ঘোষণা

“করোনা নেই” ভাবার কোনো কারণ নেই

ডা. পলাশ বসু | বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২০ | পড়া হয়েছে 77 বার

“করোনা নেই” ভাবার কোনো কারণ নেই

করোনার সাথে আমাদের পরিচয়ের শুরু গত বছরের ডিসেম্বর মাসে হলেও আমরা বাংলাদেশের মানুষেরা তার পুরো উত্তাপ পেতে শুরু করেছি মার্চ মাস থেকে। এর পরে কেটে গেছে ৬ মাস। এখনও প্রতিদিন আক্রান্ত হচ্ছে সরকারি হিসাব মতে ২ হাজারেরও বেশি মানুষ।সেই সাথে মারাও যাচ্ছে ৪০-৫০ জন করে অবুঝ ইনসান। তবুও কেন যেন আমাদের মাঝে একটা গা ছাড়া ভাব এসে গেছে।

এতদিন শহরকেন্দ্রিক করোনা আক্রমণের কথা আমরা শুনলেও এখন তা গ্রামাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছে। অথচ যা শুনছি বা দেখছি তাতে হতাশ হতে হচ্ছে। জেলা শহর থেকে শুরু করে গ্রামে সেভাবে কেউই মাস্ক পরছে না। মানছে না সামাজিক দূরত্বও। স্বভাবতই ব্যক্তিগত পরিচ্ছনতারও বালাই নেই। এই ৬ মাস পরে এসেও অনেকের মুখে শুনতে হচ্ছে যে করোনা আবার কি জিনিস? তারা বলছে করোনা,করোনা বলে লাভ নেই। করোনা এখন নেই। আর হলেও তা বড়লোকদের হয়। গরীরেব হয় না। প্রতিদিন এই যে ৪০-৫০ জন মারা যাচ্ছে তাহলে কি এরা সবাই বড়লোক? এই প্রশ্নটি কিন্তু আমাদের মনে আসছে না।

এরকম একটা উদাসীন অবস্থা আমাদের জন্য যে ভালো কিছু বয়ে আনতে পারে না তা একদম পরিষ্কার। আবার এর সাথে কমেছে টেস্টের পরিমাণও। মানুষের অসচেতনতা আর শনাক্তকরণ দুর্বলতার জন্য করোনার বিস্তার আমাদের এখানে একই ধারায় বযে চলেছে। এর ফলে এটার ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা যেটা আছে সেটা স্থির থাকলেও সেভাবে কমছে না কিন্তু। বরং সামনে আচমকা বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনাটাই আরো প্রকটতর হয়ে উঠতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

আমাদের তাই বৃহত্তর স্বার্থে করোনা নিয়ন্ত্রণে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। এজন্য এখন করোনা পরীক্ষায় দ্রুত শনাক্তকরণ এন্টিজেন কিট দিয়ে করোনা শনাক্তকরণের কাজটা করা যেতে পারে। সরকার দেরিতে হলেও এর মাঝে এ টেস্টের অনুমতি দিয়েছে। তবে কবে থেকে এ টেস্ট শুরু হবে তা কেউ জানে না। শনাক্তকরণ দ্রুততর করার সাথে সাথে তাদেরকে আইসোলেশান, কোয়ারেন্টাইন করতে হবে। কারণ অনেক বাসা বা বাড়িতে রুম সংকটের কারণে আইসোলেশান, কোয়ারেন্টাইনের ব্যবস্থা অপ্রতুল। এজন্য এলাকাভিত্তিক কমিউনিটি সেন্টার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের রুমগুলোকে প্রয়োজনে আইসোলেশান সেন্টার হিসেবে কাজে লাগানো যেতে পারে। তাতে করে করোনার ট্রান্সমিশন অনেক কমে যাবে। অথচ শনাক্তকরণ, কোয়ারেন্টাইন ও আইসোলেশানের কাজটা আমরা গুরুত্বই দিচ্ছি না।

সেই সাথে দেশের (বিশেষ করে শহরগুলোতে) কত শতাংশ মানুষ আক্রান্ত হয়েছে এরই মাঝে সেটা জানাটাও আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যদিও বলা হচ্ছে করোনা আক্রান্ত হওয়ার পরে তৈরি হওয়া এন্টিবডি ৩ মাসের স্থায়ী হয় না তবুও এটা জানা দরকার। তাতে করে হয়তো করোনার এ সময়ে অর্থনেতিক উন্নয়নের জন্য পরিকল্পনা সাজানো সহজতর হতে পারে। বিতর্কিত হলেও অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন দেশের ৬০-৭০ ভাগ মানুষ আক্রান্ত হলে হয়ত করোনার স্বয়ংক্রিয় বিস্তারও বন্ধ হয়ে যেতে পারে। সেটা জানতে হলেও এ টেস্ট করাটা ভীষণ দরকার। তবে, আমি মনে করি সে অনিশ্চিত আশায় না থেকে আমাদেরকে উদ্যোগী হয়েই এটাকে থামাতে ব্যবস্থা নেয়ার কাজটা করে যেতে হবে টিকা পাওয়ার আগ অবধি।

বাস্তবতা বিবেচনায়- এ মুহূর্তে আর ছুটি বা লকডাউন সম্ভবপর নয় বিধায় স্বাস্থ্যবিধি মানানোর ব্যাপারে প্রশাসনিক উদ্যোগ নিতে হবে। সম্পৃক্ত করতে হবে জনপ্রতিনিধিদেরকে। সম্পৃক্ত করতে রাজনৈতিক কর্মীদেরকে। এভাবে যতদিন টিকা না আসছে ততদিন ধারাবাহিকভাবে জনসচেতনতা ও জনসম্পৃক্ততা তৈরির কাজটা করে যেতে হবে। সবাইকে মাস্ক পরতে বাধ্য করতে হবে।

সেই সাথে যারা তা মানবে না তাদেরকে লাখ টাকার জরিমানার অবাস্তব বিধান না রেখে তাদেরকে শাস্তিস্বরূপ কমিউনিটিতে ১৫ দিনের জন্য দিনে ২ ঘন্টা করে স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজে প্রেরণ করা যেতে পারে। হতে পারে হাসপাতালে বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে দিনে ১ ঘন্টা করে জনসচেতনতা বাড়াতে ভলেন্টিয়ার হিসেবে কাজ করতে তাদেরকে নিয়োজিত করা যেতে পারে। যারা এ স্বেচ্ছাশ্রম দিতে চাইবে না তাদের জন্য প্রতিদিন ৫০ টাকা হারে জরিমানা ধরে ১৫ দিনের জন্য ৭৫০ টাকা আদায় করা যেতে পারে।

সেই সাথে করোনার বিস্তার বন্ধে দ্রুত এন্টিজেন টেস্ট, জনসচেতনতা ও সম্পৃক্ততা তৈরি, মাস্ক পরা নিশ্চিত করা এবং স্বাস্থ্যবিধি পালনের উপরে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে জীবন ও জীবিকাকে সচল রাখতে হবে। না হলে আক্রান্তের হার বাড়বেই। আক্রান্তের হার বাড়লে মৃত্যুও বাড়বে স্বাভাবিকভাবেই। ভারতে এখন যেমন প্রতিদিন হাজারের কাছাকাছি মানুষ মারা যাচ্ছে। এর কারণ আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। আমেরিকা, ব্রাজিলেও মানুষ মরছেই। আমাদের তাই জীবন ও জীবিকা চলমান রাখার স্বার্থেই করোনার বিস্তার বন্ধে কঠোরতম পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।

লেখক : চিকিৎসক ও শিক্ষক, সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগ এনাম মেডিকেল কলেজ।

সূত্র : জাগো নিউজ২৪

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ১:৩৬ অপরাহ্ণ | বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত