ঘোষণা

দক্ষিণ এশিয়ার উত্তপ্ত রাজনীতি : পারমাণবিক যুদ্ধই কী এর সমাধান?

অধ্যক্ষ মো: নাজমুল হুদা | সোমবার, ২০ জুলাই ২০২০ | পড়া হয়েছে 31 বার

দক্ষিণ এশিয়ার উত্তপ্ত রাজনীতি : পারমাণবিক যুদ্ধই কী এর সমাধান?

পৃথিবীর জনসংখ্যার অর্ধেক দক্ষিণ এশিয়াতে বসবাস করে থাকে। এ বিশাল ভোক্তাবাজার বৈশ্বিক অর্থনীতিতে আগে থেকেই প্রভাব বিস্তার করে আছে। এ কারণে শিল্পোন্নত পশ্চিমা দেশগুলো সবসময় দক্ষিণ এশিয়ার বাজার দখলের প্রতিযোগিতায় মরিয়া। দক্ষিণ এশিয়া পশ্চিমা বিশ্বের প্রভাবমুক্ত নিজস্ব বাজারব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে, পাশ্চাত্যের চলমান অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়ার সমূহ সম্ভাবনা। সে কারণে পশ্চিমা বিশ্বের নেতারা দক্ষিণ এশিয়ায় রাজনৈতিক অস্থিরতা জিইয়ে রাখতে সদা সচেষ্ট।

আমরা জানি, পশ্চিমা বিশ্ব আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের মাধ্যমে পৃথিবীতে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাববলয় বিস্তার করার জন্য ন্যাটো সামরিক জোট গঠন করেছে ১৯৪৯ সালে। এ জোট অব্যাহতভাবে তাদের তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। সমাজতন্ত্রী অথচ ‘ন্যাটোর বিকল্প’ ওয়ারশ সামরিক ও রাজনৈতিক জোটের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গেছে। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওয়াহের লাল নেহরু, মিসরের সাবেক প্রেসিডেন্ট জামাল আবদুুল নাসের, কিউবার সাবেক প্রেসিডেন্ট ফিদেল ক্যাস্ট্রোসহ বিশ্বের অনেক নেতা ন্যাটো এবং ওয়ারশ জোটের বিকল্প হিসেবে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন (ন্যাম) গড়ে তুলেছিলেন। এ জোটের অধীনে তারা তৃতীয় বিশে^র দেশগুলো নিয়ে তৃতীয় জোট বা শক্তি গড়ে তোলেন। সে জোটের অস্তিত্বও বিলুপ্ত হয়ে গেছে। পশ্চিমা শক্তি দক্ষিণ এশিয়াতে কেবল তাদের প্রভাব বিস্তার করেই ক্ষ্যান্ত হয়নি। তারা দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোতে একের বিরুদ্ধে অপরকে লেলিয়ে দিয়ে পরোক্ষভাবে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে চলেছে। বিগত সময়ের ইরাক-ইরান যুদ্ধ, দীর্ঘদিন চলমান ইসরাইল-আরব যুদ্ধ, ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ এবং আফগানিস্তানসহ মধ্যপ্রাচ্যের অনেক রাষ্ট্রে পশ্চিমা বিশ্ব প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ বিপুল সামরিক সহযোগিতা দিয়েছিল। পরিণতিতে দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশেই দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ অব্যাহত আছে। এসব যুদ্ধের মাধ্যমে পশ্চিমা দুনিয়া দক্ষিণ এশিয়ায় নিজের সামরিক অস্ত্রের বাজার গড়ে তুলেছে। অপর দিকে, মধ্যপ্রাচ্য থেকে ওরা বহু বছর ধরে তেল, গ্যাসসহ মূল্যবান সম্পদ লুণ্ঠন করে চলেছে। আরব বসন্তের স্লোগান তুলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কথা বলে মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা বিশ্ব যুদ্ধের সূচনা করেছিল। তবে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সম্পদ লুণ্ঠনের পর আরব বসন্তের স্লোগান স্তিমিত হয়ে গেছে। অথচ ইউরোপীয় ইউনিয়ন গঠনের মাধ্যমে পশ্চিমা বিশ্ব ইউরোপে শান্তি ও উন্নয়নের স্থায়ী আবহ তৈরি করেছে। আমেরিকা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে সহযোগিতামূলক অবস্থান নিতে হয়েছে এবং পশ্চিমা বিশ্বের অর্থনীতিকে চাঙ্গা রেখেছে। দক্ষিণ এশিয়াতে ভারত, পাকিস্তান, চীন ও ভারত মুখোমুখি যুদ্ধাবস্থানে রয়েছে। মাঝে মধ্যেই এসব দেশের মধ্যে সীমান্ত সংঘর্ষ যা সার্বিক যুদ্ধের শঙ্কা অব্যাহত রয়েছে। ভারত ও নেপাল এ দুটি হিন্দু অধ্যুষিত রাষ্ট্র দীর্ঘদিন যাবত সহাবস্থানে ছিল। ইতোমধ্যেই নেপালের সাথে ভারতের সম্পর্কের ফাটল তৈরি হয়েছে। সীমান্ত সমস্যা ও জলাধার নিয়ে নেপাল তার জাতীয় মানচিত্রকে পরিবর্তন করেছে এবং পরিবর্তিত মানচিত্র পার্লামেন্টে সাংবিধানিকভাবে অনুমোদিত হয়েছে। এ কারণে ভারতের সাথে নেপালের সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে। সীমান্ত সমস্যা নিয়ে ভারতের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করেছে প্রতিবেশীরা। মূলত নরেন্দ্র মোদি সরকার দিল্লির ক্ষমতায় আসার পর ভারতের রাজনীতিতে উগ্রপন্থী পরিবর্তনের সূচনা। ভারত তার পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোকে শত্রুতে পরিণত করেছে। কয়েক বছরে আমেরিকা ভারতের সাথে গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। ভারত ইতঃপূর্বে রাশিয়ার সাথে সামরিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ব্যাপক ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল। বর্তমানে আগের সে সম্পর্কের অনেকাংশে অবনতি ঘটেছে। এ দিকে অবনতিশীল পরিস্থিতিতে ভারত অব্যাহতভাবে তার সামরিকসম্ভার বৃদ্ধি করে চলেছে। ভারত ফ্রান্স থেকে অত্যাধুনিক জঙ্গিবিমান ক্রয় করে তা বিমানবাহিনীতে সংযোজন করছে। বলা যায়, বর্তমান সীমান্ত সংঘর্ষ যদি ব্যাপক যুদ্ধের রূপ লাভ করে, সে যুদ্ধে কে বিজয়ী হবে তা গৌণ। তবে এ যুদ্ধের ফলে দক্ষিণ এশিয়ার ঘন জনঅধ্যুষিত দেশগুলো রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক ক্ষেত্রে ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হবে। সে ক্ষতি পূরণ করতে কত দশক সময় লাগবে তা কারো জানা নেই। অপর দিকে, আমেরিকাসহ পশ্চিমা বিশ^ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে লাভবান হবে। সে ক্ষেত্রে সময় এসেছে অন্য সবার অনুধাবনের। সময় এসেছে রাষ্ট্রীয় আত্মোপলব্ধির। সার্বিক অবস্থা পর্যালোচনা করে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে তাদের ভবিষ্যৎকে চুলচেরা বিশ্লেষণ ও উপযুক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। পাশর্^বর্তী রাষ্ট্র হিসেবে এককভাবে কাউকে দায়ী করা যায় না। ভারতের সাথে যেহেতু পাকিস্তান, চীন, নেপাল, সিকিমের রাজনৈতিক ও সীমান্ত সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে, সে ক্ষেত্রে এ সব রাষ্ট্রের সীমান্ত সমস্যার নিরসনে বৃহৎ রাষ্ট্র হিসেবে ভারতকেই অগ্রণী হয়ে দায়িত্ব পালন করতে হবে। আলোচনার মাধ্যমে বিবাদের কারণ চিহ্নিত করে তা নিরসনের জন্য সবাইকে সচেষ্ট হতে হবে আন্তরিকভাবে। মনে রাখা প্রয়োজন, দক্ষিণ এশিয়ার এসব সমস্যা নিয়ে পশ্চিমা বিশ্ব বা আমেরিকা যদি সরাসরি হস্তক্ষেপ করার সুযোগ পায়, তার প্রতিক্রিয়া হবে আমাদের জন্য সুদূরপ্রসারী। অতি সম্প্রতি করোনা মহামারী আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছে। দক্ষিণ এশিয়া পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা জনবহুল অঞ্চল। এমনিতেই করোনা মহামারীর কারণে দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশ অর্থনৈতিকভাবে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। মানুষের জীবন-জীবিকা ক্রমান্বয়ে নিম্নমুখী। সে ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়াতে নতুন করে ব্যাপক সামরিক সংঘর্ষ শুরু হলে তার পরিণতি হবে ভয়াবহ। সে অবাঞ্ছিত পরিণতি থেকে দক্ষিণ এশিয়ার কোনো দেশই মুক্তি পাবে না।

যুদ্ধাস্ত্রের মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্র সর্বাপেক্ষা ভয়াবহ ধ্বংসাত্মক ক্ষমতার অধিকারী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষলগ্নে আমেরিকা এশিয়ার প্রভাবশালী দেশ জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকি নগরে পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল। এ নজিরবিহীন বিস্ফোরণের ক্ষয়ক্ষতি ছিল ভয়াবহ। ৭৫ বছর পরেও সে এলাকার মানুষ সে বিস্ফোরণের তেজস্ক্রিয়তার মর্মান্তিক শিকার হয়ে চলেছে। ভারত, পাকিস্তান ও চীন- এই তিনটি দেশে পারমাণবিক অস্ত্রের মজুদ রয়েছে। এ অস্ত্রের ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা আগের তুলনায় অনেক বেশি। এ দেশগুলোর মাঝে সামরিক সংঘর্ষ শুরু হলে চূড়ান্ত পর্যায়ে তা পারমাণবিক অস্ত্রের যুদ্ধের রূপ লাভ করতে পারে। যে যুদ্ধে দক্ষিণ এশিয়ার জনজীবন ও পরিবেশের ওপর ভয়াবহ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হবে। সময় থাকতে সবাই সংযত হয়ে পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ করা কর্তব্য। সে কারণে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রপ্রধানদের দূরদর্শী আচরণের মাধ্যমে উদ্ভূত পরিস্থিতি কিভাবে নিরসন করা যায়, তার রূপরেখা আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারণ করা বাঞ্ছনীয়।

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ১২:৫৩ অপরাহ্ণ | সোমবার, ২০ জুলাই ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত