ঘোষণা

সামান্য ঘষামাজা

বাসব রায় | রবিবার, ১১ জুলাই ২০২১ | পড়া হয়েছে 125 বার

সামান্য ঘষামাজা

-আচ্ছা তোমার চাকরির আর কতদিন ?
– চার/পাঁচ বছর হবে
– কতগুলো টাকা পাবে ?
– জানি না
– চল্লিশ পঞ্চাশ তো হবেই
– তো
– এটুকু তো মেয়ের বিয়ে দিতেই যাবে ৷ ভাবছি চাকরি শেষে তুমি কী করবে -!
– একটা বিয়ে করবো
ব্যাস্‌ এবার হলো —–
এতক্ষণ আমি একটাকিছু লিখবার প্লট তৈরি করছিলাম ৷ এরমাঝেই এসব উল্টোপাল্টা প্রশ্নে আমি জর্জরিত ৷ জবাব দিতে দিতে হাঁপিয়ে উঠেছি ৷ একটার পর একটা প্রশ্ন সিরিয়াল কিলার ঢঙ্-এ ৷ শুরু হলো গ্রিক ট্রাজেডির এপিক থেকে ইলিয়াড বচন——–

– বিয়ে তো করবেই , জানি আমি ৷ বুড়ো ঢ্যামনা এখনও বিয়ের শখ যায় না ৷ মেয়ের বিয়ে নিয়ে ভাবনা-চিন্তা নেই ৷ উনি করবেন বিয়ে ৷ তো কমবয়েসি দেখেই করিও ৷ চাকুরি শেষের টাকাটা ওই হারামজাদীকে দিয়ো আর আমরা কীভাবে চলি , চলি – ৷ কণ্ঠস্বর ক্রমশঃ শয়নকক্ষ ভেদ করে পাশের বাড়ি এবং অতঃপর পড়শীদের পর্যন্ত না পৌঁছানো অব্দি যে থামবে না পূর্ব অভিজ্ঞতা আমার তাই বলে – ৷ লেখালেখির মুডটাই দিলো নষ্ট করে ৷ আমি ততোধিক নীরব এবং সংযমী হয়ে বাইরে যাওয়ার আয়োজন করছিলাম ৷ এমন সময়ে আমার কলেজ পড়ুয়া ছেলে-মেয়েকে ডেকে এনে আমার বিবাহ করার খায়েশ সম্পর্কে বিস্তারিত দিক তুলে ধরতে লাগলেন ৷ আমি বড় অসহায় বোধ করছিলাম ৷ কি কথায় কী কথা -!

চিল্লাচিল্লি যথারীতি সি-সার্ভের র্সা পেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম ৷ ছেলেমেয়েরা মাকে থামাতে পারছে না ৷ ওরা আমার এমন নিঃস্ব এবং অসহায় পরিস্থিতি সম্পর্কে বরাবরই ওয়াকিবহাল ৷ সেজন্যই ওদের মাকে থামতে অনুরোধ করছে কিন্তু কে শোনে কার কথা -৷ মনমানসিকতা এতোটাই খারাপ হলো যে , ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করতে ইচ্ছে করলো ,” হা ঈশ্বর ! তুমি আমাকে এখনই পজেটিভ করে দাও -; আর পারা যায় না ৷ ” ঈশ্বরের কানে হতভাগার আকুল আবেদন পৌঁছালো কিনা বুঝতে পারলাম না , কিন্তু একটা অনিশ্চিত ভালোলাগা কাজ করলো – যদি ঈশ্বর সত্যিই মঞ্জুর করেন আমার আবেদন ৷

সদর্পে বের হয়ে চললাম লকডাউন দেখতে ৷ ইচ্ছেটা এমন যে , পুলিশের লাঠির মার এমনভাবে খাই যেনো আজকের সান্ধ্যকালীন কষ্টটা অন্ততঃ ভুলে থাকা যায় ৷ কিন্তু পুলিশ আর প্রশাসনের গাড়ি আমাকে ক্রস করে উল্টোদিকে চলে গেলো ৷ ইচ্ছে করেই মাস্কটাস্ক সাথে নিইনি ৷ মরণপণ প্রতিজ্ঞা আজ আমার জীবনে সর্বোচ্চ খারাপটাই যেন আজ হয় ৷ কিন্তু পুলিশের গাড়ি দিব্যি চলে গেলো -৷

ঢুকলাম রাধা বাবুর চায়ের দোকানে ৷ লকডাউনে প্রশাসনের ভয়ে ছোট্ট একটা ফাঁক দিয়ে কোনমতে ভেতরে ঢুকে চা খাওয়া যায় ৷ যেকোনো সময় প্রশাসনের লোক আসতে পারে তাই সাবধানী ব্যবস্থা ৷ একটা কোণে বসে চা খাচ্ছি ৷ মনের ভেতর পারিবারিক ঝড় যেনো আরও বৃদ্ধি পেতে লাগলো – ৷ এখানে এমুহূর্তেই পুলিশ আসুক এবং আমাকে জেল-জরিমানা সহ বেধড়ক পিটুক ৷ হাসতে হাসতে আমি কারাবরণ করতে পারবো – ৷ অন্ততঃ তেজস্ক্রিয় ছড়ানো ভাষণের সামনে আর দাঁড়াব না কোনদিন ৷ বড় বিপজ্জনক হলো পুলিশের গাড়ির “প”-টারও দেখা নেই – ৷

বিগড়ানো মেজাজ নিয়ে রাত প্রায় দশটা নাগাদ বাসায় ফিরলাম ৷ সমন্বিত বোর্ডের প্রশ্ননির্বাচনের মাননীয় চেয়ারম্যান শুয়ে শুয়ে সিরিয়াল দেখছেন ৷ আমিও খুব গুরুগম্ভীর ভাব নিয়ে ফ্রেস হয়ে মোবাইল নিয়ে পাশেই শুয়ে পড়লাম আর বললাম আজ রাতে খাওয়ার ইচ্ছে মোটেই নেই , শরীরটা বেশ খারাপ ৷ এসব কথার প্রতিত্তোর হলো না দেখে অবাকই হলাম – ৷ কখনও কখনও বিরূপ পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি না ঘটলে খাপছাড়া লাগে বৈকি ৷ মনে হয় যাত্রাপালার শেষটা যুতসইভাবে হলো না ৷ যাহোক , শুয়ে পড়লাম উল্টোমুখো হয়ে – ৷ আমি যথারীতি মোবাইলে বিজি আছি – ৷ কিন্তু আধাঘন্টার মধ্যেই অনুভব করলাম শরীরটা বেশ জ্বর-জ্বর লাগছে ৷ রেগুলেটরের শেষ অব্দি ঘুরানো চাকার ফ্যানটা শরীর যেন মেনে নিতে পারছে না ৷ বেশ বুঝতে পারছি সান্ধ্যকালীন পজেটিভের প্রার্থনা এতক্ষণে ঈশ্বর মঞ্জুর করা শুরু করেছেন ৷

আমি খুব স্বাভাবিক আছি যেন আমার কিছুই হয়নি ৷ কিছুতেই যেন কারো শরীরের কোনো একটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গের টাচ না হয় সেভাবেই শুয়ে পড়েছি ৷ ইতিমধ্যেই মোবাইল রেখে ঘুমানোর চেষ্টা করছি ৷ ভাবছি সত্যিই যদি পজেটিভ হয় তাহলে আমাকে এদের থেকে দূরত্বে থাকা দরকার কিন্তু এসব বলতেও পারছি না ৷ একটা নাপা জাতীয় ট্যাবলেট খেয়েছি কিন্তু কাজ হচ্ছে বলে মনে হচ্ছিল না ৷ একই খাটে আর কতোটা দূরত্ব মানা যায় ৷ আমার গায়ে ওনার হাত না পা পড়লো আর অমনি সচিৎকারে ” তোমার গায়ে তো জ্বর , এতক্ষণ বলোনি কেনো – ! আমি তো খেয়ালই করিনি ; ভাবলাম রেগে আছো তাই হয়তো খেলে না বা কথা বলছো না ! হায় হায় — এখন আমার কী হবে !! জ্বর কমানোর যাবতীয় এ্যারেঞ্জ শুরু হয়ে গেলো ৷ দু’এক জায়গায় মোবাইল করে জেনে নেয়া হলো এখন এরূপ অবস্থায় করণীয় কী – ইত্যাদি ৷ আমি জোর দিয়ে বললাম ,” তুমি ও-ঘরে যাও , আমার কিচ্ছু হবে না আর ছেলেমেয়েদের এঘরে আসতে দিয়ো না ৷” কে শোনে কার কথা !

ঠিক আজকের সরকারি রিপোর্ট অনুযায়ী এযাবতকালের সর্বোচ্চ মৃত্যু এবং আক্রান্তের হার সারাদেশে ৷ উনি মরিয়া হয়ে গরমজলের ভাপ , লেবু আর লবনজলের গারগিল ইত্যাদি নিয়ে ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠলেন ৷ আমি মনে মনে ঈশ্বরকে বহুবার প্রণাম করলাম এবং এরপর যদি চরম পরিণতির দিকেও যাই আর দুঃখ নেই – ৷ প্রসন্নচিত্তে পরবর্তী ঘটনাবলীর অদৃশ্য চিত্রায়ণ ভাবতে লাগলাম – ৷ মান্না দে’র গানের একটা কলি এভাবে সুরে সুরে বাজছে আমার অন্তরে ,” আবার হবে কী দেখা , এ দেখাই শেষ দেখা হয়তো—-!”

কখন কিভাবে ঘুমিয়ে পড়েছি জানি না ৷ রাত সাড়ে তিনটায় প্রকৃতির আহ্বানে জেগে দেখি , উনি আমার বালিশের ওপর একধারে আধাশোয়া হয়ে আধো-আধো ঘুমে লবনজলের গেলাস হাতে তখনও – ৷ আমার ওঠার শব্দে জেগে ওঠেই দৌড়ে বাথরুমের গেট পর্যন্ত গেলেন ৷ বিছানায় এসে যখন বসলাম তখন আর গায়ে জ্বর নেই ৷ ফ্রেস লাগছে – ৷ সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তবুও উনি পরদিন টেস্টের জন্যে নিয়ে যাবেন বলে স্থির করলেন ৷ আমি জানি , ঈশ্বর একটু মজা করলেন আর এমন মজার ফাঁকেই জং-ধরা প্রেমটাকে সামান্য ঘষামাজা করিয়ে দিলেন ৷

 

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ১২:২২ অপরাহ্ণ | রবিবার, ১১ জুলাই ২০২১

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

চন্দ্রাবলী

১৬ নভেম্বর ২০২০

এডুকেশন

২৩ ডিসেম্বর ২০২০

অনুগল্পঃ মানুষ

১০ ডিসেম্বর ২০২০

চারাগাছ

২৬ জানুয়ারি ২০২১

কারিগর

২৪ জানুয়ারি ২০২১

স্বর্গ থেকে বিদায়

০৯ ডিসেম্বর ২০২০

বাটপার

১৩ আগস্ট ২০২০

নিশি মানব

২৫ জুন ২০২১

মালতি

২৫ জুলাই ২০২০

 ফুটপাথ

৩০ জুলাই ২০২০

অলিভিয়া

০৭ এপ্রিল ২০২১