ঘোষণা

 ফুটপাথ

   রাণা চ্যাটার্জী, | বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২০ | পড়া হয়েছে 256 বার

 ফুটপাথ
“ও দিদি আমার বাচ্চাটাকে দেখেছো গো!”-ফুলকির ঘুম জড়ানো গলা শুনেই চমকে উঠেছে রেশমা।
” মাঝরাতে দুধের শিশু কোথায় যাবে রে”- বলেই পাশের বিছানা থেকে আওয়াজ দিলো সে। অনিশ্চয়তার জীবনের সহযাত্রী তারা। তিলোত্তমা সুন্দরী সুসজ্জিত কলকাতার রাতের মোহময় রূপের প্রত্যক্ষ সাক্ষী এই ফুটপাতে রাত কাটানো মানুষগুলো। রক্তের সম্পর্কের না হলেও একে অপরের খুব কাছের,আপনজন। কুমারী মা ফুলকির সাথে লেপ্টে শুয়ে থাকা বাচ্চাটা নেই শুনে পড়শী রেশমার বুকটা ভয়ে কেঁপে উঠলো। তবে কি কন্যা ভ্রূণ হত্যা প্রবণতার সভ্য সমাজে পুত্র সন্তান চাহিদার প্রভাবে ছেলে চুরি! আবার শুরু হলো ফুটপাতে দুষ্ট চক্রের দাপাদাপি ভেবে গলা শুকিয়ে যাচ্ছে তার।
রাত নামলেই ফুটপাতে প্লাস্টিক ঘিরে অস্থায়ী বিছানা বানায় ওই খোলা আকাশের নিচে রাত কাটানো চালচুলোহীন কিছু পরিবার। সারাদিন ঘুরে ঘুরে কাগজ কুড়িয়ে কখনো সামনের ফাঁকা মাঠে শুয়ে বসে  কাটিয়ে দেয় ওরা। ঝুপ করে রাত নামলে, শূন্যতা গ্রাস করলে শহরের রাস্তা, উঠে আসে ফুটপাতে। স্তপাকৃতি ঢাকা দেওয়া তাদের যৎসামান্য ছেঁড়া কম্বল, চট বিছিয়ে ঘুম ঘুম চোখে রাতের শোওয়ার  আয়োজন যেন তাদের কাছে অপেক্ষা শেষে কিছু পাওয়ার স্বর্গীয় অনুভূতি।  কি অদ্ভত ভাবে এই না পাওয়াদের মধ্যে সামান্য পাতলা শত ছিদ্র প্লাস্টিকই হয়ে ওঠে তাদের প্রাইভেসি রক্ষার একমাত্র সম্বল।
কাঁদতে কাঁদতে তখনো ফুলকি একনাগাড়ে তার বুড়ো বাপটাকে গুঁতো মেরে উঠিয়েই চলেছে- ” কইগো বাবা ওঠো, আমার বাচ্চাটাকে দেখছি না! “- বলে এদিক ওদিক সামনের মাঠ, ঝোপ হন্যে হয়ে খুঁজে চলেছে! এ যেন একাকী নিশুত রাতে কুমারী মায়ের  সন্তান আগলে রাখার লড়াই। গায়ে ফোঁটা ফোঁটা  বৃষ্টি পড়তে যেই ঘুম ভেঙেছে ফুলকি দেখে বাচ্চা নেই পাশে! কি অবাক কান্ড তবে কি কুকুর বেড়ালে টান মারলো-ভাবতেই ছ্যাৎ করে উঠল মায়ের মন। অপুষ্ট খোলা বুকে দুধ না পেয়ে ঘ্যান ঘ্যান করে  সনু ঘুমানোর পর ক্লান্ত  ফুলকির চোখ জুড়ে নেমে এসেছিল কাল ঘুম। রাতের খাবার না জোটায় কি আশ্চর্যজনক ভাবে সে স্বপ্ন দেখছিল সামনের মাঠ জুড়ে বিয়েবাড়ির প্যান্ডেল এলাহী খাবারের আয়োজন, ভাগ্যিস আচমকা বৃষ্টির ফোঁটা।
“সেকিরে বিছানা থেকে কোথায় গেল আমাদের সনু, জলজ্যান্ত শিশুটা”- বলেই  ছুটে এসেছে চোখ রগড়ে পড়শী রেশমা, ভবানী, ল্যাংড়া,ভুতু। রামু চাচা টর্চ জ্বেলে জোরালো আলো এদিক ওদিক ফেলতেই রাস্তার ওপারে চোখ চলে যায় ফুলকির! সকলে অবাক হয়ে দেখে সবে হাঁটতে শেখা ছোট্ট পায়ে তাদের আদরের পুঁচকে সনু ডাস্টবিনের কাছে ধপ করে বসে হাতে মুখে ভাত মাখছে।
দুটো কুকুর মুখে করে টেনে এনেছে একটা আধ খাওয়া বিরিয়ানি প্যাকেট  যা হয়তো কেউ গাড়ির কাঁচ খুলে ছুঁড়ে ফেলেছে খানিক আগে। সামনে সুগন্ধি ভাতের গন্ধ পেয়ে দেড় বছরের ক্ষধার্ত সনু হামলে পড়েছে প্যাকেটের দিকে। মানুষ নয় বলেই হয়তো সম্মান দিয়ে  কুকুরদুটো সরে গেল বাচ্চাটাকে খাবার দিয়ে । মধ্যরাতে খাবারের জন্য মানুষ ও সারমেয়র কি অসামান্য বোঝাপড়া। ঝিরঝিরে বৃষ্টি, উঁচু উজ্জ্বল আলোর বাতি স্তম্ভের নিচে হাতে ভাত মেখে যেন উলঙ্গ এক দেব শিশু।

লেখকঃ রাণা চ্যাটার্জী,
Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ১০:৩২ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

মালতি

২৫ জুলাই ২০২০

চন্দ্রাবলী

১৬ নভেম্বর ২০২০

বাটপার

১৩ আগস্ট ২০২০

সোনাদিঘি

১৪ জুলাই ২০২০

বিটলবণের স্বাদ

২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০

ফেরা

১৪ মার্চ ২০২০

জোছনায় কালো ছায়া

০৪ সেপ্টেম্বর ২০২০

রূপকথা

২৬ এপ্রিল ২০২০