ঘোষণা

লাল শাড়ি

| বৃহস্পতিবার, ০৭ মে ২০২০ | পড়া হয়েছে 36 বার

লাল শাড়ি

রীতা আক্তার : ঘুম জড়ানো চোখে কলিমুদ্দিন যখন বিছানার এপাশ ওপাশ করছে তখন ভোরের সূর্যটা আকাশে উঠেনি। রেল লাইনের পাশে ঝুপড়ি ঘরে থাকে সে। ভোর না হতেই কর্ম মুখর লোকদের আনাগোনা শুরু হয়ে গেছে। কেউ চলেছে ঝাঁকা নিয়ে কারোয়ান বাজারের পাইকাড়ি দোকানে কেনাকাটা করতে। কেউ সারারাত রিক্সা চালিয়ে ঘরে ফিরছে দু’ দন্ড শান্তির খোঁজে। কেউবা রিক্সা নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে খ্যাপের আশায়। ভোরের আলো ফুটতেই পাশের ঘরগুলোতে জ্বলে উঠবে উনুনের আঁচ। ছোট ছেলেমেয়েরা খেলায় মেতে উঠবে রেল লাইনের পাশে। কখনও হুটহাট ঝগড়া বেজে যায় কলমির মা আর শেফালি খালার সাথে। এ এক নিত্যনৈমেত্তিক ব্যপার।

প্রায় বছর খানেক হলো কলিমুদ্দিন ঢাকায় এসেছে। পদ্মার পাড়ে তার গ্রাম। সে গ্রামের নিলুফারের সাথে তার বেজায় প্রেম ভালোবাসার সম্পর্ক। নিলুফারের মা বেঁচে নেই। ৫ বোন তিন ভাইয়ের মধ্যে নিলুফারই সবার ছোট। ভাই বোনদের বিয়ে হয়ে সবাই যে যার মতো থাকে। নিলুফারের বৃদ্ধ বাবা রয়ে গেছেন পদ্মাপাড়ে ছোট্ট ছনের ঘরটিতে। বিয়ের উপযুক্ত বয়স হয়েছে নিলুফারের। এদিকে কলিমুদ্দিন বেকার যুবক।

গরীব কৃষকের সন্তান। তিন ভাই দুই বোনের মধ্য কলিমুদ্দিন মেজো। একই গ্রামে বসবাস করায় দুজনের মধ্যে দেখা হয়, এরপর ভালোলাগা থেকে ভালোবাসায় পরিণত হয় তাদের সম্পর্ক। গ্রামের পশ্চিম পাড়ার সুক্কুর আলির ছেলে জব্বার খুব একটা ভালো নয়। মদ, গাজা, জুয়ার আসরে তাকে পাওয়া যায় সর্বত্রই। ঘরে দু’ টি বউ আছে তার, তবুও নিলুফারের দিকে তার চোখ পড়ছে। বিয়ে করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে।

কলিমুদ্দিনের নিজের কোন জমি নাই। বর্গা চাষ করে কোন রকমে সংসারের হাল ধরে রেখেছিল বাপ ভাইদের সাথে। এদিকে নিলুফারকে নিয়ে চিন্তিত সে। জব্বারের হাত থেকে বাঁচাতে এখন তাকে বিয়ে করতে হবে। কিন্তু বিয়ে করে স্ত্রীকে খাওয়াবে কি?
সংসারের যা দশা, নুন আনতে পানতা ফুরায়। তাই সে চলে আসে বছর খানেক আগে ঢাকায় কাজের খোঁজে। দিন রাত রিক্সা চালিয়ে একটু একটু করে বেশ কিছু টাকাও জমিয়েছে। নিলুফারকে সে কথা দিয়েছিলো বছর ঘুরতেই তাকে বিয়ে করবে।
ওদিকে নিলুফারও তার পথ চেয়ে বসে রয়েছে।

এদিকে জব্বার তাকে নানা প্রলোভনে বিয়ে করতে চায়। নিলুফার তাতে রাজি হয় না। নিলুফারের অমত দেখে জব্বার সুযোগ খোজে তাকে তুলে নিয়ে বিয়ে করতে।

আগের রাতে কলিমুদ্দিনের সাথে তার কথা হয় সেল ফোনে। কলিমুদ্দিন ফিরে আসছে গ্রামে। শুভ দিনক্ষণ দেখে বিয়ে করে নিবে নিলুফারকে।

আজ বিকেলে কলিমুদ্দিন বাজারে যায় নিলুফারের জন্য শাড়ি কিনতে। ৬৫০ টাকার একটা লাল টুকটুকে শাড়ি কিনে। লাল রেশমি চুড়ি, মালা, চুলের ফিতা, আলতা, আরো কত কি কিনে নেয় প্রিয় নিলুফারের জন্য। সন্ধ্যার মধ্যে ট্রেনে চেপে রওনা হবে গ্রামের উদ্দেশ্যে।

ট্রেন ছেড়ে যাচ্ছে ব্যস্ত ঢাকাকে পিছে ফেলে। একটু একটু করে সময় চলে যায় আর মনে এক সুখানুভূতি তৈরি হয় কলিমুদ্দিনের মনে। রাত তিনটার দিকে পৌঁছে যাবে গ্রামে।

ঝিকঝিক ঝিকঝিক ট্রেন ছুটে চলে। ছুটে চলে পদ্মাপাড়ের ছোট্ট গ্রামে।

রাত তখন সাড়ে তিনটা। ট্রেন এসে পৌঁছায় স্টেশনে। ট্রেন চলে গেলে তার নিজ গন্তব্যে কলিমুদ্দিন হাটতে লাগলো রেললাইনের উপর দিয়ে। কিছুদূর এগোতেই তার পায়ে এসে ঠেকলো একটি মানুষের অচেতন দেহ। কাঁধ থেকে ব্যাগটা নামিয়ে সে দেখতে থাকে নেতিয়ে পড়া দেহটাকে। তাকে স্পর্শ করতেই বুকটা কেঁপে উঠ তার ভয়ে। এ তো আর কেউ নয়। তারই প্রিয়তমা নিলুফার। অর্ধ নগ্ন অবস্হায় পড়ে আছে রেললাইনের উপর।

দেখে সে বুঝতে পারে ধর্ষিতা নিলুফারের মৃত দেহ। তাকে বুকে চেপে ধরে চিৎকার করে উঠে কলিমুদ্দিন। নিলুফারের খোলা শরীরের উপর দিয়ে একটা ঝড় বয়ে যায়। শরীর যদি একটা ঘর হয়, তাহলে সেই ঘরের বেড়া ভেঙ্গে গেছে যেনো সেই ঝড়ে। তাড়াতাড়ি ঘর সারাতে হবে। প্যাকেট থেকে লাল শাড়িটা বের করে সুন্দর করে নীলুফারের শরীরে জড়িয়ে দেয় কলিমুদ্দিন। এরপর নীলুফারকে কোলে নিয়ে কাজির বাড়ির দিকে হাঁটা দেয় কলিমুদ্দিন। সে ভাবে বিয়েটা হয়ে গেলে ওকে যত্ন করে কবরে শুইয়ে দেবে। ওর খুব বিশ্রাম দরকার। সারারাত ধরে হাঁটতে থাকে পাগলপ্রায় কলিমুদ্দিন। দুচোখ থেকে পদ্মা ও মেঘনার স্রোতের মত করে অশ্রুর ধারা বইতে থাকে মাটির দিকে।

চাঁদ ওকে পথ দেখিয়ে কাজীর বাড়ির দিকে নিয়ে চলে।

রীতা আক্তার
মিরপুর ১৪, ঢাকা, বাংলাদেশ।

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ১০:২২ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০৭ মে ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

মালতি

২৫ জুলাই ২০২০

 ফুটপাথ

৩০ জুলাই ২০২০

চন্দ্রাবলী

১৬ নভেম্বর ২০২০

বাটপার

১৩ আগস্ট ২০২০

সোনাদিঘি

১৪ জুলাই ২০২০

বিটলবণের স্বাদ

২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০

ফেরা

১৪ মার্চ ২০২০

জোছনায় কালো ছায়া

০৪ সেপ্টেম্বর ২০২০

রূপকথা

২৬ এপ্রিল ২০২০