ঘোষণা

বিটলবণের স্বাদ

জয়দীপ দে | বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০ | পড়া হয়েছে 111 বার

বিটলবণের স্বাদ

আমরা তিনজন, ছয়টা খালি হাত নিয়ে ঘুরে বেড়াই। বছরে দু-একবার ট্যুরের আয়োজন করি। লক্ষ্যস্থির পরিকল্পিত কোনো ভ্রমণ নয়। অফিস থেকে ছুটি পেলে উত্তর-দক্ষিণ কোনো একদিকে চলে গেলেই হলো। ভ্রমণ আমাদের মূল লক্ষ্য ঠিক আছে, কিন্তু পার্শ্বলকও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।

দেখলাম, সারাটা বছর আমরা সব দরকারি কথা বলে কাটাই। প্রতিটি কথার পিঠে দাও-নাও লেগে থাকে। কথা আসলে আমরা বলি না, বলে আমাদের প্রয়োজন। আমাদের আত্মা চুপ থাকে। থাকে নির্লিপ্ত। আমাদের আত্মাকে কথা বলার সময় দেওয়া প্রয়োজন। তাই ট্যুরে গিয়ে আমরা রাতের পর রাত কথা বলি। তাস পিটাই। দিনে অন্যান্য নিশাচরের মতো ঘুমাই।

তিনজনের ঘুমের ভঙ্গি তিন রকম। একজন কাত তো একজন চিৎ, আরেকজন পাশ। একজনের নাক ডাকার জন্য বাকি দুজন ঘুমাতে পারে না- আরেকজনের হাত-পা ছোড়াছুড়িতে। অবশ্য এখন এসব আমাদের কাছে সমস্যা নয়, বরং উপভোগের পর্যায় চলে গেছে। মাঝরাতে ঘণ্টাখানেকের মধ্যে লাথি না খেলে আমাদের ঘুম কেটে যায়। জেনারেটরের মতো নাকের আওয়াজ না পেলে মনে হয় চরাচর শূন্য হয়ে পড়েছে। এই ফাঁকে পৃথিবীটা শেষ হয়ে যাবে।

এভাবে ঘুরতে ঘুরতে আমরা কীভাবে যেন কাশী হয়ে লক্ষেষ্টৗ চলে গিয়েছিলাম। কথা ছিল কাশী যাওয়ার। কী ভেবে ট্রেন থেকে নেমে লক্ষেষ্টৗর বাসে উঠে পড়ি। পরে শুনলাম সেখানে নাকি আফিমের চাষ হয়। তাতে আমাদের কী? জানি না। চলে গিয়েছিলাম। সে ভ্রমণের পর একটা ধারণা হলো, বিদেশ ঘুরতে খুব একটা খরচ হয় না। আমাদের বিদেশ বলতে আমেরিকা ইউরোপ নয়। হেঁটে দৌড়ে যাওয়া যায় এমন বিদেশ।

মূল খরচ পাসপোর্ট আর ভিসায়। পাসপোর্ট যেহেতু পাঁচ বছরের জন্য, হিসাব করলে প্রতিদিনেরও একটা ফি আছে, তাই শুধু শুধু পাসপোর্টটা বাসায় ফেলে মেয়াদ খোয়ানোর মানে নেই।

জিয়া ফার্মাসিউটিক্যালসে চাকরি করে। চালু ছেলে। ফেসবুক টেসবুক ঘাটে। সে কী করে নেপালি এক ছেলের সঙ্গে পরিচিত হয়ে গেল। সে নাকি বাংলাদেশের সীমান্তের পাশে কোন এক পাহাড়ি শহরে থাকে। সুন্দর শহর। যাওয়া যায়।

জিয়ার উদ্যোগে শফিকের সমর্থনে আমার নিস্পৃহতায় আরেকটা ট্যুর হয়ে গেল। ট্রেনে-বাসে-টুকটুকে কোনো প্রকারে বুড়িমারী গিয়ে ভেবেছিলাম দূরে যে নীলপাহাড় দেখা যায় সেখানেই নিশ্চয়ই জিয়ার বন্ধুর বাড়ি।

ওমা, ইমিগ্রেশন সেরে ওপারে গিয়ে দেখি এ তো ভারত। আবার ভারত ডিঙিয়ে যেতে হবে নেপাল। রানিগঞ্জ হয়ে কাঁকরভিটা গিয়ে শুনি আরও চারবার গাড়ি পাল্টাতে হবে। নিজের গালে জোরসে একটা চড় মারতে ইচ্ছে হচ্ছিল। নেপালের সঙ্গে বাংলাদেশের বর্ডার আছে? তাহলে জিয়া যে বলল বাংলাদেশের সীমান্তের সঙ্গে তার বন্ধুর শহর, সেটা তো বিশ্বাস করা উচিত ছিল না।

যতই নেপালের ভেতরে যাই, তত হতাশ হই। কোথায় যেন পড়েছিলাম হিমালয়-দুহিতা নেপাল। হিমালয় কই। সব তো আমাদের রংপুর কুড়িগ্রামের মতো ফলের মাঠ। আমের বাগান। তিন-চারবার গাড়ি বদলিয়ে ধারান নামে একটা ছোট্ট শহরে গিয়ে পৌঁছলাম। শহর থেকে দূরে গলা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়গুলো দেখা যাচ্ছিল। মনে একটা আর্দ্রভাব এলো।

জিয়া দিজ্ঞ্বিজয়ী সেকেন্দার শাহর মতো বলে উঠল- ‘ওই দ্যাখ…’

‘এ রকম পাহাড় আমাদের মাইমেনসিঙ-এ আছে’, আমি মুখ মুচড়ে বলে উঠলাম।

শফিক চারপাশের দোকানপাট দেখছিল, ‘এখানে দেখি ফার্মেসির সংখ্যা বেশি। এদের কি অসুখবিসুখ বেশি হয়।’

‘ফার্মেসি কই।’

‘ওই যে।’

‘ধুর, ওইসব তো মদের দোকান।’

জিয়ার চোখের তারা জ্বলে উঠল।

এ সময় জিয়ার বন্ধু ত্রিমূর্তি এসে হাজির। বহুদিন পর যেন প্রেমিকাকে ফিরে পেল এমন উচ্ছ্বাস নিয়ে সে জিয়াকে জড়িয়ে ধরল। তারপর আমাদের তিনজনকে নিয়ে একটা ঝড়তিপড়তি মার্কা বাসে উঠে পড়ল। বাসে ভীষণ ভিড়। হাত আর কনুই দিয়ে লোক সরিয়ে উঠতে হলো। কিন্তু বাস ছাড়ার নাম নেই। ত্রিমূর্তিকে বললাম, ‘কিরে ভাই, কতক্ষণ।’

ত্রিমূর্তি হেসে উঠল, ‘বাসটা ভরে যাক, ছেড়ে দেবে।’

নিরুচ্চারে বললাম, ‘এ তো আমাদের ১৩ নম্বরকে হার মানাবে।’

যাক, ধীরস্থিরভাবে বাস চলতে লাগল। ভুল হলো, উঠতে লাগল। পাহাড়ের গা বেয়ে জিলাপির মতো রাস্তা। সেটি ধরে পা টিপে টিপে বাসটা উঠতে লাগল। অপূর্ব সৌন্দর্য। যত সময় যাচ্ছে লোকালয় আমাদের কাছে বাচ্চাদের বইয়ের ড্রইংয়ের মতো হয়ে যাচ্ছিল। আমরা পাইনগাছের বনের মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছিলাম। যত পাইনের বনে ঢুকছি, ততই মনে হচ্ছে দস্যু মেঘের পাল এগিয়ে আসছে আমাদের দিকে। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে মেঘেরা আমাদের গ্রাস করে নিল। সব দৃশ্য মুছে দিয়ে হোয়াইট আউট করে দিল। বাসের হেডলাইট ঘন ঘন জ্বলছে নিভছে। ইশারা দিচ্ছে অন্য গাড়িকে। এভাবে মেঘের সঙ্গে লুকোচুরি করতে করতে একটা কটেজের সামনে এসে বাস থামল। আমরা ভিড় ঠেলে নেমে পড়লাম।

ত্রিমূর্তি কটেজের দরজায় সজোরে ধাক্কা দিতে শুরু করল। ভাবখানা এমন, দশ মিনিট সময়, না খুললে ভেঙে ফেলব। এক বুড়ি দরজা খুলে অসহিষ্ণু মুখ করে দাঁড়াল। সম্ভবত উনি আমাদের পছন্দ করেননি। তিনি পথ আগলে দাঁড়িয়ে রইলেন। ত্রিমূর্তি তাকে ধাক্কা দিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল। আমরা কী করব বুঝে উঠতে পারছিলাম না। ত্রিমূর্তি ভেতর থেকে বলে উঠল, ‘আইয়ে।’

অন্ধকার ঘর।

জিয়া ত্রিমূর্তির কানের গোড়ায় গিয়ে বলল, ‘ইলেকট্রিসিটি হ্যা?’

ত্রিমূর্তি হেসে উঠল, ‘লোডশেডিং গোয়িং অন। ইলেকট্রিসিটি কামিং সুন।’

শফিক ফিসফিস করে বলল, ‘ইংরেজি তো সাংঘাতিক!’

সত্যি সত্যি কিছুক্ষণ পর কারেন্ট এলো। ঘরে একটা ডবল সাইজ খাট। দুটো চেয়ার আর একটা আলনা কাম ড্রেসিং টেবিল। দূরে টয়লেট। খোলা না ঝোলা বোঝা ভার।

ত্রিমূর্তি জানাল কটেজটা তার এক আঙ্কেলের। তাই বড়ো সস্তায় পেয়ে গেলে। এক সপ্তাহে মাত্র চার হাজার রুপি। আসলেই কম। আমাদের একশ’ টাকা নেপালে একশ’ ত্রিশ। সে হিসাবে তিন হাজার টাকার মতো।

খাবারের জন্য বুড়ির সঙ্গে কথা বলতে বলে ও চলে গেল।

কিছুক্ষণ পর বুড়ি এলো। ও আমাদের কথা বোঝে না, আমরাও ওর। না বোঝে হিন্দি না বাংলা না ইংরেজি। কি এক বিপদ। বুঝলাম এখানে থাকা গেলেও খাওয়ার ব্যবস্থা হবে না। অগত্যা খাবারের জন্য তিনজন বের হব বলে ঠিক করছি, এমন সময় আঠারো উনিশ বছরের একটা ছোটখাটো চেহারার মেয়ে এসে ঢুকল ঘরে। হাতে ফালি ফালি করে কাটা পাহাড়ি আম।

নমস্কার জানিয়ে সে আমের প্লেট বাড়িয়ে দিল আমাদের দিকে। জিয়া প্লেটটা তুলে নিতে নিতে বলল, ‘হিন্দি সামঝে?’

‘হা।’

আবার যেন নতুন করে বিদ্যুৎ এলো ঘরে। আমাদের মুখগুলো উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

রাতের খাবারের হুকুম দেওয়া হলো। যদিও খাবারের দাম খুব বেশি। শফিক অমিতার পক্ষ নিয়ে বলল, ‘হবে না, ধারান থেকে এখানে মাল আনা চাট্টিখানি ব্যাপার!’

ও, বলা হয়নি, মেয়েটার নাম অমিতা। দারুণ চটপটে ও মিশুক। ঝড়ের বেগে পুরো ঘরটাকে পরিপাটি করে দিল। দু-বোতল পানিও দিয়ে গেল।

রাত বাড়ছে। শীতের অনুভূতি তীব্র হচ্ছে। আমাদের দেশের মাঘ মাস। অথচ নেপাল আসতে আসতে গরমে ত্রাহি দশা হয়ে গিয়েছিল আমাদের।

ব্যাগ থেকে গরম কাপড় বের করে আমরা বাইরে বেরিয়ে পড়লাম। বাইরে এসে জিয়া ‘ওয়াও’ করে একটা চিৎকার দিয়ে উঠল। ভাল্লুকের মতো প্রকাণ্ড কালো কালো পাহাড়ের ওপর রুপোর থালার মতো বিশাল এক চাঁদ। জোছনা যেন দুধের নহরের মতো বয়ে যাচ্ছে চারদিকে। পাইনগাছের মাথায় একটু সর লেগে আছে। দূরের কটেজগুলোর মাথায় একটু। আরেকটু আমাদের তিনজনের মাথায়। আমরা দেখতে পাচ্ছি না। অনুভব করছি। আমাদের সুন্দর পেয়ে বসেছে। আমাদের পাগলপারা দশা। পাহাড়ের জোছনা নাকি অসাধারণ। কিন্তু কতটা সে ধারণা ছিল না। হয়ে গেল।

রাতের খাবারে ছিমছাম আয়োজন। একটা সাদা সবজি আর মোরগের তরকারি।

‘লক্ষ্য করেছিস তরকারির টেস্টগুলো অন্যরকম।’ শফিক বিষয়টা তুলল।

‘কিছু একটা এরা দেয়।’

বিষয়টা আমরা আবিস্কার করলাম পরদিন সকালে। যখন ডিম ভাজির ওপর অমিতা মনের আনন্দে বিটলবণ দিচ্ছিল।

জিয়া বলে উঠল, ‘তোমরা কি সবকিছুতেই এটা দাও।’

‘হুম। স্বাদ বাড়ে।’

‘এটা যে শরীরের জন্য খারাপ সেটা তোমরা জানো।’

‘না তো।’

‘আর কখনো আমাদের খাবারে এটা দেবে না। স্বাদের দরকার নেই।’

‘ঠিক আছে।’

তারপরও সে দেয়। খাবার মুখে নিলে বোঝা যায়। একটা নোনতা নোনতা স্বাদ। পরে বুঝলাম লবণ এখানে ভালোবাসা প্রকাশের প্রতীক। কারণ একসময় পাহাড়ে লবণ বড়ো দুর্লভ ছিল।

অমিতার ইনস্ট্রাকশনে আমরা ধানকুডা নামে একটা জায়গায় গেলাম। আমাদের কটেজ থেকে মূল গাড়ির রাস্তা ধরে মিনিট পনেরো হাঁটার পথ। সেখানে বেশ বড়ো একটা বাজার আছে। অনেক দোকান। অমিতারা এখান থেকে বাজার করে।

‘ধানকুডা, নিশ্চয়ই ধান কুড়া থেকে এসেছে’, শফিক বলল।

‘হতে পারে। কারণ নেপালিরা বাঙালিদের মতো অনেক শব্দ ব্যবহার করে। যেমন- আলু, চাল। ধানও হয়তো করে।’ জিয়া বলল।

‘কিন্তু এখানে ধান এলো কী করে?’

‘ভেলিড কোয়েশ্চেন। আরেকটা মজার কথা বলি, এখানে না তিব্বতিরা থাকত। একবার এখানকার তিব্বতিদের তাদের রাজার লাঠিয়ালরা ধরে নিয়ে গিয়েছিল। তা নিয়ে নেপাল-তিব্বত যুদ্ধ পর্যন্ত হয়েছিল।’

‘কী বলিস?’

‘হুম। রাহুল সাংকৃত্যায়নের বইতে আছে।’

ধনকুডা বাজারের পেছনে চমৎকার একটা পর্যটন এলাকা আছে। প্রায় দুই কিলোমিটার হেঁটে গেলে একটা বড় পাহাড়ি ঝরনা পড়ে। পুরোটা পথ পাশে পাশে থাকে একটা পাহাড়ি ছড়া। দু’বার সুন্দর দুটো পুল দিয়ে সেটা অতিক্রমও করা লাগে। দেখার মতো জায়গা।

রাতে জম্পেশ আড্ডা শুরু হলো। দুনিয়ার হেন কোনো বিষয় নেই যা নিয়ে আলাপ হয় না। একমাত্র চাকরিবাকরি ছাড়া। এই জায়গায় আমরা তিনজনই নিষ্প্রভ।

এর মধ্যে হঠাৎ শফিক উঠে বলল, ‘এবার টেস্টিং হবে না?’

বিষয়টা তুলতেই মনটা বিষিয়ে উঠল। জিয়া যেখানেই যাক না কেন, কোনো না কোনো মেয়ের সঙ্গে সখ্য পাতবে। ট্যুর শেষে খুব রসিয়ে রসিয়ে বলবে সেখানকার মেয়েদের টেস্ট কেমন। অবশ্য এর আগেই পোহাতে হয় রাজ্যের ঝক্কি। গতবার রাঙামাটিতে গিয়ে তো হাজতবাসের দশা হয়েছিল। শেষে সে শপথ করেছিল আমাদের সঙ্গে এলে এসবের আশপাশেও যাবে না।

কিন্তু শফিকের প্রশ্নের উত্তরে দেখলাম সে খুব স্বাভাবিক। রহস্যময় একটা হাসি দিল। আমার কলজে কামড় দিয়ে উঠল। বিদেশ বিভুঁইয়ে না জানি কোন বিপদে পড়ি।

দেখতে দেখতে বেশ কয়েটা দিন কেটে গেল। প্রতিদিন দুই তিনবার বৃষ্টি হয়। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি। গতকাল হলো মুষলধারে। বজ্রপাতের আওয়াজে ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। পাহাড়ের বৃষ্টির এ রুদ্ররূপ আমার প্রথম দেখা।

এর মধ্যে পাহাড়ের জীবনের সঙ্গে সামান্য পরিচয় হয়ে গেল। এই যে অভ্রভেদী পাহাড়গুলোতে যেসব মানুষ থাকে তাদের দেখে আমাদের কতই না সুখী মনে হয়। কিন্তু তাদের মতো অসহায় মানুষ আর নেই। ছোটখাটো অনেক জিনিসের জন্য দুই ঘণ্টার পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে শহরে যেতে হয়। আমরাও গিয়েছিলাম। এক পাতা গ্যাস্ট্রিকের ওষুধের জন্য। পাহাড়ে বন্যপ্রাণী কমে আসছে। আর সরকার সেসব মারতেও দেয় না। ফলে পাহাড়ের মানুষজন ভীষণ প্রোটিন সংকটে পড়ে। এখানে মাছ-মাংসের দাম সমতলের কয়েকগুণ। আমাদের জন্য প্রথম দিন যে মোরগটা এনেছিল সেটার মাংসই প্রতিবেলা একটু একটু করে দেয় আমাদের। অমিতার একটা বৃদ্ধ নানা আর নানি আছে। ওরা তিনজন শাকপাতা খেয়ে থাকে। আমাদের জন্য আনা মাছ বা মাংস ছুঁয়েও দেখে না।

এসব নিয়ে সেদিন আলাপ হচ্ছিল কটেজের সামনে বসে।

‘হুম। এখানে প্রোটিন একটা বড়ো সমস্যা। আমাদের দেশেও সাজেকের ওখানে ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর শিশুরা প্রোটিন ডেফিসিয়েন্সির জন্য নানা রোগে ভোগে।’

‘তবে যাই বল, এরা কিন্তু বিশুদ্ধ আলো হাওয়া পায়। দেখ না কি সুন্দর স্বাস্থ্য।’

‘সবার না।’

আমাদের কটেজের নিচে একটা ঝিরি আছে। পরশু ভোরে গিয়েছিলাম। কম করে এক কিলোমিটার হবে। আসতে যেতে তিন ঘণ্টা লেগেছিল। গল্প করতে করতে দেখলাম সেই ঝিরি থেকে পানি নিয়ে ফিরছে অমিতা। গরিব কটেজ। পানির মোটর নেই।

জিয়া খুব মনোযোগ সহকারে অমিতাকে দেখছিল।

‘কিরে হেলথ চেকআপ করছিস নাকি।’

‘একটা সত্যি কথা বলব তোদের?’

‘সত্যি কথা বলতে আবার অনুমতি লাগে নাকি।’

‘আমি এখানকার মেয়েদের টেস্ট জেনে গেছি।’

আমরা দুজন যেন আকাশ থেকে পড়লাম। অমিতা ছাড়া তো আর কোনো মেয়ের সঙ্গ সে পায়নি। তাহলে কি অমিতাই! ছিঃ ছিঃ। লজ্জায় মাথা কাটা যাচ্ছিল আমাদের। শফিক গর্জে উঠল, ‘তুই জানলি কী করে?’

‘তাহলে শোন, আমি হাওড়ের ছেলে। আমাদের বাড়ি থেকে ফসলের ক্ষেত কয়েক মাইল দূরে। ভোরে আমরা বাপ-বেটা বেরিয়ে যেতাম। ফিরতাম দুপুরে। একদিন মাঠে মই দিতে দিতে ভীষণ তেষ্টা লেগে গেল। মাঠের গর্তে গর্তে যে পানি জমে থাকে, সেটাই আমরা খেতাম। কিছুদিন আগে আমার খুব পেট খারাপ হয়েছিল। তাই ও পানি খাওয়ার সাহস হয়নি। এদিকে দরদরিয়ে ঘামছি। নিস্তেজ হয়ে বসে পড়লাম জমির আইলে। হঠাৎ মনে হলো গায়ের ঘামও তো চেটে খাওয়া যায়। পানিই তো। সেদিন ঘামের স্বাদ পেয়েছিলাম। ঠিক বিটলবণের স্বাদ। এসব লড়াকু মানুষগুলোরও গায়ের স্বাদ সেরকমই হবে। ভিন্ন হওয়ার কথা না।’

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ২:০৫ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

মালতি

২৫ জুলাই ২০২০

 ফুটপাথ

৩০ জুলাই ২০২০

চন্দ্রাবলী

১৬ নভেম্বর ২০২০

বাটপার

১৩ আগস্ট ২০২০

সোনাদিঘি

১৪ জুলাই ২০২০

ফেরা

১৪ মার্চ ২০২০

জোছনায় কালো ছায়া

০৪ সেপ্টেম্বর ২০২০

রূপকথা

২৬ এপ্রিল ২০২০