ঘোষণা

কবি কাজী নজরুলের বিবাহ বিষয়ে কিছু বিভ্রাট

অনলাইন ডেস্ক | সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২০ | পড়া হয়েছে 99 বার

কবি কাজী নজরুলের বিবাহ বিষয়ে কিছু বিভ্রাট

কবি কাজী নজরুল ইসলাম

।। দীপক রয় ।।

কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিবাহ সংক্রান্ত বিষয়ে বহু লোকশ্রুতি আছে। সত্য মিথ্যা নানা তথ্য ছাপার অক্ষরে, ইদানীং নেট দুনিয়াতেও ঘোরাফেরা করছে। কিন্তু তথ্যবহুল বিবরণ খুজে পেতে আগ্রহী পাঠকদের বিভ্রান্তির শেষ নেই। প্রশ্ন হল কার বক্তব্যকে মান্যতা দেওয়া হবে? এক্ষেত্রে কাজী নজরুল ইসলামের দীর্ঘকালের দাদা, বন্ধু, সুহৃদ মুজফফর আহমেদের বক্তব্যই শ্রেয় মনে করছি। কারন একমাত্র মুজফফর আহমেদই নজরুলের প্রথম থেকে শেষ অবধি প্রতিটি ক্ষেত্রে নানাভাবে জড়িয়ে ছিলেন। এদের সম্পর্ক একজন ছাড়া আরেকজন যেনো অসম্পূর্ণ। আর মুজফফর আহমেদের নজরুল স্মৃতিকথা পুরোপুরি তথ্যবহুল ও যুক্তিপূর্ণ, তাই তাকে মান্যতা দেওয়াই স্বাভাবিক।

১৯১৮ সালে মুজফফর আহমেদ কলকাতার বর্তমান সূর্য সেন ষ্ট্রিটে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’র অফিসে সর্বক্ষনের কর্মী হিসাবে যোগ দেন। ১৯১৯ সাল থেকে সেখানেই থাকা শুরু করেন তিনি।

৪৯ নম্বর বেঙ্গলী রেজিমেন্টের কিছু সৈনিক সেই পত্রিকার গ্রাহক ছিলেন। কাজী নজরুল ইসলাম তার অন্যতম। সেই সূত্রে মুজফফর আহমেদ ও নজরুলের চিঠিপত্রে যোগাযোগ শুরু হয়। কাজী নজরুল ইসলামের পাঠানো কবিতা দেখে মুজফফর আহমেদ তার মধ্যে ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা খুঁজে পান। নজরুলের “মুক্তি” কবিতা তিনি পত্রিকায় প্রকাশ করেন। কবিতা প্রকাশের পর খুশি হয়ে নজরুল করাচি থেকে মুজফফর আহমেদকে চিঠি লেখেন। ১৯২০ সালের জানুয়ারিতে এসে তিনি মুজফফর আহমেদের সাথে দেখা করেন। রেজিমেন্ট বিলুপ্ত হলে মার্চ মাসে নজরুল পুরোপুরি কলকাতায় চলে আসেন। সেখানে কাজী নজরুল মুজফফর আহমেদের সাথে একই ঘরে বসবাস করতে শুরু করেন।

আমি তাঁর লেখালেখি, স্বাধীনতা আন্দোলন, কমিউনিস্ট পার্টি গঠন, পত্রিকা প্রকাশ, গ্রেপ্তারী ইত্যাদি বিষয়ের আলোচনায় যাচ্ছি না। আজকের আলোচনা শুধুই কাজী নজরুল ইসলামের কেবল বিবাহ বিভ্রাট নিয়ে লিখছি।

১৯২০ সালের শেষের দিকে তাদের ঘরে আলি আকবর খান নামক এক আগন্তুক লেখক এসে বসবাস শুরু করেন। তিনি বেশ অসুস্থ্য ছিলেন। পরবর্তীতে নজরুলের সেবায় সেই আগুন্তক সুস্থ হয়ে উঠেন। নানাবিধ কারনে মুজফফর আহমেদ আলি আকবর খানকে কিছুটা অপছন্দ করতেন। কিন্তু নজরুল ইসলাম তাকে খুব ভালবাসতেন। আলি আকবর খান নজরুল ইসলামকে তার কুমিল্লার বাড়িতে নিয়ে যেতে চাইলে মুজফফর আহমেদ নজরুলকে নিষেধ করেন। কিন্তু নজরুল ইসলাম সকলের আপত্তি অগ্রাহ্য করে ১৯২১ সালের মার্চ এপ্রিল নাগাদ কুমিল্লা চলে যান। সেখানে গিয়ে ওঠেন ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের বাড়ি। সেখান থেকে পরে দৌলতপুরে আলি আকবর খানের বাড়িতে যান।

এদিকে (চিঠিতে) খবর আসে নজরুল ইসলামের সাথে আলি আকবর খানের ভাগ্নী সৈয়দা খাতুনের ১৮ বা ১৯ জুন বিয়ে ঠিক হয়েছে। মুজফফর আহমেদ এই সংবাদ পেয়ে কড়া চিঠি লেখেন। চিঠির প্রতিক্রিয়ায় কোন কাজ তো হলই না বরং উল্টো বিয়ের নিমন্ত্রনের চিঠি এলো। মুজফফর সেই চিঠি পেলেন জুনের শেষের দিকে। এতদিনে তিনি জানলেন সত্যি সত্যিই বিয়ে হয়ে গিয়েছে। কিছুদিন পর আবার চিঠি এলো নজরুল ইসলামের। চিঠিতে ছিল তাঁর কাতর আর্জি, আলি আকবর খান প্রতারণা করেছে, দ্রুত টাকা পাঠান। তখন সেখানে চলছিল ধর্মঘট। এমন সংবাদ পেয়ে মুজফফর আহমেদ ২০ টাকা ধার করে কুমিল্লায় পাঠালেন। অন্যান্যদের পরামর্শে আরো ৩০ টাকা সাথে নিয়ে মুজফফর আহমেদ ধর্মঘটের মধ্যেই ৬ জুলাই গেলেন কুমিল্লা। নজরুল ইসলাম তখন ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের বাড়িতেই ছিলেন।

রথযাত্রার আগের দিন গিয়েছিলেন মুজফফর আহমেদ। মুজফফর আহমেদ যাবার পরেরদিন ৭ জুলাই সেনগুপ্ত পরিবারের বাচ্চা-মহিলা সকলকে নিয়ে রথযাত্রা দেখতেও গিয়েছিলেন। মুজফফর আহমেদ সেখানে গিয়ে সব ঘটনা শোনেন এবং সব শুনার পড় নজরুল ইসলামকে নিয়ে ৮ জুলাই কলকাতার পথে পাড়ি দেন।

কি এমন ঘটেছিল নজরুলের জীবনে? বিয়ে কি হয়েছিল শেষ পর্যন্ত?
সেনগুপ্ত পরিবার ও অন্যান্যেরা কি বলেছিলেন মুজফফর আহমেদকে? কি বলেছিলেন নজরুল ইসলাম? আসুন জেনে নিই সেই করুণ কাহিনী।

আলি আকবর খান নজরুল ইসলামকে দৌলতপুরের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে তার ভাগ্নী সৈয়দা খাতুনের সাথে বিয়ের জন্য পরিবেশ পরিস্থিতি তৈরি করেন এবং কাজী নজরুল সেই ফাঁদে পা দেন। সৈয়দার নাম দেন নার্গিস। সেখানে তাঁদের বিয়ের প্রস্তুতি ও আয়োজন করা হয়। ওদিকে কুমিল্লা থেকে সেনগুপ্ত পরিবারের ১০ জন শিশু কিশোর ও বড়রাও আসেন বিয়ের অনুষ্ঠানে। বিয়ের কাজ চলাকালে কাবিননামায় অপমানসূচক কিছু শর্ত নিয়ে গোলমাল শুরু হয় সেখানে। ”নজরুল ইসলাম নার্গিসকে নিয়ে দৌলতপুরেই থাকবেন” এই শর্তে নজরুল ক্ষুব্ধ হয়ে সেই রাতেই অন্ধকারে দৌলতপুর ছেড়ে, বর্ষার জলকাদা পথে এগারো মাইল দূরের কুমিল্লা শহরের সেনগুপ্ত বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেন। এতে বিয়ের সকল কাজ স্থগিত হয়ে যায়। সেনগুপ্ত পরিবারের ১০ জন সদস্য পরের দিন সকালে নৌকাপথে সেখান থেকে কুমিল্লা ফেরেন। ফলে আদতে বিয়েটাই হয়নি নজরুল ইসলাম ও সৈয়দা খাতুন ওরফে নার্গিস বেগমের মধ্যে। তবে হ্যাঁ, কাবিননামা পর্যন্ত সেদিন লেখা হয়েছিল। কিন্তু আকদ বা বিবাহ বিষয়টা আর সম্পন্ন হয়নি।

পরবর্তীতে ‘বাবা শশুর’ সম্বোধনে কুমিল্লা থেকে ২২ জুলাই লেখা নজরুলের একটি চিঠি ঘিরে ধোঁয়া সৃষ্টি হয়। কিন্তু চিঠিটি জ্বাল করে যারা নজরুল ইসলামকে অপদস্ত করতে চেয়েছিলেন, তারা জানতেন না, নজরুল ৮ জুলাই মুজফফর আহমেদের সাথে কলকাতা পাড়ি দেন। তাহলে ২৩ জুলাই কুমিল্লা থেকে তিনি চিঠি লিখলেন কি করে? আর চিঠির ভাষাও প্রমান করে, সেটি দস্তুরমতো যে অপরিনত কাচা হাতের কাজ ছিল।

কিন্তু এই বিভ্রাট কেন?

আলি আকবর খান চেয়েছিলেন ভাগ্নীর সাথে নজরুলের বিয়ে। সেটা হয়নি বলেই তিনি সেই চক্রান্ত করেছিলেন। পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়ের চিঠি, আজহারউদ্দীন খানের ভুল ধারনা, ডক্টর সুশীল কুমার গুপ্তের ভুল ধারনা ও তাদের লেখা প্রকাশ হবার পর সেগুলি মুজফফর আহমেদের চোখে পড়েনি। কারন মুজফফর আহমেদের জীবনের বেশিরভাগ সময়টাই কমিউনিস্ট পার্টি গঠন, আন্দোলন, আত্মগোপন অথবা জেলে কেটেছিল। ফলে কিছু ভুল তথ্য প্রচারিত হবার সূযোগ হয়ে যায়। আর নজরুল ইসলামের অপছন্দের লোকেরাও সেটাকে প্রচার করতে কসুর করেননি সেই সময়।

তবে এটাও সত্য যে, হ্যাঁ, পরে অবশ্যই নজরুলের বিয়ে হয়েছিল। কুমিল্লার সেই সেনগুপ্ত পরিবারের সেই ছোট কিশোরী মেয়েটির সাথেই। যে দৌলতপুরের তথাকথিত বিয়েতে উপস্থিত ছিল, যে নজরুলের সাথে রথযাত্রা দেখতে গিয়েছিল। তার নাম প্রমীলা সেনগুপ্ত। যিনি বিয়ের পরে নিজের নাম লিখতেন প্রমীলা নজরুল ইসলাম। সেই ইতিহাস, আরো এক করুণ ইতিহাস, বেদনার ইতিহাস।

 

লেখক দীপক রয়

।। দীপক রয় ।।

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ১০:০৯ অপরাহ্ণ | সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত