ঘোষণা

বিজয় লক্ষ্মী নারী

শুভ্রা সাহা | শনিবার, ৩১ জুলাই ২০২১ | পড়া হয়েছে 96 বার

বিজয় লক্ষ্মী নারী

নিতাই আজ প্রায় দেড় মাস পর হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরছে ।করোণা নেগেটিভ আসার পরও ওকে , আরো অনেক দিন হাসপাতালে থাকতে হয়েছিল । কারণ ওর লাঞ্চে ইনফেকশন ধরা পড়েছে ।এখন অনেকটাই সুস্থ। তবে সতর্ক থাকতে হবে। বিশ্রাম নিতে হবে। কিন্তু এই অভাবের সংসারে কিভাবে বিশ্রাম নেবে নিতাই? নিতাই ভাবে –হয়তো আমাকে বাঁচাতে দেনার দায় এক গলা হয়ে আছে। তবুও রক্ষা আমার একার হয়েছে। ঘরের আর কারও হয়নি । নতুবা সব বরবাদ হয়ে যেত। ভাগ্যিস সেদিন বাজারে করোনা টেস্ট করিয়ে ছিলাম। কিন্তু আমার তো কোন উপসর্গ ছিল না। সামান্য একটু গলা ব্যথা ছিল। তাতেই বিকেলে খবর এলো আমি পজেটিভ। হাসপাতাল থেকে তো ঔষধ , পত্র লিখে ছেড়ে দিয়েছিল.। বলেছিল কিছু লাগবেনা, বাড়িতে গিয়ে ওষুধ গুলো খাবেন , আর আলাদা ঘরে থাকবেন। কারো সঙ্গে মিশবেন না । সব আলাদা ব্যাবস্থা রাখবেন। কিন্তু আমার ঘরে বৃদ্ধ মা-বাবা বউ চার বছরের বাচ্চা । তাই ডাক্তারদের কাছে অনেক কাকুতি-মিনতি করে হাসপাতালে রয়ে গেলাম। কারণ আমার এই ছোট্ট বাড়িতে আলাদা থাকার কোন ব্যবস্থা নেই।

হাসপাতালে থেকেই ঘরের লোকজনের দুর্দশার কথা চিন্তা করে সারাক্ষণ ক্ষত-বিক্ষত হয়েছে নিতাই। টাকা পয়সাও ছিল না তেমন কিছু। সঙ্গে কয়েকশো টাকা ছিল, সেটা রমনী বাবুর হাতে বাড়িতে পাঠিয়েছে। এতে আর কদিন গেছে ? যদিও হাসপাতাল থেকে শুনেছে দীপ্তি ওর ছোট্ট, স্টেশনারি দোকানটা খুলে বসেছে। নিতাই এর ধারণা এতদিনে হয়তো বোকা দীপ্তি দোকানটার বারোটা বাজিয়ে লাটে তুলে দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত, সংসার চালাতে নিজেকে হয়তো দিনমজুরের কাজ করতে হবে।
কতই না সাত পাঁচ ভেবে চলছে নিতাই। এতদিনে হয়তো দীপ্তি নিজের গলার চেইন, কানের দুল, সব গয়নাই বিক্রি করে দিয়েছ। মনে মনে এসব কথা ভাবতে গিয়ে ওর পাশে অটোতে বসা দীপ্তির গলার দিকে তাকায় ।দীপ্ত ওকে আনতে গিয়েছিল হাসপাতাল থেকে । নিতাই দেখে, না – চেনটা তো গলায়ই আছে! কেমন চকচক করছে! কানের দুল আছে ,হাতের বালা টাও তো রয়েছে! দীপ্তি কে দেখলে তো মনে হয়না ও অভাবে আছে ! কত টাকা দেনা করেছ কে জানে !

দীপ্তিও যেন অনেকদিন পর আজ একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। এতদিনে মানুষটাকে ঘরে ফেরাতে পেরেছে । কিনা গেছে ওদের উপর দিয়ে এই দেড় মাস । সেদিন সন্ধ্যায় হঠাৎই নিতাই এর পাশের দোকানের রমণী বাবু এসে খবর দেয়, নিতাই এর করোণা হয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এগুলো আমাকে দিয়েছে বাড়িতে পৌঁছে দেবার জন্য। এই বলে, কয়েক শ’ টাকা দোকানের চাবি আর ওর বাইসাইকেল টা বাড়িতে দিয়ে যায়। তারপর থেকেই তো শুরু দীপ্তির সংগ্রাম । কিভাবে সংসার চালাবে। বৃদ্ধ শ্বশুর-শাশুড়ি ,ছোট্ট একটা বাচ্চা । দোকান বন্ধ ,রোজগার নেই । খাবারের ব্যবস্থা নেই । অন্যদিকে স্বামী হাসপাতালে। কি করবে দীপ্তি ?. তাছাড়া দীপ্তি সাদামাটা আটপৌড়ে মেয়ে । লেখাপড়া ক্লাস এইট পর্যন্ত ।, তেমন কোনো চালাক চতুরও নয়। তবুও পাড়ার ক্লাব থেকে কিছু সাহায্য করেছে। কিন্তু সেটাতো সাময়িক। হাসপাতালের খরচ আছে । সবকিছু হাসপাতাল থেকে পাওয়া যাচ্ছে না । দীপ্তি যেন অথৈ জলে পড়ে ।

ওদের পাশের বাড়িতেই থাকে মহিলা মোর্চার সদস্যা রীতা। ওর স্বামী হাসপাতালে আছে জানতে পেরে , খবর নিতে বাড়িতে এসেই দীপ্তি র করুন কাহিনী শুনে ওকে সাহস দেয় , ওকে সহায়তা করার আশ্বাসও দেয়। রীতার পরামর্শমতো একদিন অভাবী দীপ্তি নিজের স্বামীর ছোট্ট স্টেশনারি দোকানটি খুলে বসে। দোকানে জিনিসপত্র বিশেষ কিছুনেই । দোকানে বসেই দীপ্তি বুঝতে পারেে, কেন ওদের এতদিন এত অভাব অনটনে দিন কাটাতেে হয়েছে। নিজেই ধীরে ধীরে মালপত্র দেখে দেখে দাম দেখে নেয় ও বিক্রি করতে শুরু করে দেয়। রীতা ও মহিলা মোর্চার কয়েকজনে মিলে ওকে কিছু টাকা ধার দেয় ,দোকানের মাল পত্র কেনার জন্য। ধীরে ধীরে দীপ্তি জড়তা কাটিয়ে নিজের মধ্যে শক্তি সঞ্চয় করে তোলে। দীপ্তির দোকান ফুলে-ফেঁপে উঠে । মালপত্রে দোকান. ঠাঁসা ঠাঁসি । সকাল ৮ টা থেকে বেলা দুটো পর্যন্ত বাজার খোলা। দীপ্তির এখন আর দোকান থেকে মুখ তোলার উপায় নেই । পাড়ার মহিলারা বেশিরভাগই দীপ্তির দোকানের কাস্টমার । সঙ্গে অন্যান্যরা তো আছেই। এই দেড় মাসেই দীপ্তি একজন সফল ব্যবসায়ী হয়ে ওঠে। নিতাইয়ের ছোট্ট দোকানটি আজ জিনিস পত্রে ঠাঁসা হয়ে বাজারের মধ্যে সেরা স্টেশনারি দোকান হয়ে উঠে ।
হঠাৎই ভাবনার ছেদ পড়ে । অটো এসে বাড়ির দরজায় দাঁড়ায়। ঘর থেকে অটোর আওয়াজ শুনে বৃদ্ধ মা-বাবা আর ওর ছেলে বাইরে বের হয়ে আসে । নিতাই এতদিন পরে বাড়িতে ঢুকে দেখে বাড়িঘর বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ।

তাছাড়া ঘরে কিছু নতুন আসবারপত্র ও এসেছে। নিতাই দীপ্তিকে কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই নিতাইয়ের মা বলে —এ সব বৌমার জন্য হয়েছে । বৌমা আমাদের ঘরের লক্ষী । আর ও তোর দোকান কে খুব ভালোভাবে চালিয়েছে। এমন সময় রীতা ও মোর্চার দিদিরা এসে উপস্থিত হয়। রীতা নিতাইকে বলে —আপনাকে দেখতে এলাম। আর জানাতে এলাম ,দীপ্তি আজ বিজয় লক্ষ্মী নারী । ওকে আমরা ৮ই মার্চ মহিলা মঞ্চে সম্বর্ধনা দেবো।

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ৭:৪১ অপরাহ্ণ | শনিবার, ৩১ জুলাই ২০২১

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

নীরব-নিথর অবয়ব

১৩ সেপ্টেম্বর ২০২১

চন্দ্রাবলী

১৬ নভেম্বর ২০২০

অনুগল্পঃ মানুষ

১০ ডিসেম্বর ২০২০

এডুকেশন

২৩ ডিসেম্বর ২০২০

চারাগাছ

২৬ জানুয়ারি ২০২১

স্বর্গ থেকে বিদায়

০৯ ডিসেম্বর ২০২০

কারিগর

২৪ জানুয়ারি ২০২১

বাটপার

১৩ আগস্ট ২০২০

নিশি মানব

২৫ জুন ২০২১

মালতি

২৫ জুলাই ২০২০