ঘোষণা

আমাদের জ্ঞানী, মূর্খতা এবং অজ্ঞতা…

| বৃহস্পতিবার, ২৮ মে ২০২০ | পড়া হয়েছে 20 বার

আমাদের জ্ঞানী, মূর্খতা এবং অজ্ঞতা…

প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে

রবিউল আউয়াল।
১) জাপান করোনা ভাইরাস নিয়ন্ত্রন করতে সক্ষম হয়েছে, এটা সবাই মেনে নিয়েছে। এখানে কেউ নিজেকে করোনাযোদ্ধা বলে দাবি করেনি। প্রধানমন্ত্রী শিনজো অ্যাবে নিজে অর্থমন্ত্রী, স্বাস্হ্যমন্ত্রী সহ অন্যান্য মন্ত্রীদের অফিসে গিয়ে পরামর্শ করেছেন। বিশেষজ্ঞ যে কমিটি আছে, কমিটি যা বলেছে সরকার সেটাই করেছে। সবার গুরুত্ব আছে, এটাই মনে হয় উনি নিজে বুঝিয়ে দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী যখন সাংবাদিক সম্মেলন করেছেন, বিশেষজ্ঞ কমিটিরপ্রধান তার পাশে বসে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। এখানে আমরা আছে, কেউ আমি নেই, তাই জাপান যেকোন কাজে সফল।

২) প্রধানমন্ত্রী অ্যাবে প্রথমেই সরকারের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ দিয়েছেন ট্রাক চালকদের যারা সংকটের মধ্যে বিপদ জেনেও খাদ্য সরবরাহ বিঘ্নিত হতে দেননি। তাই নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের কোথাও কোন ঘাটতি হয়নি। তারপর কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন ডাক্তার-নার্সদের, আর মাথা নীচু করে দু:খ প্রকাশ করেছেন জনগনের বিভিন্ন অসুবিধার জন্য। তবে সবাইকে ধন্যবাদ দিয়েছেন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করার জন্য, আর বলেছেন এখনও অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে।
৩) প্রধানমন্ত্রী অ্যাবেকে নিয়ে কিছু সমালোচনা হয়েছে। উনি সেইগুলো মাথা পেতে নিয়েছেন। তবে সেই ভুলগুলো যেন আর না হয়, সেই চেষ্টা করবেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোন লাইভ শো হয় নাই। টকশো তেমন ছিলোনা, টেলিভিশন টকশোতে কোন সমালোচনা হয়নি, হয়েছে আলোচনা-পর্যালোচনা। সমস্যা যেহেতু সবার, সমাধানের জন্য সবাই নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করেছে। অফিস, দোকান, সকল প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারের দেয়া বিধি-নিষেধ যথাযথ পালন করেছে। বিশেষজ্ঞ কমিটি নিম্নকক্ষে (সংসদ) গিয়ে জনগনের কি কি সমস্যা হতে পারে এবং সমাধানের ব্যাপারে সরাসরি কথা বলেছেন। সবাই তার নিজের দায়িত্ব পালন করেছে। সুতরাং জাপান যেকোন সমস্যায় সমাধানের পথ তারা সবাই মিলেই সমাধান করেছে। তারা জানে সমস্যা আসলে সময় নিয়ে সবাইকে সম্পৃক্ত করে সমাধান করতে হয়। এখানে কোন আমি-আমিত্ব নেই, আছে আমরা। “দশে মিলে করি কাজ, হারি জিতি নাহি লাজ”।
সুতরাং, জাপানীজরা জ্ঞানী….
৪) তুলনা নয়, আমরা বাংলাদেশীরা কি করি। শুধু করি সমালোচনা, নিজে নিজেই বিশেষজ্ঞ। টকশো, লাইভশো কোনটা করিনি বলতে পারবেন? সকালে বলেন, এইটা সঠিক না, কিছুক্ষন পরই বলেন ঐটা সঠিক। যদি কিছু ভাল হয়, বলেছেন আমি করেছি। তাই সবার কোন অংশগ্রহন তেমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়, ফলাফল হাতেনাতে হয় পরাজিত। বাংলাদেশীরা একবারই জিতেছিলো, সেটা ১৯৭১ সালে, কারন সেখানে আমি ছিলো না, ছিলো আমরা…
৫) একটা মানুষ সব বিষয়ে জ্ঞান রাখতে পারে না, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বাংলাদেশী প্রত্যেক মানুষ সর্বজান্তা শমশের। কি বিষয়ে জানে না, এইরকম কোন বিষয় বাংলাদেশীদের অভিধানে নেই। জাপানীজ একটা বাস্তব উদাহরন দেই: ২০০৪ এ জাপানের কুমামতো শহরে পিএইচডি শুরুর দিকে। মি. ম্যাক্স অনেক বড় দোকান, দামও একটু কম। আমার বাসস্থান থেকে অনেক দূরে, সাইকেলে দোকানের মোটামুটি কাছে গিয়েছি, কিন্তু দোকানটা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। একজন জাপানীজ তরুন বয়সী ছেলেকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, মি. ম্যাক্স দোকানটা কোথায়? একটু সময় নিয়ে বলেছিলো, তার জানা নেই। সে চলে যাবার পর, ডান দিকে সামান্য উপরের দিকে ১০০ হাতের মতো দূরত্বে দেখি ইংরেজীতে লেখা মি. ম্যাক্স। তখন মনে হয়েছিলো, জাপানীজরা গাধা ধরনের, এরা দুনিয়ার ব্যাপারে তেমন খেয়াল রাখে না। পরে বুঝেছি, আসলে এরা যেটা জানে, ভাল করে শুধু সেটাই জানে, অন্যকিছু জানে না। আমরা বাংলাদেশীরা সবই জানি, আসলে কিছুই জানি না। সুতরাং আমরা কি জ্ঞানী না মূর্খ….
৬) Wife is boss…মেয়েদের আন্দাজ, ছেলেদের দেখার সমান, কোন এক কবি এটা বলেছেন। আপনি যত বড়ই অফিসার হোন আর নেতা হোন, আপনার বস কিন্তু আপনার বউ। উদাহরন: পুলিশ অফিসার হয়ে বাহিরে হাংকি-পাংকি যাই করেন, বাসায় গিয়ে বউয়ের কাছে ব্যবহার করতে হয় আসামীর মতো। আর বউ যদি অফিসার হয়, তাহলে সেটাতো Woman power কিন্তু। তাই আমি-আপনি বউয়ের জ্ঞানের কাছে কিছুই না। আপনে যে সব বিষয়ে পন্ডিতি দেখান, বউ জানে আপনার জ্ঞান কতটুকু। আমার কেন জানি মনে হয়, বাংলাদেশের সব স্বামীকে তার স্ত্রী গাধা অথবা মূর্খই মনে করে। অবশ্যই আমিও আছি, আমি কতবড় গাধা সেটা বউয়ের কাছে গেলেই টের পাই। বিশ্বাস করতে চাই, আপনি স্বামী হিসাবে গাধা এবং মূর্খ না, তবে আপনার মনে করাতে বউয়ের কাছে তেমন কিছু হেরফের হবে না।
মূর্খতা, অজ্ঞতা এবং জ্ঞানী, এই তিনটি বিষয় কাজেই প্রমানিত হয়। জাপানীজরা জ্ঞানী, আমরা কি, সেটা তো চোখের সামনে প্রমান। সবসময় নেতিবাচক সমালোচনা তাঁরাই বেশী করে, যারা অনেকটা মূর্খ, কিন্তু তারা নিজেকে ভাবে জ্ঞানী। মূর্খরাই নিজেকে জ্ঞানী মনে করে। আর আলোচনা-পর্যালোচনা তাঁরাই করে, যারা জ্ঞানী।

————–
বর্তমানে লেখক-
Distinguished Adjunct Professor at King Abdulaziz University, Saudi Arabia এবং Research Associate at Curtin University, Australia.

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ২:৩০ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২৮ মে ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত