ঘোষণা

মা এখন আমাদের সাথেই আছে, সুখ দুঃখের সাথী হয়ে-মাথার ছাতা হয়ে

।শুভ্রা সাহা। | শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২০ | পড়া হয়েছে 158 বার

মা এখন আমাদের সাথেই আছে, সুখ দুঃখের সাথী হয়ে-মাথার ছাতা হয়ে

মা-বাবা প্রত্যেক সন্তানের কাছেই সব থেকে প্রিয় – একান্ত আপন জন। যেখানে অন্যআর কোন সম্পর্ক ছিনিয়ে নিতে পারে না তাদের ভিতরকার স্বেদ- বিন্দু । আমার বেলায়ও তার কোনো ব্যতিক্রম ছিল না। বাবা কঠিন -কঠোর হৃদয়বান সরলতার পীঠস্থান। মা স্নেহশীলা। তবে কখনো কখনো সেই স্নেহ যেন হঠাৎই পরিবর্তিত হয়ে যেত, স্কুলের হেড দিদিমনির দৃঢ় বাচনভঙ্গির মত। আমাদের ভাই বোনদের মধ্যে বাবার স্নেহ ভাগ হতো না। একইরকম মনে হতো। তবে লেখাপড়ার ব্যাপারে বাবা অত্যন্ত সতর্ক। সন্ধ্যাবেলা সবার পড়া কানে শোনা চাই। আমার বড়দা ফাঁকি দিতে চেষ্টা করত মাঝে মাঝে। অর্থাৎ পড়ার ঘরে বসে গল্পের বই পড়তো। আর মুখস্ত করা একটা কবিতা মাঝেমাঝে আওড়ে বাবাকে শুনিয়ে দিত। বাবা অবশ্য ধরে ফেলতেন।
মা আমার ভাইদেরই বেশি পছন্দ করতেন। খেতে বসলে বাবার পরে বড় মাছের টুকরা ভাইদের আগে দিতেন। তারপর বোনেদের দিতেন। সবশেষে নিজের পাতে নিতেন । এটাতে অবশ্য আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি ছোট সময় থেকেই। এখনও এই পরম্পরা চলে আসছে । সংসারের কাজে মা কখনো ভাইদের সাহায্য করতে বলতেন না। কারণ ওদের পড়ার ক্ষতি হবে। সব কাজে মাকে আমরা তিন বোন ই সাহায্য করতাম। দুই ভাইকে মা অতি আদরে বড় করে তুলতে থাকতেন। বড়দা কে মাঝে মাঝে লেখা পড়ার জন্য বাবার সঙ্গে মায়ের বকুনি খেতে হয়েছে। আর আমাদের খেতে হয়েছে মায়ের কাছে বকুনি সংসারের কাজের জন্য।
বাবা আমাদের ব্যাপারে যথেষ্ট যত্নশীল ছিলেন। বাবার হাতে আমরা মার খাইনি। জোরে বকুনি দিলেই ভয় পেতাম।পড়ার ফাঁকে ফাঁকে আমাদের বিভিন্ন জায়গায় বেড়াতেও নিয়ে যেতেন। কোথাও কোনো সার্কাস, এক্সিবিশন, মেলা বা কোন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হলে বাবা আমাদের সেই অনুষ্ঠানে নিয়ে যেতেন। আমাদের বাড়ি শহরতলীতে ছিল। তাই শহরের প্রোগ্রাম গুলিতে আমরা একা একা যেতে পারতাম না। বাবার সঙ্গে যেতে হতো। কোন কোন সময় মাও আমাদের সঙ্গে যেতেন।26শে জানুয়ারি প্রজাতন্ত্র দিবস আর 23শে জানুয়ারি নেতাজির জন্ম দিবসে আগরতলায় বর্ণাঢ্য মিছিল বের হতো।ঐ দুইদিন স্কুলের প্রোগ্রাম শেষ হতেই বাবা আমাদের নিয়ে সেখান থেকেই শহরের উদ্দেশ্যে রওনা দিতেন। অনেক সময় আমরা যাওয়ার আগেই মিছিল শুরু হয়ে যেত। বাবা আমাদের নিয়ে মাঝামাঝি জায়গায় বাবার বন্ধুর দোকানের সামনে দাঁড় করিয়ে দিতেন। সেটি কাপড়ের দোকান ,শ্রীগুরু বস্ত্রালয়। সারা শহরে যেখান যেখান দিয়ে মিছিল যাবে সেসব রাস্তার দুপাশে লোকের ভিড়ে ঠাসা থাকতো। আমরা ভাইবোনেরা দোকানের চেয়ারের উপরে দাঁড়িয়ে মিছিল দেখতাম। মিছিলের টেবিলগুলো আকর্ষণীয় ছিল। কোনোটা ভারতমাতা। কোন টা ক্ষুদিরামের ফাঁসি। আবার কোনটাতে নেতাজির আজাদ হিন্দ ফৌজ থাকত। বাবা আমাদের বলে বলে দিতেন কোনটা কি। ক্ষুদিরামের ফাঁসি কেন হয়েছে সেটা প্রথমে আমরা বাবার কাছেই জানতে পারি। এরকম অনেক বিষয় বাবার কাছ থেকে আমরা জেনেছি যা পরবর্তী সময়ে পাঠ্যবইতে পড়েছি। বাবা কাজের ফাঁকে সময় পেলেই আমাদের অনেক গল্প বলতেন। তবে পড়ালেখার সঙ্গে কোনো আপোস করতেন না। প্রত্যেকের পড়ার উচ্চারণ জোড়ে হতে হবে যাতে বাবা শুনতে পান। প্রত্যেক সপ্তাহে খাতা চেক করতেন। সব পাতায় লিখেছি কিনা। খাতার পৃষ্ঠা নষ্ট করেছি কিনা। আমরা তখন কাঠ পেন্সিল দিয়ে লিখতাম। কলম শুধু স্কুলের ফেয়ার কোন লেখার জন্য এবং পরীক্ষার সময় ব্যবহার করা হতো। কাঠপেন্সিল গুলো বাবা নিজে চৌখা করে দিতেন। সপ্তাহে একদিন আমাদের লাইন করে বসিয়ে নখ কেটে দিতেন। আমাদের পোশাক-পরিচ্ছদ ঠিক আছে কিনা মায়ের চেয়ে বাবাই বেশি দেখতেন। মা ভালো সেলাই জানতেন । বাবা শ্রী গুরু বস্ত্রালয় থেকে জামা প্যান্টের থান কাপড় কিনে আনতেন সবার জন্য। মা সেগুলি নিজে তৈরি করতেন। মা সেলাই নিয়ে পড়াশোনা করেছিলেন।

অবশ্য দুর্গাপূজার সময় বাবা আমাদের জন্য শহর থেকে রেডিমেড সুন্দর পোশাক কিনে দিতেন। বাবা-মার সঙ্গে দুর্গাপূজা দেখার স্মৃতি অন্যরকম ছিল।
আমাদের বার্ষিক পরীক্ষার রেজাল্টের পর বাবা ভালো রেজাল্টের জন্য সবাইকে সিনেমা দেখাতে নিয়ে যেতেন। আমাদের গ্রামের চৌদ্দ দেবতার মন্দির বিখ্যাত। সেখানে বছরে সাত দিন খারচি মেলা হয়। ছোটবেলায় সেই মেলা থেকে বাবা প্রতিবছরই আমাদের খেলনাএবং রান্নাবান্নার মাটির বাসন কিনে দিতেন।
বাবা চাকরি সূত্রে ধর্মনগরে অনেকদিন কাটিয়েছেন। সেখানকার পাহাড়ি বহু এলাকায় বাবার যাতায়াত ছিল। পরবর্তী সময়ে আগরতলায় চলে আসেন । সেখানকার পাহাড়ি ট্রাইবেল দের অনেক গল্প বাবা আমাদের মাঝে মাঝে বলতেন। একটা গল্প দুই তিন দিন লাগিয়ে বলতেন।
বাবা গাছ লাগাতে খুব পছন্দ করতেন। আমাদের বাড়িটা অনেক বড়। দুটো পুকুর। বাবা বাড়ির চারিদিকে অনেক রকম গাছ লাগিয়েছেন। অনেক ফলের গাছ লাগিয়েছেন। বাড়ির সামনে ফুলের বাগান করতেন। শাক সবজির বাগান করতেন। আমরা বাবার সাথে সাথে গাছগুলিতে জল দিতাম। বাবা সৌখিন ও ছিলেন। গান-বাজনা পছন্দ করতেন। নিজে যাত্রাও করতেন। স্বল্প সময়ে বাবার কথা বলে শেষ করা যাবে না। এখন বাবা না ফেরার দেশে থাকলেও কোন সফলতায় বাবার হাসিমাখা মুখ ঘুমের দেশ থেকে আজও আমায় প্রেরণা দেয়। এতক্ষন বাবার কথা বলতে গিয়ে মায়ের সম্পর্কে তেমন কিছুই বলা হলো না। মা এখন আমাদের সাথেই আছে, সুখ দুঃখের সাথী হয়ে- মাথার ছাতা হয়ে, বাবার সাজানো বাগিচার রক্ষক হয়ে। হয়তো সম্পূর্ণ সফলতার আনন্দ থেকে অনেক কিছু হারিয়ে গেছে, কেউ কেউ চলে গেছে না ফেরার দেশে। তবুও স্মৃতি বহন করে বাকিদের নিয়ে মা সমৃদ্ধ।

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ৮:১৩ অপরাহ্ণ | শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

হে অনন্তের পাখি

৩০ আগস্ট ২০২০