ঘোষণা

জাপানের পথে পথে (পর্ব ৮) বাঁশিবাদিনী কামিলা ও অদ্ভুত মধ্যাহ্নভোজন

সাইম রানা | সোমবার, ২৪ মে ২০২১ | পড়া হয়েছে 189 বার

জাপানের পথে পথে (পর্ব ৮)  বাঁশিবাদিনী কামিলা ও অদ্ভুত মধ্যাহ্নভোজন

মধ্যাহ্নভোজনের জন্য আমরা শিবুয়া স্টেশনের নিকটবর্তী একটি রেস্টুরেন্টে গিয়ে বসলাম। হোটেলে ঢুকতেই কেমন যেন এক প্রকার কাঠের গন্ধ ভেসে এলো, অপরিচিত, তবে স্নিগ্ধতা আছে। এটি হয়তো কোন খাবার মশলারই গন্ধ হবে, যা বাঙালি হোটেলে কখনোই পাইনি। পরবর্তীতে আমি জাপানের যে প্রান্তেই গিয়েছি, সেখানে এই গন্ধ টের পেয়েছি। এই গন্ধ মেপল কিংবা পাইন কাঠের কি না তা আজও জানা হয়নি । যাইহোক, রেস্টুরেন্টটি ট্র্যাডিশনাল হলেও আধুনিকতার সাথে ইন্টেরিয়রে সমন্বয় রাখা হয়েছে, যা আমাদের দেশের মতোই। অর্থাৎ পিঁড়িতে বসে একফুট উঁচু টেবিলে খেতে হবে না, যা চলার পথে আসেপাশের দুএকটি রেস্টুরেন্টে দেখতে পেলাম।
সেখানে আগে থেকেই অপেক্ষা করছেন কামিলা হইতেঙ্গা নামে ৫০ বছর বয়সী এক সুদর্শনা আমেরিকান বাঁশিবাদিকা। একহারা লম্বা, ববকাট চুল, লম্বাটে মুখ, জন্মসূত্রে আমেরিকান হলেও বাস করছেন জার্মানিতে। সম্প্রতি টোকিওতে তার একটা কনসার্টও হয়ে গেল। আমাকে ও কিয়োকোকে তার পোস্টার ও কার্ড দিলেন। জাপানিজরা যে নিজেদের সংস্কৃতিকে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দেয়ার পাশাপাশি প্রতিদিন অজস্র বিদেশি সংগীতের কনসার্ট ও পৃষ্ঠপোষকতা করে যাচ্ছে, টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়সহ অনেকগুলো প্রতিষ্ঠানই বিদেশি মেধাবী শিক্ষার্থীদের স্কলারশিপ দিয়ে যাচ্ছে, এটা জাপান সরকারের প্রশংসনীয় উদ্যোগ, কামিলা আমার দিকে উদ্দেশ্য করে আরও বললেন, ‘তোমাদের দেশের বাউল গানও আমি পছন্দ করি, এমনকি রাগ সংগীতও। তবে তুমি এখানে এদেশের সংগীতগুলোও ভালভাবে জানতে শেখার চেষ্টা করলে দেখবে জাপানিজ মিউজিকও হৃদয়গ্রাহী।’ আমি কিছু বলবার পরিবর্তে শুনবার ভূমিকায় থাকলাম।
মেনু চার্ট এলো। নিহঙ্গতে (জাপানিজ ভাষায়) লেখা বলে আমি ও কামিলা কিছুই বুঝলাম না। কামিলা সরাসরি একশব্দে বলে দিলেন ‘ভেজ’, আমি এবং কিয়োকো ননভেজ, ফলে আমার জন্য কিয়োকো জানতে চাইলেন শিফুড মিক্সড নুডলস নিতে পারো। আমি রাজি হয়ে গেলাম নুডলস ভেবে। প্রায় ২০ মিনিট পর ভেজ হিসেবে এলো এক প্লেট লেটুস পাতা ও সালাদ, এর মধ্যে শসা, গাজর, ক্যাপ্সিক্যাম, মুলা ইত্যাদি। কামিলা প্লেটটি আরেকটু নিজের দিকে চাপিয়ে নিয়ে কাটা চামচে দু’এক টুকরো বিঁধিয়ে তা মুখে পুরেই ভেড়ার মতো কুচকুচ করে চিবোতে থাকলেন।
কিয়োকোর জন্য এলো এক প্লেট সাজানো শাশিমি ও সস। আর আমার জন্য এলো বিশাল এক বাটি (গ্রামে জাম বাটি বলে ) জুড়ে জল, জলের তলে সবুজ শ্যাওলার মতো কিছু একটা ডোবানো তার ভিতর মোটা মোটা কিছু নুডুলস। কিছু চিরল চিরল ডাঁটা সেদ্ধ, বড়ো জাতের মাছের দু’টুকরো স্লাইসও আধা ভেসে আছে প্রায় দু’ডজন শামুকের সাথে। ছোট ছোট তাজা আস্ত শামুকগুলো দুমিনিট আগেই গরম পানিতে সেদ্ধ করা হয়েছে। এগুলো ঠোঁটে লাগিয়ে খাসির পায়ার মতো জোরে চোষা দিলেই বেরিয়ে আসবে ভিতরের মাংস। দেখেই আমার চোখ ছানাবড়া, এই খাবার আমি কীভাবে গিলবো। কিন্তু বলতেও পারছি না কিছু, কারণ আবার কি এনে দেবে, তা আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠবে কি না। কিয়োকো একটা ইশারা দিয়ে জানতে চাইলেন দাইজবু দেস্কা, আমি একটু মিনমিন করে সায় দিলাম, হাই, দাইজবু দেস। কামিলা কিন্তু টের পেয়ে গেছে যে এটা আমার পক্ষে খাওয়া অসম্ভব। তাই সে একটা অপশন দিয়ে বলল, তুমি ফ্রেস ভেজিটেবল কারী রাইসও নিতে পারো। আমি বললাম না থাক। কিয়োকোকে কিন্তু অনেকটা আত্মবিশ্বাসী মনে হচ্ছিল, কারণ এজাতীয় খাবার বার্মা, ভারত, নেপাল, থাইল্যন্ডেও প্রচলিত। চীনেও রয়েছে, ফলে বাংলাদেশের খাবার ব্যতিক্রম কিছু হবে না এবং হয়তো আমি এধরনের খাবারের সাথে পূর্ব পরিচিত। আমি চরম অনিচ্ছা সত্ত্বেও চপস্টিক দিয়ে ভিতর থেকে নুডলসগুলো বের করে কোনরকম গিলতে থাকলাম। তার সাথে কিছু ডুবনো সবজির ফালি। কিয়োকো মাঝে মাঝে খেয়াল করছিলেন, কিন্তু মনে মনে ভাবছিলেন, আমাকে অভ্যস্তও তো হয়ে উঠতে হবে, নাকি । তবে শামুকগুলোর ভেসে থাকা দেখে একটু আফসোস করলেন, ওই চমৎকার সুস্বাদু শামুকগুলো তোমার ভালবাসা পেল না।
অসাধারণ বিদঘুটে খাদ্য অভিজ্ঞতা নিয়ে সবাই টেবিল থেকে উঠলাম। কিয়োকো আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন তুমি বাসায় ফিরে যাও, আমার ফিরতে আরও ঘণ্টাখানেক লাগবে। কামিলা একটু মুচকি হাসি দিয়ে কথা টেনে নিয়ে বললেন, ‘সো বিউটিফুল টিচিং এন্ড লার্নিং। ইনটারেসটিং!’ মোতেগি কিয়োকো বললেন, ‘হিস মাদার ইজ মে বি ফিফটি ফাইভ ইয়ারস ওল্ড, এন্ড আই আম অলসো ফিফটি ফাইভ ইয়ারস ওল্ড। সো আই এম হিস জাপানিজ মাদার অলরেডি।’ এরপর একটু হাসাহাসি। কামিলা বললেন, ‘ইউ আর সো লাকি পারসন, নাইচ টু মিট ইউ এন্ড সি ইউ এগেইন।’

( চলবে )

লেখক একসময় জাপান প্রবাসী ছিলেন,
বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং সঙ্গীত বিশেষজ্ঞ।

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ৯:৩৫ অপরাহ্ণ | সোমবার, ২৪ মে ২০২১

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

জাপানের পথে পথে  (পর্ব-১)

১১ জানুয়ারি ২০২১