ঘোষণা

জাপানে সবার পরিচিত মুখ ফটোগ্রাফার শহীদুল হকের জীবনযাত্রা

।। পি আর প্ল্যাসিড।। | বুধবার, ২৬ আগস্ট ২০২০ | পড়া হয়েছে 277 বার

জাপানে সবার পরিচিত মুখ ফটোগ্রাফার শহীদুল হকের জীবনযাত্রা

 

শহীদুল হক, বয়স ৫০। দেশে তাঁর বাড়ি মুন্সিগঞ্জ জেলার গজারিয়ায়। বাড়ি মুন্সিগঞ্জের গজারিয়াতে হলেও জন্ম পুরাতন ঢাকার গেন্ডারিয়াতে। কিশোরকাল, যৌবনকাল কেটেছে তাঁর সেখানেই।

বাবা-মার ইচ্ছাতে ছোট সময় মাদ্রাসায় পড়ালেখা করেছেন। কিন্তু মাদ্রাসায় তার স্বাধীন চেতা মন শেষ পর্যন্ত থাকার পক্ষে সায় দেয়নি। একারণে স্বাভাবিক জীবন যাপনের জন্য মাদ্রাসা ছেড়ে শুরু করেন অন্য দশজন ছেলে-মেয়ের মত দেশের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা। স্কুল পেরিয়ে ভর্তী হন পুরাতন ঢাকায় অবস্থিত হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজে। সেখানে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে ভর্তি হন কারাতে প্রশিক্ষণ ক্লাসে।

দেশে কারাতে ফ্যাডারেশনের অধিনে শিক্ষা গ্রহণ শেষে কুমিল্লা ক্যাডেট কলেজে ক্যাডেটদের শিক্ষক হিসেবে কাজ করেছেন এক বছর। এরপর তার যিনি কারাতে শিক্ষক ছিলেন তাঁর সহযোগিতায় ১৯৮৮ সালের এপ্রিল মাসে শহীদুল হক চলে আসেন জাপান। জাপান আসার পর টোকিও ওয়াই এম সি এ-তে কারাতে প্রশিক্ষণ কোর্সে ভর্তি হয়ে কারাতে প্র্যাকটিস শুরু করেন। একসময় জাপান কারাতে ফেডারেশন থেকে ব্ল্যাক বেল্ট অর্জন করেন।

জাপানে আসার পর থেকে শহীদুল হক অন্য বাঙ্গালীদের মত কাজ পাগল হয়ে স্রোতের সাথে ভেসে যাননি। সবসময় চেষ্টা করেছেন অন্যদের থেকে ভিন্ন কিছু করার জন্য। যে কারণে জাপানিদের কাছে নিজেকে অন্যরকম মানুষ হিসেবে পরিচয় দিতে চেষ্টা করেছেন শুরু থেকেই। আর এজন্যই থাকতেন একটি গেস্ট হাউজে বিভিন্ন দেশের ছেলে-মেয়েদের সাথে মিলে মিশে। যেখানে বেশীরভাগ ইউরোপিয়ান এবং আমেরিকান ছাত্র-ছাত্রী বা ট্যুরিস্টদের আনাগোনা ছিল। তারা খন্ডকালীন সময়ের জন্য জাপান এসে আনন্দ ফুর্তি করে আবার ছুটি শেষ হলে চলে যেতো নিজেদের দেশে। সেই গেস্ট হাউজে ভিনদেশি ছেলে-মেয়েদের মাঝে মেলামেশায় কোনো দেয়াল ছিল না। যা বাংলাদেশের প্রক্ষাপটে শহীদুল হক কখনও ভাবতেই পারেন নি। ছেলে-মেয়েদের এমন উন্মুক্ত মেলামেশার দৃশ্য দেখে শহীদুল হকের মন বেশ পুলকিত হতো।

একবার এক জাপানি ফটোগ্রাফার এসে তার সাথে রুম শেয়ার করেছিলেন। নাম তার ওয়াই নাগাসাকি, বয়স ছিল তাঁর (তখন) ৪৫ এর মত। তিনি আমেরিকার নিউইয়োর্ক সিটিতে বসবাস করতেন। জাপান এসেছিলেন তার ছবির প্রদর্শণ করতে। একই গেস্ট হাউজে রুম শেয়ার করার কারণে দুজনের মধ্যে পরিচয় এবং কথা হয় নানা বিষয় নিয়ে। শহীদুল হকের কাছে তখন ক্যাননের পুরাতন মডেলের একটি ক্যামেরা ছিল। সেই ক্যামেরা দেখে ভদ্রলোক শহীদকে পরামর্শ দিয়েছিলেন ফটোগ্রাফিতে আসার জন্য।

ভদ্রলোকের সাথে ফটোগ্রাফি নিয়ে কথা বলার পর শহীদুল হক এলাইনে কাজ করতে সম্মতি দিলে তাকে নিয়ে ভদ্রলোক পুরাতন ক্যামেরা কিনে দেবার জন্য ক্যামেরার দোকানে যান। এরপর জাপানি সেই ভদ্রলোক যেই ক্যামেরা ব্যবহার করতেন সেই একই মডেলের ক্যামেরা কিনে দিয়ে তাকে ক্যামেরা চালানো শিখালেন। শহীদুল হক জানালেন ১৯৯৫ সন থেকে তিনি পুরোদমে ফটোগ্রাফির কাজ করতে শুরু করেন। বিশেষ করে জাপানি এবং বিদেশি অল্প বয়সী সুন্দরী মেয়েদের যারা মডেলিং করতে আগ্রহী তারা শহীদের হাতে ক্যামেরা দেখে তার কাছে এসে অনুরোধ করতো বিভিন্ন পৌজে তাদের ছবি তুলে দিতে।

এভাবেই ছিল তার ফটোগ্রাফিতে হাতে খড়ি। বিভিন্ন মেয়েদের ছবি তুলে যখন তার সাহস কিছুটা বাড়ে এবং কৌশলগতভাবে পাকা হয় তখন আমেরিকা প্রবাসী সেই জাপানি ভদ্রলোক (ফটোগ্রাফার) তাকে তাদের কোম্পানীতেই ফটোগ্রাফির কাজ দেন। সে সময় বিভিন্ন দেশে তাদের প্রতিষ্ঠানের শাখা ছিল। তাদের সেই প্রতিষ্ঠান থেকে মডেলদের ম্যাগাজিন প্রকাশ করা হত। প্রতিষ্ঠানের বস শহীদুলের সাথে কথা বলে খুশী হন। যে কারণে ভদ্রলোকের অনুরোধে তাদের সেই ম্যাগাজিন হাউজ শহীদুল হককে এই ফটোগ্রাফি করতে কাজ দিয়ে হল্যান্ডে তাদের শাখায় দায়িত্ব দিয়ে পাঠায়। সেখানে কয়েক বছর তাদের সেই শাখা প্রতিষ্ঠানের সি ই ও হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এই শহীদুল হক।

২০০৩ সালে তিনি জাপানি এক রমনীকে ভালোবেসে বিয়ে করেন। বিয়ের পরপরই চাকরী নিয়ে চলে যান হল্যান্ড। স্ত্রী তার এই ফটোগ্রাফি পেশাকে ভালোভাবে গ্রহণ করতে পারেননি। যে কারণে বিয়ের ৩ বছর পরেই (২০০৬ সালে) তাদের এই সংসার ভেঙ্গে যায়। তাদের সংসারে একটি মেয়ে সন্তান হয়েছিল যার নাম এরি। বর্তমানে এরির বয়স ১৬। জাপানের আইন মেনে তাদের ছাড়াছাড়ি হলে মেয়ের ভরনপোষণ করার আদেশ দেয় আদালত শহীদুলকে এবং সপ্তাহে একবার মেয়ের সাথে শহীদুলকে দেখা করার অনুমোদন দিয়েছিল। কিন্তু নানা কারণে শহীদ একসময় তার মেয়ের ভরনপোষন করতে অপারগ হলে স্ত্রী তার মেয়ের সাথে দেখা করার সুযোগ বন্ধ করে দেয়।
এরপর থেকেই শহীদ তার ঐরসজাত মেয়েকে দেখার নানা কৌশল অবলম্বন করে আসছিলেন। কিন্তু কোনো কিছুতে কাজ হয়নি। সম্প্রতি টোকিও থেকে বহু দূরের পথ কোউচি কেন (প্রিফেকচারে) তার শ্বশুর বাড়ি গিয়েছিলেন শ্বশুরের সাথে দেখা করে পরামর্শ করতে, কি করলে সে তার মেয়ের সাথে দেখা করতে পারবে। শ্বশুর তাকে সহযোগিতা করতে চাইলেও মেয়ের অনিচ্ছার কারণে সব পরিকল্পনা তার ভেস্তে যায়। শহীদুল হক জানতে পারেন বর্তমানে তার মেয়ে এবং মেয়ের মা টোকিওতে থাকে। তাই সে চেষ্টা করছে মেয়ের স্কুলে গিয়ে মেয়ের শিক্ষিকার সাথে দেখা করে কথা বলবে। যদি শিক্ষিকাকে তার মনের কথা বোঝাতে সক্ষম হন তবেই সুযোগ হতে পারে মেয়ে এরির সাথে দেখা করার।

জাপানে শহীদ একসময় ব্যবসার সাথে জড়িত ছিলেন। মানসিক যন্ত্রণার কারণে ব্যবসা গুটিয়ে রাখলেও পুনরায় সেই ব্যবসা পুনরায় চালু করতে চেষ্টা করছেন। পাশাপাশি মেয়ে এরির দৃষ্টি আকর্ষণের উদ্দেশ্যে ইউটিউব চ্যানেল-এ বিভিন্ন ভিডিওগ্রাফি তৈরী করে পোস্ট দিতে শুরু করেছেন। শহীদুল হকের ধারণা কোনো না কোনোভাবে তার মেয়ে এরি এই চ্যানেল দেখলে তার প্রতি দুর্বল হতে পারে। তখন রক্তর টানে হলেও এগিয়ে আসবে মেয়ে এরি, বাবার মন বোঝে।

শহীদুল হকের মনে মেয়ের জন্য কোনো স্থিরতা নেই। তাই এই অস্থিরতা থেকে বাচার জন্য সময় সুযোগ পেলেই ঘুরে বেড়ান গাড়ি নিয়ে। এভাবেই তিনি হয়ে উঠেছেন একজন ভ্রমণ বিলাসী। শহীদুল হক তার অবসর সময় কাটান গাড়ি নিয়ে দূরদূরান্ত ঘুরে। এভাবে পুরো জাপান ঘুরে বেড়িয়েছেন তিনি, যে কারণে জাপানের পথঘাট এবং ইতিহাস তার যেনো সব মুখস্ত। নিজে গাড়ি চালান বলে যখন যেখানে মন চায় তখন সেখানেই চলে যান। অনেকটা যেখানে রাত সেখানেই কাত। কখনো গাড়িতে রাত যাপন কখন দলীয় কোনো আশ্রয় কেন্দ্রে, কখনো পাহাড়ে। এভাবেই পাকা একজন ভ্রমণ বিলাসী হয়ে উঠেন শহীদুল হক। বিভিন্ন লেখকের বই পড়া তার সখ। পৃথিবীর বিভিন্ন বড়বড় লেখকের লেখা বই পড়ে তার জ্ঞান ভান্ডার ভরে রেখেছেন অনেক আগেই।

পরিবারে ৫ভাই ২ বোনের মধ্যে শহীদুল হক সবার বড়। তাই জাপান আসার পর অনেক টাকা রোজগার করে রোজগারের সেই অর্থ দিয়ে দেশে ভাইবোনকে লেখাপড়া করিয়ে বিদেশ পাঠিয়েছেন, সে সাথে বোনদের বিয়ে দিয়ে সংসার করতে সহযোগিতা করেছেন। বলা যায় বাবার অসমর্থ কাজ সম্পন্ন করেছেন তিনি। পরিবারে ভাইবোনদের জন্য বাবার কোনো ইচ্ছাই অপূরণ রাখেন নি বলে জানিয়েছেন তিনি।

২০০৮ সালে সর্বশেষ তিনি দেশে গিয়েছিলেন। বর্তমানে কিছু ট্যাকনিক্যাল সমস্যার কারণে দেশে যেতে পারছেন না। বাবা বেঁচে না থাকলেও এখনও বৃদ্ধা মা বেঁচে আছেন দেশে। তিনি জানান, মাকে দেখতে যাবার খুব মন টানে। কিন্তু দেখতে যেতে চাইলে একবারে জাপান ছেড়ে চলে যেতে হবে। বিষয়টা এমন যে মাকে দেখতে চাইলে মেয়ের আশা ছেড়ে দিতে হবে। আবার মেয়েকে পাবার আশা করলে মাকে দেখতে যেতে পারবে না। উভয় সংকটে মনের মধ্যে যন্ত্রণা ধারণ করছেন। যে কারণে শহীদুল হক দেশে যাবার আশা অনেকটা ছেড়েই দিয়েছেন বলে জানালেন।

টোকিওতে প্রতিবছর অনুষ্ঠিত বাংগালী কমিউনিটির সবচেয়ে বড় অনুষ্ঠান টোকিও বৈশাখী মেলা ও কাড়ি ফ্যাস্টিভ্যালে ছবি তোলার আনুষ্ঠানিক বা অফিসিয়াল দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

২০১৬ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাপান সফরে আসলে তাঁর অনুষ্ঠানে অফিসিয়ালভাবে ছবি তোলারও দায়িত্ব পেয়েছিলেন শহীদুল হক। জাপানে প্রতিবছর অনুষ্ঠিত জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইভেন্টে তিনি ফটোগ্রাফার হিসেবে অংশ গ্রহণ করে ছবি তোলেন। সম্প্রতি আইচি কেন (প্রিফেকচার)-এ ইসসেই সামিট এ অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের ছবি তোলার জন্য জাপানের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুরোধে অংশ নেবার সুযোগ পান।

ফুজি রক, সাদো আইল্যান্ড আর্টস সেলিব্রেশন-এ ৯৮ সন থেকে প্রতিবছর ছবি তুলতে অংশ নেন। ৮৮ সন থেকে জাপানে এই ফ্যাস্টিভেলের যাত্রা শুরু এবং জনপ্রিয় রক ইভেন্ট গুলোর অন্যতম এটি। হোক্কায়দোতে বিখ্যাত স্নো ফ্যাস্টিভেলেও অংশ নেন প্রতিবছর তিনি। এছাড়াও কুয়োতো গিয়োন ফ্যাস্টিভ্যালে, আওমরী কেন (প্রিফেকচার), নেবুতা ফেস্টিভেলেও অংশ নেন তিনি নিয়মিত।

————–
লেখক: পি. আর প্লাসিড, জাপান প্রবাসী

 

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ৯:০০ পূর্বাহ্ণ | বুধবার, ২৬ আগস্ট ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |