ঘোষণা

তৃতীয়াং প্রকৃতিং গতঃ

উজ্জ্বল সামন্ত | সোমবার, ০৫ জুলাই ২০২১ | পড়া হয়েছে 76 বার

তৃতীয়াং প্রকৃতিং গতঃ

প্রত্যন্ত গ্রামে ভট্টাচার্য্য  পাড়ায় কমল ভট্টাচার্যের বাড়ির উঠানে চার জন দাঁড়িয়ে রয়েছে। রীতি অনুযায়ী বৃহন্নলার দল বাচ্চা কে নাচাতে বাড়িতে উপস্থিত। কথিত আছে ওদের আশীর্বাদ জীবনে মঙ্গল সাধন ও দীর্ঘায়ু করে। ফুটফুটে শিশুকন্যাটিকে কোলে নিয়ে নাচ গান শুরু করে। পেশায় পুরোহিত কমল বাবু মন্দির ও গ্রামের কিছু যজমানের বাড়িতে পূজা করেই কোনরকমে দিন চলে। বাড়িতে এক পুত্র ও এক মাসের কন্যা সন্তান।দলের মধ্যে বয়স্ক মাসি সুইটি (ওদের ছদ্মনাম) লক্ষ্য করে শিশুকন্যাটি স্বাভাবিক নয়। দৈহিক গঠনের ত্রুটি রয়েছে অর্থাৎ আগামী দিনে ওর নারীর তকমা লাগবে না। সমাজে অচ্ছুৎ থাকবে তাদের মতই । যখন ওর বয়স বাড়বে, বুঝতে শিখবে , সমাজের স্বাভাবিক জীবনে পা রাখবে না ও। হাসি ঠাট্টা, ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ প্রায় নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে যাবে তাদের মতই। কিন্তু কথাগুলো কী করে শিশু কন্যার মা বাবা কে বলবে? এইসব ভাবছেন ।

কিছুক্ষণ পর বলে আপনার মেয়েকে আমাদের সঙ্গে নিয়ে যাব। এই শুনে পুরোহিত পত্নী মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। কি বলছে এরা? কেনই বা বলছে? মেয়ে আমার ঘরের লক্ষী। সুইটি মাসি বুঝিয়ে বললে কান্নায় ভেঙে পড়ে শিশুকন্যা লক্ষ্মীর মা। লক্ষীর বাবার মাথায় হাত । ঘটনা জানাজানি হয়েছে, লক্ষ্মী কে তাদের কাছে রাখতে পারবেন না। সমাজ কোনদিন মেনে নেবে না । আর সমাজ অগ্রাহ্য করে যদি মেয়েকে নিজের কাছেও রাখেন, গাঁয়ের মোড়ল এক ঘরে করে দেবে।

অগত্যা নিরুপায় অসহায় বাবা চোখের জল মুছতে থাকে। শিশুকন্যাকে ওদের হাতে তুলে দিয়ে একটা কথাই বলেন, মাসি লক্ষ্মীকে তোমরা মায়ের মতোই আগলে রেখো আজীবন। ওর কপাল মন্দ তাই বাবা-মা থেকেও আজ থেকে অনাথের মতো থাকবে।

লক্ষী ওদের ছোট্ট বস্তিতে বড় হতে লাগল। পড়াশোনা কিছু শিখলো এনজিওর তত্ত্বাবধানে। রুটি রোজগারের জন্য একলা বা দল বেঁধে কখনো ট্রেনে প্যাসেঞ্জারদের কাছে হাততালি দিয়ে , মাথায় হাত ঠেকিয়ে আশীর্বাদ করে । আবার কখনো রাস্তার সিগনালে দাঁড়িয়ে টাকা তুলে জীবনে বেঁচে থাকার সংগ্রাম করতে করতে বস্তির ওই ছোট্ট স্যাঁতস্যাতে ঘরে হাঁপিয়ে উঠেছিল।

একদিন ট্রেনের এসি রিজার্ভেশন কামড়ায় টাকা তুলছে ।হঠাৎ সীটে বসা একজন সুদর্শন পুরুষ লক্ষ্মীর দিকে একদৃষ্টিতে চেয়ে থাকে। উনার সামনে হাত পাতলে একশ টাকা,ও একটি ভিজিটিং কার্ড বার করে দেয়। নাম লেখা ডক্টর অভিমুন্য চ্যাটার্জী। কখনো সময় পেলে এসো। বছর ১৮ লক্ষ্মী অবাক হল। কেন আস্তে বললেন উনি, মনে মনে ভাবছে, কিন্তু সময় কম পরের স্টেশনে নামতে হবে তাই যতটা সম্ভব টাকা তুলে পরের স্টেশনে নেমে পড়ে।

কিছুদিন যাওয়ার পর হঠাৎ লক্ষী একদিন ডক্টর অভিমুন্য চ্যাটার্জীর ক্লিনিকে উপস্থিত। রিসিপশনে গিয়ে ডক্টর সঙ্গে দেখা করার কথা জানালেন। রিসেপশনিস্ট বললেন একটু অপেক্ষা করুন উনি অপারেশন থিয়েটারে আছেন, দেরী হবে । ঘন্টাখানেক পর ডক্টর চ্যাটার্জি ওটি থেকে বের হয়ে চেম্বারে বসেন।

লক্ষ্মী ভেতরে ঢুকলে ডক্টর চ্যাটার্জি বসতে বলেন। লক্ষ্মী প্রশ্ন করেন সেদিন ট্রেনে আপনি আমাকে ভিজিটিং কার্ড দিয়ে দিয়েছিলেন ও দেখা করতে বলেছিলেন। কেন? আমি তো ঠিক বুঝতে পারিনি। এই এলাকায় কাজ ছিল, তাই ভাবলাম আপনার সঙ্গে দেখা করে যাই।বলুন কি বলবেন?

ডক্টর অভিমন্যু: লক্ষ্মী তোমার কি স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে ইচ্ছে করে না ?
লক্ষী কিছুটা অবাক হল, পরক্ষণে উত্তেজিত হয়ে ডাক্তারকে বললেন: আপনি কি আমাকে ব্যঙ্গ বিদ্রুপ করার জন্য দেখা করতে বলেছিলেন এখানে?

ডক্টর চ্যাটার্জি ওকে শান্ত হতে বললেন।
ডক্টর অভিমন্যু: আমি তোমাকে বুঝিয়ে বলছি। এখন মেডিকেল সায়েন্স অনেক উন্নতি করেছে। তোমার কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে। যদি রিপোর্ট আশানুরূপ হয় তাহলে একটা ব্যয়বহুল মেজর অপরেশন করে তোমাকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরানো অসম্ভব কিছু নয়। একটা চেষ্টা করা যেতেই পারে। তুমি কি রাজি?

লক্ষীর চোখ চকচক করে উঠলো। ডাক্তারবাবু যে কথাগুলো বলছেন যদি সত্যি হয়, তাহলে তার সমস্ত দুঃখ জ্বালা যন্ত্রণা দূর হবে। নারীত্ব! স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে।

লক্ষী জানালো তার আর্থিক ক্ষমতা নেই।
ডাক্তার বললেন তোমাকে এই বিষয়ে চিন্তা করতে হবে না। যদি রিপোর্টগুলো আশানুরূপ হয় , আমার বিদেশের বন্ধু প্রখ্যাত সার্জেন ডক্টর আলেক্সা ব্রাউন কে জানাবো । আশা করি ও রাজি হবে। তুমি টেস্টগুলো করিয়ে নাও । আমি বলে রেখেছি একটা পয়সাও লাগবে না।

লক্ষ্মী : দ্বিধাদ্বন্দ্ব মনে কিছুটা আশার আলো জ্বালিয়ে রাখল। টেস্টগুলো হলে, সাতদিন পর রিপোর্ট গুলো আশানুরূপ এল ।

ডক্টর চ্যাটার্জি : বললেন আগামী মাসে এই তারিখে আমার হসপিটালে ভর্তি হবে।

নির্দিষ্ট দিনে ডক্টর অ্যালেক্সা ও ডক্টর চ্যাটার্জি ও আরো কয়েকজন ডক্টরের সহায়তায় দীর্ঘ অস্ত্রোপচার করবেন। লক্ষ্মীর ব্লাড গ্রুপ রেয়ার। ও নেগেটিভ। ডক্টর চ্যাটার্জি আগেই জানতেন। তাই ব্লাড ব্যাংকে ফোন করে দুই বোতল রক্ত আনিয়ে রেখেছিলেন। অপারেশনের সময় অত্যধিক রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। ডক্টর চ্যাটার্জি নিজেও এক বোতল রক্ত দান করেছিলেন কারণ তার ব্লাগ গ্রুপও ও নেগেটিভ ।

চার ঘণ্টার দীর্ঘ অপারেশনের পর পেশেন্ট কে বেডে দেওয়া হল। মোটামুটি অপারেশন সাকসেসফুল কিন্তু রিপোর্ট যতক্ষণ না আসছে ততক্ষণ নিশ্চিত হতে পারছেন না।

দুই দিন পর জ্ঞান ফিরেছে লক্ষীর।
ডক্টর চ্যাটার্জি হাসিমুখে সামনে দাঁড়িয়ে জানালো , আপনার অপারেশন সাকসেসফুল। লক্ষী এখন সম্পূর্ণা নারী। কথাগুলো যেন অমৃতের মতো শোনালো লক্ষীর কানে। উৎকণ্ঠা যেন কোথায় ধুলোয় মিশে গেছে। আনন্দে চোখ দিয়ে কয়েক ফোঁটা জল গড়িয়ে পরলো। কোন ভাষায় আর কিভাবে ডক্টর চ্যাটার্জিকে ধন্যবাদ জানাবে ভাবছে। বেড থেকে উঠতে গেল।

অভিমুন্য: আরে ,আরে, কি করছেন?

এখন আপনি রেস্ট দিন।‌ মেডিকেল টেস্ট করে রিপোর্ট ভালো হলে দিন দশ পরে আপনার ছুটি হবে। ভাল থাকুন ,সুস্থ থাকুন।

লক্ষ্মী উত্তরে বলল: ভালো থাকার পথ আপনিই করে দিয়েছেন। এই মুহূর্তে আপনি আমার কাছে ঈশ্বর, যাকে আমি চাক্ষুষ করছি।

মৃদু হেসে ডক্টর চ্যাটার্জি বললেন: এবার আমি রাউন্ডে যাব অন্য পেশেন্টদের দেখতে ।

তারপর দিন মাসিরা দেখতে এলো। সবাই কি খুশি । আনন্দে ওদের চোখের জল আর ধরে না। সবাই একটা কথাই ভাবছে ডাক্তারবাবু কেন লক্ষ্মীর জন্য এতটা করলেন। আজকের দিনে নিজের আপনজনরা যেখানে দেখে না , সেখানে সম্পূর্ণ অপরিচিত বৃহন্নলা কে নারীত্ব দিলেন ডাক্তার বাবু।এ যেন অকল্পনীয়। আমাদের এই জীবন থেকে একজন তো মুক্তি পেল। প্রকৃতপক্ষে জীবনে মানুষ হিসেবে বাঁচার , মুক্তির স্বাদ পাবে লক্ষী। লক্ষী কে প্রশ্ন করল, কিরে লক্ষী ডাক্তারবাবু কি তোকে ভালোবাসে?

লক্ষী শ্রদ্ধার স্বরে বলল : মানুষকে ভালোবেসে কাছে পাওয়া যায়, কিন্তু আমি অত পুণ্য করিনি যে, ঈশ্বরের দূত কে ভালোবেসে কাছে পাব । মাসিরা দুই হাত দিয়ে আশীর্বাদ করতে লাগলেন লক্ষ্মী কে।

লক্ষ্মীর ছুটি হলে ডাক্তারবাবু বললেন, এখন কোথায় যাবে লক্ষী? কোথায় থাকবে, কিভাবে বাঁচবে, কিছু ঠিক করেছ?
ডক্টর চ্যাটার্জির প্রশ্নে লক্ষী থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে। সত্যিই তো ডাক্তারবাবু ঠিক কথাই বলেছেন। এখন তো আর ও পুরোনো জায়গায় ফিরে যেতে পারবে না ।

ডক্টর চ্যাটার্জি বললেন সে ব্যবস্থাও আমি করে দেব যদি তুমি রাজি থাকো। আমার এখানে হসপিটালে তুমি রোগীদের দেখাশোনার কাজ মানে আয়া থাকবে। যদি পড়াশুনা করতে চাও সে ব্যবস্থা আমি করে দেব । আমার একটি এনজিও সংস্থাও আছে। যদি তুমি নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাও, নিজে স্বাধীনভাবে বাঁচতে চাও। ভবিষ্যৎ যাতে কারো মুখাপেক্ষী হয়ে বাঁচতে না হয়। রাজি আছি?

পরেরদিন রাউন্ডে রোগী দেখতে গিয়ে ডক্টর চ্যাটার্জি দেখলেন সাদা শাড়ী পরে লক্ষ্মী দাঁড়িয়ে আছে পেশেন্টের বেডের পাশে।

লক্ষ্মী সহসা ডাক্তারবাবুর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে হাতটা মাথায় ঠেকালো।

ডক্টর চ্যাটার্জি কিছুটা লজ্জিত হয়ে, আরে কি করছো কি লক্ষী?
এটা হসপিটাল। এসব কোরো না, মানুষ মানুষের জন্য। আমি একজন সাধারণ মানুষ, এটাই আমার কাজ…

 

 

 

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ৮:২১ অপরাহ্ণ | সোমবার, ০৫ জুলাই ২০২১

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

নীরব-নিথর অবয়ব

১৩ সেপ্টেম্বর ২০২১

চন্দ্রাবলী

১৬ নভেম্বর ২০২০

অনুগল্পঃ মানুষ

১০ ডিসেম্বর ২০২০

এডুকেশন

২৩ ডিসেম্বর ২০২০

চারাগাছ

২৬ জানুয়ারি ২০২১

স্বর্গ থেকে বিদায়

০৯ ডিসেম্বর ২০২০

কারিগর

২৪ জানুয়ারি ২০২১

বাটপার

১৩ আগস্ট ২০২০

নিশি মানব

২৫ জুন ২০২১

মালতি

২৫ জুলাই ২০২০