ঘোষণা

জাপানের কিতা কিউসুতে আমার দিন গুলো

| বুধবার, ০৬ মে ২০২০ | পড়া হয়েছে 47 বার

জাপানের কিতা কিউসুতে আমার দিন গুলো

কে.ই. খালেদ।

সুজুকী -সান এর আলীঙ্গন মুক্ত হতেই দেখলাম ওরা একটা জাপানি সিল্কের রূমালে সবাই যে যার বটুয়া থেকে ছোট ছোট গিফ্ট প্যাকেট বের করে জমা করছে। ইতোমধ্যে ‘ আওনো-সান’ আমাকে খুঁজতে পার্কে এসে সুজুকি-সান এর আলীঙ্গনাবদ্ধ দেখে অবাক চোখে আমার বৃদ্ধ বন্ধুদের কাজ কর্ম দেখছিল। ওরা ওদের ‘ অমিয়াগে’ ( উপহার) গুলি আমার হাতে তুলে দিতে চাইলে আমি মানা করলাম। এতে ‘আওনো সেনসেই ‘ আমাকে থামিয়ে দিয়ে পোটলাটা (প্যাকেট) আমাকে গ্রহন করার ইশারা করল।

উপহারের প্যাকেটটা আমি হাতে নিতেই ওদের চেহারায় যে স্বর্গীয় আনন্দের দিপ্তী দেখতে পেলাম তা ভাষায় বর্ননা করা আমার জন্য অসাধ্য কাজ। এরপর সবাই আমাকে উদ্দেশ্য করে হাত নেড়ে কোরাসের সুরে “সায়োনারা” বলছিল। এসময় ওদের চোখে নভেম্বরের সেই গোধুলী লগ্নে যে মমতার ষ্পষ্টতা আমি দেখেছি তাতে কোন সৌজন্যতা বা লৌকিকতার ছায়া আমার চোখে পড়ে নি। সত্যিকারের অনুভূতিই সেখানে প্রকট ছিল। ‘আওনো সেনসেই’ বলছিলেন “খারিদ্দ -সান তুমি কি জান তোমাকে যে উপহার গুলি ওরা দিল তার মূল্য কত?

ছেলে মেয়ে নাতি নাতনীর জন্য এই গিফট (উপহার) গুলি ওরা নিজের কাছে রেখে প্রতিক্ষায় থেকেছে দিনের পর দিন এমন কি বছর। হয়তো আদরের ওরা আচমকা একদিন মিনামী সেনরির এই পথে যাবার সময় একবার দেখা দিতে আসবে! নতুন বছর বা কোন পার্বনে প্রিয়জনদের জন্য ছোট অথচ দামী এই প্যাকেট গুলি কিনেছে আদরের সন্তানদের জন্য। ওরা এতদিনে শেষ পর্য্যন্ত তোমার মাঝে আবিস্কার করে নিয়েছে ওদের আপনজনদের। হয়তো বুঝে ফেলেছে ব্যস্ত আধুনিক জীবনে আর সময় হবে না ওদের একটি বারের জন্য দেখা দেবার। তুমি ওদের হৃদয় ছুয়েছ। যত দিন গেছে গিফটের প্যাকেট গুলি চটকে গেছে। নতুন করে আবার প্যাকেট করেছে নতুন রাপিং টিসু দিয়ে।

দিন গিয়েছে ঐ ঝর্নার জলের মত আপন গতিতে। আসে নাই কলিজার টুকরো সন্তানেরা প্রতিক্ষায় থাকা বাবা মা দের কাছে। তাই ‘খারিদ্দ-সান’ তোমাকে অমিয়াগে (উপহার) গুলি গ্রহন করতে আমি ইশারা করেছি। ওদের তো মনটা আনন্দে ভড়ে উঠেছে ! হোক না নিজেরা শিল্পোন্নত জাপানি নাগরিক, আফটার অল ওরাতো এশিয়ান বাবা মা।”

জাপান অনেক ছোট বড় দ্বীপের মিলিত একটি দেশ। সব চেয়ে বড় দ্বীপ ‘হংসু’ । হিরোসিমা ষ্টেশন থেকে বুলেট ট্রেনে উঠে এবার আমাদের যাত্রা হংসু দ্বীপের শেষ প্রান্ত সিমনোসেকির দিকে। টোকিও, হিরোসিমা, ওসাকা, কোবে, ইয়োকোহামা ইত্যাদি বড় শহরগুলি হংসুতে অবস্থিত। হংসুর পশ্চিমে দক্ষিন দিকে প্রসারিত দ্বীপটি
“কিউসু ”নামে প্রসিদ্ধ। নাগাসাকি, কোকুরা, কুমামত এই দ্বীপের গর্বিত সব ঐতিহাসিক শহর। হংসুর পশ্চিম প্রান্তের শহর সিমনসেকির কানমন ব্রীজ আমাদের পরবর্তী গন্তব্য। সিমনসকির সর্বাধুনিক এই কানমন ঝুলন্ত ব্রীজ এবং অন্তরীপের সাগর তলদেশের সুরঙ্গের দোতলা মোটর রোড এবং রেইল রোড, এগুলো নির্মান কৌশলের জাদুঘড় আমাদের দেখানো হবে।

ছোট সাইজের জাপানিরা তাদের বড় বড় সৃষ্টির যে চমক তৈরী করেছে তা দেখা বা পর্যবেক্ষন করে জ্ঞান আহরন করাতে এও টি এস কর্তৃপক্ষ বদ্ধ পরিকর। সিমনসেকির এই অভিজ্ঞতা আত্মস্থ করার পর আমাদের নিয়ে যাওয়া হবে কিউসু দ্বীপের দানতানি কাঠের কারখানা লাম্বার এন্ড লগ প্রসেসিং এর স্বয়ংক্রীয় করাত কলের কাজ দেখতে। চল্লিশ পঞ্চাশ ফুট লম্বা আট দশ ফুট ব্যাসের দ্বৈত্য সদৃশ গাছ ধরে, তুলে, চিরে, রাদা পালিশ করে মুহুর্তে প্যাকিং করে পাঠানো হচ্ছে
ডেভেলপার কোম্পানীর ওয়্যার হাউজে।

শহরের বাইরে বেশীর ভাগ বাড়ি এখনো তৈরী হয় ঐতিহ্যবাহী জাপানি রীতির নক্সায়, কাঠের কাঠামো, ফ্লোর, দেয়াল, আসবাব, সব কাঠের। ইন্দোনেশিয়া থেকে দ্বৈত্য সাইজের কাঠ গুলিকে শৈল্পিক প্রসেসের মাধ্যমে কি অপূর্ব মনোরম রূপে রুপান্তরিত করছে কিতাকিউসুর উত্তর প্রান্তে কোকুরা শহরের এই দানতানি কাঠের কারখানা। যতই দেখছি, যাহাই দেখছি সব কিছুই স্বপ্নময় মনে হচ্ছিল যেন আমার কাছে। অতিপ্রাকৃতিক মনে হচ্ছি সবকিছ আমার কাছে। পরবর্তী কালে (এক সপ্তাহ পরেই) কিতা কিউসুর কোকুরাই হবে আমার ছয় মাসের প্রশিক্ষন এবং বাস স্থান। রাতটা আমরা কোকুরার বিখ্যাত হোটেলে কাটিয়ে লাক্সারী বাসে রওনা হব আসো সাং (পৃথিবীর সব চাইতে বড় আগ্নেয় গিরী) হয়ে বেপ্পু বা অইতা উষ্ণ প্রশ্রবনের গন্ধক মিশ্রীত পাহাড়ী ঝর্নায় স্নানে অভিজ্ঞতা নিতে।

(চলবে)

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ১২:১৪ অপরাহ্ণ | বুধবার, ০৬ মে ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |