ঘোষণা

ঘুঙুরের শব্দ

পি আর প্ল্যাসিড | রবিবার, ১১ জুলাই ২০২১ | পড়া হয়েছে 84 বার

ঘুঙুরের শব্দ

জয়ন্তদের পাশের ফ্ল্যাটে নতুন ভাড়াটিয়া এসেছে। এখবর জয়ন্ত এখনো জানে না।পাশের ফ্ল্যাট খালি হবার পর থেকে জয়ন্ত মনে মনে ভেবে রেখেছে দারোয়ানকে দিয়ে নতুন ভাড়াটিয়া আসার আগেই তাদের সম্পর্কে বিস্তারিত খোঁজ খবর নিবে। এজন্য দরকার হলে আলাদা কিছু বকশিস দেওয়া হবে তাকে। জয়ন্ত হঠাৎ করেই দারোয়ানের সাথে আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে। সময় সময় কিছু বকশিসও দেয়। কিন্তু কিছু বলে না। বাইরে থেকে ঘরে ফেরার সময় পকেটে হাত ঢুকিয়ে দশ – বিশ টাকার নোট যা-ই থাকে তাই দেয় দারোয়ানকে। প্রথম দিকে দারোয়ান বিষয়টি বুঝতে পারেনি কেনো তাকে এই বকশিস দেওয়া হচ্ছে। এরপর যখন হঠাৎ এই পরিবর্তনের কারণ জানতে চাইলে জয়ন্ত তাকে হাল্কা করে বলে। কিন্তু নতুন ভাড়াটিয়া সম্পর্কে জয়ন্তর এতো বেশি আগ্রহ কেনো, সেটাও সে বুঝতে পারে না।

একদিন বাইরে থেকে আসার সময় জয়ন্ত দারোয়ানকে দিয়ে দুইটি সফট ড্রিংক কিনিয়ে আনায়। এসময় সে দারোয়ানের টুলেই বসে অপেক্ষা করছিলো। দারোয়ান ফিরে আসলে একটা ড্রিংকের বোতল তাকে খেতে দিয়ে আরেকটা সেখানে বসেই জয়ন্ত খায়। এসময় খেতে খেতে জয়ন্ত দারোয়ানকে বলে, আমাদের পাশে নতুন যারা ভাড়া নিতে আসবে তাদের বিস্তারিত আমাকে জানাতে হবে। আর খেয়াল রাখতে হবে, পরিবারের সদস্যদের মধ্যে দুই একজন যেন স্কুল কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে এমন মেয়ে থাকে। বুঝিস তো বাসায় আমার প্রায় সময় একা থাকতে হয়, এতে সময় কাটে না। বাবা মা বেশির ভাগ সময় থাকে বাইরে।

ঘরের সাথে ঘরে পছন্দের কেউ থাকলে আমার আর বাইরে থাকতে হবে না। বাবা মা মনে করবে আমি তাদের লক্ষ্মী ছেলে। সবসময় ঘরে থাকি। বিষয়টি সে দারোয়ানকে এমন ভাবে বুঝিয়েছে যে, এর পর থেকে নতুন কেউ ভাড়ার জন্য ঘর দেখতে আসলে খোঁজ খবর নেয় পরিবারে কে কে আছে। যখন শোনে পরিবারে বড় কোন মেয়ে নেই তখনই তাদের বলে দেয় বাড়ি ভাড়া হয়ে গেছে। আর যখন শোনে বড় মেয়ে আছে তখন নিজেই ভাড়া সম্পর্কে আলাপ করে চূড়ান্ত পর্যায় বাড়িওয়ালার সাথে দেখা করানোর ব্যবস্থা করে।

এর মধ্যে একটি পরিবারের সাথে ঘর ভাড়া নেবার বিষয় সব আলোচনা চূড়ান্ত করে। সব চূড়ান্ত করার আগে জয়ন্তকে বিষয়টি বলার জন্য অনেক খুঁজেছে দাড়োয়ান। সেই সময় তার ব্যক্তিগত কাজে দেশের বাইরে ভারত গিয়েছিল দুই সপ্তাহের জন্য। কিন্তু তাড়াহুড়া করে আসতে গিয়ে দারোয়ানকে আর বলে যাবার সময় পায়নি। বিধায় তাকে অনেক খুঁজেছে। জানলে হয়তো দিনে রাতে বারবার বাসায় গিয়ে নক করে খুঁজতো না। বাসারও কেউ তাকে আর বলেনি জয়ন্ত যে দেশে নেই। বাসায় খোঁজ নিতে গেলে শুধু বলা হতো সে বাসায় নেই। আর দারোয়ান এই কথা শোনার পর উপর থেকে নিচে নেমে আসতো, বাইরে থেকে আসার সময় দেখা করবে মনে করে।

এর মধ্যে জয়ন্তদের পাশের ফ্ল্যাট ভাড়া হয়ে যায়। নতুন ভাড়াটিয়াও চলে আসে। নতুন ভাড়িটিয়া নতুন ফ্ল্যাটে এসে তাদের মতো তারা তাদের জীবন যাত্রা স্বাভাবিক করে নেয়। প্রথম একদিন কি দুইদিন বাড়ির অন্যান্য ফ্ল্যাটে গিয়ে নতুন যারা এসছে তারা মিষ্টি নিয়ে গিয়ে পরিচিত হয়। সবার সাথে মিলে থাকার পরিকল্পনায় তারা উদার হতে এভাবে মিষ্টি দিয়ে শুরু করে। পরিবারের সদস্য স্বামী-স্ত্রী আর বড় দুই মেয়ে। ঘরে তাদের বড় দুই মেয়ে থাকায় প্রতিটি ফ্ল্যাটে গিয়ে পরিচিত হয়ে অন্য ফ্ল্যাটের সদস্যদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করে তারা।

জয়ন্তদের ঘর পাশে থাকায় তাদের ঘরেই আসে ওরা প্রথম। জয়ন্তর অবর্তমানে পাশের ফ্ল্যাটে আসা পরিবারের দুই মেয়ে আর তাদের মা এসে মিষ্টি দিয়ে জয়ন্তর মায়ের সাথে পরিচিত হয়। তখনই জানতে পারে তাদের পরিবারে দুই ছেলে। বড় ছেলে থাকে কানাডা, সেখানে পড়ালেখা করছে আর ছোট ছেলে ঢাকার একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে।
পাশের ফ্ল্যাটে ভাড়া আসা পরিবারে তাদের দুই মেয়ের নাম জয়া এবং মেঘা। একজন কলেজ ছাত্রী অন্য জন বিশ্ববিদ্যালয়ের। তাদের এক বোন নাচ শিখে অপর জন শিখে গান। দু’জনই ছায়ানটের ছাত্রী। সবকিছু জয়ন্তর মাকে বলে তাদের বাসায় ছেলেকে নিয়ে বেড়াতে আসার আমন্ত্রণ জানিয়ে যান
। এর মধ্যে জয়ন্ত তার কাজ শেষ করে দেশে ফিরে আসে। আসার প্রথম দিনই ক্লান্ত হয়ে ঘরে এসে ঘুমুচ্ছিলো। তখন পর্যন্ত সে জানে না তাদের পাশের ফ্ল্যাট ভাড়া হয়ে যাবার কথা। দারোয়ানের সাথে বাড়িতে ঢোকার মূহুর্তে দেখা হয়নি তার, আর দেখা না হওয়ায় জানতে পারেনি তাদের পাশের ফ্ল্যাট ভাড়া হবার কথা। ঘরে এসে যখন ঘুমুচ্ছিল তখন আশ পাশ থেকে জয়ন্ত ঘুঙুরের শব্দ শুনতে পায়। সাথে হালকা আমেজের রবীন্দ্র সঙ্গীতের মিউজিক কানে ভেসে আসে। ঘুম ঘুম ভাব নিয়ে সে কান খাড়া করে শোনার চেষ্টা করে কোথা থেকে আসছে এই অসময়ে ঘুঙুরের শব্দ।

এক সময় আর বিষয়টি উদঘাটন না করে থাকতে পারছিলো না তাই বিছানা ছেড়ে তাদের বারান্দায় যায়। গিয়ে শোনে তার এই ঘুঙুরের শব্দের উৎস। বারান্দায় যাবার আগেই সে তাদের পাশের ফ্ল্যাটের বারান্দায় মেয়েদের কাপড় ঝুলতে দেখে বুঝতে পারে পাশের ফ্ল্যাটে যে নতুন ভাড়াটিয়া এসেছে।এসময় আরো ফ্রি হয়ে বারান্দার গ্রিল ধরে পাশের ফ্ল্যাটে চোখ রাখতেই দেখে একটি মেয়ে ঘরে নাচ প্র্যাকটিস করছে। সামনে বিশাল বড় ড্রেসিং টেবিল। টেবিল জুড়ে আয়না। সেই আয়নাতেই জয়ন্ত দেখতে পায় বড় এক মেয়ে নাচছে। তার পরনে নীল শাড়ি দিয়ে তৈরি করা নাচের ড্রেস। মেয়েটি আয়নার সামনে নিজেকে দেখে দেখে নাচ প্র্যাকটিস করলেও নাচের কারণে সে মিউজিকের সাথে মিল রেখে বারান্দার দিকে মুখ করে ঘুরে তাকায়। তখনই চোখে পড়ে তার জয়ন্তকে। আর জয়ন্ত তো সারাক্ষণ তাকিয়েই আছে।

একসময় মেয়েটি নাচ থামিয়ে বাইরে জয়ন্তের দিকে তাকায়। তাকিয়ে ভাবে তার ঘরের জানালা বন্ধ করে দিবে নাকি খোলাই রাখবে। ভাবতেই মাথায় আসে নাচ তো সে মানুষকে দেখানোর জন্যই শিখছে। পাশের বাসার কেউ দেখলে তার আপত্তি থাকার কিছু নেই। তাই জানালা বন্ধ না করে বরং কিছুটা সময় রিলাক্স করার জন্য ফ্যানের নিচে হাত উচু করে দাঁড়ায়। এসময় জয়ন্তের চোখে চোখ পড়লে মেয়েটি মুখ খুলে হাসে।

জয়ন্ত মেয়েটির দিক থেকে চোখ আর সরায় না। তার চোখে অপূর্ব লাগে মেয়েটিকে। হাসিতে যেন মুক্তো ঝরে। দাঁত গুলো ডায়মন্ডের মতো ঝিলিক দেয়। ডান দিকে উপরের পাটির একটি দাঁত তার বাঁকা। সেই বাঁকা দাঁতই যেন তার মুখের হাসিকে পরিপূর্ণতা পাইয়ে দিয়েছে। মুখ বড়, দুই দিকে ছড়িয়ে আছে। চোখ বড় হলেও নাচ প্র্যাকটিস করার ক্লান্তিতে ছোট হয়ে আসছিল তার দু’চোখ। গলা থেকে বুকের অনেকটা জায়গা ধূঁ ধূঁ করছে যেন সমুদ্র সৈকতে বালির খেলা দেখছে সেখানে সে। নাক বড়, কানটাও বেশ বড় অথচ শরীরের সাথে অসামঞ্জস্য মনে হয়না কিছুই। চুল তার লম্বা, ঘন কালো।

মেয়েটিকে দেখার পর ইচ্ছে হয় তার মাকে দৌড়ে গিয়ে বলতে, তার ভিতর যে কেমন অস্থির লাগছে। বাসার আশে পাশে যেন কোন পরি দেখেছে সে। কিন্তু তার মাকে বললে হয়তো শুরুতেই ছেলের পাগলামি ধরে ফেলবে। পরে শেষে বারান্দায় আসা নিয়ে কথা বলতে পারেন। তাই কিছুই আর বলে না জয়ন্ত তার মাকে। কিছু সময় সেখানে দাঁড়িয়ে থেকে জয়ন্ত আবার তার রুমে ফিরে যায়। গিয়ে ভাবতে থাকে, এটাকেই কি মানুষ বলে চোখ জুড়ানো বা সুন্দরী দেখে চোখ ধন্য হওয়া?

বিছানায় শুয়ে তার ঘরে রাখা কাঠের বড়ো আলমারিতে লাগানো আয়নার দিকে তাকিয়ে সে তার চেহারার উপর পাশের ফ্ল্যাটের মেয়েটিকে কল্পনা করে।এসময় আবার সেই ঘুঙুরের শব্দ শুনতে পায় জয়ন্ত। ঘুঙুরের শব্দ কানে আসলে সে আর বিছানায় স্থির থাকতে পারে না। মনে মনে কল্পনা করে পাশের ফ্ল্যাটের সেই হাসি মাখা মুখের মেয়েটির চেহারার কথা। ভাবতে ভাবতে এক সময় নেশার ঘোরে ঘুমিয়ে যায় জয়ন্ত।

 

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ১২:০১ অপরাহ্ণ | রবিবার, ১১ জুলাই ২০২১

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

চন্দ্রাবলী

১৬ নভেম্বর ২০২০

এডুকেশন

২৩ ডিসেম্বর ২০২০

অনুগল্পঃ মানুষ

১০ ডিসেম্বর ২০২০

চারাগাছ

২৬ জানুয়ারি ২০২১

কারিগর

২৪ জানুয়ারি ২০২১

স্বর্গ থেকে বিদায়

০৯ ডিসেম্বর ২০২০

বাটপার

১৩ আগস্ট ২০২০

নিশি মানব

২৫ জুন ২০২১

মালতি

২৫ জুলাই ২০২০

 ফুটপাথ

৩০ জুলাই ২০২০

অলিভিয়া

০৭ এপ্রিল ২০২১