ঘোষণা

জাপানে এক বাঙালী লেখিকার গল্প : কলমই যার প্রাণ-শক্তি

পি. আর প্লাসিড | বুধবার, ২২ জুলাই ২০২০ | পড়া হয়েছে 110 বার

জাপানে এক বাঙালী লেখিকার গল্প : কলমই যার প্রাণ-শক্তি

শাহীন আক্তার স্বাতী, দেশের বাড়ি ফেনী জেলার মজলিশপুর। স্বামী সংসারসহ জাপান প্রবাসী হয়েছেন ২০১২ সাল থেকে।

জাপানের মত কঠিন বাস্তবতার মত দেশে থেকেও শাহীন আক্তার নিয়মিত লেখালেখি করছেন। লেখালেখির যাত্রা শুরু তার শৈশব থেকেই। ৩য় শ্রেণি থেকেই বিভিন্ন পত্রিকায় নিয়মিত লেখালেখি করেন। ২০১৮ সালে বাংলাদেশে একুশে গ্রন্থ মেলায় প্রথম উপন্যাস গ্রন্থ প্রকাশিত হয়, যার নাম “চিলেকোঠা”।

লেখালেখির পেছনে সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন তার দাদা এম. এ. গফুর সারথী। দাদা ছিলেন একজন গীতিকার। তিনি বাংলাদেশের প্রথম সবাক চলচিত্র “মুখ ও মুখোশের” গীতিকার ছিলেন। তাছাড়া তার বাবা-মা, ভাই-বোন সবসময় তাকে লেখালেখির ব্যাপারে উৎসাহ দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন।

এ পর্যন্ত তার প্রকাশিত মৌলিক বই চারটি এবং বাংলাদেশ, ভারত মিলে বেশ কিছু সংকলন প্রকাশিত হয়েছে। মৌলিক বইগুলোর মধ্যে রয়েছে তিনটি উপন্যাস এবং একটি গল্পগ্রন্থ।

উপন্যাসগুলো হলো ১. চিলেকোঠা ২.হৃদয়স্পন্দন ৩. আহ্ মরি বাংলা ভাষা এবং গল্পগ্রন্থ হলো “ভিনদেশি তারা”।

জাপান সম্পর্কে বলতে গিয়ে জানালেন, সূর্যোদয়ের দেশ জাপান তার খুব পছন্দের একটি দেশ। মাতৃভূমি বাংলাদেশের পরই জাপানে সুন্দর একটি জায়গা তৈরি করে নিয়েছেন তিনি। এ দেশের শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি বরাবরই তাকে আকৃষ্ট করে। জাপানিজরা খুব ভদ্র এবং অমায়িক জাতি। তিনি বলেন এদের নম্রতা এবং শিষ্টাচার দেখে বিমহিত হয়েছেন। স্বাতীর ভাষ্য মতে, এরা খুব পরিশ্রমী জাতি। পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার দিক দিয়ে সেরা একটি দেশ বলা যায় জাপানকে। একসময় বাংলা সাহিত্যও জাপানে প্রভাব বিস্তার করেছিলো। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জাপানে এসেছিলেন। জাপানে বসে বাংলা সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে বাঙ্গালীদের কাছে অনেক বড় এক অনুপ্রেরণার নাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

দেশে থাকা কালে তিনি একুশে গ্রন্থ মেলায় যেতেন। দুর্ভাগ্য হলেও সত্য যে, জাপানে আসার পর দীর্ঘ আট বছর পর্যন্ত দেশের বই মেলাতে যাওয়ার সুযোগ হয়নি। এ বছর দেশের বই মেলাতে যাবার সৌভাগ্য হয়েছে। মেলায় উপস্থিত থেকে নিজের লেখা বই স্পর্শ করার সুযোগ হয়েছে তার। তার পরবর্তি উপন্যাস জাপান এবং বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে লিখছেন। বাংলাদেশের একটি সাধারণ মেয়ের জীবনের গল্প। তাছাড়া একটি শিশুতোষ ছড়ার বই প্রকাশের ইচ্ছা রয়েছ, সেজন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

জাপানে তার কাজের অভিজ্ঞতা খুবই বৈচিত্রপূর্ণ এবং কিছুটা হৃদয়বিদারক। ইংরেজি সাহিত্যে পড়াশোনা শেষ করে দেশে দীর্ঘদিন শিক্ষকতা পেশায় নিয়জিত ছিলেন কিন্তু জাপানে এসে সম্পূর্ণ ভিন্ন পেশায় কাজ করা শুরুতে খুব কষ্টদায়ক ছিলো। তবে জাপানিজদের সাথে কাজ করে যথেষ্ট অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করার সুযোগ হয়েছে তার।

জাপানে স্বামী সংসার নিয়ে তার লেখালেখির পথটা শুরুতে মসৃণ হলেও পরবর্তিতে তাকে দূর্গম পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। তার বর্তমান সমাজে একজন বিবাহিতা নারীকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়। অনেক বাঁধা অতিক্রম করতে হয়। তিনিও এর ব্যতিক্রম নয় বলে জানালেন। তবে তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন, যদি আত্মবিশ্বাস ও প্রবল ইচ্ছাশক্তি থাকে তাহলে সকল বাঁধা অতিক্রম করা যায়। একজন নারী কখনও পুরোপুরি স্বাধীন নয়। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর স্বাধীনতা ও ক্ষমতা সব সময় হরণ করার চেষ্টা করা হয়েছে। সে জন্যই নারীশিক্ষা অতীব জরুরী এবং পাশাপাশি স্বাবলম্বী হওয়া।

একজন নারী লেখক হিসেবে তিনি অবশ্যই নিজেকে আলাদা ভাবেন। স্রোতের সাথে গা ভাসিয়ে নিজেকে বিলিয়ে না দিয়ে আপন সত্ত্বাকে সাথী করে সৃষ্টিশীল কাজ করে যাচ্ছেন তিনি সর্বদা। সব বাধাকে তুচ্ছ করে কলমকে অস্ত্র বানিয়ে বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করছেন প্রতিনিয়ত। এটা কজনইবা পারে? তিনি সবসময় চ্যালেঞ্জ নিতে ভালোবাসেন। স্রোতের বিপরীতে যুদ্ধ করার অসংখ্য অভিজ্ঞতা আছে জীবনের প্রতিটি পরতে পরতে তার।

লেখালেখির স্বীকৃতি হিসেবে স্কুল পর্যায়ে ‘মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর’ থেকে পেয়েছিলেন বিশেষ সম্মাননা পুরস্কার। ২০১৭ সালে ‘লেখকবাড়ি গল্প প্রতিযোগিতায়’ পেয়েছিলেন সেরা দশ লেখকের পুরস্কার। ২০১৯ সালে ‘স্বরলিপি সাহিত্য গ্রুপ’ থেকে পেয়েছিলেন “সেরা লেখিকার” সম্মাননা পুরস্কার। তাছাড়া বিভিন্ন সাহিত্য গ্রুপ থেকে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় পেয়েছেন পুরস্কার।

শাহীন আক্তার স্বাতী জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে মাস্টার্স করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন সময়েই একটি আবৃত্তি সংগঠনের সাথে জড়িত হন এবং দীর্ঘদিন সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের সাথে জড়িত ছিলেন।

জাপানে বাংলাদেশি কমিউনিটির লোকদের সম্পর্কে বলেন, বাংলাদেশীরা সবাই বেশ আন্তরিক। প্রবাস জীবনে সবাই সবার সাথে হৃদ্যতার সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করে। এক সময় প্রবাসী কমিউনিটির বিভিন্ন উৎসব নিয়ে দেশর পত্রিকাগুলোর প্রবাস পাতায় আর্টিকেল লিখতেন। পরবর্তিতে নিজের বই প্রকাশের ব্যস্ততার জন্য আর্টিকেল লেখার সুযোগ হয়না।

তার লেখালেখি নিয়ে ভবিষ্যত পরিকল্পনা হলো ‘নারী এবং শিশু’। তিনি তার লেখার মাধ্যমে সমাজের অন্ধকার দিকগুলো তুলে ধরতে চান। তার কলম যেনো মশাল হয়ে তাকে পথ প্রদর্শন করে। সেজন্য সবার কাছেই তিনি দোয়াপ্রার্থী।

লেখক: জাপান প্রবাসী

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ৮:২৪ অপরাহ্ণ | বুধবার, ২২ জুলাই ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |