ঘোষণা

সম্পর্ক

| সোমবার, ০১ জুন ২০২০ | পড়া হয়েছে 27 বার

সম্পর্ক

শুভ্রা রায়.

গত বছর এপ্রিল মাসের দুই তারিখ , উড়িষ্যার ভুবনেশ্বরে এল.ভি. প্রসাদ আই ইনস্টিটিউটে গিয়েছিলাম। ওখান থেকেই সকাল ন’ টায় একটা ল্যান্ড লাইনে ফোন করলাম। ফোন নম্বরটা আমার বন্ধু সৌমেন হাজরা আমায় দিয়েছিল। রিং হতেই ফোন রিসিভ করে অপর প্রান্ত থেকে একজন বললেন — ‘কে বলছেন ?’ প্রনাম জানিয়ে নিজের পরিচয় দিলাম।

এরপর কুশল বিনিময়ের পর আবদার করে বলেই ফেললাম, একদিন দেখা করতে চাই আপনার সাথে। আসলে তাঁর লেখা ” সুভাষিনী” (২০০৮ ,দেশ পত্রিকা ) গল্পটিকে নাট্যরূপ দিয়ে নাটক মঞ্চস্থ করা হবে , তারই অনুমতি পত্রের জন্য এই আবদার। তিনি শুনে খুশী হলেন এবং মৌখিক অনুমতি দিয়ে কাজটি শুরু করতে বললেন । এরপর প্রতিনিয়ত ফোনে আলাপ চলতে থাকে আমাদের মধ্যে।

দেখা করার জন্য জুন মাসের দু- তারিখ স্হির হল | ৩০ শে এপ্রিল ,২০১৯ দুর্ভাগ্যজনক আমার মা চলে গেলেন পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে। নির্ধারিত তারিখে দেখা হল না আমার কাঙ্খিত মানুষটির সাথে। পরবর্তীতে ওনাকে জানালাম সব। উনি দুঃখ প্রকাশ করে আমাকে বললেন- ” আমি তো আছিই, পরে না হয় একদিন এসো”।

সব সামলে নিয়ে যখন ফোন করলাম, তখন জানতে পারলাম লেখা নিয়ে খুব ব্যস্ত তিনি। বেশী সময় বের করা বড্ড কঠিন হবে তার। আসলে এতো দূর থেকে যাবো বলে উনি কম সময় নিয়ে আমার সাথে দেখা করতে চান না। তাই কিছুদিন অপেক্ষা করতে বললেন ।

এর কয়েকমাস পর অর্থাৎ আগষ্ট মাসের তিন তারিখ রাতে হঠাৎ আমায় একজন ফোন করে বললেন, “টি.ভি খুলে দেখো তোমার প্রিয় মানুষটি ‘সেরার সেরা বাঙালি’ পুরষ্কার পেলেন। হ্যাঁ, এতক্ষণ এই মানুষটির কথাই বলছিলাম। উনি আর কেউ নন , আমার প্রত্যাশিত মানুষ , বাংলা সাহিত্যের স্বপ্নপুরুষ — শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়… ..সত্যিই সেরার সেরা | এমন মাপের একজন মানুষকে যখনই ফোন করেছি তখনই ফোন ধরেছেন, ধরতে না পারলে পরে রিং ব্যাক করেছেন। বিষয়টি ভেবে আমার খুব অবাক লাগতো !

কে আমি? কি যোগ্যতা আছে আমার ?একটি না দেখা হওয়া মেয়েকে রিং ব্যাক না করলে কি হত তাঁর ? ফোনালাপে পরিচয় মাত্র | অনেক প্রশ্ন জাগল মনে ! ভাবলাম বড় মাপের মানুষ বলেই এটা করেছেন তিনি | শুধু কি তাই ? আবার প্রশ্নের আনাগোনা চলল ! অবশেষে খুঁজে পেলাম এর উত্তর| এ কদিনের ফোনালাপে আন্তরিকতা থেকে জন্ম নিয়েছে একটি সম্পর্কের | হ্যাঁ… স্নেহের সম্পর্ক আর আমার কাছে শ্রদ্ধার সম্পর্ক | শুধু বড় মাপের মানুষ নন ,বড় মনের মানুষ আমাদের প্রিয় লেখক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় |

আগস্টের দশ ২০১৯ , যোধপুর পার্কের বাড়িটার সামনে দাঁড়িয়ে আনন্দে মনটা ভরে গেল আমার। দুরুদুরু বুকে ফোন করলাম প্রত্যাশিত মানুষটিকে। ওপার থেকে নয়, ওপর থেকে ভেসে এলো সেই কন্ঠস্বর, ” হ্যাঁ বলো”। বললাম আমি আপনার বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে |

নীচ থেকেই শুনতে পেলাম, কাউকে দরজাটা খুলে দিতে বলছেন। এরপর ভিতর থেকে দরজা খুলে দিলো একজন। ঘরে ঢুকতেই একগাল হেসে বললেন, ” চিনতে অসুবিধে হয়নি তো”? না, যেভাবে ঠিকানা দিয়েছেন তাতে সহজেই সবাই চলে আসতে পারবে। হয়তো একটু অবাক হলেন ! নয়তো ভাবলেন কি ডাকাবুকো মেয়ে… আসলে বিনা অনুমতিতে চলে আসবো বুঝতেই পারেননি | এ কদিনের আলাপে মানুটি বড্ড আপন হয়ে গেছে যে | তাই আমার এই অধিকার আর তার থেকেই এই কান্ড ঘটাবার সাহস | খুব খুশী হয়েছেন বুঝতে পারলাম | এতক্ষণে আমার ভয়টাও কেটে গেছে। আশীর্বাদ নিলাম।

অনেক আলোচনা হল তাঁর গল্প ‘সুভাষিনী’ নিয়ে। অনুমতিসহ শুভেচ্ছাপত্র দিলেন আমাকে। আলাপ করালেন তাঁর স্ত্রী-কন্যার সাথে।এতো দূর থেকে আমি তাদের সাথে দেখা করতে গেছি শুনে খুব খুশি হলেন। অনেক অভিযোগ সহ না বলে চলে আসা ,সব জানালাম সোনামন (স্ত্রী) দিদিভাইকে | বড় আপন করে নিয়ে জড়িয়ে ধরলেন আমায়। এক মুহুর্ত বুঝতে দেননি, আমি আজই ও বাড়িতে প্রথম। অদ্ভুত এক অনুভূতি।

খুব ভালো থাকুন আপনারা। শ্রদ্বা সহ এক আকাশ ভালোবাসা রইল | ফেরার পালা। একরাশ বিষন্নতা নিয়ে উঠে দাঁড়াতেই শুনলাম, ” আবার আসবে তো?” বড় আপনজনের কথা। গলা ধরে এল। বললাম — অবশ্যই , আবার আসবো | এটাই বোধহয় সম্পর্ক।
—————-
লেখক, একজন নাট্য শিল্পী
ভারত, পশ্চিমবাংলা, নদীয়া, কৃষ্ণনগর |

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ৪:২৩ অপরাহ্ণ | সোমবার, ০১ জুন ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত