ঘোষণা

কেন এমন হলো

শুভ্রা সাহা | শনিবার, ১০ জুলাই ২০২১ | পড়া হয়েছে 70 বার

কেন এমন হলো

রিয়া আজ নির্বাক, হতভম্ব। ঘরের কেউ আর আগের মতো স্বাভাবিক নেই। মা বাবাও ভাবতে পারেনি এরকম একটা ঘটন ঘটে যাবে। রিয়া তো কিছুতেই ভাবতে পারছে না এ করুণ পরিণতির জন্য দায়ী ও নিজে। রিয়া ঘরের চার পাশটায় চোখ বুলায়, ভালোবাসার স্মৃতি চিহ্ন গুলো তো এখনো এদিক-ওদিক ছড়িয়ে আছে। খাটের উপর নকশি কাঁথা টাও। এই সত্তরোর্ধ বয়সে কি সুন্দর করে সেলাই করে ঠাকুমা। কতজন যে প্রশংসা করেছে। এত সুন্দর সেলাই নাকি কেউ দেখেনি।

পাশের বাড়ির বিল্টুর মা ঠাকুমা বনানী দেবীকে বলতো, – মাসীমা আপনার হাতের সেলাই করা ওই কাঁথা সীমান্ত হাঁটে চার হাজার টাকায় বিক্রি হবে। আমি ওখান থেকে দুই হাজার টাকায় যে কাঁথাটা কিনেছি সেটা আপনারটার কাছে কিচ্ছু না। বৃদ্ধা বনানী দেবী মৃদু হেসে বলেন, – এটাতো আমার শখ, আগে তো অনেক করতাম। স্কুলের অফ পিরিয়ডে বেশি হতো এসব। ক্যলিগসরা তো আমাকে ছেঁকে ধরত। কেউ বলত, বনানীদি আমার এ এই সেলাইটা একটু দেখতো। কেউ আবার বলত, – আমার বাচ্চার সোয়েটারটা একটু দেখে দাও না। একটু ঠিক করে দাও না গো।

সে এক জীবন গেছে। সেটা আর ফিরে পাবো না। তাছাড়া রিটায়ারমেন্ট এর পর ঘরে বসে বসেও কম করিনি সেলাই। এখন তো বয়স হয়ে গেছে। চোখে কম দেখি। সূঁচ সুতো ধরলেই খোকা রাগ করে। তাই ভয়েও করিনা।
বিল্টুর মা বলে, – সেলাই কম করলে কি হবে মাসিমা, আপনি তো একটা দারুণ কাজ করেন। রিয়াকে পড়ান।
মৃদু হেসে ঠাকুমা কেমন রিয়ার দিকে মিটিমিটি করে তাকায়। গর্বে যেন রিয়ার বুকটা তখন ফুলে উঠত। ঠাকুমাকে ধরে চুমু খেত।
রিয়ার মা মল্লিকা দেবী কলেজের শিক্ষিকা। বাবা অপরেশ বাবু ইঞ্জিনিয়ার। ওরা নিজেরা চাকরি করে দিনের শেষে পরিশ্রান্ত থাকে। অবশ্য এখন বেশির ভাগ ঘরেই থাকে। মা ঘর থেকেই অনলাইনে ক্লাস করে। বাবা অনেক মিটিং ঘর থেকে ভার্চুয়ালি করে। অনেক সময় বেরও হয়। রিয়াও অনলাইনে ক্লাস করে। ঠাকুমা মোবাইল খুলে প্রতিলিপিতে গল্প পড়ে। অনেক সময় লেখেও। ঠাকুমার দুটো ছোট গল্পের বইও প্রকাশ হয়েছে।

ঘরের সবাই যখন অন্তর্জালে ব্যস্ত তখন রিয়ার মনে হত ওদের ঘরটা গোগুল হাব হয়ে গেছে। রিয়ার তো সেই ছোটবেলা থেকেই ঠাকুমার আঁচল ধরে দিনের শুরু। আর লেখাপড়ার হাতখড়ি তো বলতে গেলে ঠাকুমার হাত ধরেই। মুখে মুখে ছড়া শেখা থেকে শুরু করে রামায়ণ-মহাভারত পুরাণের গল্প বলা, তাছাড়া ঠাকুরমার ঝুলির সব গল্পই রিয়ার মুখস্থ। গরগর করে আজও বলে দিতে পারে সে সব। সবই তো ঠাকুমার মুখ থেকে শোনা। স্কুলের পড়া তো ঠাকুমা না হলে শেখাই হতো না রিয়ার। গত বছর ঠাকুমার অপারেশন হয়ে গেল চেন্নাইতে। মা-বাবা ঠাকুমাকে খুব সাবধানে এই অতিমারির দিনগুলোতে থাকতে বলতো । একদম আলাদা ঘরে। সেখানে কেউ আসতো না যখন তখন, শুধু চতুর্দ্শ বর্ষীয়া রিয়া ছাড়া। কারণ রিয়া ঠাকুরমা ছাড়া থাকতেই পারে না।

আজ রিয়ার মনে হচ্ছে কেউ যেন ওর বুকের উপর ভারী একটা পাথর চাপা দিয়ে রেখেছে। কথা বলতেই যেন ভয় হয়, পাথর টা একটু নড়লেই বুকটা টনটন করে ব্যথা করে উঠছে। ও ঘরে মা-বাবা ফোনে ব্যস্ত। কতজন যে সকাল থেকে ফোন করেই যাচ্ছে তার ইয়ত্তা নেই। নবম শ্রেণীতে পড়ুয়া রিয়ার এখন আর ঐ বই গুলোর দিকে তাকাতে ইচ্ছা করে না । বিশেষ করে হিউম্যানিটিস গ্রুপটা সবচেয়ে বেশি কঠিন লাগতো। আর ঠাকুমাই সেই সমস্যার সমাধান করে দেয়। সব পড়াগুলোকে কেমন মুখে মুখে গল্পের মত শিখিয়ে দেয়। তবে সাইন্স গ্রুপটা ঠাকুমা পড়াতো না। সেটার জন্যই তো শুধু তপন স্যারের কাছে যাওয়া। তাও সপ্তাহে দুদিন, নিজেদের সেনিটাইজ করা গাড়িতে করে।

এইতো মাত্র কিছুদিন আগের কথা, ঠাকুরমা কেমন ঠেসে নাক-মুখ ঢেকে মাক্স টা পরিয়ে দিয়েছিল তপন স্যারের বাড়িতে যাওয়ার আগে। তারপর থেকে তো লকডাউন পড়ে গেল আর কোথাও যাওয়া হয়নি। এখনো রিয়ার স্পষ্ট মনে আছে, মাক্সটা সারা রাস্তায় ঠিকই ছিল। স্যারের বাড়িতেও বরাবরের মত মাস্কটা চিবুকেই ঝুলানো ছিল। তবে এত জনের মধ্যে কার যে সেই ভয়ানক রোগটা ছিল সেদিন। তার দুদিন পর থেকেই তো –।

ঠাকুমা আমাকে প্যারাসিটামল গরম জল দিয়ে দুদিনেই সারিয়ে তুলেছিল। নিজেও খেয়ে নিয়েছে। নিজের কাছে শুইয়ে কতো আদর করে বলল, – আমাদের রাজকন্যার কিচ্ছুটি হবে না। তারপর দুদিন তো সব ঠিকই ছিল। হঠাৎ রাতে ঠাকুমার শ্বাসকষ্ট আরম্ভ হলো। তাড়াতাড়ি বাবা-মা ঠাকুমাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলেন। ঠাকুরমা পজেটিভ। পরদিনই ঠাকুমা চলে গেলেন। মা বাবাও ঘরবন্দি। রিয়ার বুকের ভেতরটা যেন আবার টনটন করে ব্যথা করে ওঠে। আর দুচোখ বেয়ে জলের ধারা নেমে আসে।

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ৩:০০ অপরাহ্ণ | শনিবার, ১০ জুলাই ২০২১

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

চন্দ্রাবলী

১৬ নভেম্বর ২০২০

এডুকেশন

২৩ ডিসেম্বর ২০২০

অনুগল্পঃ মানুষ

১০ ডিসেম্বর ২০২০

চারাগাছ

২৬ জানুয়ারি ২০২১

কারিগর

২৪ জানুয়ারি ২০২১

স্বর্গ থেকে বিদায়

০৯ ডিসেম্বর ২০২০

বাটপার

১৩ আগস্ট ২০২০

নিশি মানব

২৫ জুন ২০২১

মালতি

২৫ জুলাই ২০২০

 ফুটপাথ

৩০ জুলাই ২০২০

অলিভিয়া

০৭ এপ্রিল ২০২১