ঘোষণা

অনুভূতি প্রতিক্ষণ

জিনাত নাজিয়া | শনিবার, ১১ ডিসেম্বর ২০২১ | পড়া হয়েছে 147 বার

অনুভূতি প্রতিক্ষণ

আমরা চার ভাই – বোন।বড় বোন বিনু’পার বিয়ে হয়ে গেছে। বড়  ভাইয়া ঢাকা ভার্সিটির ছাত্র। ছোট ভাই দিপু ক্লাস ফোরে। আমি  সিমু ক্লাস নাইনে পড়ি। বাবা – মায়ের  চোখে অনেক বড় হয়ে গেছি, বিয়ের পাত্র দেখছেন।আমি  এই নিয়ে ভীষণ চিন্তায় থাকতাম। ভাইয়া কে বুঝিয়ে বলতেই একদিন মা- বাবা কে ডেকে বললো,
” সিমুর বিয়ে নিয়ে আপনাদের এত ভাবতে হবে না, ও আগে পড়াশোনা শেষ করুক তারপর আমিই দেখেশুনে ওকে বিয়ে দিব।” বাবা- মা তাঁদের ছেলের কথা রাখবে আমি জানতাম।আমি ও এই ব্যাপার টা  নিয়ে চিন্তা মুক্ত হলাম।
দ্বীপ জেলা ভোলার সর্বশেষ দক্ষিণের চরফ্যাশন থানায় আমাদের বাড়ি, বাড়ির দরজায় মসজিদ, মসজিদ লাগোয়া  বিরাট বড় পারিবারিক কবরস্থান।বাবা ই সব দেখেশুনে রাখতেন। তখন দেশে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলছিলো। সময়টা অক্টোবরের  মাঝামাঝি  হবে। আমাদের বাড়িতে একটা পার্সেল আসলো,বেশ বড়সড় একটা প্যাকেট। আমি দৌড়ে গিয়ে খুলতেই দেখি থ্রি ব্যান্ডের একটা রেডিও,আমার খুশি দেখে কে।(অনেক আগে ভাইয়াকে একটা রেডিও র জন্য আব্দার  করেছিলাম।) সাথে একটা চিঠি। ভাইয়া  লিখেছে,
” বাবা, আমার জন্য চিন্তা করবেন না।আমি ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচারের পরপরই মুক্তিযুদ্ধে যোগ  দিয়েছি।কিছু দিন পর ওপারে চলে যাব। দোয়া করবেন যেন দেশটাকে স্বাধীন করে বীরের মতো ফিরে আসতে পারি। মাকে ও দোয়া করতে বলবেন। চিঠি পড়া হলে পুড়িয়ে দিবেন এ পর্যন্ত পড়তেই মায়ের চিৎকারে আমরা ও ভয় পেয়ে কাঁদতে লাগলাম। বাবা মাকে শান্তনা দিয়ে বললেন,
“ভয় পেওনা,তোমার ছেলের মতো এরকম লক্ষ মায়ের সন্তান  মুক্তিযুদ্ধে ঝাপিয়ে পরেছে,এরা যুদ্ধ না করলে আমরা একটা স্বাধীন দেশ কিভাবে পাব, এ বয়সে এসে আমরা তো আর যুদ্ধে যেতে পারিনা।ওরাইতো দেশটাকে শত্রুমুক্ত করবে।কান্নাকাটি না করে এদের জন্য প্রানভরে দোয়া কর,যাতে আমরা একটা স্বাধীন দেশ পাই।” ঠিক সেই সময়ের অনুভূতির কথা বলে বোঝানো যাবেনা।আমার ভাইয়া দেশকে মুক্ত করতে যুদ্ধ করছে,ভাবতেই গা শিউরে ওঠে। আমাদের পাড়ায় রাজাকারের সংখ্যা টা একটু বেশিই ছিলো, স্বাভাবিক ভাবেই আমাদের ভয়টাও বেশি ছিলো। সবাইকে শান্তনা দিলেও বাবা ও যে একটু চিন্তিত হয়ে পরেছেন, সেটা ওনার মুখ দেখে স্পষ্টই বোঝা গেছে।  পরদিন জোহরের নামায শেষে  বাবা এসে বললেন,
” আজ মসজিদে রাজাকার  মিঠুন,দুলাল ওরা এসে আমাকে শান্তি কমিটির সভাপতি পদ দিতে চাইলো।আমি আমার অসুস্থতার  কথা বলে এড়িয়ে গেছি।রিয়াজ কবে দেশে আসবে তাও জানতে চাইলো,সেটা ও এড়িয়ে এলাম,জানিনা কিছু বুঝতে পারলো কিনা।তোমরা কেউ কিন্তু বাড়ি  থেকে বের হবেনা।”
বুঝতে পারলাম বাবা-মা আমাকে নিয়ে বেশ চিন্তিত হয়ে  পরেছেন। হবেই না  কেন, ঐ শয়তান দের কি বিশ্বাস আছে? আমি নিজেও মহা চিন্তায় পরে গেলাম। এদিকে মা ও নতুনভাবে আমাকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় পরলেন।গরুর খোয়ারের সাথেই আমাদের ৪/৫ টি খড়ের  ডিবি ছিলো,ঐগুলা গরুর খাবার। মা ওখানেই একটা মানুষ থাকার মতো বিরাট এক গর্ত করলেন, অনেক টা গুহার  মতো। উপরে তক্তা আর কিছু খড় দিয়ে এমন করে ঢেকে দিলেন যেন বাইরের থেকে  কিছু বোঝা না যায়।আমি  আমার রেডিও টা নিয়ে দিনের বেশির ভাগ সময় ওখানেই কাটাতাম।ঘরে এসে বাবাকে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সব খবর জানাতে হতো। মাঝেমধ্যে আমরা সবাই মিলে ভলিউম কমিয়ে  এম আর আখতার মুকুলের ” চরমপত্র” খুব মজা করে শুনতাম।সেই অনুভূতি ভোলার নয়।অন্যরকম এক উত্তেজনা। এরকমই এক সন্ধ্যায় আমরা সবাই মিলে বি বি সির সংবাদ শুনছিলাম,হঠাৎ  মোটরসাইকেলের শব্দে সবাই চমকে উঠলাম। মা আমাকে লুকিয়ে যেতে বলে ঘরের দরজা খুললেন। এলাকার তিন কুখ্যাত রাজাকার।চিৎকার দিয়ে একজন বলতে লাগলো,
” চাচা রিয়াজ কিন্তু মুক্তি দের সাথে হাত মিলিয়েছে,আপনি হয়তো জানেন না,কিন্তু আমরা এমনই  খবর পেয়েছি। যদি সঠিক হয় তাইলে হিসাব টা কিন্তু  অন্যরকম হবে।আপনি মুরুব্বি মানুষ, আমাদের সাথে আসতে বললাম তাও আসলেন না।
এখন দেখেন আপনার ছেলে ই কিনা আপনার পরিবারের জন্য বিপদ ডেকে আনে ।তবে সিমুকে সাবধানে রাখবেন, বলাতো যায়না কখন কোন বিপদ হয়।” এইসব হুমকি দিয়ে ওরা চলে গেল।
প্রচন্ড ভয় পেলাম আমরা।সেদিন রাতেই বাবা আমাকে বোরখা পরিয়ে রাতের বেলা আপুর বাসায় দিয়ে গেলেন।রেডিও টা ও বাড়িতে রাখতে সাহস পেলেননা। এত বিপদের মধ্যে ও স্বাধীনতার তীব্র একটা অনুভূতি সারাক্ষণ আমাকে সাহস যোগাত।শেষ পর্যন্ত আমাদের দেশটা স্বাধীন  হবে তো,নাকি রাজাকারদের হাতেই  জীবন দিতে হয়,না না এমন টা হতে পারে না, ইনশাআল্লাহ একদিন আমরা স্বাধীন হবই। এই ক্রান্তিকাল কাটিয়ে উঠে সামনে এগিয়ে যাবার জন্য ধৈর্য ধরে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি।
একদিন  সন্ধ্যায় আমি আর আপু বি বি সি শুনছি,হঠাৎ ভেসে এলো শ্রদ্ধেয় সৈয়দ শামসুল হকের গলা।পাক বাহিনীর আত্ত্বসমর্পনের খবর টা উনিই পাঠ করলেন।আপুকে জড়িয়ে ধরলাম।ঠিক ঐ মুহূর্তে আমার মনে হলো আমি শূন্যে ভাসছি।আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়।ঐ মুহূর্তে কি করব স্থির করতে পারছিলাম না।আপুর শাশুড়ী আমাদের একটা রিকশা ঠিক করে দিলেন। আমরা বাড়ির পথে রওয়ানা দিলাম।বাড়ির কাছাকাছি আসতেই দেখি মেইন রোড দিয়ে “জয় বাংলা ” শ্লোগানে বিরাট এক মিছিল যাচ্ছে।নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলাম না। ” জয়বাংলা ” স্লোগান দিতে দিতে আমিও  কখন যেন মিছিলের একদম সামনে চলে এলাম।পাশেই দেখি ভাইয়া, চিৎকার দিয়ে  ওকে জড়িয়ে ধরলাম।দু’ ভাই বোনের কান্না যেন থামছেইনা।আমাদের চারপাশে
একটা জটলার সৃষ্টি হলো,সবার চোখেই আনন্দাশ্রু। মিছিল শেষ করে বাড়িতে আস তেই শুরু  হলো আর এক দফা কান্নাকাটি। আমরা ছোট দু’ ভাই বোন শুধু অধীর আগ্রহে বসে আছি কখন ভাইয়ার কাছে মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুনব।
আমরা ভাইয়াকে নিয়ে দক্ষিণের জানালা লাগোয়া  আমার পড়ার টেবিলে বসছি।ভাইয়া মা’কে  বললো,
” মা,ডিম ভুনার সাথে নারকেল দুধের পোলাও  হবে? অনেক দিন খাইনা।”
” হবেনা কেন  বাবা, আমি এখনই রান্না করছি।” এই বলে মা ভাইয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে দিলেন।ভাইয়া মুক্তিযুদ্ধের এক একটা ঘটনা বলছে আর আমরা  মন্ত্রমুগ্ধ  হয়ে  শুনছি।বিশ্বাসই হচ্ছিলো না,যে আমার ভাইয়াটা ও একজন সফল  মুক্তিযোদ্ধা। ভাইয়া অনেক মজা করে  কথা বলতে পারে। আরও মজার মজার ঘটনা বলছে আর আমরা অট্টহাসিতে ফেটে পরছি। ” জানিস আমরা যখন  ট্রেনিং শেষে ক্যাম্পে আসতাম তখন আমাদেরকে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র শুনতে দিত।একদিন শুনি নিয়াজি খাঁনকে ” পেয়াজি খাঁন” বলেছে।আমরা হাসতে হাসতেই… হঠাৎ প্রচন্ড একটা গুলির শব্দ।লুটিয়ে পরলো ভাইয়া। রক্তে মেঝে  লাল হয়ে গেল। বুঝতে আর বাকি রইলো না যে,রাজাকারের শেষ কামড়টা আমাদের পরিবারটাকে চুর্নবিচুর্ন করে দিয়ে  গেল। ভাইয়ার প্রিয় রেসিপি হাতে  মা রান্নাঘরেই লুটিয়ে পড়লেন। খাওয়া হলো না ভাইয়ার প্রিয় রেসিপি।
সেই থেকে আমাদের মা বিছানায় পরে গেলেন। ধুকে- ধুকে দুই বছরের মাথায় চলে গেলেন ভাইয়ার কাছে।আরো একবছর বাদে বাবা ও চলে গেলেন। শুধু আমরা তিন ভাই- বোন আজও সেই কষ্টের অনুভূতিকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছি।কোনো দিন আমরা আমাদের ভাইয়ার প্রিয় রেসিপি মুখে তুলতে পারিনি।বীরের সন্মানে  আমাদের প্রিয় মুক্তি যোদ্ধা ভাইয়া টা  মা-বাবাকে নিয়ে  ঘুমিয়ে আছে ওর প্রিয় ফুল  মাধবীলতার নিচে।

 

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ১২:৫৫ অপরাহ্ণ | শনিবার, ১১ ডিসেম্বর ২০২১

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

নীরব-নিথর অবয়ব

১৩ সেপ্টেম্বর ২০২১

চন্দ্রাবলী

১৬ নভেম্বর ২০২০

অনুগল্পঃ মানুষ

১০ ডিসেম্বর ২০২০

এডুকেশন

২৩ ডিসেম্বর ২০২০

স্বর্গ থেকে বিদায়

০৯ ডিসেম্বর ২০২০

কারিগর

২৪ জানুয়ারি ২০২১

চারাগাছ

২৬ জানুয়ারি ২০২১

বাটপার

১৩ আগস্ট ২০২০

নিশি মানব

২৫ জুন ২০২১

রূপকথা

২৬ এপ্রিল ২০২০