ঘোষণা

জাপানে সফল বাঙালির গল্প

ভাইকে দেখতে এসে নিজেই থেকে গেলেন জাপানে আবদুল্লা বিন সিদ্দিক

পি আর প্ল্যাসিড, | সোমবার, ১৬ নভেম্বর ২০২০ | পড়া হয়েছে 105 বার

ভাইকে দেখতে এসে নিজেই থেকে গেলেন জাপানে আবদুল্লা বিন সিদ্দিক

১৯৮৮ সালের কথা। খুলনার ছেলে আব্দুল্লাহ বিন সিদ্দিক উরফে মারু। এখন বয়স তার সাতান্ন (৫৭) প্লাস। খুলনায় জন্ম, খুলনার সদরেই তার বেড়ে উঠা। পড়া লেখা করেছেন খুলনার মিশনারীদের দ্বারা পরিচালিত, সেন্ট যোসেফ হাই স্কুলে। এসএসসি পেরিয়ে ভর্তি হলেন খুলনার অতি পরিচিত বি এল কলেজে। সেখানেই ডিগ্রী সম্পন্ন করেছেন। এর পরপরই জাপানে পারি জমান। টোকিওতে বাঙ্গালী কমিউনিটিতে অতি পরিচিত আমাদের এই আব্দুল্লাহ বিন সিদ্দিক। বর্তমানে তিনি আমেরিকানদের পরিচালিত একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে আইটি ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।
সম্প্রতি আমরা সময় করে বসেছিলাম তাঁর জীবনের গল্প শোনার জন্য। তিনি আমাকে বেশ সাজিয়ে গুছিয়ে বললেন তাঁর অতীত, বর্তমান এবং আরো কিছু প্রাসঙ্গিক বিষয় নিয়ে। জাপানে কম বেশি প্রায় সকলেই পেশাগত কাজের বাইরে কোনো না কোনো কাজে ব্যস্ত। এই ব্যস্ততার মাঝে কেউ কাউকে সময় দিতে কয়েকবার অন্তত ভাবেন। আমার সাথে এই বসার বেলায় তিনি বেশ কয়েকদিন ভেবেছেন। অবশেষে আমার অনুরোধ তিনি রাখলেন তাঁর জীবনের গল্প বলার জন্যে। যা আপনারা বিবেকবার্তার জাপানে বাঙ্গালী বিভাগে পড়ার সুযোগ পাচ্ছেন।

আব্দুল্লাহর গল্পটা এমন। জাপানে একসময় আব্দুল্লাহ বিন সিদ্দিকের ছোটভাই এসেছিলেন পড়ালেখা করতে। এটা ছিল আশির দশকের কথা। তখন জাপানের অর্থনৈতিক অবস্থা কেবল ভালোর দিকে এগুতে শুরু করেছে। তখন আজকের মত চাকুরি এত সহজলভ্য ছিল না। চাকুরি করলেও আজকের মত এত ভালো বেতম পেতেন না অনেকেই। যে কারণে তার ছোটভাই পড়া লেখা করার পাশাপাশি নিজের খরচ চালানোর জন্য যা-ই রোজগার করতেন তা দিয়ে বেশ কষ্ট হতো নিজের খরচ চালাতে। আবার পড়ালেখা ভালোভাবে করতে গিয়ে বাড়িতে তার বাবা-মা, ভাই-বোনদের সাথে গিয়ে দেখা করার মত সময় বের করতে পারছিলেন না, তাই আব্দুল্লাহ বিন সিদ্দিক তাঁর ভাইকে কিছুটা সহযোগিতা করার কথা চিন্তা করে এবং ভাইকে দেশে পাঠিয়ে ছুটি কাটানোর জন্য জাপান এসেছিলেন। পরবর্তীতে দেশে আর ফিরে যাননি তিনি। ভর্তি হয়ে গেলেন একটি আইটি ইন্সটিটিউটে। সেই যে এলেন, এরপর জাপানে তাঁর তিন যুগ পেরিয়ে গেলো এখন পর্যন্ত রয়ে গেলেন জাপানে।

জনাব আব্দুল্লাহ বিন সিদ্দিক একসময় জাপানে বাংলাদেশিদের দ্বারা পরিচালিত সাংস্কৃতিক সংগঠন স্বরলিপির একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন। যদিও তিনি বর্তমানে নানা কারণে আগের মতন সংগঠনের কার্যক্রমের সাথে সক্রিয় নন তবে আঞ্চলিক সংগঠন গ্রেটার খুলনা সোসাইটির একজন সক্রিয় সদস্য হিসেবে কাজ করছেন তিনি। এই সংগঠনের কার্যক্রমের সাথে জড়িত থাকার কারণে টোকিওতে বাঙ্গালীদের দ্বারা আয়োজিত প্রায় সকল অনুষ্ঠানাদিতে সপরিবারে তাকে দেখা যায় অংশগ্রহণ করতে।

দেশে ছাত্রজীবনে তিনি নাট্য চর্চা করতেন। সে সময় তিনি লেখালেখিও করতেন বলে তিনি জানালেন। ছাত্র জীবনে বিশেষ করে তিনি গল্প এবং নাটক লিখতেন। যে কারণে ইচ্ছে ছিল তার নাট্য শিল্পী হবার কিন্তু বাস্তবতা তাকে বানিয়েছে একজন সফল সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ার।
তাঁর বাবার নাম সিদ্দিক আহমেদ । তিনি ছিলেন খুলনা শহরে একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। ব্যবসায়ী হবার কারণে পরবর্তীতে খুলনা শহরে ব্যবসায়ীদের স্বীকৃত সংগঠন খুলনা চেম্বারের সভাপতি নির্বাচিত হন। বাবার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নাম ছিল বেঙ্গল হার্ডওয়্যার মার্ট। ছাত্র থাকা অবস্থায় বাবার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে একসময় তিনি নিজে ব্যবসা করতে শুরু করেছিলেন।

১৯৮৫ সালের কথা। চট্টগ্রামের বাবার বন্ধু থেকে নাইলন এবং মেনিলা রোপ এনে খুলনার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সাপ্লাই করার মাধ্যমে ছাত্রজীবনেই ব্যবসা কাজের যাত্রা শুরু করেন তিনি। তিনি জানান, প্রথম (টেন্ডারে) চালানেই তিনি সেই সময়ে লাভ করেছিলেন প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা। লাভের এই টাকা থেকে প্রথম তিনি তার বাবা-চাচাকে লুঙ্গী এবং মা-চাচীদের জন্য শাড়ি কিনে উপহার দিয়েছিলেন। এছিল তাঁর সুখের স্মৃতি।
পরবর্তীতে নবাবপুর থেকে বিভিন্ন নাট বল্টু কিনে নিজেদের দোকানে বা তাদের আশেপাশের দোকানে বিক্রি করতে থাকেন এবং ইমামগঞ্জ থেকে বাবার নাম ভাঙ্গিয়ে বাকিতে মাল কিনে নিয়ে ব্যবসা করতেন। একসময় সুন্দরবন থেকে সুন্দরী কাঠ কিনে নিয়ে সাপ্লাই দিতেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে। ব্যবসার কাজ তিনি সর্বসাকূল্যে দেড় বছর করেছেন বলে জানান।

শুরুতেই বলেছি আব্দুল্লাহ বিন সিদ্দিকের ডাক নাম মারু। মারু একটি জাপানি শব্দ, যার বাংলা অর্থ গোলাকার বা বৃত্ত। তার নামের সাথে জাপানি শব্দ যোগ হবার পিছনে একটি সুন্দর কারণ বা গল্প রয়েছে যা আমাকে ব্যাখ্যা করে শুনালেন তিনি। আব্দুল্লাহর যখন জন্ম হয় তখন তার বাবা মঙ্গলা পোর্টে একটি জাপানি জাহাজ থেকে মাল খালাস করার কাজে নিয়োজিত ছিলেন এবং জাপানি সেই জাহাজের নাম ছিল টোকিও মারু। তাই তাঁর জন্ম সংবাদের পর তাঁর বাবা ঠিক করলেন আব্দুল্লাহ বিন সিদ্দিকের ডাক নাম রাখা হবে মারু, সেই থেকে ডাক নাম হলো তাঁর এই মারু।

জাপানে তিনি তাঁর ছোটো ভাইকে কিছুটা রিলাক্সা করাতে আসার কথা চিন্তা করে আসার পর দুই ভাই একসাথে পরামর্শ করে পরবর্তীতে একটি আইটি শিক্ষা ইন্সটিটিউটে ভর্তি হন এবং শিক্ষা কোর্স সমাপ্ত করার পর জব হান্টিং করতে চেষ্টা করেন। আব্দুল্লাহ বিন সিদ্দিক জানালেন কাজ পাবার আশায় মোট দশটি প্রতিষ্ঠানে চাকুরীর দরখাস্ত করেছিলেন কিন্তু ছোটো ভাইয়ের সাথে পরামর্শ করে দুইভাই পরবর্তীতে দেশে একসাথে কিছু করার প্রত্যাশায় কাজের সুবিধা হবে মনে করে যোগদান করেন জাপানের বৃহৎ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তপ্পানে। কিন্তু সেই স্বপ্নও তার হারিয়ে যায় জাপানে জীবনের নিরাপত্তা আর জাপানিদের আচার ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে। অর্থাৎ দেশে ফিরে গিয়ে কিছু করার স্বপ্ন মিশে গেলো এই দেশে থেকে গিয়ে। এর পিছনে অবশ্য তিনি বললেন অন্য গল্প। দেশে গিয়ে তার স্বপ্ন সফলের পরিকল্পনা করলেও তাঁর ভাই জাপানের বৃহৎ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কানেবোর (Kanebo) থেকে চাকুরি ছেড়ে দেশে চলে গিয়েছিলেন কিছু করার আশায়। কিন্তু দেশে তখন রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং নানাবিধ কারণে ব্যর্থ হয়ে দেশ থেকে চলে যান সিঙ্গাপুর। সেখানে তিনি এখন সফল বলা যায়। তার ছোটো ভাইয়ের দেশে এই ব্যর্থ হওয়ার বিষয়টি মাথায় ভর করায় নিজেও মুখ ফিরিয়ে আনেন দেশে কিছু করার পরিকল্পনা থেকে। পরবর্তীতে স্ত্রীকে নিয়ে পরিবারের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে ফিরে আর যাওয়া হয়নি। বর্তমানে দুই ছেলে-মেয়ের জনক তিনি।

বিয়ের পর স্ত্রীকে দেশে রেখে এসেছিলেন পরিবারের অন্য সদস্যদের সাথে। তখন তাঁর সদ্য বিবাহিত স্ত্রী পারিবারের অন্য সদস্যদের সাথে সবকিছু মিলিয়ে নিতে ব্যর্থ হন, যা সচরাচর আমাদের বাঙ্গালী ফ্যামিলিগুলোতে ঘটে থাকে। এ সকল কারণে পরিবারের উপর তার কিছুটা ক্ষোভ জন্মেছিল। এমনকি জন্মদাত্রী মায়ের প্রতিও ছিল তাঁর কিছুটা রাগ, অভিমান, ক্ষোভ। এই কারণেই অনেকদিন পর্যন্ত মায়ের সাথে ছিল তাঁর কথা বলা বন্ধ। বর্তমানে তাঁর মা জীবিত নেই তবে মায়ের সম্পর্কে বলতে গিয়ে জানালেন এখন পর্যন্ত তাঁর মন জুড়ে রয়েছেন তার মা-ই। মায়ের প্রতি আজকের অফুরন্ত ভালোবাসা যেনো সেই অভিমান কারণেই জন্মেছে। তাঁর জীবনের ব্যক্তিগত এই গল্প বলতে বলতে একসময় তাঁর চোখ ভিজে যাওয়া দেখে বুঝতে পারি তিনি যে কতটা বিশাল হৃদয়ের মানুষ।

তিনি জানালেন, সবচেয়ে বড় বিষয় দেশের চেয়ে এখানে (জাপানে) সবকিছুরই নিশ্চয়তা বা জীবনের নিরাপত্তা রয়েছে যে কারণে দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশে নিজে বা পরিবারের অন্য কোনো সদস্যদের নিয়ে প্রতিবছর বেড়াতে গেলেও একেবারে (স্থায়ীভাবে) যাবার কোনো পরিকল্পনাই বর্তমানে নেই। এখানে সরকারকে ত্রিশ বছর ধরে নিয়মিত ট্যাক্স দিয়ে যাচ্ছেন সুতরাং চাকুরি থেকে অব্যাহতি নিলে পেনশনের টাকা পাবেন, সেই পেনশনের টাকা দিয়েই বাকি জীবন কেটে যাবে তাঁর, তাই এখানে তাঁর কোনোকিছুতেই অনিশ্চয়তা নেই যেজন্য দেশে আর ফিরে না যাবার সম্ভাবনাই বেশি।

দীর্ঘদিন জাপানে থেকে এতকিছুর প্রশংসা করলেও জাপানের পাসপোর্ট নিতে আগ্রহী নন তিনি। এর কারণ জানতে চাইলে বললেন, আমি বাঙ্গালী হিসেবে জন্ম গ্রহণ করেছি, এই বাঙ্গালী হিসেবেই মরতে চাই। তবে মৃত্যুর পর তাঁর লাঁশ দেশের মাটিতে কবরস্থ করার ইচ্ছে ইতিমধ্যে স্ত্রী এবং ছেলে মেয়েকে জানিয়ে দিয়েছেন।

দেশে কিছু করার ইচ্ছে আছে কিনা জানতে চাইলে বললেন, জাপান আসার পর নানা-নানীর কবরের পাশে মায়ের তৈরি একটি মসজিদ নির্মান কাজে সহায়তা করেছেন, যেখানে তার নিয়মিত একটা কন্ট্রিবিউট রয়েছে। দেশের বর্তমান রাজনীতি সম্পর্কে তিনি জানালেন, বাংলাদেশের রাজনীতির প্রতি বিন্দুমাত্র দুর্বল নন তিনি বরং যদি বলা হয় তিনি দেশের বর্তমান রাজনীতির অবস্থা দেখে রীতিমত হতাশ এবং ঘৃণা প্রকাশ করেন।

এ পর্যন্ত তার কাজের জন্য এবং ভ্রমণ করা দুটো মিলিয়ে যে সকল দেশ ভ্রমণ করেছেন সেসকল দেশ গুলো হচ্ছে, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, হল্যান্ড, জার্মানি, ইউরোপ। এশিয়ার- চায়না, হংকং, মালোয়েশিয়া, ইন্ডিয়া, থাইল্যান্ড, সিংগাপুর নাম বলেছেন তিনি। এছাড়া আমেরিকার হোম ল্যান্ডে না গেলেও তাদের অঙ্গরাজ্যগুলোতে গিয়েছেন বেশ কয়েকবার বলে জানিয়েছেন তিনি।

বিবেকবার্তার পক্ষ থেকে আমরা মি আব্দুল্লাহ বিন সিদ্দিকী উরফে মারুর আগামীদিন গুলো সুন্দর-সার্থক হোক, সেই প্রত্যাশ্যা করি। সে সাথে তার সুস্বাস্থ্য ও মঙ্গল কামনা করি।

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ৯:১২ পূর্বাহ্ণ | সোমবার, ১৬ নভেম্বর ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |