ঘোষণা

পোর্ট রয়্যাল: পৃথিবীর সবচেয়ে কুখ্যাত শহর

শিহাবুল ইসলাম | শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২০ | পড়া হয়েছে 33 বার

পোর্ট রয়্যাল: পৃথিবীর সবচেয়ে কুখ্যাত শহর

অনেক বিখ্যাত শহরেরই ভালো-মন্দ সবার কমবেশি জানা। কিন্তু এর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ শহরটি বাছাই করা খুব একটা সহজ কর্ম নয়। এটি তেমনি এক শহরের গল্প, যেই শহরকে সম্ভবত চোখ বন্ধ করে সেই সময়ের সবচেয়ে মন্দ শহর বলা যায়! শহরটির নাম জানার আগে একটু পেছনের গল্পটা জেনে আসা যাক:

সকাল ৮টা; গত জানুয়ারি মাসের ২০ তারিখ। এখানে এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল, জ্যামাইকান ভেবেছিল যে তারা জীবনে এমনটি আর কখনো দেখবে না। দক্ষিণপূর্ব জ্যামাইকার কিংস্টন হারবারের ঐতিহাসিক পোর্ট রয়্যালে ৪০ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো একটি ক্রুজ জাহাজ নোঙর করে।

পোর্ট রয়্যালের উন্নয়নের জন্য ক্রুজ জাহাজগুলো আসায় দ্বীপের প্রায় দুই হাজার মানুষ হাসিমুখে অতিথিদের স্বাগত জানিয়েছিল। এটা কিংস্টন ও তার জনগণের জন্য একটি গর্বের মুহূর্ত ছিল। এটি নিয়ে বহু আগে থেকেই কথা হয়েছিল, তবে তা কখনো বাস্তব হয়নি। আগমনটি পোর্ট রয়্যালের ঘটনাবহুল ইতিহাসের এক উজ্জ্বল নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। এটি এমন এক ইতিহাস, যা জ্যামাইকাবাসীর কাছে পরিচিত হলেও সমুদ্রের ওপারে খুব কমই আলোচিত হয়েছে।

পোর্ট রয়্যাল এখন জেলেদের শান্ত একটি গ্রাম। সপ্তদশ শতকের গোড়ার দিকে শহরটির এতোটাই কুখ্যাতি ছিল যে অনেকে ‘পৃথিবীর নিকৃষ্টতম শহর’ বলে বিবেচনা করতো। কৌশলগত অবস্থানের কারণে স্প্যানিশরা দেড়শ বছরেরও বেশি সময় ধরে এটিকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। ১৬৫৫ সালে এক ইংরেজ বাহিনী জ্যামাইকা আক্রমণের পর এটিকে দ্রুত পয়সা বানানোর স্থানে পরিণত করে। তবে ইংরেজ জনবলের অভাবে দ্বীপটি রক্ষায় তত্কালীন গভর্নর এডওয়ার্ড ডি উইলি সেখানে জলদস্যু ও প্রাইভেটিয়ারদের (ভাড়াটে যোদ্ধা) একটি জোটকে নিয়োগ দিতে বাধ্য হন।

পরবর্তীতে তারা দাস ব্যবসা, চিনি ও কাঠের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পোর্ট রয়্যালকে অ্যালকোহল, অর্থ আর যৌনতার এক বিকারগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর আশ্রয়স্থলে পরিণত করে। সে সময় শহরটির এক-চতুর্থাংশ ভবন বার ও যৌনপল্লী হিসেবে গড়ে ওঠে এবং শহরটিতে দ্রুত পয়সাওলা লোক বাড়তে থাকে। জলদস্যুদের অসম্ভব লোভ আর ব্যভিচার দ্রুতই শহরটিকে ‘বিখ্যাত’ করে তোলে। আমোদ উল্লাসে ভরপুর জীবনযাত্রার ব্যয় বহনে তারা ওই অঞ্চলের দুর্বল স্প্যানিশ বন্দরগুলোতে আক্রমণ ও লুণ্ঠন করতে থাকে।

এই জলদস্যুরা আক্ষরিক অর্থেই যা খুশি তাই করার মতো মুক্ত ও স্বাধীন ছিল। কারণ তাদের জ্যামাইকার রক্ষক হিসেবে দেখা হতো। স্থানীয় ইতিহাসবিদ পিটার গর্ডন বিষয়টিকে এভাবে ব্যাখ্যা করেন- তাদের এভাবে ছেড়ে দেয়া ছাড়া কর্তৃপক্ষের আর কোনো উপায় ছিল না। তারা যা খুশি তা-ই করতে পারতো। যৌনপল্লী, পানশালা আর গির্জা সমান-সমান ছিল। তাই আপনি পোর্ট রয়্যালের রুক্ষ্ণ পরিবেশটি সহজেই কল্পনা করতে পারেন।

সবশেষ ১৬৯২ সালের ৭ জুন সকালে পোর্ট রয়্যাল নিজেই নিজের খোলনলচে চিরতরে পাল্টে ফেলেছিল। ভয়ানক এক ভূমিকম্পে নগরীর বেশিরভাগ অংশ ধ্বংস হয়ে যায় এবং এ দুর্যোগে দুই হাজার মানুষ প্রাণ হারায়। পোর্ট রয়্যাল আর কখনই আগের মতো হয়ে উঠতে পারেনি।

জ্যামাইকা ন্যাশনাল হেরিটেজ ট্রাস্টের প্রত্নতত্ত্বের টেকনিক্যাল পরিচালক সেলভেনিয়াস ওয়াল্টার্স বলেন, ভূমিকম্পটি পোর্ট রয়্যাল ও এর পাশের প্রায় ৫২ একর জায়গা ধ্বংস করে দিয়েছিল। পুরো এলাকাটির প্রায় দুই তৃতীয়াংশ ধ্বংস হয়ে কিংস্টন বন্দরে ডুবে গেছে। ভবনগুলো ধ্বংস হয়ে যায় এবং দেয়াল ভেঙে পড়ে প্রচুর মানুষ মারা যায়। সেসময় সেখানকার অর্ধেকেরও বেশি লোক মারা যায়।

পোর্ট রয়্যালের এমন বিপর্যয়কর গল্পটি জ্যামাইকার বাইরে খুব বেশি পরিচিত না, যা কিছুটা অবাক করে তোলে। যাইহোক, সেই জলদস্যুদের নগরীটি এখন পানির নিচে চলে গেছে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে কয়েক মিটার নিচে থাকা এই ধ্বংসাবশেষ সতেরো শতকের ঔপনিবেশিক বন্দর শহরের প্রাত্যহিক জীবনচিত্রের নমুনা বহন করছে।

ওয়াল্টার্স বলেন, এটা এই গোলার্ধের সেরা আন্ডার ওয়াটার হেরিটেজ সাইট হিসেবে মনে করা হয়। এই অঞ্চলের একমাত্র হিসেবেও ধরা হয়। সুতরাং কেবল জ্যামাইকার নয়, সামগ্রিকভাবে বিশ্বের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ। আমরা এই মূল্যবান হেরিটেজ সম্পদ রক্ষা ও সংরক্ষণ করছি।

ক্যারিবীয় এই প্রত্নসম্পদটি বর্তমানে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট স্বীকৃতি পাওয়ার প্রক্রিয়ায় আছে। এই স্বীকৃতি পেলে বিশ্বের এমন একটি অংশকে স্বাগত জানানো হবে, যা এ পর্যন্ত আড়ালেই রয়ে গেছে। যদিও এই ন্যক্কারজনক গল্প ও দাস ব্যবসা নিয়ে ২০২০ সালে এসে জ্যামাইকানদের মধ্যে কোনো নেতিবাচক মনোভাব নেই। বরং এই হ্যারিটেজ সাইট নিয়ে তারা বেশ গর্ববোধ করে।

‘অতীতকে সম্মান করো, ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখো’ স্লোগানটি পোর্ট রয়্যাল ২০২০ প্রকল্পের ওয়েবসাইটে দেয়া হয়েছে। ক্রুজ জাহাজগুলোর আগমন একটি বড় মুহূর্ত ছিল। পোর্ট রয়্যালের এই উন্নয়ন প্রকল্পটি শহরটিকে ‘বিশ্বমানের হেরিটেজ, পরিবেশগত ও সাংস্কৃতিক আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু’ হিসেবে রূপ দিবে। কয়েকটি সদাব্যস্ত নিদ্রাহীন আবাসিক রাস্তা ও মুষ্টিমেয় বার নিয়ে আজকের পোর্ট রয়্যাল তার ক্ষয়িষ্ণু অতীত থেকে অনেক দূরে। বিবিসি অবলম্বনে

সূত্র: বণিক বার্তা

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ১:১০ অপরাহ্ণ | শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত