে অটল, অবিচল এবং স্থির । পৃথিবীর কোনো মোহ, আসক্ত, আবেগ, আবেদন, ভয়-ভীতি, নির্যাতন-নিপীড়ন তাদেরকে নিবৃত করতে পারবে না । তাদের সামনে এখন একটাই লক্ষ্য– হয় মারবো, নয়তো মরবো ।

মোট ৮ জন । ডাক্তার সাহেব আওয়ামী লীগের প্যাডে একটি চিঠির সাথে নামের তালিকা সংযুক্ত করে গাইডের হাতে তুলে দিলেন । মুহূর্তে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হলো । সবাই চেম্বার থেকে বের হয়ে এলো ।

বাজারের সান বাঁধানো ঘাটে, কেড়াই নৌকো নিয়ে অপেক্ষা করছে, বারাইলচরের সিরাজ মাঝি । ছোট্ট লণ্ঠনটি তার নৌকোর ছৈয়ের ভিতরে টিমটিম জ্বলছে । সে জানে, এই মুহূর্তে তার গন্তব্যস্থল কোথায় !

ডাক্তার সাহেব ঘাটে এসে নাম ধরে ডাকলেন, মোহাম্মদ মজিবর রহমান খোকা, মোর্শেদুল ইসলাম, মোহাম্মদ ফারুক, মতিউর রহমান মন্টু, মোজাফ্ফর হোসেন, আব্দুল হেকিম, আরজু মিয়া । আর একজনের খোঁজ করে নৌকোয় তুলে দিলেন ।
বললেন, তোমরা চুপচাপ বসে থাকবে । কোনো সাড়াশব্দ করবে না । গাইডের কথামতো চলবে । কিশোর ও যুবকরা মাঝির ইঙ্গিতে নৌকোর ভিতর ৪ জন ৪ জন করে দু’ধারে বসলো । গাইড বসলো নৌকোর আগায় ।

আপাত গন্তব্যস্থল মাঝি আর গাইড ছাড়া যাত্রীদের কারও জানা না থাকলেও, সর্বশেষ স্থানটি তাদের জানা আছে । ভারতের আগরতলা । সেখান থেকে ফিরে এসে শুরু হবে, নারকীয় হত্যাযজ্ঞের প্রতিশোধের পালা !

ঘাটে দাঁড়ানো আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবরা যাত্রীদের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভেবে, অশ্রুসিক্ত চোখে বিদায় জানালো ।

সিরাজ মাঝি তিতাস নদীতে নৌকো ভাসালো । লণ্ঠনটি নিভিয়ে দেওয়ার জন্য সে অনুরোধ করলো । কেউ একজন তা নিভিয়ে দিলো ।

ভাটির টানে, লগির চৈরে, কচুরীপানার বাঁধা উপেক্ষা করে, নৌকো নদীর বুকে সস শব্দে এগিয়ে চললো । বর্ষা মৌসুমের কারণে আবাদীভূমি, আগাছা, ঝোপ-ঝাড় জঙ্গল সবকিছু পানিতে ডুবে আছে । মাঝি দূরত্ব কমিয়ে আনার জন্য কখনো কখনো সেসবের মধ্য দিয়ে কোণাকুণি পথ অতিক্রম করছে ।

চারিদিক নীরব, নিস্তব্ধ, ঘোর অন্ধকার । ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক এবং পানিতে ‘টুপ’ করে লগি পরার আওয়াজ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই !

রাত ঘন হয়ে আসছে । যাত্রীরা নিজেদের মধ্যে ফিসফাস কথা বলতে বলতে এক সময় নিদ্রায় ঢলে পড়লো ।

নৌকো ছুটে চলেছে, পূর্ব সীমান্ত পানে ।

ঘটনার দু’মাসের মধ্যে আব্দুল হেকিম আর আরজু মিয়া কসবা থানার নয়াগাঁও গ্রামে শহীদ হলো ।
বাকীরা স্বাধীনতা অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত, বাঞ্ছারামপুর থানায় বীরদর্পে পাকিস্তানী বাহিনী ও রাজাকারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, বিজয়ী বেশে গাজী হয়ে ফিরে এলো ।

জয় বাংলা ।

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ১০:১৩ পূর্বাহ্ণ | মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |