ঘোষণা

দশমীর মেলা

মিল্টন জে. পালমা | শনিবার, ২০ নভেম্বর ২০২১ | পড়া হয়েছে 82 বার

দশমীর মেলা

সে-বছর আমার এক ঠাকুর দাদা প্রয়াত লুইজ পালমা অত্যান্ত যাগ জমক সহকারে একটি নৌকা বানিয়ে ছিলেন। তখনকার দিনে এই নৌকার কদর এতোটাই বেশি ছিলো যে, যার নিজস্ব একটা নৌকা ছিলো আশেপাশের প্রতিবেশী তথা ঐ এলাকায় তার বেশ নাম ডাক ছিলো। তার উপর আবার নিজ বাড়িতে পত্তন দিয়ে নৌকা বানানো বলে কথা। পাড়ার যুবক-যুবতি, বৃদ্ধ-বনিতা সবার দৃষ্টি ঐ নৌকার দিকে। আর কতোদিন লাগবে, কখন শেষ হবে অপেক্ষার পালা, কবে জলে নামবে এই জল দানব? প্রতিদিন আশেপাশের এলাকা থেকে লোকজন দেখতে আসে পত্তন দেওয়া নৌকা তৈরির কাজ। আর কর্তা ব্যাক্তিটিতো আত্মগর্বের ঝুলা ফুলতে ফুলতে দাতা হাতেম তা-ই য়ের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে গদগদিয়ে বলে উঠতো, “কইগো পুহির মা মেহমানগো জল মুড়ি কিছু দাও”? এদিকে ট্যাড়া মাইনক্যাতো হুক্কায় তামাক সাজাতে উনিশ ঘন্টাই এক পায়ে খাড়া। তামাক ডলতে ডলতে যার হাতের তালুতে কড় জমে গেছে যেখান থেকে চামড়ার বদলে আসে কেবল তামাক আর লোচার গন্ধ। যাইহোক অনেক প্রতীক্ষার পর শেষ হলো নৌকা বানানোর কাজ। অপেক্ষা শুধু জলদানব জলে নামবে কবে? সকাল থেকে রাতে ঘুমানোর আগ পর্যন্ত আমার মাথায় কেবল একটাই ভাবনা শেষ পর্যন্ত প্রথম দিনের নৌকা বিলাসে যাবার সৌভাগ্য কি হবে আমার? স্কুল থেকে ফিরে কোনরকমে বইপত্র রেখে দাদুর বাড়ীর চারপাশে ঘুরঘুর উদ্দেশ্য কখন দাদুকে একলা পাওয়া যাবে? সুযোগ পেলেই একেবারে কাছাকাছি তারপর ছলছুঁতোয় ইনিয়ে বিনিয়ে বলা, “ও দাদু নৌকা বিলাসে আমাকে নিতে বলবে তো”? দাদু সময় নিয়ে শরতায় সুপারী কেটে শৈল্পিক কায়দায় পান সাজিয়ে মুখে পুড়ে মচ মচিয়ে চিবুতে চিবুতে বলে উঠতো, আরে তুইতো অহনো ছোট পাছে যদি পানিতে পইড়া যাস্? দাদুর কথায় মনটা মুহুর্তেই বিষন্ন হয়ে পড়তো। দাদু আমার মন খারাপের সুযোগ নিয়ে বলতো, আইচ্ছা ঠিক আছে আমি অগো কইয়্যা দিমুনে তোরে যেনো লইয়া যায়। এবার আমার হাত পা গুলান একটু টিপ্পা দে দেহি? বলেই দাদু তার বিশাল দেহটা বিছানায় এলিয়ে দিয়ে হাতির মতো পা দুটি আমার দিকে বাড়িয়ে দিতো। আমি মহা খুশিতে হাত-পা টিপছি আর কিছুক্ষণের মধ্যেই দাদু সিংহের মতো গর্জন করতে করতে সেকি মহা ঘুম? আমিও সুযোগ বুঝে দে ছুঁট। অবশেষে অনেক জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে দাদু পন্জিকা দেখে দিনক্ষণ ঠিক করে ঘোষণা করলেন আগামী রবিবার দিন নৌকা জলে নামবে। এরই সাথে সবাইকে অবাক করে দিয়ে তিনি আরোও ঘোষণা করলেন পরের রবিবার দিন জয়রামবের গ্রামের খাওইরার নৌকার সাথে তার নতুন নৌকা বাইচের প্রতিযোগীতায় নামবে। ঘোষণা অনুযায়ী রবিবার দিন সকাল থেকে পাড়ার যুবক যুবতী আত্নীয় স্বজনরা সব ভীড় জমাতে থাকলো লুইজ পালমার বাড়ীতে। আমার প্রায় একমাস ধরেই মায়ের কাছে বায়না ছিলো যেদিন প্রথম নৌকা জলে নামবে সেদিন সবার সাথে আমিও নৌকা বিলাসে যাবো। সকাল দশটার দিকে বিপুল উৎসাহের মধ্য দিয়ে দোয়া প্রার্থনা শেষে নৌকা জলে নামানো হলো। ভড়া বর্ষায় নতুন নৌকা তরতর করে ঢেউ ভেঙে বেলাই বিলের মাঝখানে চলে যাচ্ছে আবার ফিরে আসছে। দূর থেকে বৈঠার তালে তালে গান ভেসে আসছে, মানুষ তা দেখছে, কেউ হাততালি দিচ্ছে আবার কেউবা বৈঠার তালে তালে গান ধরছে। কিন্ত হায় এই মহা আনন্দের যজ্ঞলীলা দেখে হাততালি দেওয়ার বদলে আমার কেবলই বুক ফেটে কান্না বেরিয়ে আসছে। মনে হচ্ছে আমি ওদের মতো বড় হবো কবে? যাই হোক আমার কান্না দেখে মায়ের তদ্ধিরে সন্ধ্যা সাতটার দিকে নৌকায় উঠার সৌভাগ্য হলো আমার এবং এতেই আমি মহা খুশি। প্রায় মধ্যরাত পর্যন্ত নৌকা বাইলাম। আমার দুই চাচাত ভাই ওদেরও ঠিক একই দশা ওরাও সুযোগ পেলো ঠিক আমারই সাথে।

আজ রবিবার ছুটির দিন। ঘোষণা অনুযায়ী নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা হবে খাওইরার নৌকার সাথে লুইচ পালমার নৌকার। সকাল থেকেই আশেপাশের গ্রাম থেকে লোকজন এসে ভীড় জমাতে থাকলো নির্ধারিত বাইচ ঘাটে। দু’পক্ষের মধ্যেই টান টান উত্তেজনা। কেউ কেউ বাজি ধরতেও ছাড়লোনা অর্থাৎ জিতার সম্ভাবনা দু’পক্ষেরই সমানে সমান। নৌকা বাইচ উপলক্ষে দুটি নৌকাই সাজানো হয়েছে রঙবেরঙের সাজে। বাছাই করা বৈঠালদের দেওয়া হয়েছে একই রকম ভিন্ন রঙ্গের পোশাক। লুইজ পালমার তো সকাল থেকে মাথার ঠিক নেই। উদভ্রান্তের মতো এদিক সেদিক ছুটেছেন তিনি। দুটি নৌকার বৈঠালরাও প্রস্তুত তাদের চুড়ান্ত পরীক্ষা দিতে। চারিদিকে উৎসুক জনতার উপচেপড়া উপস্থিতি। সবার মনেই উৎকন্ঠা কি জানি কি হয়? কে জিতবে শেষ পর্যন্ত? ছোট কয়ের থেকে ভাড়াকরে আনা রেফারির বুক কাপানো হুইসেলে অবশেষে শুরু হলো নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা। সীমানা অথৈ জলে উপচানো বেলাই বিলের মাঝখানের বিদ্যুতের খুঁটি আর লুইজ পালমার উত্তরের পুকুর পাড়। দুটি নৌকাই এগিয়ে যাচ্ছে রকেটের বেগে কখনো খাওইড়ার নৌকা এগিয়ে আবার কখনো লুইজ পালমার। আমার ভেতর দুয়ারে বৈঠার রূপালী আওয়াজ ক্রমেই বেগবান হতে থাকলো। দেখতে দেখতে দু’টি নৌকা বিদ্যুতের খুঁটি ছুঁয়ে আবারও ফিরে আসছে। কেউ বলছে লুইজ পালমার নৌকা জিতে যাবে আবার কেউবা খাওইরার। নৌকা রাঙ্গামাটিয়ার সীমানা ছাড়িয়ে দড়িপাড়ার সীমানায় ঢুকে পড়েছে তখনো লুইজ পালমার নৌকা এগিয়ে। উপস্থিত জনতা এবার অনেকটা নিশ্চিত হয়েই হাততালি দিতে দিতে লুইজ পালমার নামে স্লোগান দিতে শুরু করলো। কিন্তু হায়! কি জানি কি হলো হঠাৎ সমস্ত জল্পনা কল্পনা আর উত্তেজনাকে পিছনে ফেলে লুইজ পালমার নৌকা মুহুর্তেই তলিয়ে গেলো। প্রতিযোগীতার নিয়মানুযায়ী খাওইরার নৌকাকে বাইচে বিজয়ী ঘোষনা করা হলো। পুরষ্কার হিসেবে খাওইরার দল বিশাল এক সীল জিতে ঢাক-ডোল বাজিয়ে নৌকা বাইতে বাইতে আর আনন্দে নৃত্য করতে করতে চলে গেলো। এই হারের বেদনায় লুইজ পালমা এতোটাই কষ্ট পেলেন যে, তিনি শয্যাশায়ী হলেন সবশেষে তিনি নৌকা বিক্রি করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। কিন্তু তাকে অনেক বুঝানোর পর নৌকা তিনি বিক্রি করলেন না ঠিকই তবে এটা তার কাছে অপয়া হয়েই রইলো।

আর্শ্বিন মাস। নৌকা বাইচের প্রায় দেড়মাস পরের কথা। এতোদিনে দাদু বাইচ হারের যন্ত্রনা অনেকটা সামলে নিয়েছেন। আমাদের এলাকায় হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে জাঁকজমক পূর্ণ অনুষ্ঠান হলো লক্ষী পূঁজা। প্রতি বছর এদিন এলেই এরা পুরো এলাকাটাকে মাতিয়ে রাখে। দিনভর দেবতা পূঁজা, ঢাকের টনটনা আওয়াজ আর রাতে বিভিন্ন যাত্রা পালা রাবণবধ, শীতার বনবাস ইত্যাদি। রাতভর যাত্রা পালা দেখে দিনের বেলায় বাঁশ কিংবা কাঠের তলোয়ার বানিয়ে কখনো রাম আবার কখনো রাবণের ডায়ালগ বলতে বলতে একা একাই যুদ্ধ করা আবার কখনো শীতা বা রামের করুণ সুরে গান গাইতে গাইতে মনে হতো ইস্ যদি আমি ঐ রাম, শীতা কিংবা রাবণ হতে পারতাম? সত্যি কথা বলতে কি যারা নাটক বা যাত্রা পালায় অভিনয় করতো তাদের দেখে মনে হতো ওরা বুঝি সাধারণ মানুষ নয়। এদের প্রতি আমার কৌতূহল এতোই বেশী ছিলো যে, একদিন মা আমাকে বাজারে পাঠালেন। আমি নাগরী বাজারে যাওয়ার উদ্দেশ্যে নলছাটা রেল ক্রসিং পাড় হবার পরই হঠাৎ দেখতে পেলাম, যে লোকটি যাত্রা পালায় রাবণ সেজে ছিলো সেই লোকটি উল্টো দিক থেকে হেটে আসছেন। চোখের সামনে এই স্বপ্ন ঘেরা মানুষটিকে দেখে আমার কৌতূহল আর কল্পনার জগৎ এতোটাই লোভী হয়ে উঠলো যে, বাজারে যাওয়ার কথা বেমালুম ভুলে গেলাম। আমি পিছু নিলাম ঐ রাবণের। সে কেমন করে হাটে, কোথায় যায়, কি করে, কি খায় সব লক্ষ্য করতে লাগলাম। লোকটা নলছাটা রেল স্টেশনের একটি চা স্টলে ঢুকলেন। পরিচিত জনের সাথে গল্প-গুজব করতে করতে চা খেলেন অনেক সময় নিয়ে। আমি দূরে দাঁড়িয়ে লক্ষ্য করছি সবকিছু। বেশ কিছুক্ষণ পর চা স্টল থেকে বেরিয়ে রাস্তায় হাটলো রাবণ। আমিও হাটলাম তার পিছু পিছু। এভাবে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো একসময় বাজার না নিয়ে বাড়ী ফেরার অপরাধে খেতে হলো মায়ের হাতের পিটুনি। কিন্তু তাতে কি, রাবণকে তো খুব কাছে থেকে দেখেছি আমি? শুধু তাই নয় লোকটি যেভাবে হাটে এবং চা পান করে বেশ কিছুদিন তার অনুকরণও করেছিলাম। যাক সে কথা আর দুদিন বাদেই লক্ষী পূঁজার দশমী। অবশ্য দাদু আগেই ঘোষণা দিয়েছিলেন নতুন নৌকা নিয়ে তিনি এবার দশমীর মেলায় যাবে। ইতিমধ্যেই আমি মায়ের সুপারিশে দাদুর কাছ থেকে নৌকায় করে দশমীর মেলায় যাওয়ার অনুমতি সংগ্রহ করেছিলাম। সঙ্গী হলো আমার আরোও দুই চাচাত ভাই। দশমীর মেলায় যাব বলে বেশ কিছুদিন আগে থেকেই পঁয়সা জমাচ্ছিলাম। মনের মধ্যে এমন এক ধরণের উত্তেজনা কাজ করছিলো যা আজ লিখে বুঝাতে পারবোনা। দশমীর মেলায় ঝাড় বম দেখবো, বায়স্কোপ দেখবো, বিভিন্ন জায়গা থেকে প্রতিমা মন্ডব আসবে প্রতিযোগিতা হবে, যে বেশী ঝাড় বম ফুটাতে পারবে যার প্রতিমা মন্ডব সবচাইতে সুন্দর হবে সেই মন্ডবকে পুরষ্কৃত করা হবে। পুতুল নাচ দেখবো, চরখ গাছে উঠবো, সারারাত দশমীর মেলায় ঘুরে সকাল বেলায় দু-তিনটে ফুলানো বেলুন হাতে, বড় একটা টেনারী গেন্ডরী কাঁধে করে প্যাঁ প্যুঁ বাঁশি বাজাতে বাজাতে বিশ্বজয়ের আনন্দ নিয়ে ফিরবো ইত্যাদি ইত্যাদি অনেক ভাবনা আমাকে ব্যাকুল করে রাখলো প্রতি মুহুর্তে। আমি দশমীর মেলায় যাব শুনে ছোট বোনটা বায়না ধরে বললো, দাদা আমার জন্য একটা তাল পাতার বাঁশি আনবে কিন্তু ? বললাম নিশ্চয় আনবো। ছোট ভাইয়ের দাবী একটাই তার জন্য বন্দুক আনতেই হবে। যাই হোক সমস্ত উত্তেজনা আর অপেক্ষার পালা শেষে অবশেষে এলো সেই প্রতিক্ষিত দিন। সন্ধা রাতে মেলা প্রাঙ্গনে গগন ফাটানো এক একটা ঝাড় বমের আওয়াজ আমার ভেতরটা কেঁপে কেঁপে উঠছে। বিকাল থেকেই দাদুর বাড়ীতে ঘন ঘন টহল দেওয়া আর ঘাটে নৌকা আছে কিনা তা বার বার নিশ্চিত হতে থাকলাম। পাছে যদি আবার আমাকে ফেলে চলে যায়? আমার সঞ্চয়ে যা ছিলো আর মা যা দিলো সব মিলিয়ে তিনটি টাকা খুব সাবধানে রুমালে বেঁধে রাত নয়টার দিকে দাদুর সাথে নৌকায় করে রওনা হলাম দশমীর মেলায়। যাবার আগে মা মাথায় হাত বুলিয়ে মনে মনে কি যেনো বিড় বিড় করে বলে ফুঁ দিয়ে বললো, সাবধানে যাবে, টাকা সাবধানে রাখবে, সবসময় দাদুর সাথে সাথে থাকবে, অপরিচিত কেউ কিছু দিলে খাবেনা ইত্যাদি ইত্যাদি আরো কতোকি শতর্ক বানী? ছোট দুই ভাই বোনও জেগে রইলো এবং যাবার আগে তাদের বায়নার কথা আবারও মনে করিয়ে দিলো। আমাদের নৌকা নলছাটা ছাড়িয়ে যখন হালদার টেকে ঠিক তখনোই চোখে পড়লো দশমীর মেলার পুবাইল হাট রঙ্গ বেরঙ্গের আলোতে সেজেছে এক অপরূপ সাজে। ঝাড় ফুটছে, ঢাক-ঢোল পিটিয়ে মাইক বাজিয়ে প্রতিমার সামনে নাচতে নাচতে বড় বড় নৌকায় করে প্রতিমা মন্ডব আসতে শুরু করেছে। আমাদের নৌকা যেনো আর এগুচ্ছেনা। এতো জোরে জোরে বৈঠা টানছি তবুও যেনো পথ ফুরোচ্ছেনা। মনে হচ্ছিলো আর কতক্ষণ, কখন যাব দশমীর মেলায়? পূবাইল গাঙ্গে আমাদের নৌকা পড়তেই একটা প্রতিমা মন্ডব আমাদের ক্রস করলো। আমার ভেতরটা প্রায় আনন্দে নেচে উঠলো। দাদু বললো, এটা ছোট কয়েরের গৌরাঙ্গ বাবুর মন্ডব। আমরা পুবাইল গাঙ্গের ঢেউ ভেঙ্গে এগুতে এগুতে একসময় পৌঁছে গেলাম দশমীর মেলায়।

ঘাটে নৌকা বেঁধে আমরা রওনা হলাম দাদুর পিছু পিছু মেলা প্রাঙ্গনে। কোথাও তিল ধারণের ঠায় নেই কেবল মানুষ আর মানুষ। আমি অবাক বিষ্ময়ে দেখছি চারিদিকের সবকিছু। জীবনের প্রথম দশমীর মেলায় এসেছি এ যেনো এক অন্যরকম অনুভূতি। কি করবো কোথায় যাব কি কিনবো সব যেনো গোলমাল হয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ মাইকে ঘোষণা এলো এবার ঝাড় বম ফুটাবে বক্তারপুরের লাল বিহারী বাবুর মন্ডবের পক্ষ থেকে। মূহুর্তেই জনতার চোখ সেদিকে এবং সাথে সাথেই জ্বলে উঠলো ঝাড় বমের লাল নীল বেগুনি আলো। আহ্! কি সুন্দর সেই রঙ বদলানোর অপরূপ দৃশ্য। একটু পরেই একে একে গগন ফাটানো আওয়াজে জানান দিচ্ছে আমি ঝাড় আমি বমের রাজা আমি দশমীর মেলার অহংকার। এভাবে একের পর এক ঝাড় বম ফুটছে। বিভিন্ন মন্ডবে ভক্তরা আনন্দে নেচে নেচে স্লোগান দিচ্ছে “লক্ষী মা কি, জয়” “লক্ষী মা কি, জয়”। ব্রাম্মন মশাই দেবীর তুষ্টিতে ধূপারতী ছড়াচ্ছে কেউবা রঙ ছূড়ে মারছে নৃত্যরত ভক্তদের জটলার মধ্যে। পূঁজার মন্ডব গুলি বড় বড় নৌকায় সারি সারি সাজানো। সৌন্দর্যের বিচারে কোনটির চেয়ে কোনটি কোন অংশেই কম নয়। সব মিলিয়ে যেনো এক স্বপ্নপুরী। আমি অবাক বিষ্ময়ে দেখছি আর ভাবছি পৃথিবীতে ইহকাল থেকে পরকাল আর মানব থেকে মানবতার বিশাল রহস্য। হঠাৎ পিছন ফিরে দেখি আমি ভীড়ের মধ্যে একা দাঁড়িয়ে। আমার ডানে বামে সামনে পিছনে দাদু বা যাদের সঙ্গে এসেছিলাম তাদের কেউ নেই। আমি দিশেহারা হয়ে দাদু ও পরিচিত জনদের খুঁজতে লাগলাম। চারিদিকে মুহু মুহু আনন্দের মাঝে মুহুর্তেই যেনো আমার বুক ফেটে কান্না বেরিয়ে আসছে। উদভ্রান্তের মতো এদিক ওদিক ছুটাছুটি করলাম অনেকক্ষণ ধরে কিন্তু কাউকেই খুঁজে পেলামনা। অবশেষে মনের মধ্যে প্রচন্ড্র সাহসের সঞ্চার করে একা একাই ঘুরতে লাগলাম মেলায়। ভাবলাম কাউকে খুঁজে পাচ্ছিনা তাতে কি? চার আনা দিয়ে অন্য নৌকায় করে নলছাটা পৌঁছাতে পারলেইতো বাড়ী ফিরে যেতে পারবো?

মেলায় ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ একটা জটলা চোখে পড়লো। ভীড় ঠেলে এগিয়ে গেলাম সেদিকে। লক্ষ্য করলাম একটা লোক কায়দা করে বেল্ট প্যাঁচিয়ে ধরে রাখছে কেউ একটা চিকন লোহার রড (কালি) দিয়ে নিশানা ঠিক করে ঘাই মেরে দরছে দ্বিগুন করা বেল্টের মাথায়। লোকটি বেল্টের এক প্রান্ত ধরে টান মারতেই বেল্টটি কখনো আটকে যাচ্ছে আবার কখনো বেরিয়ে যাচ্ছে। বিনিময়ে খদ্দের ব্যাক্তিটি এক টাকার বদলে দু’টাকা কিংবা দু’টাকার বদলে চার টাকা পেয়ে যাচ্ছে অনায়াসেই। বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খেলাটি উপভোগ করলাম। একসময় খেলাটিতে যতটুকু না মজা পাচ্ছিলাম তার চেয়ে আগ্রহ বেড়ে গেলো অনেকগুন। পকেটে হাত দিয়ে দেখলাম তিনটি টাকাই এখনো রুমালে বাঁধা বর্তমান। দেখতে দেখতে খেলাটি আমার কাছে বেশ মজার এবং সহজ মনে হলো। ভাবলাম এতো সহজে টাকা পাওয়া যায়? আমার কাছে যে তিন টাকা আছে তার সাথে আরোও এক টাকা যোগ হলেতো ভালোই হয়? মেলা থেকে আরোও ভালো কিছু কিনে নেওয়া যাবে? লোকটি বেল্ট সাজিয়ে বসে আছে সামনে মাটির উপর কালি গাঁথা। কেউ কালি হাতে নিচ্ছেনা বলে লোকটি এবার চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলছে আসুন আসুন এক টাকায় দুই টাকা দুই টাকায় চার টাকা? কেউ সাহস করে কালি হাতে নিচ্ছেনা। আমি খুব সাবধানে রুমালের গিট খুলে একটি টাকা বের করলাম তারপর আস্তে আস্তে এগিয়ে গিয়ে টাকাটা মাটিতে ছুঁড়ে দিয়ে হাত রাখলাম কালির উপর। খুব ভালো করে দেখেশুনে নিশানা ঠিক করে মনে মনে একবার ঈশ্বরের নাম নিয়ে সজোরে ঘাই বসালাম বেল্টের মাথায়। সামনেই মাটিতে পড়ে আছে আমার মহামূল্যবান একটি টাকা। কালিতে বেল্ট আটকে গেলেই এর সাথে যোগ হবে আরোও একটি টাকা। লোকটিও আর দেরী করলোনা তার হাতে ধরে রাখা বেল্টের অপর প্রান্ত ধরে মারলো টান। কি আশ্চর্য্য ফেঁসে গেলো বেল্টটি। পাশে দাঁড়ানো লোকগুলি এতোক্ষণ এইটুকুন ছেলের কান্ড্র দেখে অবাক হলেও এবার হৈ হৈ করে উঠলো। মুহুর্তেই পেয়ে গেলাম আমার মহামূল্যবান এক টাকা সাথে আরোও একটি টাকা। টাকাটা নিয়ে দাড়িয়ে পড়লাম অন্য সবার সাথে। জীবনের প্রথম উপার্জন করা একটি টাকা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখলাম অনেকক্ষণ ধরে। এর পর আরোও অনেক জোয়ারী এলো কেউ জিতলো কেউ হারের যন্ত্রণা নিয়ে বিষন্ন মনে ফিরে গেলো। আমার লোভী মন কেবলই বিলাসী হতে লাগলো। ভাবলাম আর একটা টাকা যদি পাওয়া যায় তবেতো পুরো পাঁচ টাক? খদ্দেরের একটু ভাটা দেখে আবারও কালি হাতে নিলাম ঘাই বসালাম নিশানা ঠিক করে। কিন্তু হায়! এবারে আর রক্ষা হলোনা। লক্ষ্য করলাম সহজে উপার্জিত টাকাটা চলে যাওয়ায় খুব বেশী একটা কষ্ট হলোনা তবে মনে এক ধরণের জেদ ক্রমেই দানা বেঁধে উঠছে। বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে আবারও কালি হাতে নিলাম। ভাবলাম হারানো টাকাটা যদি ফিরে পাওয়া যায়? ঘাই বসালাম বেল্টের মাথায় কিন্তু আমার জেদ আর আকাংখাকে ম্লান করে দিয়ে কালি পিছলে বেল্ট বেরিয়ে গেলো। খোয়া গেলো আমার মহামূল্যবান একটি টাকা। একটি টাকা চলে যাওয়ায় এবার বেশ কষ্ট পেলাম কিন্তু মনের মধ্যে এমন এক ধরণের ক্রোধের জন্ম হলো যে, হারানো টাকা ফিরে পেতে আমি মরিয়া হয়ে উঠলাম। এভাবে একটি টাকা পুনরুদ্ধার করতে গিয়ে দশমীর মেলায় আমি সর্বশান্ত হয়ে গেলাম। আমার কাছে একটি পঁয়সাও নেই যা দিয়ে দু’আনার নিমকি কিনে খাব। এদিকে ক্ষুধায় পেটের নাড়ীভুঁড়ি উল্টে আসতে চাইছে। কি করবো আমি বাড়ীই বা যাব কিভাবে? আমার কাছেতো নৌকা ভাড়ার চার আনা পঁয়সাও নেই? আমি দিশেহারা হয়ে মেলায় হাটতে লাগলাম এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। আমার অনেক দিনের সঞ্চয় আর মায়ের দেওয়া পঁয়সা মিলিয়ে মহামূল্যবান তিনটি টাকা হারানোর ব্যথায় বুক ফেটে কান্না আসছে বার বার। ছোট বোনটির কথা মনে পড়লো, বাড়ীতে গেলেই দৌড়ে এসে জিজ্ঞেস করবে, দাদা আমার তাল পাতার বাঁশি এনেছো? কি জবাব দিবো আমি? ছোট ভাইটি হয়তো বন্দুক ফুটানোর উন্মাদনায় সারারাত জেগেই রয়েছে? এদিকে মধ্যরাত পেরিয়ে পৃথিবী দিনের আলোর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। পূর্ব দিকে সারি সারি প্রতীমা মন্ডব হ্যাজাক লাইটের আলোয় স্বর্গপুরীর মতোই মনে হচ্ছে। পালাক্রমে চলছে ঝাড় বম ফুটানোর প্রতিযোগিতা। এসব কিছুই আমাকে আকর্ষন করতে পারলোনা। একদিকে পেটে ক্ষুধা অন্যদিকে তিনটি টাকা হারানোর যন্ত্রণা কেবলই থেমে থেমে ঢেকুর দিয়ে কান্নায় রূপ নিচ্ছে। আমি বসে পরলাম পুকুর পারের এককোনের ফাঁকা জায়গায়। একা একা বসে কাঁদলাম নিঃশব্দে অনেকক্ষণ। কাঁদতে কাঁদতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি মনে নেই। আমি দেখলাম আমার হাতে দু’টো বড় বড় ফুলানো বেলুন বাতাসে উড়ছে, কাঁধে বিশাল একটা টেনারী গেন্ডরী, নানা রকম খাবারের জিনিস আর বন্দুক হাতে তাল পাতার বাঁশি বাজাতে বাজাতে আমি বাড়ীর উঠানে দাঁড়িয়ে। ছোট দুই ভাই-বোন দৌড়ে এলো। তাদের এক হাতে উড়ন্ত বেলুন অন্য হাতে একজন তাল পাতার বাঁশি বাজাচ্ছে অন্যজন বন্দুক ফুটাচ্ছে। ছোট ভাইটি আমার দিকে বন্দুক তাক করে বললো, দাদা তোমাকে একটা গুলি করি? ফটাশ করে বন্দুকের গুলির আওয়াজ হতেই আহ্ বলে চিৎকার দিলাম। ঘুম ভেঙ্গে গেলো তখন বেলা প্রায় নয়টার কাছাকাছি। দেখলাম চারিদিক ফাঁকা হয়ে গেছে। দোকানীরা অনেকেই তাদের দোকান গুটিয়ে চলে গেছে আবার কেউবা যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। প্রতীমা মন্ডব যেগুলি এখনো রয়ে গেছে তাতে রাতের সেই ঝিলিক আর নেই। আমার সারা শরীর ধূলো আর মাটিতে একাকার।ইচ্ছে করছে পুকুরে নেমে সাঁতরিয়ে গোসল করতে কিন্তু ভেজা কাপড়ে বাড়ী যাব কি করে? আমি আস্তে আস্তে বাড়ীর পথে হাটতে লাগলাম। প্রায় পাঁচ মাইল পথ হেটে দুপুর নাগাদ যখন বাড়ী এসে পৌঁছলাম তখন আর এক ভিন্ন চিত্র। আমার চিন্তায় মা ইতিমধ্যেই কয়েকবার জ্ঞান হারিয়েছে। ডাক্তার এসে ঘুমের ঔষধ দিয়ে এখন ঘুম পাড়িয়ে রেখেছেন। প্রতিবেশী আত্মীয় স্বজন আমাকে খুঁজতে বেরিয়ে পড়েছে। ছোট দুই ভাই-বোন আমাকে দেখেই কাঁদতে লাগলো। আমি ফিরে এসেছি শুনে আশেপাশের অনেকেই আমাকে দেখতে এলো। কোথায় ছিলাম কি হয়েছিলো ইত্যাদি ইত্যাদি হাজারও প্রশ্নে আমি ক্ষত-বিক্ষত হতে থাকলাম। মায়ের পিটুনির ভয়ে আমি আগে থেকেই মনে মনে একটা গল্প তৈরী করে রেখেছিলাম সেই গল্পটিই বলছি সবাইকে বার বার। গল্পটা এরকম, একটা লোক আমাকে মেলা থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে একটা মাটির ঘরে আটকে রেখেছিলো। অনেক কষ্টে আমি সেখান থেকে পালিয়ে এসেছি। কেউ কেউ প্রশ্ন করলো মারধর করেছে কিনা? বললাম আমার কাছে তিনটি টাকা ছিলো দিতে চাইনি বলে প্রথমে দু’টো থাপ্পর মেরেছিলো এরপর আর মারেনি শুধু আটকে রেখেছিলো। তাতেও প্রতিবেশীরা ক্ষান্ত হলোনা গায়ের শার্ট খুলে দেখতে লাগলো কোথাও আঘাতের চিহ্ন আছে কিনা। কেউ কেউ বলে উঠলো এই দেখো পিঠের এখানে লাল হয়ে আছে। আহ্হারে এইটুকু বাচ্চা ছেলেকে কেউ এভাবে মারে? বলেই বানানো গল্পের খল চরিত্রের সেই লোকটিকে রাজ্যের সব গালাগাল অভিশাপ দিতে লাগলো। আমার ছোট দুই ভাই-বোন আমাকে পেয়েই খুশি তাদের এখন আর তাল পাতার বাঁশি কিংবা বন্দুকের বায়নার কথা মনে নেই। এরই মধ্যে মায়ের ঘুম ভেঙ্গেছে। চোখ মেলে তাকিয়েই মা আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলো অঝোর ধারায়। সেদিনের মায়ের কান্নার কথা আজও ভুলতে পারিনা।

প্রিয় পাঠক, সেদিনের সেই তিনটি টাকা হারানোর কষ্ট থেকে আমি দু’টো জিনিস অর্জন করেছিলাম। প্রথমতঃ জীবনে আর কোনদিন জোয়ার ফাঁদে পা দেইনি – দ্বিতীয়তঃ খুব বেশী বিপদে না পড়লে মিথ্যা বলিনি। আমার বিশ্বাস এই দু’টি অর্জনই আমার মধ্যে শক্ত ভিতের জন্ম দিয়েছিলো ঐ দশমীর মেলার জোয়ার আসর থেকে। যদিও আমি তখন জানতামনা একেই জোয়া বলে।

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ১১:১৮ অপরাহ্ণ | শনিবার, ২০ নভেম্বর ২০২১

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

নীরব-নিথর অবয়ব

১৩ সেপ্টেম্বর ২০২১

চন্দ্রাবলী

১৬ নভেম্বর ২০২০

অনুগল্পঃ মানুষ

১০ ডিসেম্বর ২০২০

এডুকেশন

২৩ ডিসেম্বর ২০২০

স্বর্গ থেকে বিদায়

০৯ ডিসেম্বর ২০২০

চারাগাছ

২৬ জানুয়ারি ২০২১

কারিগর

২৪ জানুয়ারি ২০২১

বাটপার

১৩ আগস্ট ২০২০

নিশি মানব

২৫ জুন ২০২১

রূপকথা

২৬ এপ্রিল ২০২০