ঘোষণা

শ্রীলংকার সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব “ভেসাক পোয়া” করোনার থাবায় স্থবির

| বৃহস্পতিবার, ০৭ মে ২০২০ | পড়া হয়েছে 24 বার

শ্রীলংকার সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব “ভেসাক পোয়া” করোনার থাবায় স্থবির

সোমা কস্তা:

বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের সর্ববৃহৎ ও গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব বৌদ্ধ পূর্ণিমা। শ্রীলংকার ভাষায় যাকে বলা হয় “ভেসাক পোয়া”। এই পূর্ণিমার দিনের বৌদ্ধ ধর্মের প্রবর্তক গৌতম বৌদ্ধ জন্মগ্রহণ করেন, নির্বাণ লাভ করেন এবং দেহ ত্যাগ করেন।

শ্রীলংকায় একে তিন উৎসবের দিন বলা হয়। এই উৎসবকে কেন্দ্র করে পুরো শ্রীলংকা জুরে দুইদিন ব্যাপী চলে আধ্যাত্মিক ও বাহ্যিক আনন্দমিলন মেলা। যার প্রস্তুতিপর্ব শুরু হয় ডিসেম্বর মাসের পূর্ণিমার দিন থেকে। শ্রীলংকার ভাষায় ডিসেম্বরের পূর্ণিমাকে বলা হয় “উনদুয়াপ পোয়া”। “উনদুয়াপ পোয়া”র দিন থেকে রত্নাপুরায় অবস্থিত বৌদ্ধদের তীর্থস্থান “শ্রী-পাদেয়” সর্বসাধারনের জন্য খুলে দেওয়া হয়। “শ্রী-পাদেয়” অর্থ গৌতম বুদ্ধের পায়ের চিহ্ন। এটি পাহাড়ের উপর অবস্থিত। সমুদ্রপৃষ্ট থেকে এই পাহাড়ের উচ্চতা দুই হাজার দু’শ ৪৩ মিটার। নিরামিষ আহার করে শুভ্র পোশাক পরে খালি পায়ে ৬ মাইল পথ পায়ে হেঁটে পাহাড়ের একেবারে চূঁড়ায় শ্রী-পাদেয় যেতে হয়। সেখানে ভক্তরা ভক্তিভরে তাদের মনের যত কামনা-বাসনা, চাওয়া, প্রার্থনা গৌতম বুদ্ধের নিটক তুলে ধরেন। ভেসাক পোয়া বা বৌদ্ধ পূর্ণিমার পরের দিন থেকে শ্রী-পাদেয় বন্ধ করে দেওয়া হয়। কিন্তু করোনা ভয়াল থাবায় এবার শ্রী-পাদেয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে মার্চ মাসের মাঝামাঝি থেকেই।

ভেসাক পোয়া’র এই উৎসবে বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারীরা পুরো পরিবার নিয়ে বৌদ্ধ মন্দিরে যায়। সাদা পোশাক, পদ্মফুল, বাতি আর ধুপকাঠি জ্বালিয়ে প্রার্থনা করে। সারাদিন মন্দিরে চলে বৌদ্ধ ভিক্ষুর উপদেশ বানী। এসময় ভক্তরা নিজ নিজ পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন, একে অপরের সঙ্গে পুনর্মিলিত হন এবং পুরোনো জীবনের ভুল ভ্রান্তি ভুলে নতুন জীবন শুরুর প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করেন। ভক্তরা সবাই একই সঙ্গে মন্দিরে আহার গ্রহণ করেন।

ভেসাক উৎসবকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন গ্রাম, পাড়া, মহল্লায় চলে তোরণ, আলোকসজ্জা এবং ভক্তিগীতির প্রতিযোগিতা। তোরণগুলোতে গৌতম বুদ্ধের জীবনীর উপর ভিত্তি করে ভিডিও প্রদর্শনী চলতে থাকে।

এই উৎসব গ্রামের চেয়ে শহরে আরো বেশী চমকপ্রদ এবং আকর্ষণীয় হয়ে থাকে। তাই এই সৌন্দর্য়কে উপভোগ করার জন্য গ্রামের মানুষজন এসময় শহরে চলে আসে। তখন দেশের শুধুমাত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোই নয়, সরকারী-বেসরকারী অফিস-আদালত সব কিছু পুরো এক সপ্তাহের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। দোকান পাট, কাঁচা-বাজার, মাছ মাংস, শাক-সবজী খাবার কোন কিছুই কিনতে পাওয়া যায় না। তাই ভেসাক পোয়া দেখতে আসা গ্রামের মানুষদের খাবারের যোগান দিয়ে থাকেন শহরের মানুষেরা। অর্থাৎ ভেসাক পোয়া এবং এর পরের দিন এই দুইদিন রাস্তাঘাট, মন্দির, তোরণ, আলোকসজ্জা যেখানেই যাবেন সেখানেই বিনামূল্যে খাবার সরবরাহ করা হয়। বিভিন্ন সংগঠন কিংবা ব্যক্তি নিজ উদ্যোগে খাবার পরিবেশন করে থাকে। এসময় রাস্তায় গাড়ী থামিয়ে যাত্রীেদর ডেকে খাবার পরিবেশন করা হয়। যার অর্থ ধনী-গরীব সবার সাথে খাবার সহভাগিতা করা।

এখানে একটি কথা বলে রাখা ভাল যে, এই খাবার সহভাগিতা কেবল বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরাই করেন না, খ্রিষ্টান, হিন্দু, মুসলিম সকল ধর্মাবলম্বী ভাইবোনেরা এই উৎসবে সামিল হয়। এসব খাবারের মধ্যে থাকে ভাত-তরকারী (অবশ্যই নিরামিষ), নুডুলস, ছোলা, সরবত, চা, কফি, বিস্কুট, আইসক্রিম এবং বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি।

ভেসাক পোয়া’র আনন্দময় উৎসবের যে সময় পুরো শ্রীলংকা আলোকিত থাকার কথা, করোনা ভাইরাসের বিপর্যয়ে আজ পুরো শ্রীলংকা থমকে আছে। দেশের কোথাও আলোকসজ্জা নেই, নেই কোন তোরণও , রাস্তায় গাড়ী থামিয়ে এবার খাবার সহভাগিতা করার আনন্দ নেই, মন্দিরে নেই ভক্তদের ভীড়, ফুল আর আগরবাতির গন্ধ। নিজের বাড়িতেই ছোট শিশুরা হয়তো আনাড়ী হাতে বানিয়ে নিয়েছে “ভেসাক কুডো” অর্থাৎ কাগজ দিয়ে বানানো “বাতিঘর” আর তা ঝুলিয়ে দিয়েছে ঘরের দড়জায়।

নাই বা হলো এবার বৌদ্ধদের সবচেয়ে বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব জাঁকজমক সহকারে পালন করা। যদি আধ্যাত্মিকতা হৃদয়ে থাকে তবে বাহ্যিকতা সেখানে গৌণ্য। সবার আগে জীবন, মানুষ, দেশ এবং দেশপ্রেম। করোনার কারনে এবার হয় তো আমাদের ত্যাগস্বীকার, আমাদের আত্মত্যাগ পরিপূর্ণভাবে হবে। এবারের বৌদ্ধ পূর্ণিমায় আমাদের প্রার্থনা হোক – একদিন আবার সব আগের মতো যাবে, আমরা সব উৎসব পালন করবো করোনা মুক্ত পৃথিবীতে, আবার সেই আগের মতো করেই।
—————-
সোমা কস্তা, শ্রীলংকা প্রবাসী লেখিকা।

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ৯:০৭ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০৭ মে ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত