ঘোষণা

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং শিল্পী নোওসু কোওসেৎসু

| শনিবার, ১৬ মে ২০২০ | পড়া হয়েছে 21 বার

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং শিল্পী নোওসু কোওসেৎসু

প্রবীর বিকাশ সরকার

প্রবীর বিকাশ সরকার :

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতি জাপানের নানা শ্রেণীর মানুষের গভীর আগ্রহ ছিল। প্রথমত যারা আগ্রহী হয়েছেন তাদের মধ্যে শীর্ষতম ছিলেন মনীষী, পণ্ডিত, শিল্পকলার ইতিহাসবিদ এবং চিত্রশিল্পী ওকাকুরা তেনশিন। তার আগ্রহে ১৯০২ সালেই জাপানের অনেক মননশীল মানুষের কাছে রবীন্দ্রনাথের নাম উত্থাপিত হয়। ১৯০২ সালে ভারতভ্রমণ শেষে ওকাকুরা টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সামনে তার ভারতভ্রমণ অভিজ্ঞতা বিষয়ে। উপস্থিতিদের মধ্যে সমাজের বিভিন্ন উচ্চস্তরের ব্যক্তিবৃন্দ ছিলেন। যেমন, চিত্রশিল্পী, লেখক, সাংবাদিক, শিক্ষক, গবেষক, পুরোহিত, ব্যবসায়ী ইত্যাদি।

প্রায় ১০ মাসব্যাপী ওকাকুরা তেনশিনের এই ভারতভ্রমণ ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং সুদূরপ্রসারী। তার কলকাতায় অবস্থানকালে পশ্চিমবঙ্গের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্ক, মতবিনিময় এবং আলাপআলোচনার বিবরণ বিস্তারিত জানা না গেলেও তার একটি প্রভাব সমাজের উচ্চস্তরে ও স্বাধীনতাকামী তরুণদের মধ্যে গভীরভাবেই পড়েছিল। জাপানেও স্বল্প সংখ্যক মানুষের মধ্যে তৎকালীন ভারত, বাংলা অঞ্চল এবং রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে একটা ধারণা জায়গা করে নিয়েছিল। তারই তরঙ্গ ওকাকুরা ও রবীন্দ্রনাথের আগ্রহে দ্রুতগতিতে বিস্তৃতি লাভ করে। পরের বছরই ওকাকুরা তার দুজন প্রধান শিষ্য তরুণ চিত্রশিল্পী য়োকোয়ামা তাইকান এবং হিশিদা শুনসোওকে কলকাতায় পাঠান একটি প্রকল্পে। সেটি ছিল ত্রিপুরা রাজ্যের উদয়পুরে নতুন রাজপ্রাসাদের অভ্যন্তরীণ দেয়ালে চিত্রল অলঙ্করণ করার কাজ। জাপানি শিল্পীরা এই বিষয়ে সুদক্ষ ঐতিহ্যগতভাবেই। কিন্তু সেটা ফলপ্রসূ হয়নি ব্রিটিশ শাসকদের বাধার কারণে। ওকাকুরা যে বাংলার তরুণদের মধ্যে স্বাধিকার আন্দোলনের আগুন জ্বেলে দিয়েছিলেন কিছুদিন প্রত্যক্ষ কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে এই বিষয়ে সরকারের কাছে প্রামাণ্য তথ্যাদি ছিল। এবং ব্রিটিশের চাপেই যে ওকাকুরা ভারতত্যাগ করেছেন এটাও সত্য।

রবীন্দ্রনাথ শত চেষ্টা-তদবির করার পরও প্রকল্পটি ভেস্তে যায়। বিনিময়ে, কলকাতায় জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িসহ অন্যান্য স্থানে জাপানি শিল্পীদ্বয়ের সঙ্গে স্থানীয় বিশিষ্ট শিল্পী যেমন অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, নন্দলাল বসু, অসিত হালদার, সুরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় প্রমুখের সঙ্গে সখ্য গড়ে ওঠে। উভয় পক্ষেরই নানা রকম শৈল্পিক পদ্ধতি ও বিষয়াদি নিয়ে মতবিনিময় ও শিক্ষালাভ করার কথা জানা যায়। জাপানি শিল্পীদ্বয় কলকাতায় প্রায় ৩ মাস থাকাকালীন হিন্দু ও বৌদ্ধ দেবদেবী, পৌরাণিক কাহিনি এবং বাংলার জীবনযাত্রার অভিজ্ঞতা নিয়ে বেশকিছু চিত্রকর্ম রচনা করেন। যেগুলো কলকাতায় এবং স্বদেশ প্রতাবর্তনের পর টোকিওর বিভিন্ন প্রদর্শনীতে উপস্থাপিত হয়। এতে অনেকটা সাড়া পড়ে এবং অন্যান্য চিত্রশিল্পী ও শিল্পকলার ছাত্রদের মধ্যে ভারত সম্পর্কে আগ্রহ জাগে। ফলত, এই প্রচেষ্টা জাপানে নতুন একটি প্রবণতা সৃষ্টি করে। শিল্পীদের ভারতভ্রমণ এবং ভারতীয় ও জাপানি আদলে পৌরাণিক কল্পচিন্তা ও সামাজিক জীবনযাপনের বাস্তবচিত্রাদি অঙ্কন ও প্রদর্শনী। এই ধারা যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধপূর্ব থেকে শুরু করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর ছাড়িয়ে আজও অব্যাহত তা আর না বললেও চলে। ১৯০৫ সালে আরেকজন চিত্রশিল্পী কলকাতায় যান, যান শান্তিনিকেতনে, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে। তিনি কাৎসুতা শৌকিন, ওকাকুরার ভাবশিষ্য। এরপর ১৯১৬ সালের শেষদিকে রবীন্দ্রনাথের প্রথম জাপান ভ্রমণের সময় প্রতিভাবান চিত্রশিল্পী কাম্পো আরাইএর সঙ্গে পরিচিত হন য়োকোহামা বন্দরনগরীর নয়নাভিরাম সবুজ বাগানবাড়ি সানকেইএন-এ, এই বাড়ির কর্ণধার কলাশিল্পের তৎকালীন প্রধান পৃষ্ঠপোষক হারা তোমিতারোওর মাধ্যমে। চিত্রশিল্পী কানজান শিমোমুরার অপূর্ব একটি অঙ্কনচিত্র ‘য়োরোবোশি’ বা ‘অন্ধভিক্ষু’র নিখুঁত নকলচিত্র এঁকে দিয়ে তাক্ লাগিয়ে দেন রবীন্দ্রনাথকে। প্রকৃতপক্ষে, মূল ছবিটি রবীন্দ্রনাথ কলকাতায় নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন, কিন্তু হারা তোমিতারোও না দিয়ে কাম্পোকে অনুরোধ করেন চিত্রটি নকল করে দেবার জন্য। সেটি শান্তিনিকেতনে এখনো আছে বলে জানা যায়। কাম্পোর প্রতিভার পরিচয় পেয়ে রবীন্দ্রনাথ তাকে ভারতে আমন্ত্রণ জানান। কাম্পোরও গুপ্ত ইচ্ছে ছিল ভারতে যাওয়ার জন্য। অজন্তা, ইলোরা, বাঘ গুহাচিত্রের কথা ওকাকুরা, তাইকান বা অন্যকোনোভাবে শুনে বা জেনে থাকবেন সেগুলো দেখার জন্য প্রবল আগ্রহী ছিলেন। ওই সালেরই শেষদিকে শিল্পী কাম্পো আরাই তার একজন সহকর্মী চিত্রশিল্পী কাতায়ামা নানপুউকে নিয়ে কলকাতায় যান, প্রায় বছর দুই অবস্থানকালে ঠাকুরবাড়ির বিচিত্রা ভবনে, শান্তিনিকেতনে জাপানি রীতির চিত্রকলার পাঠ শিক্ষা দেন। মহারাষ্ট্রের অজন্তা, কলকাতা, শান্তিনিকেতন প্রভৃতি জায়গায় ভ্রমণ করে অনেক ছবি আঁকেন। ফিরে এসে প্রদর্শনী করেন জাপানে। অসামান্য বহু চিত্র তার আজও বিস্ময় জাগায়। এইভাবে বিশ্বযুদ্ধপূর্ব ও পরে অনেক চিত্রশিল্পী ভারতভ্রমণ করেন এবং বহু বিচিত্র রূপমুগ্ধ চিত্রকর্ম তারা রচনা করে গেছেন। যার মূল্য অপরিসীম।

এই ধারার অনেক শিল্পীর মধ্যে নোওসু কোওসেৎসু (১৮৮৫-১৯৭৩) অন্যতম। তিনি ছিলেন ওকাকুরা তেনশিনের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত জাপানের প্রথম জাতীয় চারুকলা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান টোকিও বিজুৎসু গাক্কোও তথা টোকিও আর্ট স্কুলের ছাত্র। পরবর্তীকালে ১৮৮৯ সালে ওকাকুরা স্বপ্রতিষ্ঠিত নিহোন বিজুৎসুইন বা জাপান আর্ট ইনস্টিটিউটের সঙ্গে জড়িত হন ঘটনাক্রমে। ১৯১৬ সালে রবীন্দ্রনাথের জাপানভ্রমণের সময় ওকাকুরার এই প্রতিষ্ঠানে আগমন ও বক্তৃতাদান উপলক্ষে ভারতীয় চিত্রকর্মের একটি প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। এটাই জাপানে ভারতীয় চিত্রকর্মের প্রথম প্রদর্শনী। এই প্রথম নোওসু রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্যে আসেন এবং শিল্পকলা সম্পর্কে তার বক্তৃতা শোনেন। তখন তিনি ৩১ বছরের তরুণ। রবীন্দ্রনাথের কথা তিনি জ্ঞাত হয়ে থাকবেন অগ্রজ শিল্পী ও সহকর্মীদের কাছে বা কিছু না কিছু শুনে থাকবেন শিল্পাচার্য শিক্ষাগুরু ওকাকুরা তেনশিনের মুখে। কাজেই রবীন্দ্রনাথের প্রতি তার মনে যে অদম্য অনুরাগ সৃষ্টি হয়েছিল তা আর না বললেও চলে। চিত্রশিল্পী হিসেবে তখনও তার তেমন কোনো পরিচিতি নেই। জাপানের রীতি অনুসারে প্রতি বছর সরকারিভাবে আয়োজিত প্রতিযোগিতামূলক চিত্রপ্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করতে পারেননি। মনে মনে ভারতে যাওয়ার কথা ভাবতে লাগলেন। ভারতে অবস্থানরত অগ্রজপ্রতিম কাম্পো আরাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
পরের বছর ১৯১৭ সালের আগস্ট মাসের ২৯ তারিখে স্বখরচে ভারতের দিকে যাত্রা করেন। অক্টোবর মাসের ১ তারিখে কলকাতা বন্দরে পৌঁছান। ২২ তারিখে কলকাতা জাদুঘর পরিদর্শনে যান। যান বারাণসী ভ্রমণে। ডিসেম্বরের ১ তারিখে কাম্পো আরাইয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং অজন্তা গুহাচিত্র নকলের কাজের জন্য আবেদন জানান। আবেদন অনুমোদিত হলে পরে কাম্পোর সঙ্গে মহারাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে কলকাতাত্যাগ করেন ২৫ তারিখে।
পরের বছর জানুয়ারি মাসে আরেকজন চিত্রশিল্পী ছেনরিন কিরিয়া ভারতে যান। কাম্পো ও নোওসুর সঙ্গে মিলিত হন, তবে তিনি অন্য প্রকল্পের অধীনে অজন্তার গুহাচিত্রের নকল করার কাজে নিয়োজিত হয়েছিলেন। বোঝা যায় যে, অজন্তার বৌদ্ধিক গুহাচিত্র তখন জাপানের শিল্পকলা জগতে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।

মার্চ মাসের দ্বিতীয়ার্ধে কাজ সমাপ্ত হয় নোওসু ও ছেনরিনের, এপ্রিল মাসের ৮ তারিখে কলকাতা বন্দরে কাম্পো তাদেরকে বিদায় জানান। মে মাসের ১৩ তারিখে তারা জাপানে পৌঁছান। এই বছরেরই অক্টোবর মাসের ৫ তারিখে ‘আজানতা হেকিগা তেনরেৎসু’ তথা ‘অজন্তা দেয়ালচিত্র প্রদর্শনী’ নামে একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করেন টোকিওর নিহোনবাশি ক্লাবে। বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করে গণমাধ্যমের কল্যাণে প্রদর্শনীটি। পরের বছর ১৯১৯ সালের এপ্রিল মাসের ৫-৬ তারিখ দুুদিনব্যাপী একই প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয় প্রভাবশালী ওসাকা আসাহিশিম্বুন পত্রিকার মিলনায়তনে। পুনরায় ১৫ তারিখ থেকে মে মাসের ৩১ তারিখ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয় কিয়োতো রাজকীয় জাদুঘর ভবনে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, কেমন আলোড়ন তুলেছিল সেইসময় অজন্তার রঙিন গুহাচিত্রসমূহ। তাছাড়া, নোওসুর অঙ্কিত ‘গুহামন্দিরের সকাল’ চিত্রকর্মটি শিল্পবোদ্ধা মহলে ব্যাপক আলোচিত ও প্রসংশিত হয়। জাতীয়ভাবে তার স্বীকৃতির পথ উন্মুক্ত করে দেয়।
১৯২৪ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তৃতীয়বার জাপানে আগমন করেন মে মাসের ৩১ তারিখে। কোবে শহরে তরুণ চিত্রশিল্পী মুরাকামি কাগাকুর সঙ্গে কবিগুরুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তখন নোওসু ৩৯ বছর বয়সী। ১৯২৮ সালে তার জন্মস্থান কাগাওয়া-প্রদেশে অনু্িষ্ঠত একটি প্রদর্শনীতে ভারতীয় আদলে অঙ্কিত কয়েকটি চিত্রকর্ম প্রদর্শন করেন।

১৯৩২ সালের কথা। অকস্মাৎ তার জীবনে একটি সুযোগ আসে পুনরায় ভারতভ্রমণের এবং একটি বিশেষ কাজের সুসংবাদ নিয়ে। উত্তর প্রদেশের সুবিখ্যাত বৌদ্ধতীর্থস্থান সারনাথে নবনির্মিত একটি বৌদ্ধ মন্দির মুলাগন্ধকুটি বিহার (গঁষধমধহফযধশঁঃর ারযধৎধ) এর দেয়ালচিত্র অঙ্কনের জন্য ভারতে যাওয়ার কথা ছিল শিল্পী ছেনরি কিরিয়ার, কিন্তু যাওয়ার প্রাক্কালে তার অকাল মৃত্যু হলে পরে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, জাপান-ভারত অ্যাসোসিয়েশনের যৌথ উদ্যোগে নোওসুকে প্রেরণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। সুপারিশ করেন বিশিষ্ট বৌদ্ধধর্মীয় গবেষক টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, গবেষক ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বন্ধু তাকাকুসু জুনচিরোও, প্রভাবশালী বৌদ্ধ পুরোহিত ওয়াতানাবে কাইকিয়োকু প্রমুখ। নভেম্বর মাসের ১ তারিখে সহকর্মী কাওয়াই শিকোও এবং জ্যেষ্ঠপুত্র য়োশিআকি (?) কে সঙ্গে নিয়ে ভারতের দিকে যাত্রা করেন। তখন তার বয়স ৪৭। ২৫ শে নভেম্বর কলকাতায় পৌঁছান। পৌঁছানোর সঙ্গেসঙ্গে শান্তিনিকেতনে যান রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য।
তার ভারতে যাওয়ার সংবাদ রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে জানতে পারেন বিচিত্রা শিল্পকলা শিক্ষা ভবনের শিক্ষার্থীরা। তারা বিষয়টিকে সহলভাবে গ্রহণ করেননি। প্রতিবাদ ও আপত্তি জানান। ভারতে শিল্পী থাকতে কেন এমন একটি প্রকল্পে বিদেশি শিল্পীকে আহবান জানানো হবে এই নিয়ে বেশ উষ্মা প্রকাশিত হয় শিল্পী মুকুল দেসহ অন্যান্য শিল্পীদের মধ্যে। এই সংবাদ নোওসুর কানেও পৌঁছায়। তিনি তাই সরাসরি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শরণাপন্ন হন কারণ এই প্রকল্পের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও জড়িত ছিলেন। কবিগুরু তাকে বলেন, “ভারত এবং জাপান জনগোষ্ঠী এবং ইতিহাসের মতো (তাদের) শিল্পকলাও ভিন্ন। এই ধরনের ভিন্নতার মধ্যে উভয় দেশের শিল্পকলায় ঐকতানের মাধ্যমে একটি বিষয় সৃষ্টি করা সত্যিই কঠিন কাজ। তুমি ভারতের বৌদ্ধধর্মের জন্য এঁকে ভারতে রেখে যাওয়া দেয়ালচিত্র ভারতীয়দের উত্তমরূপে দেখার বস্তু হবে তাই ভারতীয়দের কাছে যাতে গ্রহণযোগ্য হয় এমন ছবি আঁকো।” তিনি আরও বলেন, “সেটা তুমি বুদ্ধের প্রতি নিবেদনস্বরূপ বিশ্বাস থেকে সর্বতোভাবে সম্পূর্ণ করতে পারবে।” কবিগুরুর এই আশীর্বাদ মাথায় নিয়ে কাজ শুরু করেন নোওসু। তার আগমন উপলক্ষে কলকাতাস্থ জাপানি দূতাবাসপ্রধান মি.হারা বিশেষ সংবর্ধনা সভার আয়োজন করেন নিপ্পন ক্লাবে। তাতে সভাপতিত্ব করেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে শিল্পাচার্য অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সমরেন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিচারপতি মন্মথনাথ মুখোপাধ্যায়, সপত্নী-কন্যা এন সি সেন, ডক্টর সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, ডক্টর কালিদাস নাগ, সপত্নী মুকুল দে, সপত্নী ডি আর ভাণ্ডারকার, দেবপ্রিয় ওয়ালিসিনহা, নলিনীরঞ্জন সরকার প্রমুখ। এছাড়াও ব্রিটিশ নাগরিক, এশিয়াটিক সোসাইটির উর্ধ্বতন কর্মকর্তা ওলন্দাজ নাগরিক জন ভন মেনানসহ একাধিক বিদেশি।

বিচিত্রা ভবনের যেসকল শিক্ষার্থী শিল্পীরা বিরোধিতা করেছিলেন তাদের সঙ্গেও নোওসুর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। শিল্পী মুকুল দে ও তার পরিবারের সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয় পরবর্তীকালে। ১৯৩২ থেকে ১৯৩৬ সাল পর্যন্ত তিনি উক্ত মন্দিরের দেয়ালে ৪৪ মিটার দীর্ঘ রঙিন চিত্র অঙ্কন করেন যেখানে ভগবান বুদ্ধের জীবন ও কর্মকাণ্ড উদ্ভাসিত হয়ে আছে। কর্মসমাপ্তির পর বিদায় সংবর্ধনা জানানো হয় বারাণসী বোধি সোসাইটি এবং নাগরিকবৃন্দ কর্তৃক। তাতে বারাণসী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মি.মালভিয়া আসন গ্রহণ করেন। উপস্থিত থাকেন জাপানি দূতাবাসপ্রধান মি.য়োনেজাওয়া। এছাড়াও অনেক গণ্যমান্য মানুষ।

এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে তিনি পাশ্ববর্তী দেশ ভুটান, নেপালেও আমন্ত্রিত অতিথি হয়ে সংবর্ধনায় অভিষিক্ত হন। মহাকর্মযজ্ঞের পাশাপাশি নিজের মূল কাজ ছবি আঁকাও বন্ধ থাকেনি। ভারতত্যাগ করে ১৯৩৬ সালের নভেম্বর মাসের ২৮ তারিখে কোবে সমুদ্রবন্দরে পৌঁছান। ৩০ তারিখে টোকিও রেল স্টেশনে এক মহাসংবর্ধনার মাধ্যমে তাকে অভিনন্দিত করতে উপস্থিত হন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ ১০০ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি। ১৯৩৬ সালের ডিসেম্বর মাসের ১২ তারিখে টোকিওর বিখ্যাত ফরাসি রেস্টুরেন্ট সেইয়োওকেন-এ স্বদের্শপ্রত্যাবর্তন উপলক্ষে এক মহাসংবর্ধনা প্রদান করা হয় তার সম্মনার্থে তাতে শিল্পী য়োকোয়ামা তাইকান, অধ্যাপক তাকাকুসু জুনজিরোও প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

তারপর ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত বাকী জীবনে তিনি কখনোই ভারত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে বিস্মৃত হননি। বিভিন্ন সময় তার অঙ্কিত চিত্রকর্ম প্রদর্শিত হয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে আনন্দ দিয়েছে। এগুলো জাপানের অত্যন্ত মূল্যবান জাতীয় সম্পদ। মূল্যবান সম্পদ নোওসু কর্তৃক অঙ্কিত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি চিত্রকর্মও যা দুজনের মধ্যে একটি কালজয়ী বন্ধন রচনা করেছে। ১৯৩৪ সালে শত ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি কবিগুরুর একটি ছবি আঁকেন, তাতে রবীন্দ্রনাথের একটি দুপঙক্তিবিশিষ্ট কবিতাসহ স্বাক্ষর বিদ্যমান। সম্ভবত বিদায়ের প্রাক্কালে কবিগুরু ছবিটি স্বাক্ষর করেছিলেন। কবিতাটি নিম্নরূপ:

পথের প্রান্তে আমার তীর্থ নয়,
পথের দুধারে আছে মোর দেবালয়
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

৬ই অক্টোবর
শিশুসাহিত্যিক, কথাসাহিত্যিক ও গবেষক

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ৬:২৭ অপরাহ্ণ | শনিবার, ১৬ মে ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

অশ্রু

১৩ জুলাই ২০২০

শিখে গেছি

২৫ জুলাই ২০২০

ঝিরিঝিরি পাতার গাছটি

০৪ সেপ্টেম্বর ২০২০

মালতি

২৫ জুলাই ২০২০

 হিংসুটে

১৩ জুলাই ২০২০

 ফুটপাথ

৩০ জুলাই ২০২০

অর্ধ গোলাপ

১৭ আগস্ট ২০২০

সুন্দর মন

০৯ নভেম্বর ২০২০

অচেনা প্ল্যাটফর্ম

১৫ নভেম্বর ২০২০

ঘিলু শুকিয়ে ঝরেপড়া পরিচয়

১৪ সেপ্টেম্বর ২০২০

চন্দ্রাবলী

১৬ নভেম্বর ২০২০