ঘোষণা

আজ ৬ ই অগাস্ট, হিরোশিমা দিবস

ডঃ আশির আহমেদ, জাপান। | বৃহস্পতিবার, ০৬ আগস্ট ২০২০ | পড়া হয়েছে 171 বার

আজ ৬ ই অগাস্ট, হিরোশিমা দিবস
হিরোশিমার হিরো রা জাপানি ভাষায় “হিরোশিমা”র “হিরো” মানে প্রশস্ত “শিমা” মানে দ্বীপ। বাস্তবে হিরোশিমা আলাদা কোন দ্বীপ না। হিরোশিমা বিশ্বে কেন পরিচিত তা আমাদের সবার জানা। কত বড় বোমা পড়েছিল, কে ফেলেছিল, কতজন মারা গিয়েছিল- এসব পরিসংখ্যান গুগল চাচ্চু কে জিজ্ঞাস করলেই পেয়ে যাবেন।
.
ক্লাস সেভেনে পাঠ্য বইয়ে হিরোশিমা র কথা পড়েছি। শিউরে উঠেছি। আর জাপানে এসে কয়েকবার নিজ চোখে দেখার সৌভাগ্য হলো। যতবার হিরোশিমা তে যাই, মনে হয় শুধু হতাশ হয়ে ফিরি। তারপর ও বন্ধুবান্ধবরা জাপানে এলে হিরোশিমা দেখতে চায়। নিয়ে যাই। বর্তমানে কি আছে সেখানে? টুরিস্টরা কেন আসেন? কি দেখেন? কি মনে নিয়ে ফিরেন?
.
হিরোশিমা তে আসলে দেখার কিছুই নাই। তবে অনুভব করার অনেক কিছুই আছে। রানা প্লাজা যেখানে ছিল, ন্যু-য়র্কের টুইন টাওয়ারটা যেখানে ছিল, সেখানে একটা শূন্যস্থান থাকা, আর জনবসতি গড়ে ওঠা আলাদা জিনিস।
.
বোমার কাজ বোমা করেছে, একটা বিল্ডিং ছাড়া সারা শহরকে ছাই করে দিয়ে কিছু অদৃশ্য রশ্মি বিকিয়ে দিয়ে গেছে। যারা কষ্ট পেতে চাননি, তারা একবারে ছাই হয়ে গেছেন। যারা বেঁচে গেলেন, তাদের মর্মান্তিক কাহিনি শুনতে হলে মিউজিয়ামে রাখা জাপানিজ দের জাপানি ভাষার ডায়েরি গুলো পড়তে হবে। বললাম না, হিরোশিমাতে দেখার কিছুই নেই।
.
একটি মাত্র দাঁড়িয়ে থাকা বিল্ডিং এর সেই হিরোশিমা শহর। দশ বছরের মধ্যেই চেহারা সুরত পাল্টে গেল। সাক্ষী হয়ে রইল শুধু – একটা Peace Memorial Park আর একটা ছোট মিউজিয়াম। পুরো শহরটা যেমন শূন্য ছিল তেমন রাখলে কি হতো? অদৃশ্য হাহাকার প্রকাশ করার জন্য কি শূন্যতার বিকল্প আছে?
.
বছর ঘুরে অগাস্ট মাস আসলেই টিভিতে কিছু অনুষ্ঠান দেখায়, যুদ্ধ-বিরোধী কিছু লোকজন শান্তির স্লোগান দিতে থাকেন। সেই স্লোগান পারমানবিক শক্তি নিয়ে যারা বড়াই করেন, বাণিজ্য করেন, তাদের কানে পৌঁছে বলে মনে হয়না। বহির্দৃশ্যের কথা বাদ। কিছু অন্তর্দৃশ্যের কথা বলি। তার আগে বহির্দৃশ্য।
.
(১) নাগাসাকির বোমা খানা মিস টার্গেট হয়েছিল। ককুরা নামের আরেকটা শহর আছে- ওটা ছিল প্রথম টার্গেট। আকাশে মেঘ থাকায় বিমানের পাইলট সাহেব সঠিক জায়গা চিনতে ভুল করেছিলেন। যাদের মরার কথা ছিল, তারা মরতে পারলো না।
(২) অগাস্ট ৬ তারিখ হিরোশিমায়, ৯ তারিখ নাগাসাকিতে বোমা ফেলা হল। এই দুই দিন এই দেশে সরকারি কোন ছুটি নেই। কাইন্দা কাইট্টা শোক দেখাইয়া লাভ কি? বরং বেশি কইরা কাম কাইজ করো, প্রোডাক্টিভিটি বাড়াও, দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাও -এটাই জাপানিদের দেশপ্রেম। যে মরে গেছে সে ও খুশি, যে জন্ম নিয়ে আসবে সে ও খুশি। খুশি খুশি সিচুয়েশন।
(৩) বোমা বহনকারী বিমানের নাম ছিল এনোলা গে। এটা ছিল পাইলটের মা এর নাম। বিমানটি বর্তমানে আমেরিকার ওয়াশিংটন ডিসি-র সিম্থসোনিয়ান এয়ার এন্ড স্পেস মিউজিয়ামে রাখা আছে। ২০০৩ সালে স্বচক্ষে দেখে এসেছি। কটমট করে। যাকে গালি দেয়ার দিয়ে এসেছি।
(৪) অনেকে মনে করেন, বোমাটা জাপানের পাওনা ছিল। না হয় দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শেষ করার কোন উপায় ছিল না। বর্তমানের শান্তিপ্রিয় জাপানি আর যুদ্ধক্ষেত্রের জাপানিদের চেহারা ভিন্ন। দুটো উদাহরণ দিচ্ছি-
(ক) দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে ফিলিপাইনের করিহেডর দ্বীপ জাপানিরা আমেরিকার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিল। দ্বীপে খাদ্য সরবরাহ না থাকায়, ক্ষিধা সহ্য করতে না পেরে আটককৃত আমেরিকান সৈন্যদের ধরে জবাই করে সুশি-সাশিমি বানিয়ে কাঁচা খেতে শুরু করল।
(খ) হারাকিরি (পেট কেটে আত্মহত্যা) করার জন্য এক ধরনের জাপানিজ তলোয়ার (কাতানা) ব্যবহার করা হতো। এইসব কাতানা কতটুকু ধারালো তা টেস্ট করার জন্য জীবিত চাইনিজদের উপর পরীক্ষা নিরীক্ষা করতো।
.
এইবার আসি কিছু অন্তর্দৃশ্যের কাহিনিতে।
.
(১) সাদাকো কাহিনি
মেয়েটির পুরো নাম সাসাকি সাদাকো। হিরোশিমায় যেদিন বোমা পড়লো তখন তার বয়স মাত্র দুই। হাইপো সেন্টার থেকে সাদাকোদের বাড়ি ছিল দুই কিলোমিটার দুরে। সাদাকো ঘরেই ছিল। বোমার ঝাপটায় সাদাকো সহ ঘরের সবকিছু ছিটকে বেরিয়ে গেল। মা বাইরে ছিলেন, ভাবলেন মেয়ে শেষ। গিয়ে দেখেন অলৌকিক কাণ্ড। সুস্থ-স্বাভাবিক আঘাতহীন মেয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে।
.
সাদাকো স্বাভাবিক ভাবেই বড় হয়ে উঠছিল। ১৯৫৫ সালে ১২ বছর বয়সে সাদাকোর এক রোগ স্পষ্ট হয়ে উঠল। লিউকোমিয়া। এই রোগের স্থানীয় নাম ছিল এটম-বোম-রোগ। একই রোগে অনেক শিশু মারা যাচ্ছিল। সাদাকো এই খবর জানতো, নিজের পরিণতি ও বুঝতে পেরেছিল।
.
একদিন সাদাকোর বন্ধু এসে এক অদ্ভুত কাহিনি শুনিয়ে গেল। বলল-
সুস্থ যদি হতে চাও …………………….
রঙ্গিন কাগজ হাতে নাও …………
হাজারটি সারস পাখি বানাও…
.
জাপানিরা বিশ্বাস করতো, সারস পাখি ১০০০ বছর বাঁচে। সাদাকো বাঁচতে চাইল। বন্ধুর কথা বিশ্বাস করে এক এক করে কাগজ ভাঁজ করা শুরু করলো। ৫০০ পাখি বানানোর পর সাদাকো সুস্থ অনুভব করলো। ডাক্তার হাসপাতাল থেকে বাড়ি যাবার অনুমতি দিল। কিছুদিনের মধ্যেই আবার অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হল। আবার কাগজ ধরলো। কিন্তু দিন দিন শারীরিক শক্তি কমতে লাগল। ৬৪৪ টা পর্যন্ত বানিয়ে আর পারলোনা।
.
স্কুলের বন্ধুরা সাদাকোকে অমর করতে চাইলো। বাকি ৩৫৬টি বানিয়ে কবরে দিয়ে আসবে এটাই প্ল্যান। এই খবর ছড়িয়ে গেল। দেশবিদেশের ৩১০০টি স্কুল তাদের ডাকে সাড়া দিল। লক্ষ লক্ষ সারস পাখি সাদাকোর কবরে স্থান পেল। ৩ বছরের মাথায় স্কুল ছাত্রদের উদ্যোগে একটা ফান্ড তৈরি হলো। সেই ফান্ড দিয়ে তৈরি হল একটি মনুমেন্ট। Hiroshima Peace Park এর ভেতর, বোমা খানা যেখানে পড়েছিল, তার পাশেই। মনুমেন্টে লেখা শিশুদের স্লোগানটি হলো-
.
This is our cry, This is our prayer, Peace in the world.
এই লেখাটুকুর দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায়। শত সহস্র সাদাকোদের বেঁচে থাকার শেষ আর্তনাদটুকু অনুভব করা যায়।
.
মানুষতো মরবেই। কিন্তু মৃত্যু যন্ত্রণাটা ভিন্ন। রাজনের মৃত্যু যন্ত্রণা, বিশ্বজিতের, আরবাবের মৃত্যু যন্ত্রণা আলাদা। বোমার আঘাতে তাৎক্ষনিক মৃত্যু, ম্যানুয়েল কিলিং আর অজানা অচেনা রোগে ধুঁকে ধুঁকে মরার পেইন আলাদা।
মিউজিয়ামের ভেতরে সাদাকোর স্কুল জীবনের প্রাঞ্জল ছবি আছে। নিজ হাতে বানানো সারস পাখি আছে। ক্ষুদ্র হাতের তৈরি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পাখি। হাসপাতালে থাকাকালীন নার্সদের লেখা রক্তের শ্বেতকণিকার কাউন্ট আছে। মৃত্যুর পর তাঁর ক্লাসমেটরা যে লিফলেট লিখে টাকা যোগাড় করছিল সেই লিফলেটটি তে বন্ধুদের ভালোবাসা আছে।
হিরোশিমা যাবার সুযোগ হলে লক্ষ লক্ষ কাগজের সারস পাখি দিয়ে ঢাকা সাদাকো মনুমেন্টটি দেখে আসতে পারেন। ঘটনাটি জানা থাকলে সাদাকোদের আর্তনাদ শুনতে পাবেন।
.
(২) কামিকাজে পাইলট
কামিকাজে-র শাব্দিক অর্থ হলো ঐশ্বরিক বাতাস। কিন্তু এই ঘটনার মধ্যে ঐশ্বরিক কিছুই নেই। বলতে পারেন সুইসাইড বোম্বারস। একটা প্লেন + এক পিস বোমা + এক পিস পাইলট = একটা প্যাকেজ। জেনারেল সাহেবরা একটা করে প্যাকেজ “যাও পাখি বল তারে” সিগন্যাল দিয়ে পাঠিয়ে দিতেন। পাইলট সাহেব আমেরিকার নৌবহর দেখিবা মাত্র প্লেন সহ ঝাঁপিয়ে পড়তেন। প্লেন শেষ, বোমা শেষ, পাইলট শেষ। জেনারেল সাহেব হুঙ্কার দিতেন, নেক্সট।
গত পরশু টেলিভিশনে এক কামিকাজে পাইলটের কাহিনি দেখালো।
শত সহস্র পাইলট গন প্যাকেজ হবার আগে পরিবার থেকে বিদায় নেয়ার জন্য জড়ো হয়েছেন।
.
আমাদের দেশে সিনেমা নাটকে এমন সিন থাকে। ছেলে বিদায় নিচ্ছে। বলছে “মা যাই”। মা শুধরিয়ে দিচ্ছেন, “না বাবা, বলতে হয়, মা আসি”।
.
জাপানে ও একই ধরণের গ্রিটিংস আছে। বলতে হয় “ইত্তে কিমাস” (গিয়ে আসি)। কিন্তু কামি কাজে-র ক্ষেত্রে আলাদা। এগুলো ওয়ান ওয়ে ট্রিপ। ফিরে আসার কোন সুযোগ নেই। সবাই জানে। তাই অতি হৃদয়বিদারক মনে হলে ও এদের বলতে হতো- “ইকিমাস” (যাই)। শুধু যাই। ফিরে আসবোনা।
.
তার মধ্যে এক পাইলট ছিল, নাম তার হাসেগাওয়া। হাসতে হাসতে গাইতে গাইতে প্লেনে উঠলেন। মাথায় জাপানের পতাকার লাল সুর্যের মার্ক ওয়ালা সাদা কাপড়ের ফিতা। পতাকার লাল সূর্যের পাশে লাল অক্ষরে কি যেন লেখা।
.
হাসেগাওয়া বিয়ে করেছিলেন যুদ্ধে যাবার ৩ মাস আগে। বউ এর পেটে ৩ মাসের বাচ্চা। বউ সাহস করে বিদায় দিতে আসতে পারেনি। “ইকিমাস” শোনার সাহস পাননি। প্লেনের ওঠার আগে পাইলট সাহেব নিজের আঙ্গুলে কামড় দিয়ে রক্ত বের করে লিখলেন বউয়ের নাম। ৎসুনেকো। ৭০ বছর ধরে আর্কাইভ হয়ে থাকা ভিডিও থেকে এই দৃশ্য খুঁজে পেতেই টেলিভিশনের প্রযোজক সাহেব ৎসুনেকোর বাড়িতে গেলেন। ৩ মাসের সেই বাচ্চার বয়স আজ ৭০ বছর ৩ মাস। সে তার মার লেখা ডায়েরি দেখালো। অপেক্ষা করা আর অপেক্ষা না করতে পারার কাহিনি।
.
সহেনা যাতনা, দিবস গনিয়া গনিয়া বিরলে
নিশিদিন বসে আছি শুধু পথ পানে চেয়ে
-এমন ভাব প্রকাশ করার সুযোগ ৎসুনেকোর ছিল না।
.
এমনি করে হারিয়ে গেলেন ৩৮৬০ জন কামিকাজে পাইলট। হারিয়ে গেলেই কি হিরো হওয়া যায়?
Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ৩:৫৪ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০৬ আগস্ট ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত