ঘোষণা

সন্ত্রাস, খুন আর ধর্ষণের জনপদ বেগমগঞ্জ

আনোয়ারুল হায়দার | বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২০ | পড়া হয়েছে 23 বার

সন্ত্রাস, খুন আর ধর্ষণের জনপদ বেগমগঞ্জ

নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে গত নয় মাসে খুন হয়েছেন ১৩ জন। থানায় ধর্ষণের অভিযোগ পৌঁছেছে ৯টি। চাঁদাবাজী, অপহরণ, সংঘর্ষ এসব তো রয়েছেই। স্থানীয়রা বলছেন, সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছে, আতঙ্কে পুরো এলাকার মানুষ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে।

একই কথা জানিয়েছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও নোয়াখালী জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ডা. এ বি এন জাফর উল্যাহ। নারীকে বিবস্ত্র করে নির্যাতন ও এলাকায় হত্যার ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে বলেন, বেগমগঞ্জে সম্প্রতি আইন শৃঙ্খলার চরম অবনতি হয়েছে। পরিস্থিতির উন্নয়নে পুলিশকে আরো বেশি সক্রিয় হতে হবে।

তবে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন তা মানতে নারাজ। জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (বেগমগঞ্জ সার্কেল) মো. শাহজাহান শেখ জানিয়েছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো।

গত ২ সেপ্টেম্বর বেগমগঞ্জের একলাশপুরে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও সেই ঘটনার ভিডিও এক মাস পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশে তোলপাড় শুরু হয়। এ ঘটনায় হওয়া দুই মামলায় যে নয় জনকে আসামি করা হয়েছে তাদের সবাই স্থানীয় দেলোয়ার বাহিনীর সদস্য বলে জানিয়েছে র‍্যাব।

নারায়ণগঞ্জ থেকে এরই মধ্যে র‍্যাবের অভিযানে গ্রেপ্তার হয়েছেন দেলোয়ার। তবে বেগমগঞ্জে যে দুটি বাহিনী সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে তারা হলো সম্রাট বাহিনী ও সুমন বাহিনী। আর দেলোয়ার বাহিনীর প্রধান দেলোয়ারের উত্থান সুমন বাহিনীর প্রধান খালাসি সুমনের হাত ধরে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বেগমগঞ্জ উপজেলার ১৬টি ইউনিয়ন ও পৌরসভা এলাকার সর্বত্রই নানা ‘বাহিনী’র বিচরণ। আলাইয়ারপুর ইউনিয়নে টিটু বাহিনী, রুবেল বাহিনী, রহিম বাহিনী, রাজগঞ্জ ইউনিয়নে সেন্টু বাহিনী, আমানউল্যাপুর ইউনিয়নে মন্নান বাহিনী, গোপালপুর ইউনিয়নে পিচ্চি রাসেল বাহিনী, মুজিদ বাহিনী, জীরতলী ইউনিয়নে মঞ্জু বাহিনী।

তবে পুলিশের দাবি, বেগমগঞ্জে মূলত দুটি সন্ত্রাসী বাহিনী আছে। যার একটির নেতৃত্বে ৩৬ মামলার আসামি সুমন ওরফে খালাসি সুমন। অপরটির নেতৃত্বে সম্রাট বাহিনীর সম্রাট। যার বিরুদ্ধে মামলা আছে ৩৮টি। রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশয়ে যারা এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালায়।

বেগমগঞ্জ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হারুনুর রশিদ চৌধুরী বলেন, সম্রাট ও সুমন বাহিনী ছাড়া উপজেলায় আর কোনও বাহিনী নেই। এই দুই বাহিনীর নেতারা রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ে এলাকায় প্রায়ই মাদক ব্যবসা, খুন ও দাঙ্গা- হাঙ্গামা করে থাকে। সম্রাট-সুমনকে একাধিকবার গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু তারা উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়ে মুক্ত।

নোয়াখালীর পুলিশ সুপার মো. আলমগীর হোসেন বলেন, সন্ত্রাসীদের শিকড় উপড়ে ফেলতে পুলিশ কাজ করছে। কোথাও কোন ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ অল্প সময়ের মধ্যে অপরাধীদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনছে। জেলার কোথাও কোন সন্ত্রাসী বাহিনীর অস্তিত্ব রাখা হবে না। সম্রাট- সুমন বাহিনীর সদস্যরা এলাকায় নেই। তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। বিচ্ছিন্ন দু’একটি ঘটনা ছাড়া আইন-শৃঙ্খলা অনেকটাই ভাল।

তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন ভুক্তভোগী জানান, মামলার পরেও পুলিশ আসামি গ্রেপ্তার করে না। কালেভদ্রে গ্রেপ্তার করলেও কিছুদিন পরই বেরিয়ে আসে তারা। অনেক সময় পুলিশের ছত্রছায়ায় অপরাধীরা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যায়।

অন্যদিকে সম্রাট-সুমন বাহিনীকে রাজনৈতিক নেতারাই নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছেন বলে মন্তব্য করেছেন বেগমগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এ বি এম জাফর উল্যাহ।

তিনি বলেন, বেগমগঞ্জের রাজনীতিবিদরা নিজেদের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে ও এলাকায় আধিপত্য বাড়াতে এই সব সন্ত্রাসীদের ব্যবহার করছে। রাজনৈতিক নেতারা যদি সন্ত্রাসীদের ব্যবহার না করতো তবে এসব সন্ত্রাসীদের শিকড় এতো গভীরে যেত না।

তিনি বলেন, দলীয় কোন্দলের কারণেই সন্ত্রাসী বাহিনীগুলো এলাকায় অপকর্ম করার সুযোগ পাচ্ছে।

নোয়াখালী-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মামুনুর রশিদ কিরণ বেগমগঞ্জে এই দুই সন্ত্রাসী বাহিনী থাকার কথা স্বীকার করে বলেন, পুলিশ একাধিকবার গ্রেপ্তার করলেও তারা উচ্চ আদালত থেকে জামিনে মুক্ত হয়ে আবারও সন্ত্রাসী কার্যকলাপ চালিয়ে যায়।

সন্ত্রাসী কার্যকলাপ বন্ধে ও সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারে তিনি স্থানীয় থানা পুলিশকে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন বলে জানান। সেক্ষেত্রে তার কোন অনুসারী যদি সন্ত্রাসী কিংবা নারী নির্যাতন ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকে তবে তাদেরও আইনের আওতায় আনার দাবি জানান এই সংসদ সদস্য।

সূত্র: দ্য ডেইলি স্টার

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ১১:১৪ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত