ঘোষণা

উজাড় হচ্ছে বনাঞ্চল বিলুপ্ত হচ্ছে বন্য প্রাণী

আলম শামস | রবিবার, ২১ নভেম্বর ২০২১ | পড়া হয়েছে 79 বার

উজাড় হচ্ছে বনাঞ্চল বিলুপ্ত হচ্ছে বন্য প্রাণী

এক সময় দেশের সবুজ বন-বনানী পশু-পাখির হাঁক-ডাকে মুখরিত ছিল। পাখিরকুজন-গুঞ্জনে ঘুম ভাঙতো স্হানীয় মানুষের। আজ সেদিনগুলো হারিয়ে গেছে।ভারসাম্য হারাছে দেশের আবহাওয়া ও পরিবেশ। পরিবেশবিদরা এজন্য নির্বিচারে বনজ সম্পদ উজাড়, অব্যাহতভাবে পাহাড় কাটা এবং জুম চাষের নামে পাহাড়ে অগ্নিসংযোগকে দায়ি করেছেন।দেশের বিভিন্ন গহীন অরণ্যে ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বনাঞ্চলে একসময় চোখে পড়তো হাতি, হরিণ, ছোট বাঘ, ভল্লুক, উল্লুক, বানর, হনুমান, গয়াল,বনবিড়াল, শিয়াল, বনমোরগ, ধনেশ, শকুন, ঘুঘু, শালিক, চড়াই, ময়না, টিয়া,বুলবুলি, ভৃঙ্গরাজ, দোয়েল, চিল, বাবুই, হলুদ পাখি, মাছরাঙ্গা, টুনটুনি,খঞ্জনা, বকসহ নানা ধরনের পশু-পাখি। কিন্তু অনেক পশু-পাখির অস্তিত্বই এখন আরনেই। বর্তমানে যেভাবে বন উজাড় হচ্ছে, তা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে এসব বন আর বন্য পশু-পাখি শুধু রূপকথা, উপকথা কিংবা ইতিহাসে ঠাঁই নেবে। এখনো সুন্দরবন ও বান্দরবান-রাঙামাটি জেলার বরকল, জুরাছড়ি ও লংগদু উপজেলার কিছু কিছু এলাকায় বাঘ, হাতি, বানর, অজগর সাপ, বনরুই, হরিণের দেখা মিললেও এর সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য। হাতির নিরাপদ যাতায়াতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে জনবসতি স্হাপন ও পাহাড়ে জুম চাষের মাধ্যমে গাছপালা ধ্বংস করায় সংশ্লিষ্ট এলাকার হাতি প্রতিনিয়তই নেমে পড়ছে লোকালয়ে। সেখানে চালাচ্ছেধ্বংসলীলা। এমন কি জীবনহানিও ঘটছে। প্রশাসনিকভাবে জনসাধারণকে সচেতন না করার কারণে এখানে প্রতি বছরই হরিণ শিকারের ঘটনা ঘটে। ফলে সীমান্তবর্তী প্রতিবেশী দেশের গভীর অরণ্যে পাড়ি জমিয়েছে হরিণ, বানরসহঅন্যান্য বন্য পশু-পাখি।

পদ্মা, মেঘনা ও ব্রহ্মপুত্র নদীত্রয়ের অববাহিকায় বদ্বীপ এলাকায় অবস্হিত বঙ্গোপসাগর উপকূলবর্তী প্রশস্ত বনভূমি সুন্দরবন। প্রকৃতি ও দানবতুল্য মানবেরা এ বনের গাছপালা দুমড়ে-মুচড়ে দিচ্ছে ও লুটে পুটে খাচ্ছে। নষ্ঠ করছে প্রকৃতিপ্রেমি পশু-পাখির আবাস। দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে বনের আপন বৈশিষ্ট ও উজ্ঝলতা। বিশ্বের অন্যতম প্রাকৃতিক বিস্ময় সুন্দরবনের পর দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বনাঞ্চল হচ্ছে টেংরাগিরি বা ফাতরার বন। এ বনের বিভিন্ন প্রজাতির গাছ এখন বিলুপ্তির পথে। একদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, অন্যদিকে শ্বাসমূলীয় গাছের গোড়ায় বালি জমা এর কারণ। অধিক মাত্রায় মাটি ক্ষয়ের ফলেও উপকূলীয় বনাঞ্চলের বিভিন্ন প্রজাতির গাছ মরে যাচ্ছে। বরগুনার তালতলী থেকে পটুয়াখালীর কুয়াকাটা সৈকত পর্যন চোখজুড়ানো এ বনের আয়তন ১৩ হাজার ৬৪৪ একর। প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা টেংরাগিরি অতীতেসুন্দরবনের অংশ ছিল। পরে নির্দিষ্ট অংশকে আলাদা করে ১৯৬৭ সালে টেংরাগিরি বনাঞ্চল নামকরণ করা হয়। ১৯২৭ সালের বন আইনের জরিপ অনুযায়ী ১৯৬০ সালের ১২ জুলাই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকার এটিকে সংরক্ষিত বনাঞ্চল ঘোষণা করে। বন ঘেঁষে প্রায় ৪ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য ও ৩ কিলোমিটার প্রস্হের সোনাকাটা সৈকত নৈসর্গিক সৌন্দর্যের আরেক লীলাভূমি। এছাড়াও বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার বিষখালী নদীর মোহনায় বঙ্গোপসাগরের তীরে গড়ে ওঠা আরেক দৃষ্টিনন্দন বনাঞ্চল লালদিয়ারচর। এ বনেও সাগরের ঢেউয়ে তীরের মাটি ক্ষয় হয়ে হাজার হাজার গাছ উপড়ে গেছে। এখনও শ্বাসমূলে বালি জমে অনেক গাছ মরে যাচ্ছে। সাগরতীরবর্তী এ বন দুটিতে লবণাক্ত ও মিষ্টি মাটির অপূর্ব মিশ্রণের কারণে সারি সারি গেওয়া, জাম, ধুন্দল, কেওড়া, সুন্দরি, বাইন,করমচা, বলই কেওয়া, তাল, কাঁকড়া, বনকাঁঠাল, রেইনট্রি, হেতাল, তাম্বুলকাটা ও গরান গাছের সমাবেশ ঘটেছে।

এখানে বসত গড়েছে কাঠবিড়ালি, বানরসহ প্রায় ৪০ প্রজাতির সাপ, শজারু, শূকর, উদ, কচ্ছপ, শেয়াল, ডোরাকাটা বাঘ, বনমোরগ, মধু কাঁকড়াসহ হাজার প্রজাতির প্রাণী। অনাবিল প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও বন্য প্রাণীর অভয়ারণ্য হওয়ায় এখানে গড়ে ওঠছে সোনাকাটা ইকোপার্ক, লালদিয়ারচর ও হরিণঘাটা পর্যটন কেন্দ্র। তবে পরিতাপের বিষয়, যে হারে বনগুলোতে গাছ মরে যাচ্ছে, তাতে এই পর্যটন কেন্দ্রগুলো একসময়ে দর্শনার্থীশূন্য হয়ে পড়বে। বিলুপ্ত হবে বন্য প্রানী। পার্বত্য চট্টগ্রামে বিশেষ করে বান্দরবান পার্বত্য জেলার মাতামুহুরী ও সাঙ্গু রিজার্ভ ফরেস্ট রয়েছে। এ দুটি রিজার্ভ ফরেস্ট ছাড়াও সরকারি বনাঞ্চল থাকলেও বন কর্মচারীদের মদদে এবং একশ্রেণীর কাঠ চোরাকারবারির কারণে নির্বিচারে বন উজাড় হয়ে যাচ্ছে। এতে পরিবেশে দেখা দিয়েছে মারাত্মক বিপর্যয়। বন উজাড়ও বন্যপ্রাণীর খাদ্য সঙ্কটের কারণে পাহাড় থেকে বিভিন্ন প্রাণী অনেকটা বিলুপ্ত হওয়ার পর্যায়ে। খাদ্যাভাবে ক্ষিপ্ত বন্যহাতি লোকালয়ে নেমে জানমালের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে চলেছে। এ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বিগত চার দলীয় জোট সরকারের আমলে বান্দরবানে বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য গড়ে তোলার দাবি জোরালো হয়। তৎকালীন বন ও পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী জাফরুল ইসলাম চৌধুরী বান্দরবানে বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য গড়ে তোলার জন্য বান্দরবান জেলা প্রশাসন লামা ও নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায় অভয়ারণ্য গড়ার স্হান চিহ্নিত করতে উপজেলা নির্বাহী অফিসারদের নির্দেশ দেন। সে অনুযায়ী তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী অফিসাররা
প্রতিবেদনও দাখিল করেন। কিন্তু পরিবর্তিত পরিস্হিতিতে এ কার্যক্রম আর আলোর মুখ দেখিনি। বন উজাড় হওয়ার কারণে পাহাড়ে বন্যপ্রাণী বিশেষ করে বন্যহাতির আবাস¯’ল ও খাদ্য সঙ্কট চরম আকার ধারণ করে। ফলে বন্যহাতি লোকালয়ে নেমে এসে বসতবাড়ির ওপর হামলা চালাচ্ছে, জমির ফসল নষ্ট করছে, গাছপালাদুমড়ে-মুচড়ে দিচ্ছে।

দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও তিন পার্বত্য জেলায় গত এক যুগে অন্তত এক হাজার মানুষ হাতির পায়ে পিষ্ট হয়ে মৃত্যুবরণ করার নজিরও রয়েছে। হাতির আক্রমণের শিকার হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয়েছে প্রায় ১ হাজার নারী-পুরুষ ও শিশু। বন্য হাতির দল চাষীদের আবাদি ফসল নষ্ট করছে। রিজার্ভ ফরেস্ট বনদস্যুদের কবল থেকে রক্ষা এবং বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য গড়ে তোলার দাবি জানানো হলেও তার কোন অগ্রগতি দেখা যায়নি।বান্দরবানের মাতামুহুরী ও সাঙ্গু রিজার্ভ ফরেস্ট এলাকার বন থেকে বন্যপ্রাণী লোকালয়ে বা ব্যক্তিমালিকানাধীন বাড়ি, বাগান ও চাষাবাদের জমিতে যেন আসতে না পারে বা বন্যপ্রাণী লোকালয়ে এলে দ্রুত ফেরত পাঠানোর ব্যবস্হা নিশ্চিতকরণ এবং নিরাপদ দূরত্বে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা বেষ্টনী নির্মাণসহ মানুষ যেন সংরক্ষিত বনে বা বন্যপ্রাণীর আবাস স্হলে গিয়ে তাদের খাবার ও
আবাস নষ্ট করতে না পারে সে বিষয়ে সরকারকে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। সরকারকে গুরুত্ব সহকারে স্মরণ রাখতে, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও পরিবেশ রক্ষা বর্তমানে সারা বিশ্বের প্রধান ইস্যু, এই ইস্যুতে বাংলাদেশ নেতৃত্ব দিচ্ছে। মানুষ, প্রাণী ও বৃক্ষ এই তিন প্রাণের সম্মিলনে আমাদের পরিবেশ, আমাদের পৃথিবী। এদের খাবার ও চারণভূমি দরকার। এ লক্ষ্যে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও এদের অভয়ারণ্য গড়ে তোলা খুবই জরুরী। এক শ্রেণীর অসাধু সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের অবহেলা ও অসচেতনতায় তিন পার্বত্য জেলার পাহাড়গুলো প্রতিনিয়ত বৃক্ষশূন্য হয়ে পড়ছে। বাসস্হান হারিয়ে হিংস্র হয়ে ওঠছে বন্যপ্রাণীগুলো। ক্রমাগত জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে বন উজাড় ও অবৈজ্ঞানিক পর্যায় পাহাড়ে জুম চাষের কারণে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। চাষাবাদের জমি ও বাড়িঘর তৈরির জন্য ক্রমাগতভাবে এসব বন ধ্বংস হচ্ছে। স্হানীয় দরিদ্র পাহাড়ি জনগোষ্ঠী জীবিকা নির্বাহের জন্য বাধ্য হয়ে পাহাড়ের কাঠ, বাঁশ নির্বিচারে কাটছে। ফলে পাহাড়গুলোর সবুজ অবয়ব বিনষ্ট হচ্ছে প্রতিনিয়ত। হাজার বছরের পরিচিত অনেক প্রজাতির পশু-পাখি চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছে। সবুজ পৃথিবী গড়তে প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় আন্তরিকভাবে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এগিয়েআসবেন- এমনটি আশা করে দেশবাসী।

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ২:০৫ অপরাহ্ণ | রবিবার, ২১ নভেম্বর ২০২১

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

৩০ বছরে কোথায় গণতন্ত্র

০৭ ডিসেম্বর ২০২০