ঘোষণা

জাপানের পথে পথে (পর্ব-৯) বীণাবাদিনী মাতোবা ইউকো

সাইম রানা | শনিবার, ২৯ মে ২০২১ | পড়া হয়েছে 78 বার

জাপানের পথে পথে (পর্ব-৯) বীণাবাদিনী মাতোবা ইউকো

শিবুয়া থেকে একা একা সেতাগায়া কু-এর বাসায় ফিরেছি। ঘণ্টাখানেক পর সেনসেইও সঙ্গে একজন অতিথি নিয়ে বাসায় ফিরলেন। পঞ্চাশোর্ধ হবেন। দরজা খুলতেই আমাকে ‘কননিচি ওয়া’ সম্বোধন করলেন। অতিথি নিজেই হাত বাড়িয়ে দিয়ে হিন্দিতে পরিচয় দিলেন যে তিনি মাতোবা ইউকো। আমি বললাম, ‘খুবই দুঃখিত যে আমি হিন্দি ভালো বুঝি না, তুমি বাংলা জানো কি না?’ এবার ইংরেজিতে উত্তর এলো, ‘তোমার হিন্দি জানার মতোই।’
মাতোবা ইউকো জাপানের একজন প্রসিদ্ধ বীণাবাদিকা। পড়ালেখা করেছেন টোকিও সংগীত বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিখ্যাত মিউজিকোলজিস্ট ফুমিও কোইজুমির কাছে মিউজিকোলজির উপর দীক্ষা গ্রহণ করেন । (ফুমিও কোইজুমি সম্পর্কে আলোচনা টোকিও বিশ্ববিদ্যালয় প্রসঙ্গে আসবে) এরপর ভারতে শ্রীমতি রাজলক্ষ্মী নারায়ণন, শ্রীমতি কল্পকম স্বামীনাথন, শ্রী নাগেস্বর রাও প্রমুখের কাছে বীণাবাদন শিখেছেন। একটি বিষয় লক্ষ্যনীয় যে জাপান বা অন্যান্য দেশ থেকে যারা ভারতীয় সংগীত শিখতে আসে, তারা মূলত ঐতিহাসিক কারণে ধ্রুপদ ও মধ্যযুগীয় সংগীতের ধারাকেই সর্বগ্রে বিবেচনা করেন। ইউকোও কেরালায় দীর্ঘদিন ধ্রুপদ নিয়ে কাজ করেছেন।
প্রফেসর কিয়োকো একারণেই তাকে নিয়ে এসেছেন আমার সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে। ভারতীয় এমনকি অনেক বাংলাদেশির সাথেও তার যোগাযোগ রয়েছে বিস্তর। কিয়োকো দুইদিনেই আমার একাকীত্ব কিংবা মনের ভিতর ঘটে যাওয়া নিঃসঙ্গতা ধরতে পারছিলেন, ফলে নিজেই আন্তর্জাতিক কল করার ব্যবস্থা করেছিলেন, এখন মাতোবাকে এনেছেন কিছুটা সঙ্গ দেয়া এবং এদেশে যোগাযোগ বাড়ানোর কাজে। ইউকো প্রথমেই টেলিফোনে যোগাযোগ করিয়ে দিলেন জাইকা ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা মুন্সী আজাদ এবং ভাবির সাথে। তারা দীর্ঘদিন ধরে জাপানে রয়েছেন। টোকিওতে স্বরলিপি নামে তাদের একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন রয়েছে, এখানে বসবাসকারী বাঙালিদের নিয়ে নিয়মিত অনুষ্ঠান করার চেষ্টা করেন। আমাকে এই সংগঠনে প্রশিক্ষণ দানের জন্য আমন্ত্রণ জানালেন। তারপর কথা হলো জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ইউসুফ হাসান অর্কের সাথে। অর্ক ওকিনাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করছেন, ওকিনাওয়া জাপানের পশ্চিমে সর্বশেষ দ্বীপাঞ্চল। যাকে কিউশিউ আইল্যান্ড বলে ডাকা হয়। উভয়ের সাথে পরিচয় হয়ে ভালো লাগল। কারণ আমি তিনদিনেই হাফিয়ে উঠেছিলাম, প্রথম বিদেশ আসা, তারপর ভাবছিলাম আমার দেশ, পরিবার পরিজন ছেড়ে মহাসমুদ্রের মাঝে এসে পড়েছি। দ্বীপরাষ্ট্র বাস করা এবং বিচ্ছিন্নতার ধারনা কিন্তু আমাদের দেশের মতো প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কসূচক অনুভূতির মতো নয়। বৃহৎ ভূখণ্ডের মধ্যে স্বতন্ত্র রাষ্ট্র হলেও হাজার হাজার বছরের মিশ্র সংস্কৃতির ধারনা দ্বীপরাষ্ট্রে নেই। এখানে একটা মনসেন্ট্রিক জাতিসত্ত্বার দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। এখানেও উপনিবেশ ছিল, এরা উপনিবেশ সৃষ্টিও করেছে, তা সত্ত্বেও এদের ভাবনাচিন্তার পদ্ধতি আলাদা, যা সীমানা বিভাজিত রাষ্ট্রের জনপদের সাথে মেলানো যাবে না।
মাতোবা ইউকো হিন্দি ভালোই জানে, ফলে প্রফেসর কিয়োকো ভেবেছিলেন আমাদের ভাষা হয়তো একই হবে, তা আর হলো না বলে একটু হতাশা ব্যক্ত করলেন। ফলে ইংরেজিই আমাদের একমাত্র অবলম্বন হলো। তবে ভারতীয় সংগীতের নানা প্রসঙ্গ নিয়ে ত্রিমুখী আলোচনা হলো। আমাদের আড়বাঁশির সাথে কৃষ্ণের পৌরাণিক সম্পর্ক নিয়ে কথা হচ্ছিল, তখন তারা সাকুহাছি বাঁশির ইতিহাস বললেন।
কিছুক্ষণ পরই প্রফেসর কিয়োকো নিগাতা প্রদেশে তার জয়েতসু বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মস্থলে চলে যাবেন। এই তিনদিন আমার জন্যই ছুটি নিয়ে টোকিও এসেছেন। ফিরবেন তিন সপ্তাহ পর। যেহেতু আমি প্রফেসরের বাসায় উঠেছি, এবং তিন সপ্তাহ মতো এখানেই থাকতে হবে, তারপর তিনি ফিরে এসে আমার এপার্টমেন্টের ব্যবস্থা করবেন, ফলে, কদিনের বাজার সদাই করতে হবে। প্রফেসর কিয়োকো সন্ধ্যার দিকে টোকিও ত্যাগ করবেন। আমি ও ইউকো তার আগেই মার্কেটের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়লাম কিছু নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস ও খাদ্য কিনতে । কামিমাছি থেকে শিমোতাকাইদো, তারপর মেইদামায়ে, খিছিজিয়উজি প্রভৃতি এলাকায়। ইউকো খিচিজিয়ও এর অর্থ বললেন ‘লক্ষ্মী’ আর ‘জি’ মানে মন্দির, অর্থাৎ লক্ষ্মীর মন্দির। আমি জানতে চাইলাম এটা কি জাপানিজ না ভারতীয় লক্ষ্মী দেবতার কথা বলছো? মাতোবা উত্তর দিলেন, ‘অনেক ধর্মীয় দেবতাই ভারত থেকে অভিযোজিত হয়ে এসেছে, তবে তা চীন এবং কোরিয়া ঘুরে । এইযে তুমি বৌদ্ধ মন্দিরের সামনে প্রধান ফটকে যে দুটি প্রহরাদার ভাস্কর্য দেখতে পেলে, তার একটির মুখ হা করা অন্যটির বন্ধ, এই দুটি চরিত্রের নাম ‘কঙ্গো’ ও ‘রিসিকি’। এরাও মূলত ভারতীয় নারায়ণ ও বিষ্ণু দেবতা থেকেই অভিযোজিত হয়েছে।’’
কথার ফাঁকে ফাঁকে কিছু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনলাম, কিছুটা খাদ্যও। তবে কেনাকাটার পদ্ধতি জেনে নিলাম, আশেপাশের হোটেল গ্রোসারি শপ, স্টেশন, এক্সিট-ইন্ট্রাস ইত্যাদি সম্পর্কে ইউকো মাধ্যমে বেশ ধারণা পেলাম। আর সে যেহেতু ইন্ডিয়ায় অনেকদিন থেকেছে, ফলে আমাকে বুঝতে তার কোন অসুবিধা হচ্ছিল না, আমারও নয়।

মাতোবার বয়স তখন পঞ্চান্ন পার হয়েছে, কিন্তু তাকে দেখে মনে হয় চল্লিশের ঘরে হবে। চেহারায় বয়স লুকোনোর এটা এক আশ্চর্য গোপন রহস্য অধিকাংশ জাপানিজদের মধ্যে লক্ষ্য করেছি। তাদের জীবন-যাপনের শৃঙ্খলাই যে এর পিছনে প্রধান ভূমিকা রাখে, তবে অত্যধিক শরীর সচেতনতা ও ব্যায়ামও সাপোর্ট দিয়ে থাকে, আর তাদের বয়স লুকোনোর শেষ অস্ত্র হলো প্লাস্টিক সার্জারি। এটাও নেহায়েত কম নয়। মাতোবাকে বললাম পরের দিন আসতে। সারাদিনের কর্মব্যস্ততা সেরে ক্লান্তি নিয়ে বিকেলে আসলেন। আমি আরো কিছু যোগাযোগ সেরে নিলাম তাঁর সহযোগিতায়। পাশে একটি সাইবার ক্যাফে চিনে এলাম, কিন্তু ব্যয়বহুল। বাংলাদেশেও তখন মোড়ে মোড়ে সাইবার ক্যাফে গড়ে উঠেছিল।
পরে আর তার সাথে আর কখনো দেখা হয় নি। তবে তাঁর সাথে চলতে চলতে বুঝে নিয়েছিলাম তাদের সংস্কৃতি কতটা প্রফেশনাল। মার্কেটে ঘুরতে ঘুরতে একসময় বললাম আমরা কোথাও একটু খেতে পারি কি না। তিনি সম্মতি জানিয়ে একটি জাপানিজ হোটেল পছন্দ করলেন। স্নাক্স ও জুস জাতীয় হোটেলে কিছু খেলাম। উঠার সময় অনুগ্রহ করে বিলটা আমি দিয়ে দিতে চাইলাম। কিন্তু তিনি বললেন যার যা বিল এসেছে, সেটা প্রদান করাটাই বরং ভালো হয়। এরপর আরেকটি হোটেলে ডিনারের জন্য ঢুকেছিলাম, সেখানে আমি যার যা বিল হয় তাই দিতে চাইলাম, কিন্তু তিনি পরামর্শ দিলেন, যেহেতু আমার কারণে তিনি সময় দিচ্ছেন ফলে বিলটির পুরোটাই আমাকে দেয়া শ্রেয়। আমি অবশ্য এতে কোনো ধাক্কা খাইনি, আন্তরিকতার অভাবও দেখিনি, বরং তাদের জীবন-যাপনের প্রকরণ শুরু হয়ে গিয়েছিল এইদিনের শিক্ষা থেকে। জাপানিজদের কাজ করা কিংবা সেবা প্রদানের ব্যাপারে কোনো কৃপণতা নেই। যেকোনো নির্দেশ তারা মনোযোগের সাথে পালন করে। মাতোবা প্রফেসরের অনুরোধ রেখেছিলেন সযতনে, তার অর্থ এই নয় যে বন্ধুত্ব হয়ে যাবে। অথবা বন্ধুত্ব তৈরি হলেও প্রতিদিনের নতুন নতুন কাজের ব্যস্ততা জীবনের অনেক ইচ্ছা থেকেই বিচ্ছিন্ন করে রাখে। এটাই জাপানি জীবন।

( চলবে )

লেখক একসময় জাপান প্রবাসী ছিলেন,
বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং সঙ্গীত বিশেষজ্ঞ।

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ১০:১৫ অপরাহ্ণ | শনিবার, ২৯ মে ২০২১

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

জাপানের পথে পথে  (পর্ব-১)

১১ জানুয়ারি ২০২১