ঘোষণা

করোনাতে কি শিক্ষা হবে মানবজাতির?

| সোমবার, ০১ জুন ২০২০ | পড়া হয়েছে 22 বার

করোনাতে কি শিক্ষা হবে মানবজাতির?

আবু তাহের খোকন : সমগ্র বিশ্ব জুড়ে বর্তমানে আতঙ্কের নাম করোনা ভাইরাস। গোটা বিশ্বে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ক্রমশই বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইতিমধ্যে বহু মানুষের এই ভাইরাস মৃত্যু হয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর সংখ্যা ৩ লাখ ৭৩ হাজার ৯৭২ জন। সেই সঙ্গে সারা বিশ্বে আক্রান্তের সংখ্যা ৬১ লাখ ৮৪ হাজার ৫৬৪ জন। তবে এই করোনাই প্রথম নয় এর আগেও বহু মহামারীর মুখোমুখি হয়েছে সমগ্র বিশ্ব।

১. খ্রিষ্টপূর্ব ৪৩০ অব্দ: এথেন্স
পেলোপনেসিয়ান যুদ্ধের সময় খ্রিষ্টপূর্ব ৪৩০ অব্দে একটি রোগ মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছিল। বর্তমানের লিবিয়া, ইথিওপিয়া ও মিসর ঘুরে তা গ্রিসের রাজধানী এথেন্সে ছড়িয়ে পড়েছিল। এ রোগে ওই অঞ্চলের মোট জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের মৃত্যু হয়। ওই রোগের মূল লক্ষণ ছিল জ্বর, প্রচণ্ড তেষ্টা, গলা ও জীব রক্তাক্ত হওয়া, ত্বক লালচে হয়ে যাওয়া ও ক্ষত সৃষ্টি। ধারণা করা হয়, এটি ছিল টাইফয়েড জ্বর। বলা হয়ে থাকে, এমন মহামারির কারণেই স্পার্টানদের কাছে যুদ্ধে হারতে হয়েছিল এথেনিয়ানদের।

২. ৫৪১ খ্রিষ্টাব্দ: জাস্টিনিয়ান প্লেগ
মিসরে প্রথম এই রোগ মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ে। সেখান থেকে ফিলিস্তিন ও বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এই মহামারি। পরে পুরো ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে এই প্লেগ তাণ্ডব চালায়। সম্রাট জাস্টিনিয়ান ওই সময় রোমান সাম্রাজ্যের সঙ্গে বাইজেন্টাইনকে একীভূত করার পরিকল্পনা করছিলেন। মহামারিতে সব ভেস্তে যায়। শুরু হয় অর্থনৈতিক সংকট। এই রোগ পরবর্তী আরও দুই শতাব্দী ধরে বিভিন্ন সময়ে মহামারি আকার নিয়েছিল। মারা গিয়েছিল প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ। তখনকার হিসাবে এটি ছিল পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ২৬ শতাংশ। এই প্লেগের মূল বাহক ছিল ইঁদুর। মূলত মানুষের চলাচলের মাধ্যমে এই রোগ ছড়িয়ে পড়ে এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে।

৩. একাদশ শতাব্দী: কুষ্ঠ
কুষ্ঠরোগের অস্তিত্ব ছিল আগে থেকেই। কিন্তু মধ্যযুগে ইউরোপে এই রোগ মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছিল। কুষ্ঠ ব্যাকটেরিয়াজনিত একটি রোগ। অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কারের আগ পর্যন্ত কুষ্ঠ ছিল প্রাণঘাতী রোগ। বর্তমানেও বছরে লাখ লাখ লোক কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে। কিন্তু অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার আর এই রোগে মানুষের প্রাণ কেড়ে নিতে পারে না।

৪. দ্য ব্ল্যাক ডেথ: ১৩৫০ সাল
এই মহামারিতে তৎকালীন সময়ে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশের মৃত্যু হয়েছিল। একে বলা হয় একধরনের বুবোনিক প্লেগ। একটি নির্দিষ্ট ব্যাকটেরিয়া এ রোগের জন্য দায়ী। দ্য ব্ল্যাক ডেথ নামে খ্যাতি পাওয়া এই মহামারি প্রথমে এশিয়া অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল। পরে তা পশ্চিমে ছড়ায়। একপর্যায়ে পুরো ইউরোপ এই মহামারিতে আক্রান্ত হয়। আক্রান্ত এলাকায় প্রাণহানির ঘটনা এতই বেড়ে যায় যে রাস্তাঘাটে পড়ে ছিল মানুষের লাশ। এসব লাশ পচে-গলে আরেক দুঃসহ সংকট সৃষ্টি করে। শুধু এই মহামারির কারণে ওই সময়ে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স যুদ্ধ থেমে যায়। এই প্লেগে জনমিতিগত ও অর্থনৈতিক ব্যাপক পরিবর্তন হওয়ায় ধসে পড়েছিল ব্রিটিশ সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থা।

৫. দ্য গ্রেট প্লেগ অব লন্ডন: ১৬৬৫ সাল
এটিও ছিল বুবোনিক প্লেগ। এতে লন্ডনের মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশের মৃত্যু হয়। প্রাথমিকভাবে রোগের উৎস হিসেবে কুকুর-বিড়ালের কথা ভাবা হয়েছিল। রোগের আতঙ্কে তখন নির্বিচারে শহরের কুকুর-বিড়াল মেরে ফেলা হয়। লন্ডনের বন্দর এলাকায় এই প্লেগ ছড়িয়ে পড়ে।

৬. প্রথম কলেরা মহামারি: ১৮১৭ সাল
কলেরা রোগের প্রথম মহামারির শুরুটা হয়েছিল রাশিয়ায়। সেখানে এতে প্রায় ১০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। দূষিত পানির মাধ্যমে এই রোগ পরে ব্রিটিশ সেনাদের মধ্যে ছড়ায়। পরে তা ভারতে ছড়ায়, যাতে ১০ লাখের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। ব্রিটিশ উপনিবেশগুলোতেও কলেরা মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ে। স্পেন, আফ্রিকা, ইন্দোনেশিয়া, চীন, জাপান, ইতালি, জার্মানি ও আমেরিকায়ও কলেরা ছড়িয়ে পড়ে মহামারি আকারে। এসব অঞ্চলে প্রায় দেড় লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। সব মিলিয়ে ২২-২৩ লাখ লোক মারা যায়। এখানেই শেষ নয়, পরবর্তী আরও দেড় শ বছর ধরে কলেরা বিভিন্ন সময়ে কয়েক দফায় মহামারি আকারে দেখা দিয়েছিল।

৭. তৃতীয় প্লেগ মহামারি: ১৮৫৫ সাল
চীন থেকে এর সূত্রপাত হয়েছিল। পরে তা ভারত ও হংকংয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। প্রায় দেড় কোটি মানুষ এই মহামারির শিকার হয়েছিল। ভারতে এই মহামারি সবচেয়ে প্রাণঘাতী রূপ নিয়েছিল। ইতিহাসবিদেরা বলে থাকেন, এই মহামারিকে উপলক্ষ হিসেবে নিয়ে ভারতে ব্রিটিশ শাসকেরা নিপীড়নমূলক পদক্ষেপ নেয় এবং সেসবের মাধ্যমে বিদ্রোহ দমন করে।

৯.১৯১৮ সালে স্প্যানিশ ফ্লুয়ের তাড়নাতেও প্রায় অর্ধেক হয়ে গিয়েছিল বিশ্বের জনসংখ্যা ৷ জানা যায়, প্রায় ৫০০ মিলিয়ান মানুষের প্রাণ গিয়েছিল এই স্প্যানিশ ফ্লুয়ে আক্রান্ত হয়ে ৷ তবে করোনার জন্ম যেমন চীনে, তেমন অবশ্য স্প্যানিশ ফ্লু ঠিক কোথা থেকে আসে তা জানা যায় না ৷ স্প্যানিশ নামকরণ হওয়ার নেপথ্যে রয়েছে, এই ভাইরাস প্রথম পাওয়া যায় স্প্যানিশ এক সেনাবাহিনীর সেনাদের শরীরে ৷ আর তা থেকে স্প্যানিশ ফ্লুয়ের নামকরণ ৷ যা চলতি কথায় ইনফ্লয়েঞ্জা! জানা যায়, শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই সেই সময় প্রাণ গিয়েছিল প্রায় ৫০ মিলিয়ন মানুষের ৷ শোনা যায়, এই স্প্যানিশ ফ্লুতে সে সময় সবচেয়ে বেশি প্রাণ গিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রেই ৷ সে সময়ও এই ভাইরাসের সঙ্গে লড়তে অনেকটাই দেরি করে ফেলেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ৷ উড়িয়ে দিয়েছিল এই ভাইরাসের শক্তিকে ৷ তারপরই নামে মৃত্যুর অন্ধকার ৷ গোটা বিশ্বেই ভেঙে পড়েছিল চিকিৎসা ব্যবস্থা ৷ আজও সেই মহামারীর ছবি দেখতে পাওয়া যায় বিভিন্ন প্রতিবেদনে ৷

১০. এশিয়ান ফ্লু: ১৯৫৭ সাল
হংকং থেকে এই রোগ চীনে ছড়িয়ে পড়ে। পরে তা ছয় মাসের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র হয়ে যুক্তরাজ্যে ব্যাপকভাবে ছড়ায়। এ কারণে প্রায় ১৪ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়ে। ১৯৫৮ সালের শুরুর দিকে এশিয়ান ফ্লু দ্বিতীয়বারের মতো মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ে। ওই সময় এশিয়ান ফ্লুতে বিশ্বব্যাপী প্রায় ১১ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই মারা গিয়েছিল ১ লাখ ১৬ হাজার মানুষ। পরে ভ্যাকসিন দিয়ে ওই মহামারি প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছিল।

তাহলে কী ইতিহাস থেকে আমরা কিছুই শিখতে পারিনি, বা শিক্ষা নেইনি!

বিজ্ঞানীদের মতে করোনা জৈবাস্ত্র। বরাবরের মত এবারও আঙুল উঠেছে চীনের দিকে। যদি বিশ্বের অভিযোগ মেনে নেয়া হয় তাহলে এটাই কি প্রথম জৈবাস্ত্র ‘যুদ্ধ’। ধার্মিকরা বলছে ধর্মের দৃষ্টিতে মহামারী মানবজাতির উপার্জিত। পাপের ফসল। পৃথিবীতে যখন অশ্লীলতা, নাফরমানি, পাপাচার, ব্যভিচার বেড়ে যায় তখন মহামারী দেখা দেয়। আল্লাহ আজাব হিসেবেও পৃথিবীতে এই মহামারী পাঠান। পরিবেশবিদ বলছেন, পরিবেশ বিপর্যয় জলবায়ুর পরিবর্তন আর মাত্রাতিরিক্ত জনসংখ্যার ব্যাপারটি পরস্পর সম্পর্কিত। বার বার এভাবেই হেরে যাচ্ছে মানব সভ্যতা! প্রকৃতির সঙ্গে আমাদের যে কোনও লড়াই চলে না, তা নিয়ে যেন আরও কঠোরভাবে ভাবার সময় এসেছে। জলবায়ুর পরিবর্তন, পরমাণু যুদ্ধ, মহামারী কিংবা মহাকাশ থেকে ছুটে আসা অ্যাস্টরয়েড বা গ্রহাণুর আঘাত। এর যে কোন একটিই পৃথিবী থেকে মানবজাতিকে নিশ্চিহ্ণ করে দিতে পারে।

লেখক: ফটোসাংবাদিক

সৌজন্যে : বাংলাদেশ প্রতিদিন

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ৮:৩৫ পূর্বাহ্ণ | সোমবার, ০১ জুন ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত