ঘোষণা

প্রয়াত হলেন সুরের নাইটেঙ্গেল লতা মঙ্গেশকর

বিবেকবার্তা ডেস্ক | রবিবার, ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২২ | পড়া হয়েছে 105 বার

প্রয়াত হলেন সুরের নাইটেঙ্গেল লতা মঙ্গেশকর

ভারতীয় সঙ্গীত জগতে ঘোর তমসাময় দিন আজ।৬ সেপ্টেম্বর ২০২২ প্রয়াত হলেন সুরসম্রাজ্ঞী লতা মঙ্গেশকর । রবিবার সকালে মুম্বইয়ের ব্রিচ ক‍্যান্ডি হাসপাতালেই শেষ নিঃশ্বাস ত‍্যাগ করেন তিনি। লতা মঙ্গেশকরের বোন উষা মঙ্গেশকর তাঁর মৃত‍্যুর খবর জানান সংবাদ মাধ‍্যমকে।

ভারতীয় সাংষ্কৃতিক জগতে ইন্দ্রপতন। গোটা দেশ শোকাহত বর্ষীয়ান গায়িকার প্রয়াণে। টুইটারে শোকবার্তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তিনি লিখেছেন, ‘আমি বাকরুদ্ধ। দয়াশীল ও যত্নবান লতা দিদি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। তাঁর প্রয়াণে আমাদের দেশে যে শূন‍্যতা তৈরি হল তা আর কোনোদিন পূর্ণ হবে না। আগামী প্রজন্ম তাঁকে ভারতীয় সংষ্কৃতির একজন দিকপাল হিসাবে চিনবে, যার সুরেলা গলা মানুষকে মুগ্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখত।’

গত ৮ জানুয়ারি করোনার মৃদু উপসর্গ নিয়ে মুম্বইয়ের ব্রিজ ক‍্যান্ডি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন গায়িকা। নিউমোনিয়াও ধরা পড়ে তাঁর। গত সপ্তাহে ভেন্টিলেটর থেকে বের করা হয় প্রবীণ গায়িকাকে। অনেকটাই সুস্থ হয়ে তিনি।

তারপরেই আসে দুঃসংবাদ। গতকাল সরস্বতী পুজোর দিনই এসে পৌঁছেছিল খারাপ খবর। শারীরিক পরিস্থিতির অবনতি হয় সুরসম্রাজ্ঞী লতা মঙ্গেশকরের। শ্বাসকষ্টের সমস‍্যা শুরু হওয়ায় আবারো ভেন্টিলেশনে রাখা হয় বর্ষীয়ান গায়িকাকে। দিদিকে দেখতে গিয়েছিলেন গায়িকা আশা ভোঁসলেও। তিনি স্বস্তির খবর দিয়ে বলেন, লতা মঙ্গেশকর আপাতত স্থিতিশীল আছেন।

হাসপাতালে গায়িকাকে দেখে ফেরার পথে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়েছিলেন আশা ভোঁসলে। তিনি আশ্বাস দিয়ে বলেন, “চিকিৎসকরা জানিয়েছেন তিনি এখন স্থিতিশীল আছেন।” সংবাদ মাধ‍্যম সূত্রে খবর, চিকিৎসকদের কড়া পর্যবেক্ষণে রয়েছেন লতা মঙ্গেশকর। তাঁর স্বাস্থ‍্যের অবনতির খবর পেয়েই হাসপাতালে পৌঁছান আশা, উষা ও হৃদয়নাথ।

শনিবার খবর আসে লতা মঙ্গেশকরের শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়েছে। যে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে তিনি রয়েছেন, সেই প্রতীত সামদানি জানান, আবারো অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বর্ষীয়ান গায়িকা। ফলতঃ পুনরায় ভেন্টিলেশনে রাখতে হয়েছে তাঁকে। আইসিইউতে চিকিৎসকদের কড়া পর্যবেক্ষণে রয়েছেন সুরসম্রাজ্ঞী। কিন্তু শেষরক্ষা হল না।

লতা মঙ্গেশকর ভারতের একজন স্বনামধন্য গায়িকা। লতা মঙ্গেশকর এক হাজারেরও বেশি ভারতীয় ছবিতে গান করেছেন। এছাড়া ভারতের ৩৬টি আঞ্চলিক ভাষাতে ও বিদেশি ভাষায় গান গাওয়ার একমাত্র রেকর্ডটি তারই।

লতা মঙ্গেশকর ১৯২৯ সালের ২৮শে সেপ্টেম্বর তৎকালীন ইন্দোর রাজ্যের রাজধানী ইন্দোর জন্মগ্রহণ করেন ।
দ্বীননাথ মঙ্গেশকর আর সেবন্তী মঙ্গেশকরের ঘরে এলো তাদের প্রথম সন্তান, নাম রাখলেন হেমা।দ্বীননাথের দ্বিতীয় স্ত্রী ছিলেন সেবন্তী। পণ্ডিত দ্বীননাথ নিজেও সঙ্গীত আচার্য ছিলেন। সঙ্গীত ও নাটক- দু’ক্ষেত্রেই ছিল তার সাবলীল যাতায়াত। মঞ্চনাটক লিখতেন, সাথে অভিনয়ও করতেন। নাটকের প্রয়োজনে গানও গাইতেন। ‘ভাউবন্ধন’ নামের এক নাটক পরিচালনার পর নাটকের প্রধান চরিত্র লতিকাকে খুব মনে ধরেছিল দ্বীননাথ-সেবন্তী দম্পতীর। তাই সন্তানের নাম হেমা থেকে বদলে রাখা হলো লতা।

নাম বদলের ইতিহাস তাদের পরিবারে অবশ্য নতুন নয়। বর্তমান মধ্যপ্রদেশের অধিবাসী লতা মঙ্গেশকরের পরিবারের পদবী ছিল হরদিকর। দ্বীননাথ এটিকে বদলে মঙ্গেশকর করেন, যাতে তাদের নিজেদের এলাকা গোয়ার মঙ্গেশি শহরের মানুষ বলে তাদের চিহ্নিত করা যায়।

লতা মঙ্গেশকরের পুরো পরিবারই বলতে গেলে সঙ্গীতের রথী মহারথী ছিলেন। লতার পর একে একে সেবন্তীর কোলে আসেন আশা ভোঁসলে, উষা মঙ্গেশকর, মীনা মঙ্গেশকর ও সর্বকনিষ্ঠ হৃদয়নাথ মঙ্গেশকর। ভাই-বোন বলতে পাগল ছিলেন লতা। কথিত আছে প্রতিদিন ছোট বোন আশা ভোসলেকে নিজের সাথে করে স্কুলে নিয়ে যেতেন। স্কুল কর্তৃপক্ষ নিষেধ করলে রাগ করে সেই স্কুলে যাওয়াই ছেড়ে দেন তিনি। এ নিয়ে আবার ভিন্ন একটি মতও আছে। স্কুলের প্রথম দিনেই নাকি শিশু লতা অন্য শিশুদের গান শেখাচ্ছিল! শিক্ষক নিষেধ করতেই ছেড়ে চলে আসেন স্কুল।

শোনা যায়, লতাকে ছোটবেলায় গান শেখানো হলেও কোনো অগ্রগতি ছিল না তার শেখায়। ওদিকে দ্বীননাথ নিজের বাসাতেই অনেক ছাত্রকে গান শেখাতেন। একদিনের ঘটনা, অল্প কিছু সময়ের জন্য বাইরে গেছেন দ্বীননাথ। এক ছাত্রকে বলে গিয়েছেন গানের অনুশীলন করতে। ফিরে এসে দরজায় দাঁড়িয়ে দেখলেন ছোট্ট লতা তার ছাত্রের গানের রাগ শুধরে দিচ্ছে। তারপর থেকেই বাবার কাছে লতার তালিমের শুরু।

পাঁচ বছর বয়স থেকে বাবার লেখা মারাঠি গীতি নাটকে ছোট ছোট চরিত্রে অংশগ্রহণ করতেন লতা। একদিন দ্বীননাথের নাটকে নারদ মুনির চরিত্রের অভিনেতা কোনো কারণে এসে পৌঁছান নি। তার আবার গানও গাওয়ার কথা। লতা বাবাকে এসে বললেন, তিনি নারদের ভূমিকায় অভিনয় করতে চান। প্রথমেই দ্বীননাথ তার প্রস্তাব বাতিল করে দিলেন। ওই অতটুকু নারদ মুনিকে দেখতে যদি জোকার লাগে? লতার পীড়াপীড়িতে শেষটায় রাজি হলেন। লতার অভিনয় আর গান শেষে দর্শকরা “আবার চাই আবার চাই” বলে চিৎকার করেছিল সেদিন।

পিতার ছায়া খুব বেশিদিন থাকেনি মঙ্গেশকর পরিবারের উপর। লতার বয়স যখন মাত্র ১৩ বছর, তখন (১৯৪২ সাল) হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে দ্বীননাথ মঙ্গেশকর মারা যান। ফলে সম্পূর্ণ পরিবারের দায়িত্ব এসে পড়ে ১৩ বছর বয়সী লতার উপর। পরিবারের বন্ধু ‘নবযুগ চিত্রপট চলচ্চিত্র কোম্পানি’র মালিক মাস্টার বিনায়ক তখন পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন মঙ্গেশকর পরিবারের। ছোটবেলায় মাঝে মাঝে চলচ্চিত্রে গান গেয়েছেন লতা। কিন্তু বিনায়ক তাকে গান আর অভিনয়কে ক্যারিয়ার হিসেবে নিতে শেখালেন। মারাঠী চলচ্চিত্রে গাওয়া তার গান ‘খেলু সারি মানি হাউস ভারি’ চলচ্চিত্রের ফাইনাল কাট থেকে বাদ পড়ে গেল। তবু দমে যাননি লতা।

মাস্টার বিনায়ক তার চলচ্চিত্র ‘পাহিলি মঙ্গলা-গৌর’ এ লতা মঙ্গেশকরের জন্য ছোট একটি চরিত্র বরাদ্দ করেন। এ চলচ্চিত্রে দাদা চান্দেকারের রচনা করা গান ‘নাটালি চৈত্রাচি নাভালাল’ এ কন্ঠ দেন তিনি। তখনো চলছে তার জীবনের সাথে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ। চলচ্চিত্রের জীবনকে কখনো আপন করে নিতে পারেননি তিনি। একদিন কাজ শেষে কাঁদতে কাঁদতে বাসায় ফিরলেন। মায়ের প্রশ্নের উত্তরে জানান, এই কৃত্রিম অভিনয়ের জগত তার আর ভালো লাগে না। কিন্তু কিছু করার নেই, পুরো পরিবারের দায়িত্ব তার কাঁধে।বসন্ত যুগলকরের ‘আপ কি সেবা ম্যায়’ চলচ্চিত্রে ‘পা লাগো কার জোরি’ গানটি তার প্রথম হিন্দি ভাষার চলচ্চিত্রে গাওয়া গান।

বিনায়কের মৃত্যুর পর সঙ্গীত পরিচালক গুলাম হায়দার হন লতার গুরু। ৮৪তম জন্মদিনে তিনি বলেছিলেন, গুলাম হায়দার তার জীবনে ‘গডফাদার’ ছিলেন। গুলাম হায়দারের হাত ধরে তার জীবনে সুযোগ এল ‘মজবুর’ (১৯৪৮) চলচ্চিত্রে ‘দিল মেরা তোড়া, মুঝে কাহি কা না ছোড়া’ গানটি গাওয়ার। এই এক গানেই বলিউড ইন্ডাস্ট্রি নতুন এই গায়িকাকে নিয়ে ভাবতে বাধ্য হয়। জীবনের প্রথম বড় ধরনের হিট নিয়ে আসে ‘মহল’ (১৯৪৯) চলচ্চিত্রের ‘আয়েগা আনেওয়ালা’ গানটি। এ গানে ঠোঁট মেলালেন মধুবালা।

সেই তো সবে শুরু। তারপর শত শত গানে আপ্লুত করেছেন লাখো মানুষকে। ভালোবাসার সাথেই এসেছে অসংখ্য পুরষ্কার ও উপাধি।পঞ্চাশের দশকেই গান করে ফেললেন নামীদামী সব সঙ্গীত পরিচালকদের সাথে। ষাটের দশকে উপহার দিলেন ‘পিয়ার কিয়া তো ডারনা কিয়া’ বা ‘আজিব দাসতা হ্যায় ইয়ে’ এর মতো এখনো পর্যন্ত তুমুলভাবে বিখ্যাত সব গান।

১৯৬৩ সাল; ভারত-চীন যুদ্ধে লিপ্ত, জীবন বিসর্জন দিচ্ছেন সৈন্যরা। লতা গাইলেন ‘ইয়ে মেরে ওয়াতান কি লোগো’ গানটি। তার এই গান শুনে কেঁদেছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং জওহরলাল নেহরু। সত্তরের দশকে শত শত গান সৃষ্টির সাথেই কনসার্ট করেছেন দেশে-বিদেশে, তাদের অনেকগুলো আবার চ্যারিটিও। থেমে থাকেনি সময়, থেমে থাকেননি লতা। তার এত এত সৃষ্টির ফলে অনায়াসে গিনেজ বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে সর্বোচ্চ সংখ্যার গান রেকর্ডকারী হিসেবে তার নাম আসে। পরে অবশ্য তার এই রেকর্ড ভেঙেছিলেন নিজেরই ছোট বোন আশা ভোঁসলে। মোট ৩৬টি ভাষায় রচিত তাঁর এই গানগুলোর অনেকগুলো ভাষা তিনি আসলে জানতেনই না। তার মধ্যে বাংলা গানও আছে।

তার কৃতিত্বের স্বীকৃতি স্বরূপ রয়েছে তিনটি জাতীয় পুরস্কার, বারোটি বাঙালী ফিল্ম জার্নালিস্ট এসোসিয়েশন পুরস্কার এবং চারটি ফিল্মফেয়ার পুরস্কার। শেষে অবশ্য তিনি আর ফিল্ম ফেয়ার নেবেন না বলে জানিয়ে দিয়েছেন। তার মতে, নতুনদের জায়গা করে দেয়া দরকার।

শুধু পুরস্কার নয়, ১৯৬৯ সালে ‘পদ্মভূষণ’, ১৯৮৯ সালে দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার, ১৯৯৯ সালে ‘পদ্মবিভূষণ’ আর ২০০১ সালে দ্বিতীয় ভারতীয় সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে লতা অর্জন করেন ‘ভারত রত্ন’ খেতাব।

তার পিতা পণ্ডিত দীনানাথ মঙ্গেশকর একজন মারাঠি ও কোঙ্কিণী সঙ্গীতজ্ঞ এবং মঞ্চ অভিনেতা ছিলেন । তার মাতা শেবন্তী (পরবর্তী
ত্রিশ হাজারেরও অনেক বেশি গান গাইবার বিশ্ব রেকর্ডের অধিকারী লতা মঙ্গেশকর । বহু গান শিল্পীর নিজের সংগ্রহেই নেই । সম্পূর্ণ তালিকা উদ্ধারই বেশ শক্ত কাজ । ১৯৫৯ সালেই সপ্তাহে গড়ে তিরিশটি করে গান রেকর্ড করতে হয়েছে লতা মঙ্গেশকরকে । একাত্তর সালের মধ্যে আঠারোশো সিনেমায় লতা মঙ্গেশকর রেকর্ড করে ফেলেছেন প্রায় পঁচিশ হাজার গান ।

আকাশছোঁয়া খ্যাতির পথে হাঁটতে হাঁটতে অজস্র পুরস্কার সম্মানের মিছিল লতার দরোজায় কড়া নেড়েছে । কোলাপুর , খয়রাগড় , হায়দ্রাবাদ তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডক্টরেট খেতাব ( সম্মানসূচক ) , শঙ্করাচার্যের দেওয়া ‘ স্বরভারতী উপাধি , ইলকরঞ্জী প্রদত্ত রাষ্ট্রভূষণ তিরুপতি দেব স্থানমের দেওয়া ‘ আস্থাবিদ্বান খেতাব পেয়েছেন । তেইশ বার শ্রেষ্ঠ প্লে – ব্যাক সিঙ্গার পুরস্কার অর্জন করেছেন । মধ্যপ্রদেশ সরকার দিয়েছেন ‘ তানসেন পুরস্কার ’ । লতা মঙ্গেশকরকে ভারত সরকার চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সম্মান ‘ দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার ’ এবং ‘ পদ্মভূষণ ’ পুরস্কারে ভূষিত করেছেন ।

২০০১ সালে ভারতের সর্বোচ্চ পুরস্কার “ ভারতরত্ন ” পুরস্কারে পুরস্কৃত হয়েছেন কোকিলকণ্ঠী লতা মঙ্গেশকর।

লতা মঙ্গেশকরের প্রয়ানে সুরের জগতে এক সোনালী অধ্যােয়র অবসান হলো।লতাজি তাঁর কন্ঠের মূর্ছনায় ছুঁয়ে গেছেন সবার হৃদয়।তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করছি

প্রয়াত হলেন সুরের নাইটেঙ্গেল লতা মঙ্গেশকর

ভারতীয় সঙ্গীত জগতে ঘোর তমসাময় দিন আজ।৬ সেপ্টেম্বর ২০২২ প্রয়াত হলেন সুরসম্রাজ্ঞী লতা মঙ্গেশকর । রবিবার সকালে মুম্বইয়ের ব্রিচ ক‍্যান্ডি হাসপাতালেই শেষ নিঃশ্বাস ত‍্যাগ করেন তিনি। লতা মঙ্গেশকরের বোন উষা মঙ্গেশকর তাঁর মৃত‍্যুর খবর জানান সংবাদ মাধ‍্যমকে।

ভারতীয় সাংষ্কৃতিক জগতে ইন্দ্রপতন। গোটা দেশ শোকাহত বর্ষীয়ান গায়িকার প্রয়াণে। টুইটারে শোকবার্তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তিনি লিখেছেন, ‘আমি বাকরুদ্ধ। দয়াশীল ও যত্নবান লতা দিদি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। তাঁর প্রয়াণে আমাদের দেশে যে শূন‍্যতা তৈরি হল তা আর কোনোদিন পূর্ণ হবে না। আগামী প্রজন্ম তাঁকে ভারতীয় সংষ্কৃতির একজন দিকপাল হিসাবে চিনবে, যার সুরেলা গলা মানুষকে মুগ্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখত।’

গত ৮ জানুয়ারি করোনার মৃদু উপসর্গ নিয়ে মুম্বইয়ের ব্রিজ ক‍্যান্ডি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন গায়িকা। নিউমোনিয়াও ধরা পড়ে তাঁর। গত সপ্তাহে ভেন্টিলেটর থেকে বের করা হয় প্রবীণ গায়িকাকে। অনেকটাই সুস্থ হয়ে তিনি।

তারপরেই আসে দুঃসংবাদ। গতকাল সরস্বতী পুজোর দিনই এসে পৌঁছেছিল খারাপ খবর। শারীরিক পরিস্থিতির অবনতি হয় সুরসম্রাজ্ঞী লতা মঙ্গেশকরের। শ্বাসকষ্টের সমস‍্যা শুরু হওয়ায় আবারো ভেন্টিলেশনে রাখা হয় বর্ষীয়ান গায়িকাকে। দিদিকে দেখতে গিয়েছিলেন গায়িকা আশা ভোঁসলেও। তিনি স্বস্তির খবর দিয়ে বলেন, লতা মঙ্গেশকর আপাতত স্থিতিশীল আছেন।

হাসপাতালে গায়িকাকে দেখে ফেরার পথে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়েছিলেন আশা ভোঁসলে। তিনি আশ্বাস দিয়ে বলেন, “চিকিৎসকরা জানিয়েছেন তিনি এখন স্থিতিশীল আছেন।” সংবাদ মাধ‍্যম সূত্রে খবর, চিকিৎসকদের কড়া পর্যবেক্ষণে রয়েছেন লতা মঙ্গেশকর। তাঁর স্বাস্থ‍্যের অবনতির খবর পেয়েই হাসপাতালে পৌঁছান আশা, উষা ও হৃদয়নাথ।

শনিবার খবর আসে লতা মঙ্গেশকরের শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়েছে। যে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে তিনি রয়েছেন, সেই প্রতীত সামদানি জানান, আবারো অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বর্ষীয়ান গায়িকা। ফলতঃ পুনরায় ভেন্টিলেশনে রাখতে হয়েছে তাঁকে। আইসিইউতে চিকিৎসকদের কড়া পর্যবেক্ষণে রয়েছেন সুরসম্রাজ্ঞী। কিন্তু শেষরক্ষা হল না।

লতা মঙ্গেশকর ভারতের একজন স্বনামধন্য গায়িকা। লতা মঙ্গেশকর এক হাজারেরও বেশি ভারতীয় ছবিতে গান করেছেন। এছাড়া ভারতের ৩৬টি আঞ্চলিক ভাষাতে ও বিদেশি ভাষায় গান গাওয়ার একমাত্র রেকর্ডটি তারই।

লতা মঙ্গেশকর ১৯২৯ সালের ২৮শে সেপ্টেম্বর তৎকালীন ইন্দোর রাজ্যের রাজধানী ইন্দোর জন্মগ্রহণ করেন ।
দ্বীননাথ মঙ্গেশকর আর সেবন্তী মঙ্গেশকরের ঘরে এলো তাদের প্রথম সন্তান, নাম রাখলেন হেমা।দ্বীননাথের দ্বিতীয় স্ত্রী ছিলেন সেবন্তী। পণ্ডিত দ্বীননাথ নিজেও সঙ্গীত আচার্য ছিলেন। সঙ্গীত ও নাটক- দু’ক্ষেত্রেই ছিল তার সাবলীল যাতায়াত। মঞ্চনাটক লিখতেন, সাথে অভিনয়ও করতেন। নাটকের প্রয়োজনে গানও গাইতেন। ‘ভাউবন্ধন’ নামের এক নাটক পরিচালনার পর নাটকের প্রধান চরিত্র লতিকাকে খুব মনে ধরেছিল দ্বীননাথ-সেবন্তী দম্পতীর। তাই সন্তানের নাম হেমা থেকে বদলে রাখা হলো লতা।

নাম বদলের ইতিহাস তাদের পরিবারে অবশ্য নতুন নয়। বর্তমান মধ্যপ্রদেশের অধিবাসী লতা মঙ্গেশকরের পরিবারের পদবী ছিল হরদিকর। দ্বীননাথ এটিকে বদলে মঙ্গেশকর করেন, যাতে তাদের নিজেদের এলাকা গোয়ার মঙ্গেশি শহরের মানুষ বলে তাদের চিহ্নিত করা যায়।

লতা মঙ্গেশকরের পুরো পরিবারই বলতে গেলে সঙ্গীতের রথী মহারথী ছিলেন। লতার পর একে একে সেবন্তীর কোলে আসেন আশা ভোঁসলে, উষা মঙ্গেশকর, মীনা মঙ্গেশকর ও সর্বকনিষ্ঠ হৃদয়নাথ মঙ্গেশকর। ভাই-বোন বলতে পাগল ছিলেন লতা। কথিত আছে প্রতিদিন ছোট বোন আশা ভোসলেকে নিজের সাথে করে স্কুলে নিয়ে যেতেন। স্কুল কর্তৃপক্ষ নিষেধ করলে রাগ করে সেই স্কুলে যাওয়াই ছেড়ে দেন তিনি। এ নিয়ে আবার ভিন্ন একটি মতও আছে। স্কুলের প্রথম দিনেই নাকি শিশু লতা অন্য শিশুদের গান শেখাচ্ছিল! শিক্ষক নিষেধ করতেই ছেড়ে চলে আসেন স্কুল।

শোনা যায়, লতাকে ছোটবেলায় গান শেখানো হলেও কোনো অগ্রগতি ছিল না তার শেখায়। ওদিকে দ্বীননাথ নিজের বাসাতেই অনেক ছাত্রকে গান শেখাতেন। একদিনের ঘটনা, অল্প কিছু সময়ের জন্য বাইরে গেছেন দ্বীননাথ। এক ছাত্রকে বলে গিয়েছেন গানের অনুশীলন করতে। ফিরে এসে দরজায় দাঁড়িয়ে দেখলেন ছোট্ট লতা তার ছাত্রের গানের রাগ শুধরে দিচ্ছে। তারপর থেকেই বাবার কাছে লতার তালিমের শুরু।

পাঁচ বছর বয়স থেকে বাবার লেখা মারাঠি গীতি নাটকে ছোট ছোট চরিত্রে অংশগ্রহণ করতেন লতা। একদিন দ্বীননাথের নাটকে নারদ মুনির চরিত্রের অভিনেতা কোনো কারণে এসে পৌঁছান নি। তার আবার গানও গাওয়ার কথা। লতা বাবাকে এসে বললেন, তিনি নারদের ভূমিকায় অভিনয় করতে চান। প্রথমেই দ্বীননাথ তার প্রস্তাব বাতিল করে দিলেন। ওই অতটুকু নারদ মুনিকে দেখতে যদি জোকার লাগে? লতার পীড়াপীড়িতে শেষটায় রাজি হলেন। লতার অভিনয় আর গান শেষে দর্শকরা “আবার চাই আবার চাই” বলে চিৎকার করেছিল সেদিন।

পিতার ছায়া খুব বেশিদিন থাকেনি মঙ্গেশকর পরিবারের উপর। লতার বয়স যখন মাত্র ১৩ বছর, তখন (১৯৪২ সাল) হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে দ্বীননাথ মঙ্গেশকর মারা যান। ফলে সম্পূর্ণ পরিবারের দায়িত্ব এসে পড়ে ১৩ বছর বয়সী লতার উপর। পরিবারের বন্ধু ‘নবযুগ চিত্রপট চলচ্চিত্র কোম্পানি’র মালিক মাস্টার বিনায়ক তখন পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন মঙ্গেশকর পরিবারের। ছোটবেলায় মাঝে মাঝে চলচ্চিত্রে গান গেয়েছেন লতা। কিন্তু বিনায়ক তাকে গান আর অভিনয়কে ক্যারিয়ার হিসেবে নিতে শেখালেন। মারাঠী চলচ্চিত্রে গাওয়া তার গান ‘খেলু সারি মানি হাউস ভারি’ চলচ্চিত্রের ফাইনাল কাট থেকে বাদ পড়ে গেল। তবু দমে যাননি লতা।

মাস্টার বিনায়ক তার চলচ্চিত্র ‘পাহিলি মঙ্গলা-গৌর’ এ লতা মঙ্গেশকরের জন্য ছোট একটি চরিত্র বরাদ্দ করেন। এ চলচ্চিত্রে দাদা চান্দেকারের রচনা করা গান ‘নাটালি চৈত্রাচি নাভালাল’ এ কন্ঠ দেন তিনি। তখনো চলছে তার জীবনের সাথে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ। চলচ্চিত্রের জীবনকে কখনো আপন করে নিতে পারেননি তিনি। একদিন কাজ শেষে কাঁদতে কাঁদতে বাসায় ফিরলেন। মায়ের প্রশ্নের উত্তরে জানান, এই কৃত্রিম অভিনয়ের জগত তার আর ভালো লাগে না। কিন্তু কিছু করার নেই, পুরো পরিবারের দায়িত্ব তার কাঁধে।বসন্ত যুগলকরের ‘আপ কি সেবা ম্যায়’ চলচ্চিত্রে ‘পা লাগো কার জোরি’ গানটি তার প্রথম হিন্দি ভাষার চলচ্চিত্রে গাওয়া গান।

বিনায়কের মৃত্যুর পর সঙ্গীত পরিচালক গুলাম হায়দার হন লতার গুরু। ৮৪তম জন্মদিনে তিনি বলেছিলেন, গুলাম হায়দার তার জীবনে ‘গডফাদার’ ছিলেন। গুলাম হায়দারের হাত ধরে তার জীবনে সুযোগ এল ‘মজবুর’ (১৯৪৮) চলচ্চিত্রে ‘দিল মেরা তোড়া, মুঝে কাহি কা না ছোড়া’ গানটি গাওয়ার। এই এক গানেই বলিউড ইন্ডাস্ট্রি নতুন এই গায়িকাকে নিয়ে ভাবতে বাধ্য হয়। জীবনের প্রথম বড় ধরনের হিট নিয়ে আসে ‘মহল’ (১৯৪৯) চলচ্চিত্রের ‘আয়েগা আনেওয়ালা’ গানটি। এ গানে ঠোঁট মেলালেন মধুবালা।

 

সেই তো সবে শুরু। তারপর শত শত গানে আপ্লুত করেছেন লাখো মানুষকে। ভালোবাসার সাথেই এসেছে অসংখ্য পুরষ্কার ও উপাধি।পঞ্চাশের দশকেই গান করে ফেললেন নামীদামী সব সঙ্গীত পরিচালকদের সাথে। ষাটের দশকে উপহার দিলেন ‘পিয়ার কিয়া তো ডারনা কিয়া’ বা ‘আজিব দাসতা হ্যায় ইয়ে’ এর মতো এখনো পর্যন্ত তুমুলভাবে বিখ্যাত সব গান।

১৯৬৩ সাল; ভারত-চীন যুদ্ধে লিপ্ত, জীবন বিসর্জন দিচ্ছেন সৈন্যরা। লতা গাইলেন ‘ইয়ে মেরে ওয়াতান কি লোগো’ গানটি। তার এই গান শুনে কেঁদেছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং জওহরলাল নেহরু। সত্তরের দশকে শত শত গান সৃষ্টির সাথেই কনসার্ট করেছেন দেশে-বিদেশে, তাদের অনেকগুলো আবার চ্যারিটিও। থেমে থাকেনি সময়, থেমে থাকেননি লতা। তার এত এত সৃষ্টির ফলে অনায়াসে গিনেজ বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে সর্বোচ্চ সংখ্যার গান রেকর্ডকারী হিসেবে তার নাম আসে। পরে অবশ্য তার এই রেকর্ড ভেঙেছিলেন নিজেরই ছোট বোন আশা ভোঁসলে। মোট ৩৬টি ভাষায় রচিত তাঁর এই গানগুলোর অনেকগুলো ভাষা তিনি আসলে জানতেনই না। তার মধ্যে বাংলা গানও আছে।

তার কৃতিত্বের স্বীকৃতি স্বরূপ রয়েছে তিনটি জাতীয় পুরস্কার, বারোটি বাঙালী ফিল্ম জার্নালিস্ট এসোসিয়েশন পুরস্কার এবং চারটি ফিল্মফেয়ার পুরস্কার। শেষে অবশ্য তিনি আর ফিল্ম ফেয়ার নেবেন না বলে জানিয়ে দিয়েছেন। তার মতে, নতুনদের জায়গা করে দেয়া দরকার।

শুধু পুরস্কার নয়, ১৯৬৯ সালে ‘পদ্মভূষণ’, ১৯৮৯ সালে দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার, ১৯৯৯ সালে ‘পদ্মবিভূষণ’ আর ২০০১ সালে দ্বিতীয় ভারতীয় সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে লতা অর্জন করেন ‘ভারত রত্ন’ খেতাব।

তার পিতা পণ্ডিত দীনানাথ মঙ্গেশকর একজন মারাঠি ও কোঙ্কিণী সঙ্গীতজ্ঞ এবং মঞ্চ অভিনেতা ছিলেন । তার মাতা শেবন্তী (পরবর্তী
ত্রিশ হাজারেরও অনেক বেশি গান গাইবার বিশ্ব রেকর্ডের অধিকারী লতা মঙ্গেশকর । বহু গান শিল্পীর নিজের সংগ্রহেই নেই । সম্পূর্ণ তালিকা উদ্ধারই বেশ শক্ত কাজ । ১৯৫৯ সালেই সপ্তাহে গড়ে তিরিশটি করে গান রেকর্ড করতে হয়েছে লতা মঙ্গেশকরকে । একাত্তর সালের মধ্যে আঠারোশো সিনেমায় লতা মঙ্গেশকর রেকর্ড করে ফেলেছেন প্রায় পঁচিশ হাজার গান ।

আকাশছোঁয়া খ্যাতির পথে হাঁটতে হাঁটতে অজস্র পুরস্কার সম্মানের মিছিল লতার দরোজায় কড়া নেড়েছে । কোলাপুর , খয়রাগড় , হায়দ্রাবাদ তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডক্টরেট খেতাব ( সম্মানসূচক ) , শঙ্করাচার্যের দেওয়া ‘ স্বরভারতী উপাধি , ইলকরঞ্জী প্রদত্ত রাষ্ট্রভূষণ তিরুপতি দেব স্থানমের দেওয়া ‘ আস্থাবিদ্বান খেতাব পেয়েছেন । তেইশ বার শ্রেষ্ঠ প্লে – ব্যাক সিঙ্গার পুরস্কার অর্জন করেছেন । মধ্যপ্রদেশ সরকার দিয়েছেন ‘ তানসেন পুরস্কার ’ । লতা মঙ্গেশকরকে ভারত সরকার চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সম্মান ‘ দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার ’ এবং ‘ পদ্মভূষণ ’ পুরস্কারে ভূষিত করেছেন ।

২০০১ সালে ভারতের সর্বোচ্চ পুরস্কার “ ভারতরত্ন ” পুরস্কারে পুরস্কৃত হয়েছেন কোকিলকণ্ঠী লতা মঙ্গেশকর।

লতা মঙ্গেশকরের প্রয়ানে সুরের জগতে এক সোনালী অধ্যােয়র অবসান হলো।লতাজি তাঁর কন্ঠের মূর্ছনায় ছুঁয়ে গেছেন সবার হৃদয়।তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করছি

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ১:৩৭ অপরাহ্ণ | রবিবার, ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২২

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত