ঘোষণা

বিবর্তন

আশরাফ উদ্‌দীন আহ্‌মদ | সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২০ | পড়া হয়েছে 59 বার

বিবর্তন

নতুন খালপাড় বাজারের একেবারে শেষ দিকে, পিঁয়াজ-আলু-রসুনের আড়তের পেছনে, ছবিদ এখানেই বসে প্রতিদিন, আরও অনেকেই আছে। ওর একটা নিজের জন্য টুল, আরেকটা সামনের টুলে বসে খদ্দের, খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে- এটাই ছবিদের ব্যবসা, জীবনযাপনের রুজি। নাপিতকে ভদ্রোচিত ভাষায় নরসুন্দর বলে, ‘নর’কে সুন্দর করে বলেই তো নরসুন্দর। ছবিদ হাসে আর বলে, ভদ্রলোকদের কত কিছু বিলাস-বাসন, ও নাম দিলেই বা কী আর না দিলেই বা কী, সেই তো নাপিত, ওই নাপিতই, মানুষকে সুন্দর বা অসুন্দর করা বলে কোনো কথা নেই, কথা হচ্ছে পেটের ধান্ধা, বেঁচে থাকার লড়াই।

ছবিদের সঙ্গে আমার কথা হয় অনেক কারণে অকারণে, ওর পথ আর আমার পথ এক না হলেও কোথায় যেন-বা একটা মিল রয়েছে, তা হলো পেটের ধান্ধা, ছবিদ যা করে তা যেমন ব্যবসা; আর আমি যা করি তাও তো ব্যবসা, দিন আনা দিন গোনা লোকের তো মিল ওই জায়গায়। সে যাই হোক, মূল কথায় আসা যাক, কাশেমপুর বাজারে ওর একটা সেলুন ছিল, বেশ সাজানো-গোছানো, ফকরুদ্দীন-মইনউদ্দিন সরকারের সময় সরকারি জমি পুনর্দখল করতেই ওর সেলুন ভেঙে দিল রাতারাতি। তারপর আর দোকান নয়, টুল পেতে বসে গেল যত্রতত্র, এখন দিন শেষে যা হয়, ওর ভাষায়- চালিয়ে দেয় ওপরওয়ালা। রাখে আল্লাহ তো মারে কে, মারবে আর কে, গতর খাটা মানুষের আবার লবণ-ভাতের অভাব, চালিয়ে দেয় ওই পাগলা ওপরওয়ালা! কথাটা বেশ সুন্দর, নিজে নিজেই তৈরি করে ফেলেছে মানুষ। মানুষ যে কত কিছু তৈরি করে ফেলে ভাবা যায় না।

খালপাড়ের সবচেয়ে বয়স্ক ওই অশ্বত্থগাছটা হলো এ অঞ্চলের একটা পরিচয়। অনেক কিংবদন্তি ছড়িয়ে আছে গাছটাকে ঘিরে। কারও কথায় ফেলে দেওয়ার নয়, তবে সবাই বলে বেশ নিজের মতো করে। অনেকটা গল্পের মতো মনে হয়। ছবিদ জানায়, বয়স আনুমানিক তিন-সাড়ে তিনশ বছর হবে, হয়তো তার চেয়েও বেশি হতে পারে। কবে কে যে এর পত্তন করেছে, কেউই বলতে পারে না। হয়তো এমনি-এমনিই বেড়ে উঠেছে, যেভাবে আদর-যত্ন ছাড়া বড় হয় আর কি, তবে এ অশ্বত্থগাছ কিন্তু যেমন-তেমন নয়, এর আলাদা মোজেজা নিশ্চয় আছে। এখানে প্রতিদিন মানুষ আসে, মানত করে, সিন্নি দেয়, তা ছাড়া একটা লালসালু দেওয়া কবরও আছে, মানুষ বিশ্বাসে আসে। কথায় আছে, বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর। মানুষের ভালোবাসা আর দান-খয়রাতে দিনকে দিন কেমন জৌলুস ফিরে আসছে এলাকাটা, সবাই কিছু না কিছু পাওয়ার আসায় আসছে, কেউই তো খালি হাতে যাচ্ছে না, হাতভর্তি করেই মানুষ নিয়ে যাচ্ছে যার যা খুশি। আমি একদিন মুখ ফসকে বলেই ফেললাম, ব্যবসাটা কিন্তু মন্দ নয়, তুমি কেন ছেড়ে দিলে…

ছবিদ জানায়, নাহ্‌ যার যা ভাগ্যে আছে করে খাচ্ছে, আমি না হয় আমার মতো খেটে-হেঁটে খাই!

ওর কথা শুনে কিছুক্ষণ থেমে গেলাম, মানুষ সত্যিই চমৎকার; এবং চমৎকার বলেই কেউ কারও মতো নয়, যার যার অবস্থান ভিন্ন, পথও ভিন্ন, আর এই ভিন্ন বলেই মানুষ একাই একশো…

কথাটার মধ্যে হয়তো কিছু যুক্তি আছে অথবা সবই মেকি, আজকাল তো মেকির ওপরেই চলছে দেশটা, সব কিছুতেই একটা রঙ, সেই রঙের মধ্যে ভেসে যাচ্ছে আমাদের ভূত-ভবিষ্যৎ! খালপাড় বাজার আজ উঠে বসেছে, দিনরাত মানুষ আর মানুষ, কে বলবে অজপাড়াগাঁ! ছবিদ জানায়, অনেককাল আগে আমারই পূর্বপুরুষদের এদিকে বসত ছিল, এককালে এ অঞ্চলে শত-সহস্র বাঘের বসত ছিল, তখন থেকেই জায়গাটার নাম হয়ে যায় বাঘমারা, হয়তো কেউ বাঘ-টাঘ মেরেটেরে থাকতে পারে, তবে বাঘ ছিল তা কিন্তু আমার বাপেও দেখেছে, এখন মাঝেসাঝে শিয়াল-বনবিড়াল দেখতে পাওয়া যায়, আর বেজি তো আছেই।

আমার অবশ্যই এদিকে অনেককাল ধরে যাওয়া-আসা, রাত্রিযাপন করেছি অনেক-অনেক। এই অঞ্চলের মানুষজন সত্যিই সাদামাটা, বন্ধুত্বপরায়ণ হলেও বেশ ভীতু প্রকৃতির, কিছুটা অলস। তার পরও কেউই আর ঘরে বসে থাকে না, কাজের ধান্ধায় এদিক-ওদিক ছুটে বেড়ায়, লেখাপড়ার চেয়েও কায়িক পরিশ্রম করতেই বেশি পছন্দ করে, হাঁটুতে একটু বড় হলেই বিয়ে এবং দিনমজুরের কাজ, স্বপ্ন জিনিসটা যে কী, তা কেউ জানে না, জানবার কারও ইচ্ছেও নেই। শরীর খাটাও পয়সা রোজগার করো তারপর শরীরের গরম মেটাতে একটা বিয়ে করা না হলে আর চলে বা কী করে!

বাজারটা ছোট হলেও বেশ ছিমছাম, কয়েকটা গ্রামের মোড় বলা যায়, মানুষজনের ভিড়ে বেশ পরিপূর্ণই থাকে, আগে নদীপথে অনেক অনেক দূরে যাওয়া-আসা যেত। আজ তো সবখানে খরা, পানির বড় অভাব, শুখা মাটি, শুখা বাতাস, সবই কেমন খাপছাড়া, সবাই বলে মরণ ওই ফারাক্কা বাঁধের কারণে মাটির তলায় পানি শুকিয়ে যাচ্ছে, টিউবওয়েলও পানি উঠছে না। নদীপথের স্বপ্ন মানুষ ভুলে গেছে, ব্যাপারিরা ওই নছিমন-ভটভটি ভরেই মালপত্র আনা-নেওয়া করে। ছবিদ কিন্তু ওসবের ধার ধারে না, হেঁটেই সে দূরদূরান্ত পাড়ি দিতে পারে। খবর পেলেই হলো, টাকা যাতে আসে সেই চেষ্টায় ওর সর্বক্ষণ মাথায় ঘোরে।

সেদিন ছবিদ আমাকে জানাল, বিদিরপুরে নতুন একটা জুট মিল বসছে, খবর পেয়ে গেলাম একদিন…

-তারপর কী হলো?

-তার আবার পর… বলে কিনা চাকরি দেবে, সিকিউরিটি দিতে হবে পঞ্চাশ হাজার টাকা, বেতন শুনে আক্কেলগুড়ূম।

-টাকা থাকলে করতে নিশ্চয়!

-কী বলেন ভাই, অত টাকা দেবো কেন, পাগল নাকি! দিনকাল পাল্টে গেছে, টাকায় এখন টাকা আনে, রবিশস্য ঘরে রাখলে টাকায় টাকা…

– তোমার বুদ্ধি তো বেশ ভালো।

– কেন লেখাপড়া শিখিনি বলে কি বুদ্ধি থাকতে নেই।

– না তা অবশ্য বলছি না।

-বলছেন না কিন্তু না বলা একটা কথা তো আমি বুঝে গেলাম।

-বুঝতে পারছি, তুমি বেশ চালাক।

তারপর অনেকদিন আর দেখা পাইনি ওর, অবশ্য আমিও ওদিকে যাওয়াটা অনেক কমিয়ে এনেছিলাম। আগে যেভাবে কথায় কথায় গ্রামের দিকে যাওয়া হতো, এখন গ্রামের কথা শুনলেই মনটা চাঙ্গা হলেও শহরের বিলাসিতা ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করে না। অনেকের মুখে শুনেছি শহরের সুখ আর গ্রামের সুখের মধ্যে অনেক পার্থক্য। তার পরও একটা প্রশ্ন থেকে যায়- আমি তাদের বলি, তোমাদের কথা মেনে নিলাম, কিন্তু তোমরা না হয় চাকরি-ব্যবসার কাজে শহরে আছ বা এসেছ; একটা সময় মানে অবসরে, কেন সেই গ্রামে ফিরে যাও না, তখন তাদের অন্যরকম উত্তর শুনে বড় করুণা হয়, চোখে খানিক লজ্জা আর ঠোঁটে মিহি হাসিটুকু মিলিয়ে যায়। আমি তখন শহরের ব্যস্ততার মধ্যে হারিয়ে যায়।

কাকতালীয়ভাবে সেবার যেতে হলো কী একটা কাজে বাঘমারার দিকে, আমার জন্য নির্ধারিত বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা তো আছেই, তো বিকেলের দিকে গেলাম খালপাড়ের বাজারে। ছবিদ একটা পাকা ঘর তুলে বেশ বড় একটা সাইনবোর্ড পর্যন্ত লাগিয়েছে। অনেকক্ষণ ধরে দেখলাম দোকানের বাইরের পরিবেশ, বাজারটা এখন অনেক বড় হয়েছে, ব্যস্ততা বেড়েছে সবার, কারও দিকে কারও তাকানোর ফুরসত নেই যেন। দোকানে ঢুকতেই ছবিদের সঙ্গে দেখা, হেসে বলল, অনেকদিন পরে এদিকে আসলেন, আপনার কথা ভাবি মাঝেমধ্যে, শরীর ভালো তো!

একটা চেয়ার এগিয়ে দিয়ে মুছে দিলো তারপর। ভালো করেছ তো দোকানটাকে…

-হ্যাঁ ব্যবসা যখন করতে বসেছি, জায়গাটুকু কিনে পাকা ঘর তুলে ফেললাম, মানুষজন এখন টুলে বসে আর কাটতে চায় না, শহরের মতো আর কি!

কথাটা শেষ করেই হাসতে থাকল। ছবিদের হাসি দেখে মনে বড় তৃপ্তি পেলাম, মানুষ সত্যিই মানুষ হতে চায়, আশপাশের পরিবেশ দেখে কেউ শেখে কেউ-বা এমনি এমনিই শিখে যায়। ছবিদ কিন্তু মানুষ হওয়ার যে প্রেরণা পেয়েছে, তার কোনো তুলনা হয় না। আমি এবার প্রশ্ন ছুড়ে দিলাম ওর দিকে- তা তুমি মিয়া এত চমৎকার একখানা দোকান দিলে আমাকে জানালে না, শহরে তো তোমার গ্রামের অনেক মানুষ যায় দিনরাত্রি, আমার বাড়িও তারা চেনে এবং যায়ও…

ছবিদ খানিক লজ্জা পেল মনে হলো। এরপর আর বেশি লজ্জা দিতে মন চাইল না। কিন্তু কথা হলো অনেকটা সময় ধরে। একসময় ছবিদ জানাল- আগের বউটাকে বললাম বাপের বাড়ি থেকে হাজার পঞ্চাশেক টাকা আনতে; কিন্তু সে আনল না। বলে কিনা বাপ আমার শয্যাগত কুষ্ঠরোগী কোথায় পাবে টাকা…

-তারপর কী করলে তুমি!

-দিলাম তাড়িয়ে, যা বাপের বাড়ি, কুষ্ঠরোগীর মেয়েকে নিয়ে কী করব, আরেকটা বিয়ে করলাম। তারপর নগদ সত্তর হাজার টাকা- সঙ্গে দিলো ঘরের এটা-সেটা…

কথা থেমে যায় আমার, কী বলব ভাবতে পারছি না। মানুষ সত্যিই অনেক পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে দিনকে দিন। পরিবর্তন হতে হতে মানুষ কি আবার বানরে রূপান্তরিত হবে! হয়তো হতে পারে, নয়তো মানুষ ডাইনোসর হবে, টিকটিকি হবে, আরশোলা হবে, মানুষ কিন্তু একদিন মানুষ থেকে হারিয়ে যাবে। সেদিন কি মানবতা থাকবে? হয়তো সভ্যতা থাকবে, সুন্দরের প্রতীক কবিতা থাকবে, ষোড়শী-অষ্টাদশীর হাসি থাকবে, নদীতে জোয়ার-ভাটার খেলা থাকবে, পাখির গান থাকবে; কিন্তু সবই হবে অন্যরকম। আবার প্রশ্ন করি- সেই টাকা দিয়ে তাহলে তুমি দোকানটা দিলে?

-দোকান আর হলো কোথায় দেখছেন, এরপর এলে দেখবেন আমার দোকানে এসি থাকবে। তখন আপনি আমার কাছে চুল কাটাবেন, দাড়ি-গোঁফ সেভ করাবেন বলে রাখছি।

-তাহলে ভালোই তোমার ইনকাম বলতেই হয়।

-তা কেন বলছেন, এই দোকান দেখে রক্ষিতপাড়ার সবেদালী ঘটক বলল, হাতে একটা মেয়ে আছে করবে নাকি, মোটা অঙ্কের টাকা পাইয়ে দেবো।

-তুমি কী বললে ঘটককে…

-হাতের লক্ষ্মী পায়ে ঠেলে, বলে দিলাম পাকা কথা, তুমি যদি লাখখানেক বাগাতে পারো তো তোমাকে দেবো দশের ওপর; আর যাওয়া-আসার খরচ-খরচা। কি ভালো বলিনি? আমি আবার কাউকে না দিয়ে একা একা ভোগ করি না, জানেন তো ভাই…

-এবারের মেয়ের বাড়িখানা কোথায়…

-তা কি বলতে পারি? শুভকাজের আগে ওসব ফিরিস্তি জানানো নিষেধ, শুধুমাত্র আপনি আমার নিজের লোক মনে করে বললাম, গ্রামের লোকে কেউই জানে না এসব তথ্য।

-বিয়ের পর তো জানবে।

-জানবে তখন, আকাশে চাঁদ উঠলে তো সবাই দেখে, নাকি? তবে শুনেছি এই মেয়েটা বড়লোকের মেয়ে হলেও দেখতে অতটা ভালো না। আরও সংবাদ পেয়েছি, মেয়েটি দূরসম্পর্কের মামা নাকি চাচার সঙ্গে পালিয়ে পেটে বাচ্চাও এনেছিল। বাপের টাকার জোরে তা আবার খালাস হয়ে গেছে… হে-হে-হে-হে-হে…

ছবিদের হাসি আর আমার সহ্য হলো না। কানে যেন কেউ সিসা ঢেলে দিচ্ছে, আমাকে এখন উঠতে হবে, এরপর আর কোনো কথা থাকতে পারে না। রাত নেমে এসেছে অনেক আগে। শিয়ালের চিৎকার ভেসে আসছে; সেইসঙ্গে গেরস্তবাড়ির কুকুরের ডাক, কুকুরের ডাক বড় বীভৎস লাগে, কেমন কেঁদে কেঁদে ডেকে মরছে দূরে কোথাও। ছবিদের কথাগুলো কানের মধ্যে বারবার ঘুরেফিরে আসে। দূরের হাটফেরা মানুষগুলো বাড়িমুখো এখন, কার সময় আছে ছবিদকে নিয়ে চিন্তা করার। জোনাকির মিটিমিটি আলোর ভেলায় চড়ে আমি হাঁটছি। গ্রাম এখন শহরের রূপ না পেলেও শহরের পথে হাঁটছে, শহর কোথায় যাবে, কোথায় গিয়ে মুখ লুকোবে!

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ৭:২০ অপরাহ্ণ | সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

মালতি

২৫ জুলাই ২০২০

 ফুটপাথ

৩০ জুলাই ২০২০

চন্দ্রাবলী

১৬ নভেম্বর ২০২০

বাটপার

১৩ আগস্ট ২০২০

সোনাদিঘি

১৪ জুলাই ২০২০

বিটলবণের স্বাদ

২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০

ফেরা

১৪ মার্চ ২০২০

জোছনায় কালো ছায়া

০৪ সেপ্টেম্বর ২০২০

রূপকথা

২৬ এপ্রিল ২০২০