ঘোষণা

ফেসবুকীয় কলহ

বাসব রায় | রবিবার, ১৬ মে ২০২১ | পড়া হয়েছে 135 বার

ফেসবুকীয় কলহ
সেদিন সকাল বেলা গৃহমধ্যে পরিচিত চিৎকারের কল্যাণে আমার ঘুম ভেঙ্গে  গেলো। ছুটির দিন থাকায় একটু ইচ্ছেমত  ঘুমানোর অভিপ্রায় ছিলো । চিৎকারের হেতু খুঁজবার নিষ্ফল চেষ্টা করছিলাম  ঘুমের ভাণ করতে করতে। ঠিক বুঝতে পারছিলামনা কী এমন অপরাধ করলাম যে হঠাৎ সাতসকালে গৃহিণীর মাথা খারাপ হয়ে গেলো ; সন্তানেরা যার যার মতো কাজে ব্যস্ত । সাহস হলোনা ওদেরকে জিজ্ঞেস করার ।
এমন মৌখিক তান্ডবের মাঝে পরিষ্কার উপলব্ধি হলো উনি প্রস্তুত হয়ে ব্যাগ গুছায়ে গৃহ পরিত্যাগের জন্য অল্পক্ষণেই নিষ্ক্রান্ত হবেন । অনর্গল মুখ হতে তপ্ত বাক্য নির্গত হচ্ছে যার তীক্ষ্ণ তীর ঘুমের ভাণে বিছানায় শোয়া লোকটির দিকে ,এটুকু বুঝতে পারা গেলো ।
এরকম মুহুর্তে আমার করণীয় সম্পর্কে বরাবরই আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ় থাকি । ঠিক কী করা উচিত তা কখনই স্থির করতে পারিনে । অপরপক্ষে আমার এ ধরনের নিষ্ক্রিয়তাকে তার প্রতি চরম অবজ্ঞা মনে করে উনি পূর্বাপেক্ষা আরও অগ্নিমূর্তি ধারণ করেন যা একত্রে বসবাসের বিশটি বছরেও তাকে বুঝাতে ব্যর্থ হয়েছি বারংবার ।
অনেক কথা অনেক অভিযোগের মধ্যে এটুকু পরিষ্কার হলো যে সর্বসাকুল্যে কারণ হলো জুকারবার্গের ফেসবুক । ফেসবুকে বিভিন্ন পুরুষ এবং মহিলার সাথে চ্যাটিং কমেন্ট পোস্টিং সর্বোপরি অনেক রাত অব্দি জেগে জেগে কী করা হয় যা উনি অনুমানে সংসার এবং তার প্রতি দুর্দান্ত অবহেলা হিসেবে চিহ্নিত করে এর সুষ্ঠু সমাধান না পাওয়ায় বাকি জীবনের জন্যে পিতৃগৃহে কাটানোর সিদ্ধান্তে স্বয়ং প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়ে সেদিনের  শুভসকালে ছেলেমেয়ে সংসার সবকিছুই পরিত্যাগপূর্বক অমন সংসারের মুখে ঝাঁটা মেরে বিদায় হচ্ছেন ।
এক্ষেত্রে আমার অপরাধ ষোলো আনা বিবেচনায় প্রতি উত্তর  করবার সৎসাহস কোনমতেই ছিলনা । চুপ করে বিছানায় শুয়ে থাকলাম । বুঝলাম ফেসবুকীয় ঝড়ের গতি আপাতত থামবার কোন লক্ষণ আর নেই ।
যাইহোক, সারাবাড়ি তোলপাড় করতে করতে ছেলেমেয়েদের সমস্ত দায়-দায়িত্ব তাদের পিতার উপর বর্তাইয়ে গৃহ হতে ব্যাগ হাতে করে ঘর থেকে বাইরে গেলেন । চরম বিরক্তির মাঝেও আমাকে উঠতেই হলো  । বললাম , ‘তোমার চশমাটা যে ফেলে যাচ্ছো – ‘ আমার কথাটি শেষ হতে না হতেই পুনরায় , ‘ তার খেয়াল করতে হবেনা , ফেসবুক নিয়েই থাকো ইত্যাদি ইত্যাদি বলতে বলতে সবেগে চশমাটি নিয়ে গৃহ হতে চূড়ান্তভাবে বের হয়ে গেলেন  । ছেলেমেয়েরা কী যেন বলতে লাগছিলো কিন্ত অত্যন্ত ধমকে ওদের কথা মুখেই আটকে র’লো ।
ততক্ষণে বাইরে কয়েকজন শুভাকাঙ্ক্ষী প্রতিবেশীনি তাকে পিতৃগৃহে না যাওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল । অতঃপর এবারে উনি কান্না শুরু করলেন এবং অজ্ঞাত এক দুর্দমনীয় উচ্চাঙ্গ সুরের বিকট আওয়াজে অসহনীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে লাগলো । আমার ছোট মেয়েটি মায়ের সাথে যাওয়ার জন্যে কাঁদতে কাঁদতে পিছু পিছু রওয়ানা দিলো । আমি আর থাকতে না পেরে একটা অটোতে মা-মেয়েকে নিয়ে বাসস্ট্যান্ডের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম । সারা রাস্তায় কোনো কথা হলোনা , মেয়ে দাদুর বাড়ি যাওয়ার আনন্দে খুব খুশি ।
সকল বিদায়ই কষ্টের , এটাও তাই । বাসে তুলে যখন দিলাম তখন উনি হাউমাউ করে সম্ভবত শেষ কান্নায় একেবারে ভেঙ্গে পড়লেন । আমি অপ্রস্তুত এবং অপ্রতিভ । আমার এই একটি দোষ কোনো কারণেই কান্না জিনিসটা আসেনা । কিছু কিছু ক্ষেত্রে চোখের জল আসাটা একেবারে অনুচিত নয় । আমি অনেকটা ভ্যাবাচ্যাকা বনে গেলাম । হয়তো আমার চোখেও জল আসা উচিত ছিলো , হয়তো একটু অন্যরকম আবেগ থাকলে সেদিন আর উনি পিতৃগৃহে নাও যেতে পারতেন । তবে তখন আমার সেসব মনেই আসেনি একদম । আমার চোখেও জল আসে , অনেক সময় চোখের কোণ গড়িয়ে কপোল ভিজে যায় -তবে সেটা বয়সজনিত চোখের অসুখমাত্র । সে সময় সেই জলটুকুও আর চোখে এলোনা । কী মুশকিল । এরকম চোখের জলে অনেক ঘটনায় সমব্যথী হওয়ার একটা দারুন সুযোগও সৃষ্টি হয় কিন্তু । অবশ্য আমার চোখের সমস্যার চিকিৎসা চলমান ।
যাহোক, বাস যাত্রা করলে আমি বাসায় ফিরে এলাম । বড় মেয়ে জানতে চাইলো বাসে উঠায়ে দিলাম কিনা এসব , ছেলের কোন প্রকার ভাবান্তর লক্ষ্য করলাম না । যেভাবেই হোক দিনটি কেটে গেলো ।
রাতে শুয়ে শুয়ে আমি টিভি দেখতেছিলাম । মনটা সেদিন বেশ ভালো । অনেকদিন পর মনে হচ্ছিলো সত্যিই বাস উপযোগী একটি বাসায় আছি । কোনো চিৎকার চেঁচামেচি বা অভিযোগ নেই । আমরা সবাই দিব্যি আছি যেন এরকমই প্রত্যাশা আমাদের । হঠাৎ রাত ঠিক দশটা বা সাড়ে দশটা আমার মোবাইলে গৃহিণীর কল । একটু অবাক এবং বিরক্তও হলাম । প্রথমত ইচ্ছে করেই কলটি রিসিভ করলাম না । আবার কল – এবার রিসিভ করলাম । প্রথম কথা দরদ আর আবেগের যৌথ সংমিশ্রণে – ‘আমি না থাকায় তোমরা খুব ভালোই আছো না ? ‘ আমি যথারীতি নীরব । তারপর ছেলেমেয়ের খবর নিলেন , খাওয়া পড়ালেখা ইত্যাদি -আমি যথাসম্ভব হ্যা বা না বলেই জবাব দিচ্ছি ।
শেষে আমাকে বললেন  মিষ্টি কন্ঠে ,’ তোমার খাওয়া হয়েছে ‘ ? আমি হ্যাঁ সূচক উত্তর দিলাম । এরপর , ‘ তোমার ওষুধ খেলে (!) – প্রেসারের ট্যাবলেট তো বোধহয় একটাই আছে । আচ্ছা কালকে কিনে দিব । টেবিলে জলের জগ মগ আছে কিনা ! সকাল সকাল ঘুমায়ো , কম্বলটা গায়ে লম্বালম্বি নিয়ো – ‘ আমি জবাব দিচ্ছি বা দিচ্ছিনা ; হঠাৎ খেয়াল করলাম আমার দুচোখ বেয়ে জল গড়িয়ে বালিশ ভিজিয়ে দিচ্ছে ! সত্যি সত্যিই আমার চোখে  কখন যে জল এসে গেছে বুঝতেই পারিনি ।
 পরিষ্কার অনুভব করলাম , এ জল চোখের সমস্যার জল ছিলোনা ।
Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ১২:৩১ পূর্বাহ্ণ | রবিবার, ১৬ মে ২০২১

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

চন্দ্রাবলী

১৬ নভেম্বর ২০২০

এডুকেশন

২৩ ডিসেম্বর ২০২০

অনুগল্পঃ মানুষ

১০ ডিসেম্বর ২০২০

চারাগাছ

২৬ জানুয়ারি ২০২১

কারিগর

২৪ জানুয়ারি ২০২১

স্বর্গ থেকে বিদায়

০৯ ডিসেম্বর ২০২০

বাটপার

১৩ আগস্ট ২০২০

মালতি

২৫ জুলাই ২০২০

 ফুটপাথ

৩০ জুলাই ২০২০

অলিভিয়া

০৭ এপ্রিল ২০২১

আমাদের গল্টু

১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১