ঘোষণা

লেখকের তীর্থযাত্রা

| সোমবার, ১৫ জুন ২০২০ | পড়া হয়েছে 30 বার

লেখকের তীর্থযাত্রা

সাইফুর রহমান :

বাংলাসাহিত্যের অন্যতম দিকপাল বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় কলকাতায় থাকতেন না। লেখালেখির সুবিধার জন্য নিজের বাসভূম তৈরি করেছিলেন কলকাতা থেকে বেশ খানিকটা দূরে, মনোরম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা ঘাটশিলায়।

জন্মস্থান বনগাঁয়ের বারাকপুরেও থাকতেন কখনো-সখনো। তাঁর সাহিত্যচর্চা কলকাতাকেন্দ্রিক হলেও কলকাতায় কখনো তিনি স্থায়ীভাবে থিতু হননি। বাংলাসাহিত্যের আরেক দিকপাল তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ও শুরুতে বীরভূমের লাভপুরে বসেই সাহিত্যচর্চা করতেন। কিন্তু একদিন তারাশঙ্করের সঙ্গে দেখা হলো বিখ্যাত চিত্রশিল্পী যামিনী রায়ের। যামিনী রায়কে চিনেছেন তো? ওই যে আমরা মেয়েদের চোখের সৌন্দর্য বোঝাতে বলি না- ‘পটলচেরা চোখ’। সেই পটলচেরা চোখ সর্বপ্রথম যিনি তুলির আঁচড়ে ফুটিয়ে তুলেছিলেন সেই হলো পটুয়া যামিনী রায়। মেয়েদের তো নিশ্চিতভাবে তার কাছে কৃতজ্ঞ থাকার কথা। সে যা হোক, প্রথম পরিচয়েই যামিনী রায় তারাশঙ্করকে বললেন, ভায়া, বীরভূমে কেন? চলে আসুন কলকাতায়। শ্মশান না হলে কিন্তু শব সাধনা হয় না, জানেন তো? প্রত্যেক সাধনায় সাধনাপীঠের প্রয়োজন হয়।

যামিনী রায় ঈষৎ হেসে পুনরায় বললেন, এ যুগে কলকাতাই হলো বাংলার সাহিত্য শিল্পের সাধনপীঠ। এখানে আসুন, কষ্ট করুন, একবেলা খেয়ে থাকুন। তবেই তো পাবেন। সেদিন যামিনী রায়ের সে কথা তারাশঙ্করের আদৌ মনঃপুত হয়নি। তারপর পাকচক্রে তাকে কলকাতাতেই কিন্তু থিতু হতে হয়েছিল। বিভূতিভূষণকেও নির্ঘাত অনেকেই প্ররোচিত করেছিলেন কলকাতায় এসে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে; কিন্তু প্রকৃতিপ্রেমী বিভূতিভূষণ তাদের কথায় কান না দিয়ে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত স্থায়ীভাবে বসবাস করেছিলেন ঘাটশিলায়। কলকাতার বাইরে থেকে অবশ্য আরও দু-চারজন সাহিত্যিক সাহিত্য সাধনা করে খ্যাতির চূড়ায় আরোহণ করেছিলেন। বিখ্যাত সাহিত্যিক সতীনাথ ভাদুড়ী বিহারের পূর্ণিয়ায় বসেই লেখালেখি করতেন।

অমিয়ভূষণ মজুমদার কোচবিহারে, শৈলজানন্দ সাহিত্যচর্চার গুরুত্বপূর্ণ অর্ধেক সময় কাটিয়েছেন কাশিতে। আর বনফুল অর্থাৎ বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় হুগলি জেলার ভাগলপুরে থেকেই সাহিত্যচর্চা করতেন। বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয়তম সাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়েরও শৈশব-কৈশোর কেটেছে এই ভাগলপুরে। ঘাটশিলা থেকে কলকাতায় এলে বিভূতিভূষণ সাধারণত উঠতেন তাঁর আত্মীয়স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের বাড়িতে। বিশেষ করে ঢাকুরিয়ার বেনী ব্যানার্জি অ্যাভিনিউয়ে প্রখ্যাত সাহিত্যিক গজেন্দ্রকুমার মিত্রের বাড়িটি ছিল তাঁর একটি অবিকল্প আশ্রয়। গজেন্দ্রকুমার মিত্র একাধারে সাহিত্যিক ও প্রকাশক। ১৯৩৪ সালে বন্ধু ও লেখক সুমথনাথ ঘোষকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন আজকের বিখ্যাত প্রকাশনালয় ‘মিত্র অ্যান্ড ঘোষ’। গজেন্দ্রকুমার মিত্র ‘কলকাতার কাছেই’ ‘উপকণ্ঠে’ ‘পৌষ ফাগুনের পালা’ ইত্যাদি উপন্যাস লিখে ততদিনে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন একজন অসামান্য উপন্যাসিক হিসেবে।

তিনি ছিলেন নিঃসন্তান, স্ত্রী প্রতিমা মিত্রও ছিলেন সুশিক্ষিত ও বিদূষী। তাদের বেনী ব্যানার্জি অ্যাভিনিউয়ের বাড়িতে প্রায়ই সাহিত্যিকদের জম্পেস আড্ডা বসত। সে সময়ের জনপ্রিয় ও খ্যাতনামা সাহিত্যিক প্রবোধকুমার সান্যাল, গৌরীশঙ্কর ভট্টাচার্যসহ আরও দু-চারজন কবি-সাহিত্যিক ঢাকুরিয়াতেই বাস করতেন বলে তাঁরা প্রায়ই এসে আড্ডা জমাতেন গজেন্দ্র নিবাসে। এ ছাড়াও কলকাতার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসতেন প্রমথনাথ বিশী, সজনীকান্ত দাস, বানী রায়, জিতেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, আশাপূর্ণা দেবীসহ বহু লেখক-সাহিত্যিক। গজেন্দ্রকুমার মিত্র ছিলেন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রধান প্রকাশক। আজও বিভূতিভূষণের প্রায় সব গ্রন্থই সুনিপুণভাবে প্রকাশ করে চলেছে মিত্র অ্যান্ড ঘোষ।

সে সব বিবেচনাতেই বিভূতিভূষণ কলকাতায় এলে বেশির ভাগ সময় উঠতেন গজেন্দ্রকুমার মিত্রের বাসভবনে। তো হয়েছে কী, এমনি করে একদিন বিভূতিভূষণ এসে যথারীতি উঠেছেন গজেন্দ্রকুমার মিত্রের বাড়িতে। মনোহরপুর, চক্রধরপুর অঞ্চলের অরণ্য ছিল বিভূতিভূষণের খুব প্রিয়। এসব অঞ্চলে তার লেখক বন্ধুদের নিয়ে যাওয়ার জন্য তিনি প্রলুব্ধ করতেন প্রায়ই। একদিন গজেনবাবুর বাড়িতে বসে এ বনাঞ্চলের রূপ সৌন্দর্যের বর্ণনা গজেনবাবুর স্ত্রীর সামনে ফলাও করে বলাতে তিনি ধরে বসলেন তিনিও যাবেন সেই অরণ্য দেখতে। স্ত্রীর আড়াল থেকেই গজেনবাবু ভ্রƒ কুঁচকে বললেন, এ কী করলেন বড়দা (বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে গজেনবাবুর পরিবার বড়দা বলেই সম্বোধন করতেন)! আপনি কী জানেন না ওইসব অঞ্চলে মহিলাদের নিয়ে যাওয়া কত অসুবিধা। এখন ঠেলা সামলান। বিভূতিবাবু একটু ভেবে বললেন, ও এই কথা! আচ্ছা দাঁড়াও আমি ঠিক করে দিচ্ছি। তারপর একটু পরই গজেনবাবুর স্ত্রী চা নিয়ে ঢুকলেন ঘরে। বিভূতিবাবু বললেন পাশে বসো বৌমা।

মনোহরপুরের সবটা গল্প তো শুনলে না। একথা বলেই তিনি কাল্পনিক নানা অসুবিধা ও বিভীষিকার এমন ছবি আঁকলেন সেই অরণ্যের তাতে স্বভাবতই একজন মহিলার আর সাহস হবে না মনোহরপুর যাওয়ার। এ ঘটনার পরপরই বিভূতিভূষণ একটা গল্প লিখে ফেললেন। সেটা ছাপা হলো পরবর্তী পূজা সংখ্যায়, নাম ‘ভালো মনোহরপুর ও খারাপ মনোহরপুর’।

উপরোক্ত কাহিনীগুলো আমাকে বলতে হলো এ কারণে যে, মাসখানেক আগে আমারও পদচরণ পড়েছিল ঢাকুরিয়ার বেনী ব্যানার্জি অ্যাভিনিউয়ের গজেন্দ্রকুমার মিত্রের সেই বাড়িটিতে। সে এক অভিজ্ঞতা বটে! ঘটনাটি ছিল আকস্মিক ও অপ্রত্যাশিত। মাস তিনেক আগে মিত্র অ্যান্ড ঘোষের বর্তমান কর্ণধার ও লেখক সবিতেন্দ্রনাথ রায়ের একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। সাক্ষাৎকারটি নেওয়া হয়েছিল কলেজ স্ট্রিটের মিত্র অ্যান্ড ঘোষের কার্যালয়ে বসে, ফলে তখন আর তার বাসভবনে যাওয়ার সুযোগ ঘটেনি। সাক্ষাৎকারটি ছাপা হওয়ার কিছুদিন পর পুনরায় ভিন্ন এক কাজে আমাকে যেতে হয় কলকাতায়।

সবিতেন্দ্রনাথ রায়ের কন্যা ইন্দ্রানী রায় মিত্র এবার নিমন্ত্রণ করলেন আমায়। ইন্দ্রানী রায় মিত্রের আরেকটি পরিচয় হচ্ছে বর্তমানে তিনি মিত্র অ্যান্ড ঘোষের কার্যনির্বাহী পরিচালক, ভীষণরকম বন্ধুবৎসল, সাহিত্যপ্রেমী ও সমাজসেবক। তবে নিমন্ত্রণটি তার বাড়িতে নয়, মুল্যাঁ রুজ নামে পার্ক স্ট্রিটের একটি রেস্তোরাঁয়। ইংরেজি ভাষাভাষীরা অবশ্য ‘মুল্যাঁ রুজ’কে বলে ‘মুলান রুশ’। যেমন ‘তুর এফেলকে’ বলে আইফেল টাওয়ার। আসলে ফরাসি ভাষাটি বেশ জটিল, বানান এক রকম অথচ উচ্চারণ অন্যরকম। বহু বছর আগে দেশ পত্রিকার পাতায় সৈয়দ মুজতবা আলী এবং সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মধ্যে র্যাঁবো লেখা হবে না হ্রে্যাঁবো লেখা উচিত তাই নিয়ে চিঠিযুদ্ধ চলেছিল বেশ কিছু দিন ধরে। আমরা উঠেছিলাম কলকাতার একেবারে প্রাণকেন্দ্রে, গ্রান্ড অবেরয় হোটেলে। সঙ্গে ছিল আমার দীর্ঘদিনের সুহৃদ ব্যারিস্টার আবদুল্লাহ মাহমুদ হাসান। হাসান সাহিত্যচর্চা যতটুকু করেন তার চেয়ে বেশি সাহিত্যের সেবক। আমার আরেক বন্ধু ব্যারিস্টার মীর হেলাল, ব্যারিস্টার হাসানসহ আমরা চার-পাঁচজন বন্ধু মিলে ‘সৃজন’ নামে একটি সাহিত্য পত্রিকাও সম্পাদনা করি। ব্যারিস্টার হাসান আর আমি আমন্ত্রিত ছিলাম সেই মধ্যাহ্নভোজে। মুল্যাঁ রুজ রেস্তোরাঁটি পার্কস্ট্রিটের বিখ্যাত অক্সফোর্ড বইয়ের দোকানের একেবারে পাশ ঘেঁষে।

ইন্দ্রানী মিত্রের রসবোধের তারিফ করতে হয়। বইয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এ মানুষটি দুপুরের আহারের জন্য রেস্তোরাঁও নির্বাচন করেছেন বইয়ের দোকানের পাশে। তার বদৌলতে আরও দুজন মানুষের সঙ্গে পরিচয় হলো। একজন তার সহধর্মক অর্থাৎ স্বামী নুর ইসলাম অন্যজন এ সময়ের বাংলা সাহিত্যের উদীয়মান নক্ষত্র বিনোদ ঘোষাল। বিনোদ ঘোষালের সঙ্গে অবশ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের সুবাধে আগে থেকেই আমার পরিচয় ছিল। সম্মুখ পরিচয় এই প্রথম। তিনি খাদ্য পরিবেশনকারীকে বেশ কয়েক প্রস্থ রসনাতৃপ্ত ব্যঞ্জনের ফরমায়েশ করে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন মুল্যাঁ রুজ নামের এই রেস্তোরাঁটি কিন্তু আহামরি কোনো রেস্তোরাঁ নয়; কিন্তু আমরা প্রায়ই এখানে আসি বলে তোমাদেরও নিয়ে এলাম এখানে। আহামরি কোনো রেস্তোরাঁ না হলেও মুল্যাঁ রুজের পরিবেশ কিন্তু চোখে পড়ার মতো। একেবারে সামনের দিকে একজন পিয়ানো বাদক পিয়ানোতে তুলেছে সুরের মূর্ছনা। আধো আলো অন্ধকারে রেস্তোরাঁর ভিতরটায় সৃষ্টি হয়েছে এক রহস্যময় পরিবেশ। একটু দূরে আমার মুখোমুখি সামনের বিস্তীর্ণ দেয়ালজুড়ে বিশাল এক ফ্রেস্কো। সাত-আটটি মেয়ে শেকলের মতো একজন আরেকজনের বাহুতে হাত ঢুকিয়ে সারবেঁধে নৃত্যরতা। তাদের সবার একটি পা ভূমিতে থাকলেও অন্য পা-টি সামনের দিকে সুদূরপ্রসারিত। ফলে নিম্নাঙ্গের গাগরাটি উঠে গেছে ঊরু পর্যন্ত এবং সবক’টি মেয়ের-ই অন্তর্বাস দৃশ্যমান। সবার দেহেই একই রকম পোশাক-পরিচ্ছেদ। হাত ধরাধরি করা নাচের এ ফ্রেস্কোটি আমাকে এ যুগের চিয়ার লিডার্সদের কথা মনে করিয়ে দিল।

হাসান আমার কানের কাছে অস্ফুট কণ্ঠে বলল, কী আশ্চর্য এমন একটি অশ্লীল ছবি এরা এখানে এঁকে রেখেছে! আমি বললাম, আসল মুল্যাঁ রুজ রেস্তোরাঁটি তো আসলে প্যারিসে। কিন্তু মজার বিষয় হচ্ছে ১৮৮৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ওটা ছিল ক্যাবারে। সেখানে নগ্ন কিংবা অর্ধনগ্ন মেয়েরা নাচত। মুল্যাঁ রুজ কথাটির অর্থ লাল উইন্ডমিল বা হাওয়াকল, ওই সময়ে ওই দিকে প্রচুর উইন্ডমিল ছিল যেগুলোতে গম, ভুট্টা বা পাথর ভাঙা হতো। শুরুর পর থেকেই ওই ক্যাবারে এত জনপ্রিয় হয় যে ১৮৯০ সালে ইংল্যান্ডের যুবরাজ, ভবিষ্যতের সপ্তম এডোয়ার্ডও সেখানে গিয়েছিলেন। ১৯৮১ সালে একদিনই মুল্যাঁ রুজ জনসাধারণের জন্য বন্ধ ছিল কারণ সেখানে সেদিন রানী এলিজাবেথ এসেছিলেন।

পোস্ট ইম্প্রেশনিস্ট শিল্পীরা এখানে এসে আড্ডা দিতেন। আইফেল টাওয়ার নামের সেই দৃষ্টিনন্দিত স্থাপনাটিও তৈরি হয়েছিল ১৮৮৯ সালে। এরপর আইফেল টাওয়ার ও মুল্যাঁ রুজের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলে কোনটি হবে ফরাসি দেশের আইকন। কালের বিবর্তনে আইফেল টাওয়ারের-ই জয় হয়। মহাত্মা গান্ধী ওই সময় লন্ডন থেকে সাতদিনের জন্য প্যারিসে এসেছিলেন। আইফেল টাওয়ার দেখে তাঁর শিল্পসম্পন্ন মনে হয়নি বরং নোত্রাদাম গির্জা দেখে তিনি মোহিত হয়েছিলেন। আমি হাসানকে বললাম, সেই ক্যাবারের ঐতিহ্য ধরে রাখতেই নিশ্চয়ই আঁকা হয়েছে এ ফ্রেস্কোটি। হাসান বলল ফ্রেস্কো আবার কী জিনিস! আমি বললাম কোনো কিছু ক্যানভাসে আঁকলে সেটাকে বলা হয় তৈলচিত্র। যেহেতু ছবিটি আঁকা হয়েছে ঘরের মূল দেয়ালে সে জন্য এটাকে বলে ফ্রেস্কো।

আচ্ছা তুমি কী যিশু খ্রিস্টের ‘দ্য লাস্ট সাপার’ চিত্রটি দেখেছ? হাসান বলল হ্যাঁ দেখেছি। লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির আঁকা তাই না। আমি বললাম হুম, ওটাও কিন্তু একটা ফ্রেস্কো অর্থাৎ ওটাও আঁকা হয়েছিল দেয়ালে। আর শোন শিল্পসাহিত্যের ক্ষেত্রে অশ্লীল ব্যাপারটি বেশ গোলমেলে ও জটিল। শ্লীল আর অশ্লীলের মধ্যে পার্থক্য কী? এ প্রশ্নের উত্তরে পিকাসো একবার বলেছিলেন উলঙ্গ নারীর চিত্র অশ্লীল নয় বরং ওটা শিল্প। কিন্তু সেই নারীর ছবিতে যদি দস্তানা অর্থাৎ হাতমোজা আঁকা হয় তবে সেটা হবে অশ্লীল। আর ‘ছবির দেশ কবিতার দেশ’ বইটিতে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কী বলেছেন, জানো তো অশ্লীলতা আসলে পোশাকে নয়, অশ্লীলতা প্রকাশ পায় মানুষের ভঙ্গিমায়। ভোজপর্ব শেষ হতে না হতেই ইন্দ্রানীদি আমাকে দাওয়াত করলেন। পরদিন রাতে খেতে হবে তার বাড়িতে। অনেক পীড়াপীড়ির পর সিদ্ধান্ত হলো রাতে নয় বরং যাওয়া হবে বিকালের দিকে।

পরদিন বিকালে একটি উবার ডেকে রওনা হলাম ঢাকুরিয়ার বেনী ব্যানার্জি রোডের গজেন্দ্রকুমার মিত্রে বাড়িতে। আমি আগেই বলেছি, বিখ্যাত সাহিত্যিক গজেন্দ্রকুমার মিত্রের কোনো সন্তানাদি ছিল না। সে জন্য গজেন্দ্রকুমার মিত্র ও তাঁর স্ত্রী সবিতেন্দ্রনাথ রায়কে পুত্রের মতো দেখতেন। তাদের মৃত্যুর আগে ঢাকুরিয়ার বেনী ব্যানার্জির এ বাড়িটি তারা উইল করে দিয়ে যান তাকে। হোটেল থেকে ঢাকুরিয়ায় যেতে সময় লাগল ঘণ্টাখানেকের মতো। বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াতেই প্রবেশের প্রধান ফটকের ওপর সাদা মার্বেল পাথরের একটি ফলক চোখে পড়ল।

সেখানে লেখা আছে ‘যশস্বী কথাশিল্পী গজেন্দ্রকুমার মিত্র ১৯০৮-১৯৯৪। এই বাড়িতে আমৃত্যু সস্ত্রীক বসবাস করেছেন। এখানেই লিখিত হয় তার শ্রেষ্ঠ রচনাগুলো রাত্রির তপস্যা, বহ্নিবন্যা, কলকাতার কাছেই, উপকণ্ঠে, পৌষ ফাগুনের পালা, পাঞ্চজন্য ইত্যাদি উপন্যাস এবং আনুমানিক তিন হাজারের মতো ছোটগল্প। এই বাড়িতে গজেন্দ্রকুমারকে কেন্দ্র করে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রবোধকুমার সান্যাল, সুমথনাথ ঘোষ, প্রমথনাথ বিশী, আশাপূর্ণা দেবী প্রমুখ সাহিত্যসেবী নিয়মিত আড্ডা জমাতেন। এই বাড়ি সাহিত্যপ্রেমীদের কাছে একটি পবিত্র স্থান।’

বসার ঘরে থেকে শুরু করে সব বাড়িজুড়ে সারি সারি সেগুন কাঠের আলমারিতে থরে থরে সাজানো রাজ্যের সব বই। খোঁজ নিয়ে জানা গেল এগুলোর মধ্যে বেশির ভাগই মিত্র অ্যান্ড ঘোষ থেকে প্রকাশিত বিখ্যাত লেখকদের বইয়ের প্রথম সংস্করণ। বিভূতিভূষণের ‘পথের পাঁচালি, আরণ্যক, ইছামতি, আদর্শ হিন্দু হোটেল’। জরাসন্ধের ‘লৌহকপাট’, অবধূতের ‘মরুতীর্থ হিংলাজ’।

তারাশঙ্করের ‘কবি’, হাঁসুলিবাকের ‘উপকথা’। প্রমথনাথ বিশীর ‘কেরী সাহেবের মুন্সি’, ‘লালকেল্লা’। সন্তোষ কুমার ঘোষের ‘কিনু গোয়ালার গলি’। বিমল মিত্রের ‘সাহেব বিবি গোলাম’, ‘কড়ি দিয়ে কিনলাম’। আরও শত শত বই। সব উপন্যাসের-ই প্রথম সংস্করণ। এতো দুর্লভ সংগ্রহ! ঘরজুড়ে বই ছাড়াও গজেন্দ্রকুমার মিত্র ও তার সতীর্থ লেখকদের অসংখ্য আলোকচিত্র। দেয়ালের এক কোণে দেখলাম সৈয়দ মুজতবা আলীর একটি তৈলচিত্র। আমি ইন্দ্রানীদিকে বললাম এটা তো বাড়ি নয় যেন একটি জাদুঘর। ইন্দ্রানীদি সহাস্য বদনে বললেন দোতলায় এসো। বসার ঘরের একপাশে একটি সিঁড়ি উঠে গেছে দোতলায়। সেই সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠে দেখলাম সবিতেন্দ্রনাথ রায় শুয়ে আছেন একটি লম্বা আরাম কেদারায়। আমি তাকে জেঠু বলে সম্বোধন করি। জেঠু আমাকে দেখেই বললেন এসো, বসো এখানে। তুমি কী জানো এই যে আরাম কেদারাটা দেখছো এটাতেই শুয়ে বিশ্রাম করতেন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। আমার শরীরে যেন রোমাঞ্চ খেলে গেল। আমি যেন চোখ দুটো মুদিত করে স্পষ্ট দেখতে পেলাম বিভূতিভূষণ শুয়ে আছেন এই আরাম কেদারায় আর গজেন্দ্রকুমার মিত্রের স্ত্রী প্রতিমা দেবী চা হাতে দাঁড়িয়ে আছেন তার সামনে। এখন থেকে ষাট-সত্তর বছর আগে বিখ্যাত সব মানুষ রক্ত মাংসের শরীরে উচ্ছ্বাসিত কণ্ঠে সাহিত্য আড্ডায় মজেছে।

নিশ্চয়ই সেসব অনেক গল্প, অনেক স্মৃতি, অনেক ইতিহাস। গজেন্দ্রকুমার মিত্রের এ বাসভবনে বসে আমার মনে পড়ল কত কায়ক্লেস অতিক্রম করে তাঁরা পৌঁছেছিলেন খ্যাতির চরম শিখরে। সেগুলো হয়তো খুব কম পাঠকেরই জানা। অর্ধাহার-অনাহারে ছুটেছেন সাহিত্যের পেছনে। জীবনে যে কত বিচিত্র কাজ করতে হয়েছে সেটা ভাবতে গেলেই গা শিউরে ওঠে। গজেন্দ্রকুমার মিত্র ও তার বন্ধু সুমথনাথ দুজন মিলে স্কুলপাঠ্য বই নিয়ে মফস্বল শহর ও গ্রামে ক্যানভাসিং করে বিক্রি করেছেন বেশ কিছুদিন। গজেন্দ্রকুমার মিত্র তার স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ‘তারপর এটা-সেটা ব্যবসার খোঁজে থাকতুম।’

একদিন দেখলুম কলেজ স্ট্রিটে এক জায়গায় ভালো ভালো উপন্যাস রাস্তায় ঢেলে বিক্রি হচ্ছে। প্রায় জলের দামে। ভালো ভালো বই বেছে বেছে কিনে নিয়ে চলে গেলাম বাইরে ভাগলপুরে, বিহারের অন্যান্য শহরেও। সুমথ সঙ্গী হলো। ভাগলপুরে বলাইদার সাহায্য পেলুম। অন্যান্য শহরেও ফল খারাপ হলো না। সব মিলিয়ে দেখলুম দুশ’ টাকার মতো লাভ হয়েছে। এই প্রথম শহরেও ব্যবসায়ে নামার সাহস পেলুম। এরপর ১৯৩৪ সালে শুরু হলো মিত্র অ্যান্ড ঘোষ নামে তাদের প্রকাশনার ব্যবসা।

লেখক : সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী।

ই- মেইল : barristershaifur@yahoo.com

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ৮:০৫ পূর্বাহ্ণ | সোমবার, ১৫ জুন ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত