ঘোষণা

ধর্ম নিয়ে রুচিহীন প্রশ্ন ও বিব্রতকর আলোচনা বন্ধ হোক

প্রভাষ আমিন | বুধবার, ১৯ মে ২০২১ | পড়া হয়েছে 173 বার

ধর্ম নিয়ে রুচিহীন প্রশ্ন ও বিব্রতকর আলোচনা বন্ধ হোক

কয়েকদিন আগে ভারতের পাঁচ রাজ্যে নির্বাচন হয়েছে। এই রাজ্যগুলোর মধ্যে ছিল পশ্চিমবঙ্গও। বাংলাদেশের গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রতিক্রিয়া দেখে মনে হয়েছে, ভারতের কেন্দ্রীয় নির্বাচনের চেয়ে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন নিয়েই বুঝি বাংলাদেশের মানুষের আগ্রহ বেশি। আগ্রহটা অবশ্য অমূলক নয়। পশ্চিমবঙ্গের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কটা নাড়ীর। একসময়কার অভিন্ন বঙ্গ পরে ভাগ হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ পড়েছে ভারতে, পূর্ববঙ্গ পড়ে পাকিস্তানে, নাম হয় পুর্ব পাকিস্তান। একাত্তর সালে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তান থেকে স্বাধীনতা অর্জন করে বাংলাদেশ। তবে পশ্চিমবঙ্গের সাথে বাংলাদেশের মানুষের ভাষা, সংস্কৃতি, শিল্প-সাহিত্যের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগটা রয়েই গেছে। পশ্চিমবঙ্গ বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশী। ভারতের সাথে বাংলাদেশের সীমান্তের বড় অংশটা পশ্চিমবঙ্গের সাথে।

সাধারণ সময়ে বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ ভারতে বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে যায়। পর্যটন, চিকিৎসা, কেনাকাটা, ব্যবসা- নানা কারণে বাংলাদেশের মানুষ পশ্চিমবঙ্গে যায়। তাই পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় কারা থাকবে তা নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের বিপুল আগ্রহ। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের আগ্রহটা নানা কারণে। আমার ধারণা প্রথম কারণটা নির্বাচন। অনেক বছর ধরে বাংলাদেশের মানুষ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের স্বাদ ভুলে গেছে। পাশের রাজ্যেই যখন করোনার মধ্যেও আট দফায় দারুণ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হচ্ছে, সে উত্তাপটা ছুঁয়ে গেছে বাংলাদেোশর মানুষকেও।

আমার ধারণা অনেকদিন পর কাছ থেকে একটা নির্বাচন দেখে নির্বাচন নির্বাসনে যেতে দেখা বাংলাদেশের মানুষকে আনন্দে আপ্লুত করেছে। তবে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী সমীকরণটাই এবার বাংলাদেশের মানুষকে বেশি কৌতূহলী করেছে, একইসঙ্গে বিপদেও ফেলেছে। একদিকে সাম্প্রদায়িক বিজেপি। অপরদিকে বাংলাদেশের তিস্তার পানি পাওয়ার প্রধান অন্তরায় মমতা ব্যানার্জী। পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রদায়িকতার নীরব উত্থান ঘটলেও বিজেপি জিততে পারেনি। আর বিজেপির জিততে না পারায় বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগ উল্লাসের ঢেউ খেলে যায়। মমতার জয়ে যতটা না তারচেয়ে বেশি উল্লাস বিজেপির পরাজয়ে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ যেভাবে দিনের পর দিন বাংলাদেশ বিদ্বেষ ছড়াচ্ছিলেন, তাতে বিজেপির পরাজয়ে উল্লসিত হওয়ার যথেষ্ট যৌক্তিক কারণ রয়েছে। তবে আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের মানুষের স্বতস্ফুর্ত অবস্থান। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির নীরব উত্থান ঘটেছে বটে, তবে বিজেপির ক্ষমতায় আসতে না পারাটা যেন, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে বাঙালিয়ানার জয়।

কিন্তু নিজ দেশে নির্বাচনকে নির্বাসনে পাঠিয়ে পাশের দেশের নির্বাচন নিয়ে মাতামাতি করা বা নিজ দেশে সাম্প্রদায়িকতার অবাধ বিস্তার ঘটিয়ে পাশের দেশে সাম্প্রদায়িকতার পরাজয়ে উল্লসিত হওয়াটা আমার কাছে আত্মপ্রতারণা মনে হয়। বলছিলাম, সাম্প্রদায়িকতার কথা। মা দিবসের ছোট্ট দুটি ঘটনা আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, আমরা কতটা অসহিষ্ণু, কতটা অসভ্য, কতটা সাম্প্রদায়িক। এটা ঠিক একাত্তর সালে এই দেশ স্বাধীন হয়েছিল, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াই করেই। একাত্তর সালে আমাদের স্লোগান ছিল ‘বাংলার হিন্দু, বাংলার খ্রিস্টান, বাংলার বৌদ্ধ, বাংলার মুসলমান; আমরা সবাই বাঙালি।’

বাংলাদেশের চার মূলনীতির একটি হলো ধর্মনিরপেক্ষতা। ‘আমার এ দেশ সব মানুষের’ এটাই একাত্তরের চেতনা। কিন্তু দেশটা সব মানুষের থাকেনি, সব মানুষের হয়ে উঠতে পারেনি। এখানে গরীব আরো গরীব হয়েছে, সংখ্যালঘু আরো লঘু হয়েছে। এই যে দেশটা সব মানুষের হতে পারেনি, এটা আমাদের দোষ। মুক্তিযোদ্ধারা দেশটাকে স্বাধীন করে দিলেও, আমরা দেশটাকে ঠিক পথে রাখতে পারিনি। পাকিস্তানী প্রেতাত্মারা আবার এই দেশে শিকড় গেড়েছে। গত কয়েকবছরে রাষ্ট্রযন্ত্রের পৃষ্ঠপোষকতায় হেফাজত দেশের যে ক্ষতি করেছে, তা কয়েক দশকেও শুধরানো কঠিন। দেশের বিভিন্নস্থানে ওয়াজের নামে যেভাবে নারী বিদ্বেষ, ঘৃণা আর ধর্মবিদ্বেষ ছড়ানো হয়; তা বন্ধ করতে না পারলে এই দেশটাকে সব মানুষের বানানো যাবে না।

মা দিবসে অভিনেত্রী ভাবনা এবং তার বোন মিলে তার মাকে সারপ্রাইজ দিয়েছেন, কেক কেটেছেন, ফান করেছেন। প্রথম দেখে ভেবেছি, চমৎকার এই পারিবারিক ভিডিওটি ভাইরাল হবে মায়ের প্রতি সন্তানের ভালোবাসার নিদর্শন হিসেবে। কিছুক্ষণ পর টের পেলাম অভিনেত্রী ভাবনার ওয়ালে গালির স্রোত। কারণ তাদের তিনজনের কারো পরণেই ওড়না ছিল না। ছাপার অযোগ্য সব গালি তো আছেই, আছে বেহেশত-দোজখের ভাগাভাগি, তাদের জায়গা দোজখের নিকৃষ্টতম স্থানে হবে, সে রায়ও চলে এসেছে ফেসবুকের আদালতে।

ফেসবুকের কমেন্ট যদি সভ্যতার মাপকাঠি হয়, তাহলে মানতেই হবে বাংলাদেশ একটি অসভ্য দেশ। যিনি ধর্মীয় বিবেচনায় ভাবনা, তার বোন ও মাকে অশ্লীল গালাগাল করছেন; তারা কোনোভাবেই ভালো মুসলমান নন। ইসলাম কখনোই গালাগাল, অশ্লীলতা, ঘৃণা, বিদ্বেষ সমর্থন করে না। আপনি আপনার বিশ্বাস প্রচার করবেন, কিন্তু আরেকজনের ওপর সেটা চাপিয়ে দেবেন না। পোশাক একজন মানুষের ব্যক্তিগত রুচি, ব্যক্তিগত কমফোর্ট। এখানে চাপিয়ে দেয়ার কিছু নেই। একজন সভ্য মানুষ রুচিশীল শালীন পোশাক পরে চলবে, এটাই স্বাভাবিক।

উলঙ্গ চলাফেরায় কোনো আইনী বাধা নেই। কিন্তু কেউ উলঙ্গ চললে লোকে তাকে পাগল বলবে। শাড়ি পরে যেমন কেউ সমুদ্র সৈকতে যাবে না আবার বিকিনি পরে কেউ অফিসে আসবে না। পোশাকের ব্যাপারে ধর্মের চেয়ে কমফোর্টটাই আসল। ভাবনার পোশাক আপনার খারাপ লাগতে পারে, আপনি সেটা প্রকাশও করতে পারেন। কিন্তু আপনার একটি মন্তব্যই বুঝিয়ে দেবে আপনি মানুষ কেমন। ভাবনার ওয়ালে যারা মন্তব্য করেছেন, তাদের সবার আইডি কিন্তু ফেক নয়। তথাকথিত ভদ্র, সভ্য অনেকেই যে ভাষায় মন্তব্য করেছেন, তা অবিশ্বাস্য। আমি মাঝে মাঝে ভাবি, যারা এমন নোংরা মন্তব্য করে; তাদের বাবা-মা, ভাই-বোন, স্ত্রী-সন্তান কি এসব মন্তব্য দেখে না। তাদের কি লজ্জা হয় না?

মানলাম ভাবনা, তার বোন এবং মা মুসলমান হয়েও কেক কাটার সময় ওড়না না পরে, বোরকা না পরে মহা অন্যায় করেছে। কিন্তু সে শাস্তি দেয়ার জন্য নিশ্চয়ই আপনাকে কেউ দায়িত্ব দেয়নি। আপনি কেন সোশ্যাল পুলিশিং করছেন? ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর মত অনেক সময় থাকলে সোশ্যাল পুলিশিং না করে সোশ্যাল ওয়ার্ক করুন। বিদ্যানন্দের অনেক স্বেচ্ছাসেবী দরকার। সবাইকে তার মত করে তার জীবন যাপন করতে দিন, তার পছন্দমত পোশাক পরতে দিন। আচ্ছা এবার বলুনতো চঞ্চল চৌধুরীর অপরাধটা কী? মা দিবসে মায়ের সাথে তার ছবিটি তো অসাধারণ। নিষ্ঠাবান হিন্দু হিসেবে চঞ্চল চৌধুরীর মা সিঁথিতে সিদুর, কপালে টিপ পরেছেন, তাতে তাকে আরো সুন্দর লাগছিল। একজন হিন্দু নারী কপালে টিপ আর সিঁথিতে সিদুর পরলে আপনার সমস্য কোথায়?

চঞ্চল চৌধুরী হিন্দু, এটা যে আপনি জানতেন না; এটা তো আপনার সমস্যা, চঞ্চল চৌধুরীর নয়। চঞ্চল চৌধুরী তো মাইক নিয়ে বলে বেরাবে না যে ‘আমি হিন্দু’। চঞ্চল চৌধুরীর মায়ের ছবি যদি আপনার ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়েই থাকে, আপনি বোরকা পরা মায়ের সাথে ছবি দিন। একজন নিষ্ঠাবান হিন্দুকে গালি দিয়ে আপনি কো ধর্মকে ওপরে তুলতে চান? ‘হিন্দু হয়েও চঞ্চল এত ভালো অভিনয় কীভাবে করে’ এই যদি আপনার জ্বলুনির কারণ হয়, তবে তারচেয়ে ভালো অভিনয় করে আপনি দেখিয়ে দিন, গালি দিতে হবে কেন?

সমস্যা হলো, সাম্প্রদায়িকতা আমাদের মননে-মগজে গেঁথে আছে। আমাদের পাঠ্যপুস্তকের সাম্প্রদায়িকীকরণ হয়েছে। হিন্দুরা যে খারাপ সেটা ঘরে শেখানো হয়, স্কুলে শেখানো হয়। লাল পিঁপড়ার কামড়ে ব্যথা হয়, তাই এটা খারাপ, তাই লাল পিঁপড়া হিন্দু; এটাও তো ছেলেবেলা থেকে দেখে আসা। হিন্দুর সম্ভাষণের জবাবে তার খারাপ কামনা করার কথা টেলিভিশনে প্রচার হয়। সৌম্য বা লিটন দাশের ব্যাটিংও আমাদের সবাইকে আমোদিত করতে পারে না, ধর্ম বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ভারতে করোনার তাণ্ডবলিলার সময় উল্লসিত হতে দেখেছি অনেককে। ভারত হিন্দুপ্রধান রাষ্ট্র বলে সেখানে করোনার বিস্তার বেশি, বাংলাদেশ মুসলমানপ্রধান দেশ বলে এখানে করোনার বিস্তার কম; এমন বিশ্বাস করার মানুষ সমাজে অনেক।

সাম্প্রদায়িকতা সমাজের প্রতিটি স্তরে ছড়ানো। এটা ভাঙতে আমাদের সবাইকে আগে মানুষ হতে হবে। এই ‘মানুষ’ হতে চেয়েই চঞ্চল চৌধুরী দ্বিতীয় সাম্প্রদায়িক হামলার মুখে পরেছেন। মায়ের সাথে ছবি দিয়ে চরম সাম্প্রদায়িক হামলার মুখে পরা চঞ্চল চৌধুরী জবাবে লিখেছিলেন, ‘ভ্রাতা ও ভগ্নিগণ, আমি হিন্দু নাকি মুসলমান তাতে আপনাদের লাভ বা ক্ষতি কী? সকলেরই সবচেয়ে বড় পরিচয় মানুষ। ধর্ম নিয়ে এসকল রুচিহীন প্রশ্ন ও বিব্রতকর আলোচনা সকল ক্ষেত্রে বন্ধ হোক। আসুন সবাই মানুষ হই।’ কিন্তু সবাইকে মানুষ হতে বলে তিনি হিন্দু সাম্প্রদায়িকদের কবলে পরেছেন। ‘বাংলাদেশে হিন্দুদের অবস্থা এতটাই খারাপ যে চঞ্চল চৌধুরীর মত তারকা হিন্দুও জোর গলায় বলতে পারেননি- আমি হিন্দু। নিজেকে বাঁচাতে তাকেও নিজেকে মানুষ দাবি করতে হয়েছে।’ এই হলো বাংলাদেশের কিছু হিন্দুর মানসিকতা। হে আল্লাহ, হে ভগবান; এই মুসলমান আর হিন্দুদের অনবতর থেকে তুমি সাম্প্রদায়িকতার গরলটুকু তুলে নাও, ধর্মের অমৃতের সন্ধানটা তাদের দাও। তাদের ভালো ধার্মিক বানাও, তার আগে তাদের ভালো মানুষ বানাও।

চঞ্চল যেটা বলতে চেয়েছেন, সেটাই মোদ্দা কথা। ধর্ম থাকুক ব্যক্তিগত জীবন আচারে, আমাদের সবার বড় পরিচয় হোক, আমরা মানুষ। সুমন চট্টোপাধ্যায় আমার খুবই প্রিয় শিল্পী। ধর্মান্তরিত হয়ে তিনি এখন গাইছেন কবির সুমন নামে। তাতে কোনো ফারাক হয়নি। সুমন এখনও আগের মতই ধারালো, চিন্তাশীল। সুমনের একটি চাওয়ার সাথে আমার চাওয়া ষোলআনা মিলে যায়। সেই চাওয়া দিয়েই শেষ করছি লেখাটি ‘আমি চাই বিজেপি নেতার সালমা খাতুন পুত্রবধূ/আমি চাই ধর্ম বলতে মানুষ বুঝবে মানুষ শুধু।’
১৬ মে, ২০২১


প্রভাষ আমিন, লেখক, সাংবাদিক-কলামিষ্ট।
——————-
জাগো নিউজ ২৪ থেকে লেখাটি নেয়া হয়েছে।

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ১০:০৬ পূর্বাহ্ণ | বুধবার, ১৯ মে ২০২১

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

৩০ বছরে কোথায় গণতন্ত্র

০৭ ডিসেম্বর ২০২০