ঘোষণা

মাকে নিয়ে বিক্ষিপ্ত চিন্তা ও চেতনা

| বুধবার, ১০ জুন ২০২০ | পড়া হয়েছে 33 বার

মাকে নিয়ে বিক্ষিপ্ত চিন্তা ও চেতনা

আসিফ সরকার:

১ম.

‘মা’ একটি ছোট্ট শব্দ। এই শব্দের মধ্যেই লুকিয়ে আছে পৃথিবীর সব মায়া, মমতা, অকৃত্রিম স্নেহ, আদর, নিঃস্বার্থ ভালোবাসার সব সুখের কথা। চাওয়া-পাওয়ার এই পৃথিবীতে বাবা-মায়ের ভালোবাসার সঙ্গে কোনো কিছুর তুলনা চলে না। মায়ের তুলনা মা নিজেই। মায়ের মতো এমন মধুর শব্দ অভিধানে দ্বিতীয়টি আর নেই। নদীর তলদেশে তো যাওয়া যায় কিন্তু মায়ের ভালোবাসার গভীরতা পরিমাপ করা যায় না। ‘মা’ যেন সীমার মাঝে অসীম। প্রতিবছরের ন্যায় এবারও মা দিবস এমন একটি সময়ে এসেছে যে সময়ে মায়েদের কান্নার শেষ নেই। মহান আরশের অধিপতির নিকট প্রার্থনা করি, তিনি যেন পৃথিবীর সব মায়ের কান্নাকে থামিয়ে দেন।

২য়.

মায়ের স্পর্শেই সন্তান ধীরে ধীরে পূর্ণ মানুষ হয়ে ওঠে। পৃথিবীর সব ধর্মেই মায়ের মর্যাদাকে উচ্চাসীন করেছে। ৩৬৫ দিনের প্রতিটি সেকেন্ডেই মনে করতে চাই ‘মা’ শব্দটিকে। মা, আম্মা, আম্মি, মাম্মি সন্তানেরা যে যেভাবে ডাকুক; এই শান্তির ডাক শতকিছুর বিনিময়েও অন্য কোনো শব্দের সঙ্গে তুলনা করা যাবে না। বিভিন্ন ভাষাভাষীর সন্তানের কাছে ‘মা’ ডাক শব্দটি কতই না আপন। প্রথম দিন থেকে জীবনের শেষ পর্যন্ত সন্তানের প্রতি মায়ের ভালোবাসার কোনো পরিবর্তন হয় না। মা তাই আমাদের কাছে অতুলনীয়, তিনি অনন্য। কিন্তু সেই অতুলনীয় মানুষটিকে অনেক সময় তাঁদের সন্তানেরা উপযুক্ত প্রতিদান দিতে ব্যর্থ হয়। তখনো মা আগের মতোই তাঁর সন্তানের জন্য মঙ্গল কামনা করেন।

৩য়.

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর সম্প্রসারণের ফলে আজকাল মানুষের মাঝে যে কত দিবসের জন্ম হয়েছে, তার হিসাব নেই। বাবা দিবস, মা দিবস, ভালোবাসা দিবস, বন্ধু দিবস ইত্যাদি। নাম না জানা আরও কত যে দিবস আছে! বাবা দিবসে বাবার ছবি দিয়ে অনলাইনে পোস্ট করে ক্যাপশনে লেখা হয়—‘বাবা, আমি তোমাকে অনেক অনেক ভালোবাসি।’ অথচ সেই বাবাই হয়তো জানেন না যে তাঁর সন্তান তাঁকে কতটুকু ভালোবাসে! কারণ ওই বাবার তো অনলাইন সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই। মা দিবসে লেখা হয়—‘মা, তুমি আমার জীবন।’ অথচ মা দিবসে সেই বয়স্ক মা জীবনের তোয়াক্কা না করে কষ্ট করে হলেও রান্নাঘরে উনুনের সামনে রান্না করেন। কারণ তিনি রান্না না করলে বাড়ির সবাইকে উপোস থাকতে হবে। আমার জীবনে ২৮টি বছর চলে গেছে। এই ২৮ বছরে ২৮ বার মা দিবস, বাবা দিবস চলে গেছে।

৪র্থ.

‘মা’ তোমার কথা মনে হলেই মনে পড়ে তোমার কষ্টের কথা। ছোট থেকে বড় হয়েছি, যখন থেকে বুঝতে শিখেছি, দেখেছি কোনো না কোনো ঝামেলা জড়িয়ে আছো তুমি, মধ্যবিত্ত পরিবারের মাসকাবারি গোনা টাকায় সংসার চালানোর মতো চিরন্তন সব ঝামেলা। ছোট বেলাতে তোমার এসব ঝামেলাগুলো মনে তেমন প্রভাব ফেলত না, অবুঝের মতো এটা সেটা আবদার করে ফেলতাম। অনেক ছোট ছিলাম মা, অনেক অবুঝ ছিলাম। তাই বিনা কারণেই অনেকভাবে কষ্ট দিয়েছি তোমাকে। পড়াশোনা করতাম না, স্কুলে যেতে চাইতাম না, সাইকেল নিয়ে সারা দিন রোদে রোদে ঘুরতাম। আরও অনেক কিছু করেছি, যেগুলো বলে শেষ করা যাবে না। জানি না সবকিছু তোমার মনে আছে, না ভুলে গেছ অনেক কিছু। আমার কিন্তু সবই মনে আছে মা। কিছুই ভুলিনি আমি।

৫ম.

‘মা’ বড় হওয়ার পরে একটা সময় আমি বুঝতাম আমার ভুলগুলোর কথা। হোস্টেল থেকে প্রতিবার বাসায় যাওয়ার সময় নিজেকে অনেক করে বোঝাতাম, যেন এইবার আমি তোমার সঙ্গে কোনো খারাপ ব্যাবহার না করি। যে কয়টা দিন থাকতাম, কোনো কোনোবার পারতাম, কোনো সময় পারতাম না। নিতান্তই অবুঝের মতো সাধারণ সব ব্যাপারে রেগে যেতাম তোমার সঙ্গে। পরে খুব কষ্ট হতো। সেসব কিছুই এখন অর্থহীন লাগে মা। সবকিছু ছেড়ে দিয়ে তোমার কাছে চলে যেতে ইচ্ছা করে। একসময় তো যাব দেশে, আবার হয়তো অবুঝের মতো রাগ করব তোমার সঙ্গে। অনেক কথা বলে ফেলব, যেগুলো আমার বলা কোনোভাবেই উচিত না। মাগো, আমার এই লেখায় আমি তোমাকে যেভাবে বলতে পারি, সামনাসামনি কোনো দিন এভাবে কথা বলতে পারব না। মা, আমি আমার সবকিছুর জন্য ক্ষমা চাই তোমার কাছে, যা করেছি তোমার সঙ্গে তার জন্য, যা হয়তো ভবিষ্যতে করতে পারি, তার জন্যও।

৬ষ্ঠ.

সময় কত দ্রুত চলে যায় মা। তোমার সেই দুষ্টু ছেলেটা এখন কত বড় হয়ে গেছে, আর তুমিও পেরিয়েছ ৫০টি বসন্ত। কোনো দিন কি তোমাকে এক টুকরা সুখ দিতে পেরেছিলাম মা? কেবলই মনে পড়ে তোমার সঙ্গে বিনা কারণে রাগ করে কথা বলার মুহূর্তগুলোর কথা। মা, ছোট আমি, অবুঝ আমি তোমার কাছে, আমি তোমার সন্তান, মা। তোমার কাছে ক্ষমা চাওয়ার মতো যোগ্যতাটুকুও আমার নেই।

৭ম.

শুনেছি মা আর ছেলের মাঝে অজানা একটা বাঁধন থাকে। যে বাঁধনের কারণে মা তাঁর ছেলের কথা কোনো মাধ্যম ছাড়াই শুনতে পায়। তুমিও কি আমার হৃদয় থেকে বলা কথাগুলো শুনতে পারছ মা?

৮ম.

‘মা’ তোমাকে খুব মনে ছয়টি সন্তানকে লালন–পালন করেছ, সেটি আমার দৃষ্টিতে খুবই নজিরবিহীন। আমি তখন সপ্তম শ্রেণিতে পড়ি। প্রতিদিন ফজর নামাজ শেষে পুরো বাড়িটির আঙিনা নিজের হাতে ঝাড়ু দিতে মা। একতলা ভবন আর টিনশেড বাড়িটির সামনে কিছু ফুলের গাছে (বেইলি, গন্ধরাজ, হাসনাহেনা) নিজ হাতে পানি দিতেন। তারপর আমাদের কোনো না কোনো ভাইকে বলতেন, আমার জন্য চা নিয়ে আয়। তখন সুশান ভাই নাশতার সঙ্গে আম্মার জন্য চা নিয়ে আসত। আম্মা নাশতা-চা-পান সেরে আবার পুকুরঘাটে গিয়ে থালাবাসন ধুয়েমুছে সাফ করতেন। কোনো কোনো সময় আমি আম্মাকে সহযোগিতা করতাম কিছু কাজে। আমার আম্মা সব সময় নিজের কাজ নিজেই করতে পছন্দ করতেন।

৯ম

চীনের পৌরাণিক একটা গল্প আছে। গল্পটা এমন ‘এক প্রেমিকা তার প্রেমিককে পরীক্ষা করার জন্য বলল, তোমার ভালোবাসার পরীক্ষা নিতে চাই আমি! প্রেমিক বলল, কী পরীক্ষা নেবে? সব পরীক্ষার জন্য আমি প্রস্তুত। প্রেমিকা বলল, তোমার মায়ের হৃৎপিণ্ডটা নিয়ে আসো…! প্রেমে অন্ধ ছেলেটি ছুটল মায়ের কাছে! মাকে হত্যা করে তার হৃৎপিণ্ড নিয়ে ছুটল প্রেমিকার কাছে, ভালোবাসার পরীক্ষায় পাস করতে…! পথে হঠাৎ আছড়ে পড়ল ছেলেটি। হাত থেকে ফসকে গেল মায়ের তাজা হৃৎপিণ্ডটা! ছেলেটি খুঁজে পেয়ে মায়ের হৃৎপিণ্ড হাতে নিল। তখনো ধক ধক করছে মায়ের হৃৎপিণ্ড। হাতে নিতেই তা বলে উঠল, ব্যথা পেলি খোকা?’

১০ম.

পার্থিব উপন্যাসে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় বলেছেন, ‘মানুষ যখন ভয় পায়, যখন বিপদে পড়ে, যখন মনে হয় একা তখন ভয়ার্ত শিশুর মতো মাকেই আঁকড়ে ধরে।’ সন্তানের জন্য মায়ের আবেগ অনন্তকালের। অন্যদিকে সন্তানের কাছে মায়ের কোল পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। সন্তান যত বড়ই হোক না কেন মায়ের জন্য সেই শিশুটিই থাকে। মায়ের সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ক চিরন্তন। ‘মা’ কথাটি খুব ছোট অথচ ওই শব্দই পৃথিবীর সবচেয়ে মধুরতম শব্দ; মায়ের অকৃত্রিম ভালোবাসা ও স্নেহের সাথে অন্য কোনো সম্পর্কের তুলনা চলে না।

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ১:৪০ অপরাহ্ণ | বুধবার, ১০ জুন ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত