ঘোষণা

অসাধারণ ভূমিকা রাখছে বাংলাদেশ পুলিশ

| সোমবার, ১১ মে ২০২০ | পড়া হয়েছে 26 বার

অসাধারণ ভূমিকা রাখছে বাংলাদেশ পুলিশ

মেজর জেনারেল এ কে মোহাম্মাদ আলী শিকদার পিএসসি (অব.) :

ভয়াবহ করোনার বিরুদ্ধে সম্মুখ সারিতে যারা যুদ্ধ করছেন তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন শাহাদাতবরণ করেছেন, শহীদ হয়েছেন। এসব নিয়ে ভাবতে ভাবতে অনেক দিন আগের একটা ঘটনার কথা মনে পড়েছে। ২০০৫ সালের কথা। জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়, প্রচণ্ড শীত। বনানীর কামাল আতাতুর্ক রোডে এক সুপরিচিতজনের অফিসে একদিন গল্প আর আড্ডায় কখন যে রাত সাড়ে ১১টা বেজে গেল টের পাইনি। ঘড়িতে চোখ পড়তেই মনে হলো এখনই বাসায় ফেরা উচিত। সঙ্গে গাড়ি নেই। বের হয়ে দেখি রাস্তায় মানুষজন গাড়িঘোড়া বলতে কিছুই নেই। সুনসান নীরব নিস্তব্ধ একটা পরিবেশ। একটু দূরে বনানী লেকের ব্রিজের ওপর দুজন পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে। জানা ছিল, কামাল আতাতুর্ক পার হয়ে এপারে গুলশান ক্লাবের লাগোয়া ৫৫ নম্বর সড়কে অধিক রাতেও রিকশা পাওয়া যায়। সুতরাং একটু জোরে হেঁটে ৫৫ নম্বর সড়কের মাথায় আসতেই দেখি একটি মাত্র রিকশা চাদর মুড়ি দিয়ে একজন সিটের ওপর বসে আছে। কাছে এসে জিজ্ঞাসা করতেই বলল কোথায় যাবেন। বারিধারা ডিওএইচএস বলতেই রাজি হলো। রিকশায় উঠে একটু চারদিকে তাকিয়ে দেখি একজন মানুষের চিহ্ন কোথাও নেই। আশপাশের বাড়িগুলোর নিরাপত্তা কর্মীরাও বোধহয় শীতের প্রকোপে ভিতরে ঢুকে কোথাও চুপচাপ বসে আছে। এর আগে শুনেছি এবং পত্রিকায়ও পড়েছি অনেক সময় রিকশা চালকের সঙ্গে ছিনতাইকারীদের একটা যোগাযোগ থাকে। সুযোগ পেলেই তারা কাজে লাগায়। তাই রিকশায় বসেই একটু আগবাড়িয়ে রিকশাওয়ালাকে বললাম, কোনো সমস্যা বা ছিনতাই হওয়ার কোনো ভয় নেই তো। প্রতিউত্তরে রিকশাওয়ালার কথা শুনে আমি একটু চমকেই গেলাম। বলল, স্যার আপনি এখন আমার জিম্মায় আছেন। আপনাকে নিরাপদে বাসায় পৌঁছে দেওয়ার সব দায়িত্ব আমার। এটা হলো গিয়ে ইমানি দায়িত্ব। শহীদ হয়ে যাব তবুও আপনার কোনো ক্ষতি হতে দিব না। শহীদ কাকে বলে এবং সে কেন রিকশা চালায় ইত্যাদি অনেক বিষয় নিয়ে কথা বলতে বলতে এলাম। লেখাপড়া জানা ছেলে, বাড়ি রংপুর। সেদিন রিকশাওয়ালার কথায় অভিভূত হয়ে অনেকটা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলাম। এ রকম আত্মত্যাগের সাহস ও উৎসাহ দেখলেই একাত্তরের কথা মনে পড়ে।

গল্পটি লেখার শুরুতে এ জন্য বললাম, আত্ম উপলব্ধিগত দায়িত্ববোধ এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসা একজন সাধারণ মানুষকেও কতখানি অনুপ্রাণিত করতে পারে তার একটা উজ্জ্বল উদাহরণ সেদিন পেলাম একজন রিকশাওয়ালার কাছ থেকে। ভাবতেও কত ভালো লাগে। এরাই তো আসল সোনার মানুষ। এবার মূল প্রসঙ্গে আসি। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশ আজ করোনার আক্রমণে বিপর্যস্ত ও বিধ্বস্ত। অজানা, অদেখা, কায়াহীন শত্রু করোনার আক্রমণ থেকে মানুষের জীবনের নিরাপত্তা বিধান করাই এখন রাষ্ট্রের এক নম্বর প্রধান কাজ। এ মুহূর্তে করোনার আক্রমণ থেকে বাঁচার একমাত্র মূলমন্ত্র সামাজিক ও শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা এবং যথাসম্ভব ঘরে থাকা। নিশ্চিতকল্পে শুরু থেকে বাংলাদেশ পুলিশ যেভাবে মাঠে-ময়দানে কাজ করছে তা দেখে আমার গল্পের ওই রিকশাওয়ালার কথাই বারবার মনে আসছে, শহীদ হয়ে যাব তবুও দেশের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কাজ থেকে পিছু হঠবো না। এ যেন আমাদের এক অন্যরকম পুলিশ বাহিনী। অন্য সময়ে সামাজিক অপরাধ দমন সংক্রান্ত বিষয়াদি নিয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযোগের শেষ নেই। কিন্তু আজ জাতির এই কঠিন সংকটে পুলিশ সম্পূর্ণ ঘুরে দাঁড়িয়ে প্রত্যাশিত স্বমূর্তিতে যেভাবে ভূমিকা রাখছে তা এক কথায় অসাধারণ। কথায় আছে, পুলিশ যদি সত্যিকার অর্থে মানুষের বন্ধু হয় তাহলে ওই দেশকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয় না। জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা শুধু যে সামাজিক ও শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা এবং মানুষকে ঘরে রাখা নিশ্চিতকল্পে কাজ করছে তাই নয়। সব রকম মানবিক সহায়তা নিয়ে তারা মানুষের দুয়ারে দুয়ারে হাজির হচ্ছে। ত্রাণসামগ্রী বিতরণ, অসুস্থ মানুষকে হাসপাতালে নেওয়া, কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করা এমনকি মৃত ব্যক্তির লাশ দাফনও করছে পুলিশ। আদরের ছেলেমেয়েরা যখন করোনায় আক্রান্ত বৃদ্ধ পিতা মাতাকে রাস্তার পাশে ফেলে রেখে পালিয়ে যাচ্ছে তখন পুলিশ তাদের সযত্নে তুলে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করছে। করোনায় মৃত ব্যক্তির লাশ যখন স্বজনরা নিতে আসছে না, তখন পুলিশ সেই লাশ নিয়ে যথাযথভাবে দাফন করছে। এই দৃশ্য দেখে ছোটবেলায় পড়া সেই কবিতার কথাই মনে পড়ে। ‘কোথায় স্বর্গ কোথায় নরক/কে বলে তা বহুদূর/মানুষের মাঝে স্বর্গ-নরক/মানুষেতে সুরাসুর। মানুষ আর মানবতা না থাকলে এই পৃথিবী থাকত না। মানুষকে রক্ষার মহান ব্রত পালনকালে ইতিমধ্যেই পুলিশের সাত সদস্য করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। আরও পনেরোশর বেশি সদস্য আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন আছেন। মহান সৃষ্টিকর্তা বলেছেন, যারা দেশ ও মানুষের জন্য আত্মদান করেন তাদের তোমরা মৃত বল না, তারা শহীদ। দেশ ও মানুষকে বাঁচানোর কাজ সব সময়ই ঝুঁকিপূর্ণ। সুতরাং আত্ম সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় সব কিছুই পুলিশের জন্য নিশ্চিত থাকা উচিত। পুলিশ কর্তৃপক্ষ আরেকবার সব কিছু পর্যালোচনা করে দেখতে পারেন। সুরক্ষা সামগ্রীর কোনো ঘাটতি ও ত্রুটি আছে কিনা সেটা যেমন দেখা দরকার, তেমনি দেখা দরকার সুরক্ষা সামগ্রী ব্যবহারে সদস্যদের ভিতর অনুপ্রেরণার কোনো অভাব আছে কিনা। আমি নিজের অভিজ্ঞতায় দেখেছি দেশ ও জাতির সুরক্ষায় নিজেদের ক্ষয়ক্ষতিতে বাহিনীর মনোবল কখনো ক্ষুণ্ণ হয় না, বরং সেটি শতগুণ বৃদ্ধি পায়। যে লক্ষ্য অর্জনে তারা জীবন দিয়ে গেলেন, সেই লক্ষ্য অর্জনে বাকিরা যখন আরও উদ্বুদ্ধ হবেন, তখনই ওই আত্মদান সফলতা লাভ করবে। একটু আগে যেমনটা বলেছি, পুলিশের বিরুদ্ধে শত অভিযোগ থাকলেও জাতির সংকটকালে এর আগেও আমাদের পুলিশ বাহিনী অভূতপূর্ব সফলতা দেখিয়েছে। মনে পড়ে ২০১৬ সালের ১ জুলাই গুলশানের হোলি আর্টিজানে সশস্ত্র জঙ্গিদের তা-বের কথা। গুলশান ঘটনার আগে ২০১৩ সাল থেকে জঙ্গিরা দেশব্যাপী উদারমনা এবং ভিন্নধর্মাবলম্বীদের ওপর টার্গেট কিলিং চালিয়ে কয়েক ডজন নিরীহ মানুষকে হত্যা করে। সে সময়ে দেশি-বিদেশি কিছু পক্ষ ও গোষ্ঠী উদ্দেশ্যমূলকভাবে প্রচার করতে থাকে বাংলাদেশে আইএসের মতো ভয়ঙ্কর সব জঙ্গি গোষ্ঠীর উপস্থিতি রয়েছে। যা বাংলাদেশের একক প্রচেষ্টায় দমন করা সম্ভব নয়। সে ছিল আরেক মহাদুর্যোগের সময়। আইএস বাংলাদেশে আছে, এটা সরকারের মুখ থেকে বের করতে পারলেই ষড়যন্ত্রকারীদের কেল্লাফতে। সেই দুর্যোগ মোকাবিলায়ও পুলিশ বাহিনী অসাধারণ ভূমিকা পালন করেছে।

গুলশান ঘটনার পর জঙ্গিদের বড় বড় সব পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি পুলিশ গুঁড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে। তাতে র‌্যাবের গোয়েন্দা প্রধান কর্নেল আবুল কালাম আজাদসহ কয়েকজন পুলিশ সদস্য শহীদ হয়েছেন। বিশ্ব মহলে জঙ্গি দমনে বাংলাদেশ পুলিশ এখন একটা উদাহরণ। গুলশান ঘটনার পর জঙ্গিরা যদি ওই রকম আরও দু-চারটা ঘটনা ঘটাতে পারত তাহলে ওই দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীদের কবলে পড়ে বাংলাদেশের অস্তিত্বই বিপন্ন হতো। কে বা কারা এবং কেন, কখন কী ষড়যন্ত্র করছে তা সব সময় বোঝা না গেলেও বাতাসে কান পাতলে তার কিছু আওয়াজ তো পাওয়াই যায়। গার্মেন্ট কারখানা খোলা-বন্ধ রাখা নিয়ে শ্রমিকদের জনস্রোতের পরিণতিতে করোনাভাইরাসের বিস্তৃতি কত দূর গড়িয়েছে তার পূর্ণচিত্র এখনো আসেনি। সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখী। গার্মেন্ট কারখানা খুলে দেওয়া হয়েছে। কী হবে একমাত্র খোদাই জানেন।

ইতিমধ্যে সাভার-আশুলিয়া এলাকায় বেশ কয়েকজন শ্রমিক আক্রান্ত হয়েছে। এটি এমন যে, একজনের হলে তা আর থামিয়ে রাখা কঠিন। চায়নায় প্রথম একজনেরই হয়েছিল। প্রবল যৌক্তিক অভিযোগ রয়েছে। উহান ল্যাবের কর্তৃপক্ষ শুরুতেই আমলে না নেওয়ার কারণেই সেটি এখন সারা বিশ্বের আতঙ্ক এবং ইতিমধ্যে আড়াই লাখেরও বেশি মানুষকে বধ করে ফেলেছে। মার্কিন গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর ইনফেকশাস ডিজিজ অ্যান্ড রিসার্চ পলিসি সম্প্রতি মতামত দিয়েছে করোনার কবল থেকে বিশ্ববাসী সহজেই মুক্তি পাচ্ছে না। এটি দীর্ঘমেয়াদি হবে এবং ভ্যাকসিন না আসা পর্যন্ত মানুষের মৃত্যু ঠেকানো নির্ভর করবে টিটিটিআই, অর্থাৎ টেস্ট, ট্রেসিং, ট্রিটমেন্ট এবং আইসোলেশন কার্যক্রমের সফলতা এবং তার সঙ্গে সামাজিক ও শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার ওপর। অর্থনৈতিক কারণে সব ধরনের কলকারখানা ও ব্যবসা-বাণিজ্য ধীরে ধীরে পর্যায়ক্রমে খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত অযৌক্তিক না হলেও সংক্রমণ ঠেকানোর জন্য সুরক্ষা বিধিমালা কঠোর ও যথার্থভাবে কার্যকর করতে না পারলে মানুষের মৃত্যুর মিছিল ঠেকিয়ে রাখা যাবে না। শুরুতে নারায়ণগঞ্জের লকডাউন যদি কঠোরভাবে নিশ্চিত করা যেত তাহলে দেশের অন্যান্য জায়গায় হয়তো সংক্রমণ ঠেকিয়ে রাখা যেত। নারায়ণগঞ্জ থেকে লোক যাওয়ার পরেই অন্য অনেক জেলায় সংক্রমণ শুরু হয়েছে। বাংলাদেশের পরিস্থিতি ক্রমাবনতির ভিতরেই ঈদ এসে গেছে। শুধু অর্থনৈতিক কারণে দোকানপাট এ মাসের ১৬ তারিখ থেকে খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তের সঙ্গে তাতে ঝুঁকির মাত্রা কতখানি বৃদ্ধি পাবে সেটি খতিয়ে দেখা হয়েছে কিনা জানি না। জনসংখ্যা ও তার ঘনত্ব বিচারে টিটিটিআই কার্যক্রমে আমরা এখনো অনেক পিছনে আছি। ঝুঁকি হয়তো নিতে হবে। তবে তার মাত্রা সম্পর্কে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

ঈদ আমাদের জীবনে আগে এসেছে, ইনশা আল্লাহ আগামীতেও আসবে। মানুষের জীবনের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। সব কিছু ভবিষ্যতের ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না। যা করা যায় তা দ্বিধাহীনভাবে করতে হবে। সামাজিক ও শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং তা অনুসরণে মানুষকে সজাগ ও অনুপ্রাণিত করার জন্য ব্যাপকভিত্তিক প্রচারণা দরকার। সবাইকে মাস্ক পরতে হবে। এটি নিশ্চিত করার পদক্ষেপ জরুরি। এই মর্মে ব্যাপক প্রচারণা দরকার যে আই প্রটেক্ট ইউ অ্যান্ড ইউ প্রটেক্ট মি, অর্থাৎ আমি আপনাকে সুরক্ষা দিব/আপনি দিবেন আমাকে/থাকব আমরা নিরাপদে/পরব মাস্ক সকলে। এই স্লোগানে মানুষ উদ্বুদ্ধ হলে অনেক কাজ হবে। পুলিশ বাহিনী যেহেতু মানুষের সুরক্ষায় গ্রাউন্ড লেভেলে কাজ করছে, তাই সব কর্মস্থলের জন্য এসওপি তৈরি ও মাস্ক পরিধান নিশ্চিতকল্পে তারা অগ্রণী ভূমিকা নিতে পারে। প্রয়োজন হলে এ সময়ে পুলিশের সঙ্গে আনসার এবং আরও অন্যান্য স্বেচ্ছাসেবক দল নিয়োগ করা উচিত। এ পর্যন্ত পুলিশের ভূমিকাকে স্যালুট জানাই। আশা করি জাতির এই ক্রান্তিকালে তারা আগের মতোই সফল হবে।

লেখক : রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক।

বাংলাদেশ প্রতিদিনের সৌজন্যে

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ৬:২৯ পূর্বাহ্ণ | সোমবার, ১১ মে ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত