ঘোষণা

বাঁচার সংগ্রামে আপনিও জেগে উঠুন

| মঙ্গলবার, ০৫ মে ২০২০ | পড়া হয়েছে 28 বার

বাঁচার সংগ্রামে আপনিও জেগে উঠুন


শাহানুর আলম উজ্জ্বল

করোনাভাইরাস সংক্রমণ ঠেকাতে জেগে উঠেছে দেশ। জেগে উঠেছে শহর, গ্রাম, পাড়া মহল্লা। এ যেন জীবানুযুদ্ধ। বাঁচার সংগ্রাম। যেখানে সেখানে লকডাউন। ঘরে থাকার প্রবনতায় রক্ষাকবচ। বিশেষভাবে লক্ষনীয় ভাইরাসটির আগমনে এবার আমরা কয়েকটি নতুন শব্দ শিখলাম। হোম কোয়ারেন্টিন, আইসোলেশন, লকডাউন। এই তিনটি শব্দের সাথে কয়েকদিনে পরিচিত হয়ে গেছি। ইংরেজী শব্দ হলেও বাংলাভাষাতে মুটোমুটি রপ্ত করে ফেলেছি। এই শব্দ তিনটি আমাদের বাঁচার স্বপ্ন দেখাতে পারে। যদি মানি বা সকলকে মানায়।
প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসে প্রতিদিনই বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা। বাড়ছে নতুন করে আক্রান্তের সংখ্যাও। চীনের ভূখন্ডে আঘাতের সূত্রপাত হলেও ভাইরাসটি বিভিন্ন দেশে ছড়িয়েছে। আমেরিকা, ইতালী, ফ্রান্স, জার্মান, কানাডা, সিঙ্গাপুর, মালায়েশিয়া, সৌদিআরব, ইরাক, অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের প্রায় ৩’শ টি দেশে ভাইরাসটি ছড়িয়েছে। বাংলাদেশেও আঘাত হানতে শুরু করেছে এই ভাইরাস। বিশ্বের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পারি মহামারী এই ভাইরাস মোকাবেলার জন্য তারা কি করছে। কিভাবে মোকাবেলায় অংশ নিচ্ছে মানুষ। ক্ষমতাধর ও সভ্যতার শিখরে ওঠা দেশগুলো হিমশিম। গোটা পৃথিবী যেন লকডাউন। চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা বোঝার চেষ্টা করছেন এই ভাইরাসের চরিত্র ও বৈশিষ্ট। তবে একটি ব্যাপার লক্ষনীয়, উন্নত দেশগুলোর মানুষ ভাইরাসটিকে আমলে নিচ্ছেনা। স্থিরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং সকল নিয়ম কানুন শতভাগ মেনে চলছে। অনেক দেশ মৃত্যুর হারও কমিয়েছে। জাপান, সিঙ্গাপুরকে উদাহরণ হিসাবে টানতে পারি।
বাংলাদেশে গত ৮ মার্চ প্রথম করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্তের ঘোষনা আসে। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট আইইডিসিআর থেকে তিনজনের করোনা ভাইরাস সংক্রমণ শনাক্তের ঘোষণা দেওয়া হয়। যাদের দুইজন ইটালি ফেরত। ১৯ মার্চ সত্তরোর্ধ্ব এক ব্যক্তি প্রথম এই ভাইরাসে মৃত্যুবরণ করেন। পর্যায়ক্রমে প্রতিদিন বাড়তে থাকে করোনা সংক্রমণ। ৪ মে সোমবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত অনলাইন ব্রিফিংয়ে ঘোষনা দেয়া গত ২৪ ঘন্টায় দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণে আরো ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে মারা গেছেন ১৮২ জন। আর নতুন শনাক্ত হয়েছে ৬৬৮ জন। আর করোনার উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে মোট ১০ হাজার ১’শ ৪৩ জনের মধ্যে।
করোনা উদ্ভুত পরিস্থিতে এই ভাইরাসের মহামারিতা পৃথিবীর মানুষকে ভাবিয়ে তুলেছে। বাংলাদেশের মানুষ হিসাবে আমরাও ভাবতে শুরু করেছি। সরকারের পক্ষ থেকে সীমাবদ্ধতা থাকা সত্বেও আপ্রাণ চেষ্টা চালানো হচ্ছে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত নির্দেশনা আমরা মেনে চলার চেষ্টা করছি।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে-আমরা কি এই মহামারি থেকে উত্তোরণ হতে পারব? উত্তোরণের পথ সরকার, স্বাস্থ্য বিভাগ বাতলে দিয়েছেন তা কি যথার্থতায় পালন করতে পারছি কি?
গত ৮ মার্চের পর থেকে সারাদেশে বিভিন্ন মাধ্যমে প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা উচ্চস্বরে একটি বার্তা দিচ্ছেন। দেশকে নিরাপদ রাখার জন্য হৈচৈ করছেন। উদ্দেশ্য- সকলে যেন ভালো থাকে। সকলে যেন নিরাপদে থাকে।
আমাদের মনে রাখা দরকার আমরা একটি উন্নয়নশীল দেশে বসবাস করি। আমাদের বার্ষিক আয়, প্রবৃদ্ধি অন্যান্য উন্নততর রাষ্ট্রের মত নয়। এরই মাঝে আমার পদ্মা সেতু নির্মাণের সাহস দেখিয়েছি। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করেছি। শ্রমবাজারকে আরো বেগবান করেছি। খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য নিরাপত্তা, সামাজিক নিরাপত্তা তৈরি করে প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছি। শুদ্ধাচার কৌশল বাস্তবায়নের পথে হাঁটছে দেশ। একটিবার ভাবুনতো করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব মোকাবেলায় আমরা ব্যর্থ হলে আমাদের অর্থনীতি কী পরিমান ক্ষতিগ্রস্থ্য হবে। দেশের সকল উন্নয়নে ধ্বস নামতে বাধ্য হবে। যে আকাংখা নিয়ে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে সেই আকাংখা আমাদের পূরণ হবে কি? অর্থনৈতিক ক্ষতির প্রভাব তৃণমূল পর্যন্ত নিশ্চিত গড়াবে।
এত তাত্বিকতায় না বুঝে সহজে একটু বোঝার চেষ্টা করি-
ধরুণ আপনার বাড়ীতে ছ’মাসের খাবার মজুদ আছে। ব্যাংকে কিছু টাকাও জমানো আছে অথচ আপদকালীন সময়ে ব্যাংকের লেনদেন বন্ধ। পরিবারের চিকিৎসা খরচ, দিনান্তের তৈজসপত্র ও ব্যবহার্য জিনিসেরও দরকার। আয়ের উৎস আপনি নিজে। পরিস্থিতির কারনে আপনার আয়ও লকডাউন করে বসে আছে। এই অবস্থায় আপনি কি করবেন। ধীরে ধীরে খাবার শেষ হচ্ছে। পরিবারের স্বাভাবিক চাহিদা জেকে বসেছে। টাকা সংকটের কারনে বৃদ্ধ পিতা মাতা বা পরিবারের অসুস্থ্য রোগীকে চিকিৎসা করাতে পারছেন না। রান্না করার লাকড়ি বা গ্যাসও নিঃশ্বেষ। অভিভাবক হিসাবে আপনার মরিমরি অবস্থা। ধরুণ এই অবস্থা সকলের চলছে। পাশের বাড়ীতে, শহরে, গ্রামে বা মহল্লায়। কি করবেন আপনি? একবুক যুগ যন্ত্রনা নিয়ে চরম হতাশায় আপনাকে ভুগতে হবে। আর এগিয়ে যেতে হবে অন্য কোনো পরিনামের পথে।
নিছকভাবে এই গল্পটি না নিলেই ধন্য হব বৈকি। এবার আসল কতায় ফিরে আসি। জনগনের এমন পরিনতি ও দেশের পরিস্থিতি বিবেচনা করে বর্তমান সরকার স্বাস্থ্য বিভাগের মাধ্যমে কয়েকটি নির্দেশনা জারি করেছেন। লক্ষ্য হচ্ছে- জনগনকে বাঁচানো-দেশকে অর্থনৈতিক ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করা। সরকার বদ্ধমূলভাবে জানেন অর্থনৈতিক সচল চাকার কি পরিনতি হতে পারে। তাই সাবধান বাণী দিচ্ছেন। যথাযথ মোকাবেলা করার চেষ্টা করছেন।
এখন জনগণ হিসাবে আমাদের করণীয় আসলে কি? একটু সাময়িক কষ্ট হলেও ভবিষ্যতে ভালো থাকার জন্য সরকারকে সহযোগিতা করা কি উচিৎ না? মনে রাখবেন দুর্দিনে যে বা যারা সমালোচনা করেন তারা কপোট শ্রেণির। আপনি কোন দলের ভাবুনতো? আপনি নিজেকে যেমন ভালোবাসেন পরিবারকেও ভালোবাসেন। তেমনি দেশকে ভালোবাসার এখনই মক্ষম সময়। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে আমার মত অনেকে অংশ গ্রহণ করতে পারেন নি। কিন্তু জীবাণুযুদ্ধে অংশ নিয়ে প্রমান করি আমরা কতটা দেশকে ভালোবাসি। তাই আসুন সকলে ঘরে থেকে যুদ্ধে অবতীর্ণ হই। পরবর্তী নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত নিজেকে লকডাউন করে ফেলি। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখি।
গত কয়েকদিনে এই যুদ্ধের অবশিষ্ঠতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। শহর কিংবা গ্রাম। পাড়া কিংবা মহল্লা। সব ক্ষেত্রেই মানুষ জেগে উঠেছে। রাস্তাঘাট বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে। এলাকার যুবকরা পাহারা বসিয়েছে। ব্যাপারটা ভালো। তবে লক্ষ্য রাখতে হবে অন্যকে সচেতন করতে গিয়ে যেন নিজেই অসচেতন না হয়ে পড়ি। পারস্পারিক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছি। এটাও বেশ ভালো। কদাচিৎ যেন ভুল না হয় সেটা নজর রাখতে হবে। যার খাবার আছে ঘরে তাকে দিয়ে যেন খাবারহীন পরিবারকে এড়িয়ে না যায়। মানবিক কাজের মধ্যে অমানবিকতা ঢুকে না পড়ে।
এই আলোচনায় সরকারি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কিছু কথা বলার আছে। করোনা ভাইরাস মোকাবেলার নামে আমরা যেন চিকিৎসাসেবা বন্ধ না করি। গণমাধ্যমে খবর আসছে-চিকিৎসকগণ পালিয়েছে। চেম্বারে ডাক্তার থাকছেন না। এই অবস্থা তৈরি হলে শতশত অন্য রোগীর কি হাল হবে একটিবার ভেবে দেখুন। গর্ভবতী মায়েরা আছেন তাদের এই সময়টি খুবই জরুরী সময়। তাদেরকে কোনভাবেই অবহেলা করা যাবেনা। আপনারা মহান ব্রত নিয়ে মহান পেশায় নিযুক্ত। কারোনা ভাইরাসের ছোবল থেকে নিশ্চয় গোটা দেশ গোটা বিশ্ব মুক্ত হবে। আমরা আশাবাদী হয়ে বাঁচতে অভ্যস্ত। মানবিক মূল্যবোধও ক্ষণস্থায়ী। এই সংকট সময়ে নিজেকে শান্ত রাখি, সচেতন থাকি। সামনে সেই দিন অপেক্ষা করছে- স্পর্শ, আবেগ আর ভালোবাসার দিন। এই ভাইরাস মানুষই পরাস্থ করবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। আসুন বুকফুলে নিশ্বাস নিই। প্রিয়জনকে জড়িয়ে ধরে বলি পৃথিবীটা কতইনা সুন্দর।
——————————
শাহানুর আলম উজ্জ্বল
গণমাধ্যমকর্মী ও সাধারণ সম্পাদক প্রেসক্লাব,
চৌগাছা যশোর, বাংলাদেশ।

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ৭:২১ পূর্বাহ্ণ | মঙ্গলবার, ০৫ মে ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত