ঘোষণা

জাপানের পথে পথে (পর্ব-৫) বৃত্তির বিড়ম্বনা ও মিউজিক স্কুল

সাইম রানা | রবিবার, ০২ মে ২০২১ | পড়া হয়েছে 238 বার

জাপানের পথে পথে (পর্ব-৫)  বৃত্তির বিড়ম্বনা ও মিউজিক স্কুল

এখানে কেন ভর্তি হলাম? অনেকের কাছে এমন প্রশ্ন জাগতে পারে। ব্যাপারটা খোলাসা করা দরকার। আইওইন একটি বৌদ্ধমন্দির হলেও এখানে একটি গবেষণা ইন্সটিটিউট রয়েছে যার নাম ক্যারিওবিঙ্গা বুদ্ধিস্ট কেনকিউকাই। ক্যারিওবিঙ্গা অর্থ হল চীন দেশের এক প্রকার সুরেলা গানের পাখি আর কেনকিউকাই মানে গবেষণাগার। এই গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি মূলত সিঙ্গন ধারার সংগীত ও দর্শন চর্চা করা থাকে। জাপানের বুদ্ধিজম আরও কিছু ধারা বা সেক্টর রয়েছে, তন্মধ্যে তেনদাই ও জেন অন্যতম। এ নিয়ে পরে বিস্তারিত আলোচনা করা যাবে।
বুনকা-চো বা জাপান সরকারের এজেন্সি ফর কালচারাল অ্যফেয়ার্স এদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সমন্বয় রেখে বৃত্তি প্রজ্ঞাপন দেয়নি, ফলে সেশন-কার্যক্রমের সাথে অসংগতি রয়ে গেছে । জাপান সরকারের এই ধরনের প্রজেক্ট তৈরির মূল উদ্দেশ্য ছিল শিল্পী বা গবেষকের উন্মুক্ত পরিভ্রমণের সুবিধা করে দেওয়া, যেন সে সংস্কৃতির স্বরূপ অন্বেষণে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে । কিন্তু স্কলারশিপ প্রোগ্রামটি উচ্চ সম্মানীয় এবং প্রাতিষ্ঠানিক বাধ্যবাধকতাহীন হওয়ার কারণে ভিন্ন একটা সমস্যায় পড়তে হয়। অর্থাৎ ১০ মাসের জন্য জাপানের সংগীত বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজ কোনো শিক্ষা পরিকল্পনার আওতায় আনতে পারেনি। ফলে প্রফেসর কিয়োকো বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে আবেদন করেও বিফল হন, অবশেষে এই গবেষণা ইনস্টিটিউটকে রাজি করাতে পেরেছিলেন তাঁর এক ঘনিষ্ঠ আরাই সানের মাধ্যমে। মিষ্টার আরাই আৎসু জোরাকোয়েন টেম্পলের প্রধান। তিনিই ওয়াসেই হিরাইকে অনুরোধ করে এখানকার গবেষক হিসেবে ভর্তির ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। এখানে প্রাতিষ্ঠানিক বাধ্যবাধকতা তেমন একটা ছিল না। সপ্তাহে দুইদিন সৌম্য সংগীত শেখার জন্য এখানে আসা হতো।
প্রফেসর কিয়োকো আরও কিছু বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ-এর সাথেও সরাসরি যুক্ত করে দিয়েছিলেন। যেমন নিগাতায় জয়েৎসু ইউনিভার্সিটি অব এডুকেশন, টোকিও ন্যাশলাল থিয়েটার, সেনজকু গাকুইন মিউজিক কলেজ, কামিইতাবাসির জোরাকোয়েইন টেম্পল, তাকিনোজোর মিউজিক স্কুল প্রভৃতি। যেন জাপানিজ ঐতিহ্যবাহী সংগীতের আরও অন্যান্য দিকগুলো সম্পর্কেও ভালো ধারনা পাই। তবে সবই ছিল ব্যবহারিক পাঠ। টোকিও সংগীত বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথেও পরোক্ষ সংযোগ ছিল, এমনকি ব্যক্তি পর্যায়েও কয়েকজন শিক্ষক নিয়োগ করা হয়েছিল ভাষা শেখা, আচার-আচরণ, ভ্রমণ সহযোগী ইত্যাদি সুবিধার জন্য।
মজার ব্যাপার হলো কোথাও কোনো পরীক্ষা বা এ্যাসাইনমেন্ট সংক্রান্ত বাধ্যবাধকতা ছিল না। বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানে আমাকে ব্যক্তিগত পর্যায়ে অর্থ প্রদান করতে হতো। প্রতিদিনের জন্য আমার ব্যক্তিগত খরচাদি প্রদান করা হতো পূর্ব নির্ধারিত সতের হাজার ইয়েন, যা সত্যিই কোনো প্রবাসী বাঙালির কাছে ঈর্ষানীয় মনে হবে। আমার সাপ্তাহিক রুটিনে এসব প্রশিক্ষণ ছাড়াও বিভিন্ন কনসার্ট এবং পরিবেশনা যুক্ত ছিল। তবে আইওইন টেম্পলে সৌম্য সংগীত আমি দ্রুতই বুঝতে শুরু করেছিলাম। প্রথম দিনের সক্ষমতা দেখেই কিয়োকো খুব খুশি হলেন। কারণ জাপানিজদের কাছে এটা বিদেশি ভাষা হলেও আমার কাছে মনে হচ্ছিল চেনাচেনা। কারণ প্রাচীন এই সুরগুলো অনেক সরল ও টানা টানা, আশপ্রধান। এই সুর শাস্ত্রীয় সংগীতের তালিম প্রাপ্ত যে কারু পক্ষেই সম্ভব মনে হতে পারে, কারণ এর ভাষা ও সুর দেড় হাজার বছর আগে ভারতবর্ষ থেকেই আমদানিকৃত, তবে প্রাচীন চাইনিজ নোটেশনটা আয়ত্তে আনতে বেশ সময় লেগেছিল। এই সুরের ভিতর শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যবহার প্রবল, ধ্যান-মগ্নতাও রয়েছে। গায়নের সময় স্থির ও সুনির্দিষ্ট একরৈখিক স্বর অন্য জগতে ডুবে যেতে সায় দেয়।
টেম্পল প্রধান হিরাই সান ছিপছিপে লম্বা গড়নের মানুষ, শান্ত মেজাজের। ক্লাস শেষে অফিস কক্ষে হালকা নৈশভোজনের আয়োজন করেছিলেন। সেখানে জাপানিজ কালচারাল অ্যাফেয়ার্স এর কিছুটা দায়িত্বহীনতা সম্পর্কে একটু বিরক্তি প্রকাশের আভাস ফুটে উঠেছিল। তাঁদের শ্লথতার কারণে, অর্থাৎ আমি যে জুন মাসে এসেছি, কিন্তু তাঁরা জুলাই মাস থেকে অবস্থান ভাতার কার্যক্রম শুরু করবে। ফলে এই বিশ দিন কীভাবে চলবে? অবশ্য হিরাই সান ও কিয়োকো কিছু অর্থ ধার দেবেন বলে মনঃস্থির করলেন। যা দিয়ে আমার মাস চলার খরচ, একটা কম্পিউটার, মোবাইল, ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য কেনা সম্ভব হয়েছিলো।এখানে আরেকজন গবেষককে নিয়োগ দেয়া হল আমার সহযোগী বা হিসেবে, ওর নাম সাইতো সেতসুজিইও । তুলনামূলকভাবে অন্যদের থেকে একটু ভালো ইংরেজি জানে এবং ভারতীয় সংগীত সম্পর্কে কিছুটা ধারনা রয়েছে তার, ভারতবর্ষও ভ্রমণ করেছে। মজার কথা হল তার সংগ্রহে তানপুরা, হারমোনিয়াম ও তবলা রয়েছে। সে হারমোনিয়ামটা আমাকে ধার দেবে বলে প্রস্তাব রাখল। ফলে প্রফেসর কিয়োকো তাঁর জয়েৎসু বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা গানের এবং বিশেষ করে বাউল গান শেখানো ও সংগীত পরিবেশনের জন্য আমন্ত্রণ জানালেন। এই মন্দিরেও একটা কনসার্ট করা যায় কি না, সেই প্রস্তাব রাখলেন আমাকে ও হিরাই সানের দিকে লক্ষ্য করে । বাসায় ফিরতে রাত হয়ে গেল। আগের রাত বিমানে বিমানে কেটেছে, এরপর সারাদিনই কাটলো প্রচণ্ড ব্যস্ততায়। আমার প্রচণ্ড মাথা ধরতে শুরু করলো বাসায় ফিরতে ফিরতে। রাতে ভালো ঘুম হল।


লেখক একসময় জাপান প্রবাসী ছিলেন, বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং সঙ্গীত বিশেষজ্ঞ।
————-
(চলবে)

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ১০:৫৭ অপরাহ্ণ | রবিবার, ০২ মে ২০২১

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

জাপানের পথে পথে  (পর্ব-১)

১১ জানুয়ারি ২০২১