ঘোষণা

কামাল লোহানীর সাথে উত্তাল আন্দোলনের দিনগুলি

অনলাইন ডেস্ক | বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২০ | পড়া হয়েছে 47 বার

কামাল লোহানীর সাথে উত্তাল আন্দোলনের দিনগুলি

 

পি.আর. প্ল্যাসিড

বিটিভির জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ”যদি কিছু মনে না করেন” এর জনপ্রিয় পরিচালক/ উপস্থাপক ফজলে লোহানীকে চিনেন না এমন লোকের সংখ্যা কমই ছিল সেই সময়। যে সময়ের কথা বলছি তখন বিটিভি ছাড়া বাংলার মানুষ দেশের অন্য কোন টিভি চ্যানেলের কথা শুনেছে বলে মনে হয় না। যে কারণে অল্প কিছু মান সম্পন্ন অনুষ্ঠান মানুষ দেখেছে বলে কলাকুশলীদের কথা নাম সহ মনে রেখেছে। তেমনি ভাবে ফজলে লোহানীর নামটিও ছিল আমার মুখস্থ। এ কারণেই কামাল লোহানী নামের দীর্ঘ দেহের মানুষটির সামনে যাবার পর যখন জানলাম তাঁর নাম কামাল লোহানী তখন প্রশ্ন করে বসলাম, আপনি কি ফজলে লোহানীর ভাই বা কোনো আত্মীয় হোন? উনি কোনো জবাব না দিলেও তার মেয়ে বন্যা বলেছিল, আমার চাচা হোন ফজলে লোহানী।

এর পরের কথায় আসছি। স্থান ছিল পুরানো পল্টন, রাশেদ খান মেনন এর ওয়ার্কার্স পার্টি অফিস। সময়টা ছিল বাংলাদেশে তখনকার স্বৈরাচার সরকার এরশাদ শাসনের শেষ দিক। দেশে তখন স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের ভিত কাঁপিয়ে তুলেছিল মেহনতি জনতা। মিটিং মিছিল, হরতাল, ঘেরাও, জ্বালাও, পোড়াও সব কিছুই চলছে তখন ঢাকা তথা সাড়া দেশ জুড়ে। আমি তখন থাকি ফার্মগেইট মনিপুড়িপাড়ায়।

পাড়ায় আমাদের বেকার এবং ছাত্রদের একটি গ্রুপ গড়ে তুললাম। সময় পেলেই ওদের সবাই চলে আসতো আমার বাসার সামনে একটি আম গাছ ছিল, সেই গাছের নীচে। কাঁঠাল বাগান, তালতলা, মোহাম্মদপুর থেকেও আসতো অনেকে। সেই বয়সে এমনিতেই টগবগে শরীর। কথায় কথায় রাস্তায় ব্যারিক্যাড তৈরী করে জলপাই রঙ্গের পোশাকধারীদের যাত্রা পথে বাধার সৃষ্টি করতাম। কত দৌঁড়ানি খেয়েছি ফার্মগেইট এলাকায় সেই স্বৈরশাসনের শুরু থেকে তার হিসাব নেই।

আমাদের কোন নেতা ছিল না। নিজেদের মনের তাগিদেই রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মসূচিতে একাত্বতা ঘোষণা করে রাস্তায় বেড়িয়ে আসতাম। সেই উত্তাল আন্দোলনের সময় তালতলার এক বন্ধু নাম মুরাদ, সে একদিন বলল চল পল্টন পার্টির অফিসে যাই। পার্টি বলতে আওয়ামী লীগ বা বি এন পি হলে যাবো না বললে পর মুরাদ বলল আরে চলো,  সেখানে রাজনীতি না, গান বাজনা হয়। পার্টি অফিসে গেলে সেখানে আমাদের নিয়ে নতুন একটা গোষ্ঠি গঠনের কথা বললে আমি আগ্রহ দেখালাম যেতে। প্রথম যেদিন যাই সেদিন গ্রুপের আরো কয়েকজনকে আমাদের সাথে করে নিয়ে যাই।

পল্টনের সেই অফিসে গিয়ে দেখি সেখানে সব সোভিয়েত সম্পর্কীত বই আর ম্যাগাজিনের ছড়াছড়ি। বুঝে গেলাম, কাদের পার্টি অফিস সেটা। বসার কিছু সময় পর জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জাহাঙ্গীর আলম ভাই এলেন তার কয়েকজন শিল্পী বন্ধু নিয়ে। এরপর একে একে কামাল লোহানী তার ছেলে সাগর ভাই-মেয়ে বন্যাকে নিয়ে, রাশেদ খান মেনন এলেন তার মেয়ে সূবর্নাকে নিয়ে এরপর এলেন নাট্য শিল্পি আরিফুল হক, সাংবাদিক ফয়েজ আহমেদ সহ আরো অনেকে। সবার সাথেই পরিচয় হল, শুরু হলো চা চক্র।

লোহানী সাহেব (তখন ভাই সম্ভোধন করতাম) এরশাদ সরকার সম্পর্কে ব্রিফ দিয়ে বললেন গণ শিল্পী সংস্থা নামে একটি সংগঠন করার কথা। এই সংগঠনের কাজ হবে সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের মাধ্যমে আন্দোলনকে শক্তিশালী করে তোলা। সেই থেকে আমাদের যাত্রা শুরু। আমার সাথে ছিল তখনকার ঘনিষ্ঠ বন্ধু স্বপন, জোবায়ের, আমজাদ সহ আরো কয়েকজন (কারো পুরো নাম এখন আমি মনে করতে পারছি না)।

শিল্পী আরিফুল হক আমাদের দিয়ে একটি পথ নাটক করানোর চেষ্টা করেছিলেন। দুর্ভাগ্য হলেও সত্য যে, আমাদের কেউই অভিনয়ে পাঁকা ছিলাম না। নাটকের প্রতিও আন্তরিক ছিলাম না, যে কারণে শেষ পর্যন্ত নাটক আর করা হয়নি। প্রতি সপ্তাহে আমরা পল্টনের সেই অফিসে গেলে চলতো চায়ের আড্ডা, দেশের সার্বিক অবস্থা নিয়ে আলোচনা, এরপর রিহের্সাল। পাশে বসে দেখতেন কামাল লোহানী। সেই রিহের্সালের পূর্ণতা ঘটেছিল শহীদ মিনারের পাদদেশে গেয়েছিলাম দলীয় সংগীত। অনেক গুলো গানের মধ্যে একটি গানই মনে পড়ে, ”বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা আজ জেগেছে এই জনতা” গানটির কথা। সেখানে আমাদের দলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন লোহানী সাহেব নিজে।

কামাল লোহানী সম্পর্কে বলার মত তাঁর সাথে আমি ঘনিষ্ঠ হবার সুযোগ বলতে এই অল্প সময়েই যেটুকু পেয়েছিলাম তার মধ্যে মনে হয়েছিল তিনি খুব রাগী। তবে, চেহারায় ভেসে উঠা রাগের কোন কিছুই মনে হয়নি তাঁর অন্তরে ধারন করেন। কথায় এত বেশী আন্তরিক ছিলেন যে, যে কাউকেই তিনি সহজে কাছে টানার আলাদা এক শক্তি রাখেন। দেশে যখনই যাই, যাবার পর কম বেশি আমি একবার হলেও জাতীয় প্রেসক্লাবে যাই। ক্লাবে গিয়ে চা কফি খাই বা লাঞ্চ করি ক্লাবে পরিচিত এবং ঘনিষ্ঠ কারো সাথে বসে।

মনে পড়ে একবার যাবার পর গিয়ে দেখি অডিটরিয়ামে কোনো এক প্রোগ্রাম চলছিল, আগ্রহ নিয়ে সময় ছিল বলে ভিতরে গিয়ে বসে প্রোগ্রাম দেখি। অনুষ্ঠান শেষে প্রেসিডেন্ট বিশ্বাস (তখন প্রাক্তন), নাট্যকার আরিফুল হক, কামাল লোহানী একসাথে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন হলের বারান্দায়। সামনে গিয়ে পরিচয় দিয়ে কথা বললাম। অনেকদিন পর দেখা হবার কারণে অতটা মনে রাখতে না পারলেও সব মনে করিয়ে দিলে বেশ আন্তরিকতার সাথে খোঁজ খবর নিলেন। সেবারই ওনার সাথে আমার শেষ দেখা।

সম্প্রতি একুশে গ্রন্থ মেলায় তার এক মেয়ের সাথে দেখা হলে খোঁজ খবর নিয়েছি। দেশের বাইরে থাকার কারণে ইচ্ছে থাকা সত্বেও সব সময় সবার সাথে দেখা সাক্ষাৎ বা যোগাযোগ হয়ে উঠে না। জনাব লোহানীর সাথেও হয়নি। ফেইসবুকে যখন সংবাদ দেখেছি, কামাল লোহানী আর নেই। তখন ভিতরটা আমার মোচড় দিয়ে উঠলো। মনে হলো যেনো কোন আপন আত্মীয় মারা গেছেন। তাঁর মৃত্যুতে সত্যিই দেশ একজন গুরুত্বপূর্ণ লোককে হারিয়ে অপূরণীয় ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছে।

কামাল লোহানীর যেখানে যেভাবেই থাকুন, তাঁর আত্মার শান্তি ও বেহেস্ত নসীব কামনা করি। আমিন।

———————

পি আর প্ল্যাসিড; জাপান প্রবাসী লেখক-সাংবাদিক।
২১ জুন ২০২০, রবিবার
Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ৪:৫৪ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

হে অনন্তের পাখি

৩০ আগস্ট ২০২০