ঘোষণা

যার কথা না বললেই নয়, তিনি স্যার গ্যাব্রিয়েল মানিক

অনলাইন ডেস্ক | বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২০ | পড়া হয়েছে 61 বার

যার কথা না বললেই নয়, তিনি স্যার গ্যাব্রিয়েল মানিক

 

পি.আর. প্ল্যাসিড

২৩ জুন ছিল স্যার গ্যাব্রিয়েল মানিক গমেজ এর তৃতীয় মৃত্যু বার্ষিকী। জাপানে আমাদের ঘড়ির কাটা ঘুরে ২২ তারিখ পেরোলেই ফেইসবুকে ভেসে এলো গাব্রিয়েল মানিক গমেজ এর ছবি, স্মৃতিকথা, মন্তব্য সহ আরো কতো কি। তিনি ছিলেন নটর ডেম কলেজে বাংলা বিভাগের শিক্ষক। বাংলাদেশের সেরা কলেজ গুলোর মধ্যে এই নটর ডেম কলেজে যারা পড়ার সুযোগ পেয়েছেন তাদের অধিকাংশই আশা করি এই গ্যাব্রিয়েল মানিক স্যারের ক্লাস পেয়েছেন। তাদের কোনো ভাবেই স্যারকে ভোলার কথা নয়। অধ্যাপক গরীব নেওয়াজ, হামিদ স্যার এবং গাব্রিয়েল মানিক স্যারের কথা আশা করছি কেউ ভুলে যান নি। তদ্রুপ আমিও ভুলিনি।

১৯৮০ তে নাগরী সেন্ট নিকোলাস হাই স্কুল থেকে এস এস সি পাশ করে নটর ডেম কলেজে ভর্তি হবার আগে থেকেই পারিবারিক ভাবে স্যারের সাথে পরিচয়। বাংলাদেশে রাজনৈতিক এবং সামাজিক কর্মকান্ডের সাথে তিনি জড়িত ছিলেন বলেই তাঁর সাথে আমার ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল। আমাদের বাসায় উনি মাঝে মধ্যে আসতেন। আমিও যেতাম বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কাজে স্যারের বাসায়। এস এস সি পরীক্ষা লেখার আগে হোস্টেলে স্যারের বড় ছেলে জর্জ গমেজ আমরা একই সাথে হোস্টেলে থাকার কারণে সম্পর্কটা পারিবারিকভাবে নিবীড় হয়েছিল।

কলেজে ভর্তি হবার পর থেকেই দেখেছি, স্যার ক্লাসে এসে আমাকে আলাদা খাতির যত্ন করতেন। ক্লাসের রুল নম্বর অনুযায়ী আমার সিট ছিল পিছন দিকে। কিন্তু তিনি ক্লাসে এসেই রুল কল করার পর প্রথমেই আমাকে ডেকে এনে সামনের সারির বেঞ্চে বসিয়ে এরপর পড়ানো শুরু করতেন। এটা ছিল যেন স্যারের নিয়মিত বিষয়। মাঝে মধ্যেই ক্লাসে পড়ানোর সময় বলে ফেলতেন, আমাকে তিনি অনেক ভালো জানেন। আমার বড় ভাইয়ের সাথে তাঁর বন্ধুত্ব সম্পর্ক। এমন আরো কিছু বলতেন, যে কারণে ক্লাসে আমার ঘনিষ্ঠ যারা ছিল তারা আমাকে বিভিন্ন কথা বলে ক্ষ্যাপানোর চেষ্টা করতো। আমার এই লেখায় সেই বিষয়টি বলা ঠিক হবে না এই কারণে যে অনেকের ব্যক্তিগত বিষয় হয়ে যাবে যা মোটেও শুভনীয় নয়, তাই।

নটর ডেম কলেজের সীমানায় স্যারকে দেখলে ছাত্রদের কেউ কেউ দূর থেকে টিস কাটার চেষ্টা করতো। তাই আমাকে দেখলেই হতো, ডেকে কাছে নিয়ে বলতেন, খারাপ ছেলেদের সাথে মিশবে না কিন্তু। তুমি অনেক ভালো ছেলে। আমাদের বাসায় সব সময় তোমার কথা বলি। তাছাড়া তোমার বড় ভাই বাসায় এলে তোমাকে নিয়ে কথা হয়। সেই বয়সে একটু আধটু যে দুষ্টামী করতাম সেই সুযোগটা যেনো তিনি বন্ধ করে দিতেন আমার সম্পর্কে এভাবে প্রশংসা করে।

অধ্যাপক গাব্রিয়েল মানিক গমেজ নটর ডেম কলেজে পড়ানোর পাশাপাশি যতটা জানতাম ঢাকাস্থ আমেরিকান দূতাবাসের বিভিন্ন কর্মকর্তা যারাই দেশে নতুন আসতেন তাদের বাংলা শিখাতেন। একারণে তিনি দূতাবাসে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন পার্টিতে যোগ দিতে সুযোগ পেতেন। যে কারণে পার্টিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের মধ্যে করা আলোচনার বিষয় তাঁর কাছ থেকে শোনা যেতো। সবসময় না হলেও মাঝে মধ্যে আমাদের বাসায় এলে বড়ভাই বা অন্যদের সাথে তাঁর আলোচনা থেকে শোনা হত অনেক কথা যা সচরাচর কোন মিডিয়ার সংবাদ হত না অথচ সেসকল বিষয় ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

আমার জ্ঞান হবার পর থেকে বাংলাদেশে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের দুজন মানুষকে চিনতাম যে দুজন, বঙ্গবন্ধু বলতে ছিলেন অন্ধ। তাদের সামনে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে কেউ কোনো বাজে মন্তব্য তো দূরের কথা কোনো ধরনের সমালোচনা পর্যন্ত করতে পারতেন না। আবার বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে কেউ ভালো বললে, পারলে তাকে যেনো সব কিছু উজার করে দিয়ে দেন খুশীতে। একজন ছিলেন এড. সিরিল শিকদার আরেকজন ছিলেন এই অধ্যাপক গাব্রিয়েল মানিক । বড় ভাইয়ের সাথে তাদের সম্পর্কের কারণে আমি খুব কাছ থেকে তাদের সাথে মেলা মেশা করতে সুযোগ পেয়েছি। এই দুজনই ছিলেন বঙ্গবন্ধু তথা আওয়ামী লীগের একনিষ্ঠ ও নিঃস্বার্থ কর্মী। আমার বিশ্বাস বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এই দুজনের নাম জানেন এবং ব্যক্তিগত ভাবেও চিনতেন।

আমি যতটা জানি, ১৯৭১ সনের ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে দেওয়া বঙ্গবন্ধুর সেই ঐতিহাসিক ভাষণ দেবার আগে গাব্রিয়েল মানিক গমেজ বাইবেল পাঠ করেছিলেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে বিষয়টি হয়তো কোথাও লেখা নেই তবে গল্পের ছলে জেনেছি। আমাদের দেশের এমন অনেক ঘটনাই আছে যা ইতিহাসে নেই। শুধু তাই নয় গাব্রিয়েল মানিক স্যারের এমন অনেক কিছুরই ইতিহাস আছে, ইতিহাসে নেই। এজন্য দুঃখ নেই।

স্যারকে আমার ভালো লাগার পিছনে একটি কারণ ছিল, যা তাঁকে কোনো দিন রাগ করতে দেখিনি। অত্যন্ত শান্ত স্বভাবের লোক ছিলেন তিনি। সিলভার কালারের ফ্রেমের চশমা পড়তেন। চশমার উপর দিয়ে তাকিয়ে সবসময় হেসে কথা বলতেন তিনি। ব্ িএন পি প্রতিষ্ঠার পর অধ্যাপক গাব্রিয়েল মানিক গমেজকে আমি অনেক কাছ থেকে দেখেছি। দেখেছি সামাজিক সংগঠনের বিভিন্ন সিদ্ধান্তে সহজ সরল ভূমিকা পালনের মাধ্যমে সবসময় শুভ কাজের সূচণা করতে। তাঁর মৃত্যু দিবসে তাঁর সকল ভালো কাজের প্রশংসা ও আত্মার স্বর্গবাস কামণা করি।

গাব্রিয়েল মানিক স্যারের জন্ম হয়েছিল, ১০ ফেব্রুয়ারী ১৯৪২ সনে পটুয়াখালী জেলার পাদ্রীশিবপুরে। ৩৩ বছর তিনি নটর ডেম কলেজে শিক্ষকতা করেছেন। পাশাপাশি দি খ্রিস্টান কো-অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়নের সভাপতি, বাংলাদেশ খ্রিস্টান এসোসিয়েশনের সভাপতি, ন্যাশনাল ওয়াই এম সি এ-র সভাপতি, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের কো চেয়ারম্যান সহ আরো বিভিন্ন সামাজিক ও জাতীয় সংগঠনের সাথে জড়িত থেকে কাজ করেছেন।

———————
২৪ জুন ২০২০, বুধবার

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ৪:৫৯ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

হে অনন্তের পাখি

৩০ আগস্ট ২০২০