ঘোষণা

প্রাচীন কাল থেকে বৌদ্ধ ধর্ম এবং সংস্কৃতিতে রয়েছে বাঙালি জাতির উত্তরাধিকার

রাজু আহমেদ মামুন | বুধবার, ২৬ মে ২০২১ | পড়া হয়েছে 158 বার

প্রাচীন কাল থেকে বৌদ্ধ ধর্ম এবং সংস্কৃতিতে রয়েছে  বাঙালি জাতির উত্তরাধিকার

বৌদ্ধ পুর্ণিমা। বাঙালি মুসলমান বলে বাঙালিদের মধ্যে সবচেয়ে বড় যে ধর্মসম্প্রদায়টিকে আমরা আজ দেখতে পাই- এদের একটি অংশের পূর্বজরা এসেছেন বৌদ্ধ সম্প্রদায় থেকে এবং বৌদ্ধ প্রভাবিত বাংলার স্থানীয় ধর্ম নাথ সম্প্রদায় থেকে। অধিকাংশ বাঙালি মুসলমান অতীশ দীপঙ্কর শ্রী জ্ঞানের সাক্ষাৎ বংশধর।

প্রাচীন বাংলা একক কোন রাজনৈতিক দেশ ছিলোনা। ছিলো একটি সাংস্কৃতিক এবং ভাষা বলয়, কারন সম্ভবত – নৃতাত্ত্বিক ঐক্যে । গোল মুণ্ডের এই মানুষ প্রজাতি তৈরি হয়েছিলো প্রগৈতিহাসিক যুগে, প্রধানত মঙ্গোলয়েড এবং অষ্ট্রালোয়েড গ্রেট রেস দ্বয়ের মিশ্রণে। এই একক রাজনৈতিক দেশ, সার্বজনীন বাঙালি পরিচয়ের ধারনাটি তৈরি হয়েছে সুলতানি আমল থেকে এবং ব্রিটিশ আমলের কলকাতা কেন্দ্রিক হিন্দু ঐতিহাসিকদের আবেগ সংজাত রচনার কারনে। এর একেক অঞ্চলের ইতিহাস এবং জনগোষ্ঠীর বিকাশ আলাদা আলাদা।

ঐতিহাসিক কালে যখন ভারত বর্ষে আর্য জনগোষ্ঠীর আগ্রাসন হয় তখন তারা মিথিলা পর্যন্ত দখল করলেও অজস্র নদী বেষ্টিত দুর্গম দূর্ভেদ্য বাংলায় ঢুকতে পারেনি। কিন্তু অনেক পরে আর্য সংস্কৃতি প্রভাবিত এবং আর্য বিরোধী কয়েকটি ধর্ম সম্প্রদায় বাংলায় প্রবেশ করে। এরাই বাঙালিদের মধ্যে আর্য শব্দ এবং নামের প্রবর্তক। এরা হলো জৈন,আজিবক এবং বৌদ্ধ ধর্ম সম্প্রদায় । বিশেষ করে বৌদ্ধদের প্রভাব পূর্ব বাংলার সুদূরতম অঞ্চল ঢাকার ওয়ারিবটেশ্বর পর্যন্ত পৌঁছে গেছিল খ্রিস্টপূর্ব সাড়ে চারশো বছর আগে। এখানের মাটি খনন করে যে প্রচীন নগরীর ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে তাতে একটি বৌদ্ধ পদ্ম মন্দির মিলেছে, কার্বন ডেটিংএ যার বয়স খ্রীস্টপূর্ব ৪৫০ বছর। ফলে বাঙালি জাতির মানস গঠনে এই প্রোআর্য অহিংস নাস্তিক্যবাদি ধর্মগুলোর অনেক অবদান ছিলো, বিশেষ করে বৌদ্ধ ধর্মের।

যদিও এই প্রোআর্য ধর্ম সংস্কৃতি পশ্চিমের রাঢ়ভূমি, উত্তর বঙ্গ,সিলেট এবং সমতট অঞ্চলে কিছুটা প্রভাব বিস্তার করলেও মধ্য, দক্ষিণ এবং দক্ষিণ পূর্ব বঙ্গের অধিকাংশ মানুষই ছিলো স্থানীয় লোকায়ত কৌমধর্মের অনুসারী, জড়পুজারি। ফলে সপ্তম শতকে যখন আরব বনিক-শেখদের হাত ধরে ইসলাম এসে উপকূলে পৌছায় এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। শুধু কি দক্ষিণ বাংলায়! না, ঐ শতকেই ইসলাম পৌঁছে গেছিলো বঙ্গের একদম উত্তর অংশে। লালমনিরহাট জেলায় ৬৮৯ খ্রিস্টাব্দের মসজিদ যার প্রমাণ।

কিন্তু হিন্দু ধর্ম? বৃহত্তর বঙ্গে ব্রাহ্মণ্যবাদ বা হিন্দু ধর্ম তুলনামূলক অনেক নবীন। উত্তর প্রদেশের বংশ জাত গুপ্ত শাসকেরা খ্রিস্টিয় চতুর্থ পঞ্চম শতকে কিছু ব্রাহ্মণদের ভূমি দান করেছিলেন কিন্তু তারা প্রবাসিই থেকে গেছেন। তবে অষ্টম, নবম শতকের দিকে বৌদ্ধ পাল শাসনের সময় তারা ধর্মসম্প্রসারণ এবং জীবিকার সন্ধানে আসতে শুরু করে। ধিরে ধিরে পশ্চিম বঙ্গ এবং উত্তর বঙ্গের প্রো আর্য বলয়ে ছড়িয়ে পড়েন অল্পসংখ্যক ব্রাহ্মণরা। কিন্তু দক্ষিণ এবং দক্ষিণ পূর্ব বঙ্গে তারা সুবিধা করতে পারে নি। এর কারন হলো জৈন, বৌদ্ধদের তারা যে ভাবে সহজে পরাস্ত করতে অভ্যস্ত ছিলো ইসলামের কাছে অবস্থাটা ছিলো ঠিক উল্টো এবং ততধিক কঠিন। ফলে দক্ষিণ পশ্চিম বঙ্গে আমরা যত হিন্দু দেখতে পাই তেমনি পূর্ব ও দক্ষিণ বঙ্গে পাই না। এতেও হয়তো সেন আমলের হিন্দু রাজ ক্ষমতার একটা প্রভাব আছে বোধ করি কিন্তু তার আয়ু ছিলো মাত্র শত বছর, তারপরই উত্তর বঙ্গে হাজির হতে দেখি তুর্কী মুসলমানদের। যদিও মধ্য ও দক্ষিণ বঙ্গের মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে তুর্কীদের দখল ছিলো না।

দক্ষিণ বঙ্গের অহিন্দু জনগোষ্ঠীর একটি হলো নোমো। এরা ১৯৩২ সালের সেনসাসেও নিজেদের হিন্দু পরিচয় দিতে চায় নি। মজার বিষয় হলো – দক্ষিণ বঙ্গে মুসলমান বলতে বোঝায় শেখ আর অমুসলমান বলতে বোঝায় নোমো। লোকে হিন্দু বাড়ি বলে না, বলে নোমবাড়ি। অনেকেই ধারনা করেন বাঙালি মুসলমানরা হিন্দু থেকে কনভার্টেট, এটা সম্ভবত বড় রকমের একটি ভুল প্রপঞ্চ। সমগ্র বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে হিন্দু থেকে আগতের সংখ্যা হয়তো দশ ভাগেরও কম হবে । এরা অধিকাংশই অপ্রাতিষ্ঠানিক কৌম ধর্ম থেকে আসা, তারপর হয়তো নাথ এবং বৌদ্ধ থেকে ।

প্রচীন বাংলায় নানা রকম লোক ধর্মের বাইরে সম্ভবত সর্বাধিক প্রচারিত ধর্ম ছিলো বৌদ্ধ ধর্ম। কিন্তু অনেক সাম্প্রদায়িক ঐতিহাসিকরা সেটা স্বীকার করতে চাননা। তারা সপ্তম শতকের সল্পকালিন হঠাৎ হিন্দু শাসক- শশাঙ্ককে মনে করেন বাংলার প্রথম স্বাধীন রাজা। এটা সত্যের মারাত্মক অপালাপ। শশাঙ্ক ছিলেন গুপ্তদের নিয়োগ কৃত একজন সামান্ত রাজা, সম্ভবত উত্তর প্রদেশ জাত গুপ্ত রাজবংশেরই কেউ। গুপ্ত সাম্রাজ্যের অবসিত পর্যায়ে তিনি উত্তর পশ্চিম বঙ্গের কিয়দাংশে রাজা হয়ে উত্তর ভারতীয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। তিনি সমগ্র বাংলার শাসক ছিলেন না। তিনি তার অধিভুক্ত অঞ্চলের বাঙালি বৌদ্ধদের উপর সাম্প্রদায়িক নির্যাতন করেছেন বলে ইতিহাসে তথ্য রয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা হলো শশাঙ্কের আগের শতাব্দীতেই বঙ্গ সমতট অঞ্চলের বিরাট অঞ্চল জুড়ে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের তিনজন রাজার নাম পাওয়া যায়। গোপচন্দ্র, ধর্মাদিত্য,সমাচার দেব। এরা বৌদ্ধ রাজা ছিলেন। আবার শশাঙ্কের পরবর্তী পাল সাম্রাজ্য এবং পূর্ব বঙ্গের চন্দ্র বংশও বৌদ্ধ ছিলো।

কাজেই প্রাচীন কাল থেকে বৌদ্ধ ধর্ম এবং সংস্কৃতিতে রয়েছে বাঙালি জাতির উত্তরাধিকার। তাই এই বুদ্ধপূর্ণিমায় শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি মহামতি গৌতম বুদ্ধকে।

বুদ্ধং স্মরণাং গচ্ছামি…

রাজু আহমেদ মামুন, সম্পাদক, সাপ্তাহিক ধাবমান, ঢাকা। ২৬/০৫/২০২১।

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ৯:১৭ অপরাহ্ণ | বুধবার, ২৬ মে ২০২১

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

জুতার দাম ১০ লাখ ডলার!

০৯ ডিসেম্বর ২০২০