ঘোষণা

গ্রীন রোডের গল্প

সৌম্য দে | বুধবার, ০৭ এপ্রিল ২০২১ | পড়া হয়েছে 130 বার

গ্রীন রোডের গল্প

 

ট্রেন প্লাটফর্মে ঢুকে গেছে,আবিরের টিকিট কাউন্টারে যেতে এখনো প্রায় এক মিনিটের পথ।তারপর লাইনে দাঁড়ানো, টিকিট কাটা সেখান থেকে প্লাটফর্মে আসা।আবির বারবার ঘড়ি দেখছে, অস্থিরতা কাজ করছে। টিকিট কেটে, প্লাটফর্মে গিয়ে আবার ভিড় ঠেলে ট্রেনে উঠতে পারবে তো ?ট্রেনের বাঁশি দিয়ে দিয়েছে । আবির ভীষণ ছুঁটছে…পেছন থেকে মেঘমালা চিৎকার দিয়ে বললোআবির , ছুটো না, রিস্ক নিও না আমি এখানে ।অতোটা ভিড়েও আবিরের কানে কণ্ঠস্বরটি পৌঁছে যায়। দাঁড়িয়ে যায় আবির ।মেঘমালা তার সামনে এসে বলে তোমার দেরি দেখে আমি নিজেই ট্রেন থেকে নেমে পড়েছি ।আবির লজ্জিত আর মেঘমালা উচ্ছ্বসিত ।মেঘমালা আর আবির পরের ট্রেনে উঠে পড়ে।কিছুদূর যেতেই তারা দুজনেই বসার জায়গা পেয়েযায়।মেঘমালা লং জার্নি তে বই পড়ে খুব।কাও শয়েচিনের লেখা ‘দ্য ড্রিম অব দ্য রেড চেম্বার’ মেঘমালার প্রিয় বইদের মধ্যে একটি ।এই উপন্যাসটিকে ‘দ্য স্টোরি অব দ্য স্টোন’ নামেও বলা হয়ে থাকে। প্রেমিক-প্রেমিকার ভালোবাসা ঘরানার কাহিনি নিয়ে গড়ে ওঠা এই উপন্যাসে চীনের মহান সভ্যতার জয়গান গাওয়া হয়েছে।তার থলেতে আর কিছু পাক আর না পাক বই পাওয়া যাবে । বই আর আবির তার প্রাণ ।আবির আর মেঘমালার খুনসুটিটা চালতে ফুলে হলুদ রঙের মতো । সব সময় হাস্যোজ্জ্বল ।মেঘমালার বাড়ি আবিরের থেকে দুটো স্টপেজ পরেই।আবির মেঘমালা কে বিদায় জানিয়ে নেমে যায় ।মেঘমালা বাড়ি ফিরেই কেমন যেন অশনি আভাস পায়।কেউ কোন কথা বলছে না, শুধু চার বছরের ছোট বোনঅনন্যা নিজের মনে খেলে যাচ্ছে ।মেঘমালা এগিয়ে যায় মায়ের কাছে। মায়ের হতাশাগ্রস্ত মুখটা তুলে বলে, মা কি হয়েছে ?মা কান্নায় ভেঙে পড়ে । যেন তার সব স্বপ্ন আশা ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে ।কেঁদো না প্লিজ। বলবে তো কি হয়েছে ? কিছুটা শান্ত হয়ে মা বলেন, তোর বাবার ব্যবসায়ী পার্টনার পঁচিশ লক্ষ টাকা মেরে দিয়ে চলে গেছে। কিছুদিন আগেই তিনি চড়া সুদে কয়েকটি জায়গা থেকে টাকা লোন করে এনেছিলেন ।মেঘমালার বাবা সমর বাবু একজন কাপড়ের ব্যবসায়ী।স্ত্রী সর্বানী দেবী আর তিন সন্তান মেঘমালা , আদর , এবং অনন্যা। তিনজনকে নিয়ে তাদের মধ্যবিত্ত পরিবার।মেঘমালা অত্যন্ত মেধাবী ছাত্রী। এবার উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিয়েছে। মেজো ছেলে আদর সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। অনন্যা সবার খুব আদরের ফুটফুটে কন্যা ।
সব শুনে মাকে সান্তনা দিয়ে মেঘমালা নিজের ঘরে চলে যায় । এবার সে আকাশ পাতাল ভাবতে থাকে।মাস শেষ হলে এতোগুলা টাকার কিস্তি । এতোবড়ো সংসার কি করে চলবে ? এতোগুলা মুখ !!রাত গভীর হতে মেঘমালা বাবার ঘরে এসে তার মাথায় হাত বোলাতে থাকে । সমর বাবু মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলেন। তিনি বলেন আমি বুঝি তোদের অনেক বিপদে ফেলে দিলাম তাই নারে মা !মেঘমালা বাবাকে সান্তনা দিয়ে বলে, আমরা আবার সামলে উঠবো বাবা। তুমি চিন্তা করো না আমি তো আছি। কিছু টিউশনি করে তোমাকে হেল্প করতে পারবো । ঘুমাও তো এখন ।আবার নিজ ঘরে চলে আসে মেঘমালা । সে ঘুমতে পারে না, জানালায় চোখ রেখে উদয়াস্ত ভাবে, কি করে টিউশন বা চাকরি পাওয়া যায় !
সকাল হতেই আবির কে সব খুলে বলে মেঘমালা ।তাদের দুজনের প্রচেষ্টায় দুটো টিউশন জোগাড় হয়ে যায়।আবির হল মেঘমালার শৈশবের বন্ধু । বন্ধুত্বটা গড়িয়ে এখন কাঁচা কাঁচা প্রেমের পর্যায়ে । কেউ কাউকে বলেনি ভালোবাসে কিন্তু প্রকাশভঙ্গিতে অনেকটাই পরিষ্কার ।সমর বাবুর ব্যবসা প্রায় বন্ধ । দোকানে নতুন কাপড় নেই , কাস্টমার নেই । এদিকে দেনাদাররা বাসায় আসতে শুরু করেছে। সমর বাবুর কোন কাকুতি মিনতি তাদের হৃদয়কে স্পর্শ করতে পারে নি ।এর মধ্যে মেঘমালার ভর্তি পরীক্ষার রেজাল্ট বেড়িয়েছে। দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে পড়ার সুযোগ।টিউশনি থেকে বেরিয়ে মেঘমালার নজরে জব ডট কম এর একটি বিজ্ঞাপন চোখে পড়ে ।পার্লারে স্পা করানোর জন্য কিছু সুন্দরী কম বয়সি শিক্ষিত মেয়ে নিয়োগ দেওয়া হবে ।
মেঘমালা রাস্তা পার হয়ে অফিসে ঢুকবে এমন সময় একটি প্রাইভেট কার এসে সামনে দাঁড়ালো। সুটেড বুটেড একজন গণেশাকৃতি লোক বেরিয়ে এসে বললো ম্যাডাম কাউকে খুঁজছেন কি ? মেঘমালা ইতস্তত গলায় বললো, না মানে ওই বিজ্ঞাপনটা দেখে এসেছিলাম ।তিনি নিজের পরিচয় দিলেন , আরিফুর রহমান এই অফিসের ম্যানেজার । আসুন ভিতরে আসুন ।মেঘমালা এবং আরিফ সাহেব দুজনেই ভিতরে গেলেন

মোটামুটি চাকচিক্য পরিবেশ। দেওয়ালের গায়ে ফ্যাশনেবল কিছু সস্তা নারী পোস্টার । আরিফ সাহেব রুমে ডেকে নিলেন মেঘমালা কে ।বলুন কি খাবেন চা , কফি ? মেঘমালা ভীত ও নাজুক গলায় উত্তর দেয় কিছুই খাবে না। টিউশন বাড়ি থেকে এসেছি তো, ওখানে একটু আগে চা খেয়েছি ।আরিফ সাহেব তবু দু কাপ চায়ের অর্ডার দিয়ে বলেন বলুন কিভাবে আপনাকে হেল্প করতে পারি ?মেঘমালা আরিফ সাহেব কে সব ঘটনা খুলে বলে।
তার বাবার ব্যবসাটা যখন চলছিলো প্রতি রাতেই ছোট বোন আর ভাইয়ের জন্য কিছু না কিছু খাবার নিয়ে বাড়ি ফিরতেন। আদর করে কাছে ডেকে খাওয়াতেন। কিন্তু এখন বাবার আয় নেই, তিনি রাতের অন্ধকারে মাথা নিচু করে ঘরে ফেরেন। বাবাকে না পেয়ে ওরা আমার কাছে বায়না করে। আবার বুক ভেঙে আসে। ওদের বড়ো বোন হয়েও তেমন কিছুই করতে পারিনা। বলেই অঝোরে কাঁদতে থাকে ।সেই মুহূর্তে আরিফ সাহেব সুযোগটা লুফে নেন । তিনি চেয়ার ছেড়ে বেরিয়ে এসে মেঘমালার মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বলেন, আপনার জন্য কিছু একটা আমি করবোই । আপনি নিশ্চিন্তে বাসায় যান ।আগামীকাল ঠিক দশটায় আমার অফিসে চলে আসবেন। সেখান থেকে আপনাকে বসের অফিসে নিয়ে যাবো। ওনার কাছে ইন্টারভিউ দিয়ে আপনি নিজেকে প্রমাণ করতে পারলেই আপনার চাকরি পাক্কা ।মেঘমালা সালাম দিয়ে বেরিয়ে আসে, রাস্তায় নেমেই তার কি উচ্ছ্বাস ! তার মনে হচ্ছে সে বাবার পাশে দাঁড়াবে, ব্যবসার লোনের টাকা শোধ করবে, মাকে আর পাওনাদারদের কাছে অপমানিত হতে দেবে না। অনন্যার ক্ষুধা ক্ষুধা নিয়ে আর চিৎকার করবে না ।ইউনিভার্সিটিতে ভর্তিটাও হয়ে যেতে পারবে ।পরদিন সকাল দশটার মেঘমালা অফিসে হাজির হয়কিছুক্ষণ পরেই আলম সাহেব আসেন ।আলম সাহেবের গাড়িতে করেই মেঘমালা আর সে তার বসের অফিসে যান ।বস রাকিব হোসেন একজন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী অপ্রতুল সম্পদের মালিক। মেঘমালা কে ওয়েটিং রুমে বসিয়ে রেখে আলম সাহেব রাকিব সাহেবের রুমে যান । বেশ কিছুক্ষণ পরে দুজনেই হাসতে হাসতে ওয়েটিং রুমে আসেন। রাকিব সাহেব এক নজরে মেঘমালার সমস্ত শরীরে চোখ বুলিয়ে নেন । তারপর আলম সাহেবের হাতে এক বান্ডিল টাকা দিয়ে তাকে বিদায় করেন ।আলম সাহেব যাবার সময় মেঘমালাকে বলেন
স্যারের কাছে ইন্টারভিউ দিয়ে নিজেকে যোগ্য প্রমাণ করে চাকরিটা কনফার্ম করে নেবেন ।এই প্রথম মেঘমালা সতেরো ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাতেও ঘামছে। এই প্রথম সে ভয় পাচ্ছে।এই প্রথম সে মনে করছে বাবা যদি তার সাথে থাকতেন ! এই প্রথম সে চাইছে আবির তার হাত ধরে বসে থাক ।কিন্তু চাওয়া গুলি অধরা থেকে যায় ।রাকিব সাহেব হাসতে হাসতে মেঘমালার দিকে এগিয়ে আসে।চুল ছোঁয়, চিবুক ছোঁয়, স্তনাগ্র… ,মেঘমালা প্রতিবাদ করতে পারে না। খাঁচায় বাঁধা পাখির ডানা ঝাপটানো ছাড়া আর কি’ই বা করার থাকে !মেঘমালার যখন টানে টানে খসে পড়ছে লজ্জা রাকিব সাহেব তখন মনে করিয়ে দেন ,অনন্যার ক্ষিধে মুখ , আদরের আবদার, মায়ের অপমান, বাবার হতাশা আর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির স্বপ্ন।
তার ভিতরে চিৎকার করে ওঠে ব্যাথা। ধোঁয়ার মতো চোখ খুলে জল বেরিয়ে আসতে চায় । আবিরের নিঃস্বার্থ মুখটা বার বার জলছবির মতো ভেসে আসে মনের উপর । কিন্তু না সব কিছুকে গিলে খায় রাকিব নামের পাইথন ।

গল্পটা এখানেই শেষ হতে পারতো কিন্তু নাবরঞ্চ এখান থেকেই গল্পের শুরু ।
মেঘমালা এখন মাসে চার থেকে পাঁঁচবার ডেইট করে। শিল্পপতি, রাজনীতিবিদ, সরকারি চাকরিজীবী, পুলিশ কর্মকর্তা এরাই এখন মেঘমালার দ্বিতীয় ঈশ্বর। প্রায় লাখ টাকার মতো ইনকাম তার। তার লজ্জা বিক্রির টাকায় সংসারের সচ্ছলতা ফিরতে থাকে। যোগাযোগ কমতে থাকে বা কমিয়ে দেয় আবিরের সাথে । দিনের পর দিনসে আবিরকে উপেক্ষা করে। ইচ্ছে করেই করে কারণ মেঘমালা আবিরকে ঠকাতে চায় না । যে জীবনে সে জড়িয়ে গেছে সেখানে কেবল তলিয়ে যাওয়া সম্ভব ভেসে ওঠা নয়।এই গল্পটা এতক্ষণ মেঘমালা এক নিউজ রিপোর্টার কে করছিলো । সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে তার সাথে পরিচয় ৷ তারপরে ধ্বসে যাওয়া এই জীবনের গল্পটা বলতে শুরু করে সে ।মেঘমালা ফিরতে চায় ভীষণ ভাবে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চায়। সে চায় কেউ তাকে বকুক, শাসন করুক। ভাত মেখে খাইয়ে দিক। গান শোনাক কেউ একজন। শীতে শরীর কাঁপতে থাকলে কেউ এসে চাদরটা টেনে দিক গায়ের উপর। কিন্তু চাওয়াদের তো হাত থাকে না, যে চাইলেই কোনো এক নিরাপদ হাত জাপটে ধরবে সে । জীবনটা এখন একটা রসিকতার মতো জ্বলে–পুড়ে ছাই হয়ে যাবে কিন্তু এই কষ্ট কান্না যন্ত্রণা কাউকে বোঝানো যাবে না । বিধাতাকে বলতে ইচ্ছে করে আমার জীবন নিয়ে এমন জুয়া কেন খেললে?
কেন ওই গ্রীন পার্কের মোড়ে আমায় নিয়ে দাঁড় করালে?আমার তো মাত্র উনিশের একটি বিকেল জীবন তাকে কেন তুমি ঘনো অমাবস্যায় ঢেকে দিলে ! আমার পাঁজর কাঁপানো দীর্ঘশ্বাস কি তোমায় স্পর্শ করে না !কিছুক্ষণ পরে মেঘমালা দেখছে জার্নালিস্টের চোখে জল টলটল করে বেয়ে পড়ছে। তাদের ট্যাক্সির বাইরে একজন অগোছালো চুল–দাড়ির যুবক হন্যে হয়ে কাকে যেন খুঁজছে ।অবিকল আবিরের মতো দেখতে ।।

 

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ৭:৪৬ অপরাহ্ণ | বুধবার, ০৭ এপ্রিল ২০২১

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

চন্দ্রাবলী

১৬ নভেম্বর ২০২০

এডুকেশন

২৩ ডিসেম্বর ২০২০

অনুগল্পঃ মানুষ

১০ ডিসেম্বর ২০২০

চারাগাছ

২৬ জানুয়ারি ২০২১

কারিগর

২৪ জানুয়ারি ২০২১

স্বর্গ থেকে বিদায়

০৯ ডিসেম্বর ২০২০

বাটপার

১৩ আগস্ট ২০২০

মালতি

২৫ জুলাই ২০২০

 ফুটপাথ

৩০ জুলাই ২০২০

অলিভিয়া

০৭ এপ্রিল ২০২১

আমাদের গল্টু

১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১