ঘোষণা

ড. এমাজউদ্দিন স্যার বেশ কয়েকবার বলেছিলেন বাসায় যেতে, যাওয়া হলো না

অনলাইন ডেস্ক | সোমবার, ২০ জুলাই ২০২০ | পড়া হয়েছে 34 বার

ড. এমাজউদ্দিন স্যার বেশ কয়েকবার বলেছিলেন বাসায় যেতে, যাওয়া হলো না

। পি আর প্ল্যাসিড ।

বিবেকবার্তা ম্যাগাজিন এক সময় ঢাকা থেকে প্রিন্ট করিয়ে আনা হতো জাপানে। সর্বশেষ প্রিন্ট করার দায়িত্বে ছিল বনানীতে অতীশ দীপংকর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক। তার মাধ্যমে সমস্ত কাজ করিয়ে আনার পর যখন দেখি হাজারটা ভুল রয়ে গেছে তাই
আমি দেশে বিবেকবার্তা ম্যাগাজিনের প্রিন্ট করানোর সিদ্ধান্ত বাতিল করি। যেহেতু ঢাকায় আমার আরো বেশ কিছু কাজের দায়িত্ব তাকে দিয়ে পালন করাতাম সুতরাং আমার লেখা তিনটি বইয়ের প্রকাশনা উৎসবের আয়োজন করার জন্য তাকে দায়িত্ব দিই।
দেশের বাইরে থাকি সুতরাং অনেক কিছুই দেশ থেকে আমাকে যেভাবে বলা হতো সেভাবেই বিশ্বাস করে সিদ্ধান্ত দিতাম। আর দেশে গিয়ে যেহেতু খুব বেশি দিন থাকা হয় না সুতরাং অন্যদের উপর নির্ভর করতে অনেকটা অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম। আমার সাথে এই বই প্রকাশনী উৎসব নিয়ে ভ্যানু প্রসঙ্গে কথা বললে আমি জাতীয় প্রেসক্লাব এবং ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনকে প্রাধান্য দিয়ে সমস্ত কাজ সম্পন্ন করতে বলেছিলাম এবং সুবিধা মতো তারিখও বলে দিয়েছিলাম তাকে। এরপর তারা আমার কথা অনুযায়ী ভ্যানু ঠিক করে।
অনুষ্ঠানের দিন, তারিখ এবং ভ্যানু সব কিছু ফাইনাল হলে প্রধান অতিথির কথা জানতে চাইলাম, কাকে করা হচ্ছে অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি। বলা হলো অধ্যাপক ড: এমাজউদ্দিন আহমেদ (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ভিসি) স্যারের কথা। বিশেষ অতিথির কথা জানতে চাইলে বলেছে, কবি আল মুজাহিদীর নাম। দেশে থাকা কালে আমি কবি আল মুজাহিদীকে ভালো চিনতাম তাই অতিথি নিয়ে আর কোনো দ্বিমত পোষণ করিনি তখন।
এরপর দেশে গিয়ে নিজের কাজের পাশাপাশি আমার বইয়ের প্রকাশনা উৎসবের খোঁজ খবর নিচ্ছিলাম। সাংবাদিক বন্ধুদের কাউকে কাউকে বলতে অনেকটা সময় কেটে গেলে আমি আর প্রধান অতিথি এবং বিশেষ অতিথির সাথে সরাসরি যোগাযোগ করে উঠতে পারিনি। যে কারণে অনুষ্ঠানের দিন সময় মতো ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির কনফারেন্স হলে গিয়ে অপেক্ষা করছিলাম দর্শক-শ্রেুাতা দিয়ে হল ভড়ার জন্য। অনুষ্ঠানে যাদের আসার কথা তাদের আসতে দেরী হতে দেখে মন খারাপ হচ্ছিল। প্রধান অতিথির আসতে দেরী মেনে নেয়া গেলেও হলে যদি উপস্থিতির সংখ্যা কম থাকে তবে লজ্জা পেতে হবে যে। তাই টেলিফোন করে জনে জনে যোগাযোগ করায় ব্যস্ত হয়ে উঠি সেই মুহূর্তে। কারণ, যাদের দ্বারা সেদিনের অনুষ্ঠান করিয়েছি তারা যে সব ব্যাপারে ততটা আন্তরিক নয় তা বুঝতে পারি তাদের কথা ও আচরণে।
প্রত্যাশিতদের প্রত্যেকের সাথে টেলিফোনে যোগাযোগ শেষ করে মঞ্চের এক পাশে বসে অনুষ্ঠানের সঞ্চালককে আমার সম্পর্কে এবং আমার বই সম্পর্কে ব্রিফ করছিলাম। এমন সময় প্রধান অতিথি অধ্যাপক ড. এমাজউদ্দিন আহমেদ এসে আমার পিছন দিক থেকে ধরে বললেন, সরি প্ল্যাসিড সাহেব। আমার একটু সময় দেরী হয়ে গেছে। প্রেসক্লাবে আমার একটা প্রোগ্রাম ছিল, সেটি শেষ করে বের হয়ে আসতে দেরী হয়ে গেলো যে। আমি জানি আপনি জাপান থাকেন। জাপানের মানুষেরা সময় খুব মেনটেইন করে। আমাকে ভুল বোঝবেন না। বলে পাশে খুব সহজভাবে আমাকে ধরে দাঁড়ালেন। স্যারের উপস্থিতি আমার হার্টবিট বাড়িয়ে দিছিল। তখন আমি কি রেখে কি করবো বুঝে উঠতে পারছিলাম না।
অনুষ্ঠান চলাকালে মঞ্চে যাদের বসার কথা নয় তারাই দেখি আগে গিয়ে মঞ্চে উঠে বসে আছেন আর যাঁদের বসাবো ভেবে রেখেছিলাম তাঁরা দূরে বসে তামাশা দেখার মতন দেখছিলেন। আসলে আমি বিষয়টিতে এভাবে অভ্যস্থ ছিলাম না বলে নিজেই মঞ্চে উঠতে লজ্জা পাচ্ছিলাম তখন। এরপর উপস্থিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য শিক্ষকদের সহায়তায় স্যারকে নিয়ে মঞ্চে উঠে চেয়ার টেনে বসলে তাঁর সামনে আমার বই তিনটি দিলাম। স্যার বললেন, আমি আপনার বই পড়েছি। আমি স্যারের কথা শুনে অবাক হলাম। স্যার বললেন, যেহেতু প্রকাশনা উৎসব সুতরাং আমার তো বই নিয়ে কিছু কথা বলতে হবেই আর বই যদি পড়া না থাকে বলবো কি করে, তাই রাত জেগে পড়েছি কিছুটা। বলেই নিশি গুচি পার্ক বইটির প্রথমে ব্যবহার করা একটি উক্তির নিচে লেখা ভুল নাম দেখিয়ে বললেন এটি রবীন্দ্রনাথের নয়, এখানে শরৎচন্দ্র হবে।
ভুলটি আমার চোখে পড়লেও অনুষ্ঠানে যে এই ভুল ছাপার বই নিয়ে আসবে ভাবিনি। যে কয়টা বই অনুষ্ঠানে দেওয়া হবে সে কয়টি বই ফ্লুইট দিয়ে কারেকশন করে আনার কথা ছিল। কিন্তু কেনো তা করেনি বোঝলাম না। স্যারকে বললাম, আসলে আমি ঠিক করে দিলেও এখানে যারা প্রুফ কেটেছে তারা কেনো এটা ঠিক করেনি বুঝলাম না। অনুষ্ঠান চলাকালে স্যার আমার জাপানে জীবনযাত্রা সম্পর্কে অনেক সময় ধরে সেখানে বসে কথা বলেছেন। এরপর আমার ঢাকার টেলিফোন নাম্বার চেয়ে নিয়ে বলেছিলেন একদিন সময় করে তাঁর বাসায় চা খেতে যেতে।
সত্যি কথা বলতে, আমার সেই বইয়ের প্রকাশনী অনুষ্ঠানের পর বেশ কয়েকবার বাংলাদেশে গিয়েছি। স্যারের সাথে আমার যোগাযোগও হয়েছে। টেলিফোনে কথাও হয়েছে আমার। প্রতিবারই বাসায় যেতে বলেছেন। কিন্তু একা যাবার চেয়ে সাথে কাউকে নিয়ে যাবার কথা ভেবে ঘনিষ্ঠ এক সাংবাদিককে নিয়ে যাবার জন্য যখনই তাকে আবদার করেছি তখনই স্যারের ভিন্ন রাজনীতির আদর্শ বিশ্বাস করার কারণে আমার যাওয়ায় বাধা দিয়েছেন। এতে প্রতিবারই বিষয়টির জন্য নিজেকে অপরাধী মনে হয়েছে।
আমি সবসময় নিজের রাজনৈতিক আদর্শের কথা বলতে গিয়ে খুব স্পষ্ট বলি, বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি আমার বিন্দুমাত্র ভালোবাসা বা বিশ্বাস-আস্থা কিছু নেই। তবে বঙ্গবন্ধুর বিষয়ে দুর্বলতা রয়েছে। এই কথাটি স্পষ্ট করতে সাহস যুগিয়েছি প্রয়াত বির্ষীয়ান নেতা মিজানুর রহমান চৌধুরীর বাসায় তাঁকে অসুস্থ অবস্থায় দেখতে যাবার পর তার ঘরে বঙ্গবন্ধুর ছবি দেখে যখন প্রশ্ন করেছিলাম তখন তাঁর সুন্দর উত্তর শোনার পর থেকে। মিজানুর রহমান চৌধুরী তখন কেবল এরশাদের সাথে যোগ দিয়েছেন।
বলছিলাম অধ্যাপক ড. এমাজউদ্দিন আহমেদ সম্পর্কে। তিনি হতেই পারেন একটি দলের আদর্শে বিশ্বাসী। তাই বলে তিনি একজন রাস্ট্র বিজ্ঞানের শিক্ষক হয়ে কখনও দেশকে জ্বালাও পোড়াও এর মাধ্যমে ধ্বংসের রাজনীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন না। স্যারের চাওয়াতেও ছিল ভাল রাষ্ট্র গঠনের চিন্তা চেতনা। যদিও স্যারের চিন্তা-চেতনার প্রয়োগ বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক দলই মন থেকে গ্রহণ করেনি। শুধু তাই নয়, স্যার যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ছিলেন তার অধীন সব শিক্ষক-ছাত্র কিন্তু তার বিশ্বাস করা আদর্শের দলের আদর্শ লালন করেননি। তাহলে স্যারের সাথে আমার দেখা করে কথা বললেই আমি বাংলাদেশে ভিন্ন মতের আদর্শে বিশ্বাসী হয়ে বঙ্গবন্ধুর দলের বিরোধী হয়ে যাবো এমন সিল আমার আদর্শে লাগিয়ে দেবার ভয় দেখানোর বিষয়টি তখন না বুঝলেও স্যার চলে যাবার পর মনে হচ্ছে আমরা আসলেই জ্ঞানী লোকের মর্যাদা দিতে কার্পণ্য করি, তারই প্রমাণ আমি নিজে।
স্যারের সাথে আমি যতবারই কথা বলেছি ততবার একটা কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন, তোমাদের তো রাজনীতি করার দরকার নেই। তোমাদের মতো প্রবাসীদের দেশে দরকার আছে। যাই পারো দেশের মানুষদের জন্য কিছু করে রেখে যেয়ো। স্যার চলে গেলেন। দেশের মানুষদের জন্য এখনও কিছু করতে পারিনি। জানি না শেষ পর্যন্ত কিছু করে রেখে যেতে পারবো কি না। তবে স্যারের কথাটি মনে লালন করেই চেষ্টা করছি কিছু অন্তত করতে।
স্যার যদিও সরাসরি আমার শিক্ষক ছিলেন না, তারপরেও স্যার তো স্যারই। তিনি জ্ঞান পাপীদের কাছে স্যারই ছিলেন। স্যারের সেদিনের কথাগুলো আমি ভুলতে পারছি না। যেখানেই থাকুন স্যার ভালো থাকুন। আপনার আত্মার চির শান্তি ও বেহেস্ত নসীব কামনা করছি।
——————–
লেখক: জাপান প্রবাসী।

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ১১:১৪ অপরাহ্ণ | সোমবার, ২০ জুলাই ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

হে অনন্তের পাখি

৩০ আগস্ট ২০২০