ঘোষণা

আজ মা কে বড়ই মনে পড়ছে তাই মাকে নিয়ে লিখলাম স্মৃতিচারণা

কে ই খালেদ | বুধবার, ১৯ মে ২০২১ | পড়া হয়েছে 173 বার

আজ মা কে বড়ই মনে পড়ছে তাই  মাকে নিয়ে লিখলাম স্মৃতিচারণা

আন্তর্জাতিক মা দিবসে বলেছিলাম আমার মা-র কথা বলবো। সেদিনটিতে আমি আর বলিনি। দিনটি পিছিয়ে দেওয়ার কারন হল আমার মা যে স্বতন্ত্র বা আলাদা। আমার কাছে তিনি শ্রেষ্ঠ, তাই আমি আমার মাকে নিয়ে কিছুটা অহমিকার কারণে গতকাল বিশ্ব মা দিবসের ডামাডোল থেকে বাইরে এসে মা-র কথা বলতে চাইলাম মাত্র।
তোমরা জোয়ান অব আর্ক, ঝাসির রানী, ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল এদের কথা শুনে থাকলে তো ভালই হল তা হলে আমাকে বেশী না বললেও চলবে। আমার মা একজন যোদ্ধা ছিলেন। মানিকগন্জ শহরের খান্দানী পরিবার মুন্সিবাড়ীর মেয়ে ছিলেন তিনি। আমাদের অজ পাড়া গায়ে এসেছিলেন লেডি ওইথ দি ল্যাম্প” হয়ে। শহরে বেড়ে উঠা আমার মা আমার শিক্ষক বাবার সংসারে শহর থেকে পায়ে হাঁটা, ঘোড়ায় টানা দুই চাকার টমটমে দুই ঘন্টার পথ, বর্ষা হলে নৌকায় বাদামে, বৈঠায়, গুনটানায়, দাঁড়টানায়, লগ্গিতে ৩/৪ ঘন্টায় পৌছানোর দূরত্বে কৈট্টা নামীয় গ্রামের যৌথ পরিবার কাজী বাড়ীতে বউ হয়ে এসে উঠলেন।
আমার মেঝোফুফু মানিগন্জের বান্দুটিয়ার দারগা বাড়ীর বৌ হয়ে গেলে একই গ্রামের আঃ সালাম মুন্সির চটপটে মেয়েটাকে নিজ ভাইয়ের জন্য নিতে চাইলে আমার খুত খুতে চরিত্রের নানামিয়া আমার বাবার বংশ কাজী পরিবার জেনেই খুশী হলেন না। আমার বাবার মাতুল বংশের কুষ্টি চেয়ে বসলেন ফুফু আম্মার কাছে। তখন তিনি প্রমাণ পেলেন যে বাবার মামারা সোনাহাজরা ছিলছিলার অনুসারী এবং ঢাকার ছোটকাটরার সম্ভ্রান্ত ব্যবসায়ী পরিবার। উপরন্তু বৃটিশরা চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রয়োজনে এবং পরবর্তীকালে ১৮৭৫ সনের বঙ্গীয় সার্ভে আইনের প্রয়োজনে ভারতে তাদের ভূসম্পত্তির একটা হিসাব নিকাশ করার জন্য ভারতে যে ব্যাপক জরীপ কাজ শুরু করে সেই কাজের স্বনামধন্য দায়ীত্বে সম্পৃক্ত সরকারী সিনিয়ার সার্ভেয়ার জমীর আমীন সাহেবের নিজ পৌত্রই যে তার জামাতা হতে যাচ্ছে তা জেনে তখন তিনি সম্মতি দিতে বিলম্ব করেন নাই।
আমাদের গ্রামের চারিদিকে অসচ্ছল কৃষক পরিবারের আর ছোট ছোট হিন্দু ব্যবসায়ীদের বাসস্থল।ডাক্তার নাই, স্কুল নাই। আছে দারিদ্র, ম্যালেরিয়া, কালাজ্বর, ওলাউঠা, আর গ্রাম্য রেষারেষি, শত্রুতা ষড়যন্ত্র।
সন্ধে হলে ওলাউঠা, বসন্তের হাত থেকে রেহাই পেতে দলে দলে গ্রামবাসী মশাল হাতে গ্রামের এ মাথা থেকে ও মাথা পর্যন্ত জিগির করে উচ্চে স্বরে “আল্লাহু আকবার, দাফিউল বালা, দাফিউল বালা” বলে চিল্লিয়ে উঠতো। পাশের জয়কৃষ্ণপুর, উমানন্দপুরের হিন্দুরা একই সময় মশাল হাতে দল বেধে ‘হরি বোল্ হরি বোল্’ বলে সমস্বরে খোল করতাল আর কাশার থালা পিটিয়ে চিল্লিয়ে উঠতো, খালের পারে তখন একটার পর একটা লাশ দাহ হচ্ছে চিতায়। কবরস্থানে লাশ দাফন হচ্ছে। গভীর রাতে কুকুরদের এক অদ্ভুত ভুতুরে সুরে কান্নার মতো ডাক, শেয়াল আর শকুনের লাশ নিয়ে টানাটানির শব্দ আমাদের কিশোর মনে নিত্যদিন ভয়াল এক রাতের আগমনে অসার করে দিত।
এসব নিদান কালে মাথা ঠান্ডা রেখে ধীর স্থির ভাবে কাজ করার মত মানসিক ভাবে সাহসী ছিলেন আমার মা। তার একটা সুবিধা ছিল, দক্ষ চৌকস পিতার ঘড়ে তার হাতে কলমে প্রশিক্ষণ নেওয়ার কারণে নিজেকে সেভাবে তৈরি করে ছিলেন। নানা ভাই সরকারী চাকুরীর পাশাপাশি হোমিও প্যাথিক, ইউনানী, কবিরাজী চর্চা এবং নিজে ওয়াছিয়া তরিকার ধারক হিসাবে ঝারফুক চিকিৎসাও চর্চা করতেন এবং এসব চর্চার কারণে তার মেঝো মেয়ে অর্থাৎ আমার মা তার সরাসরি সহকারী ছিলেন।
মা ছোট থাকতেই নানী ইন্তেকাল করলে নানা ভাইর পাঁচ সন্তানের বড় মেয়ে কম বয়সে বিয়ে হয়ে চিররোগী হয়ে শ্বশুর বাড়ীর হাড়ি সামলাতে চলে যান। ঐ কম বয়সে ছোট দু’টি ভাই ও একটি বোনের দায়ীত্ব এসে পড়ে মা-র উপর। বাড়ীর সব কিছুর চাহিদাই তখন ছিল “মাইজা বুজি” র কাছে। নানা ভাই সরকারী চাকুরীতে বদলী হয়ে টাংগাইল-এ পোষ্টিং হলে ছোট্ট মেয়েটির উপর পুরো সংসারের দায়ীত্ব এসে বর্তায়। এই সুকঠিন যুদ্ধ ক্ষেত্রে মা নিজেকে শক্ত রেখে সঠিক ভাবে দায়ীত্ব পালন করে যাচ্ছিলেন। সমান্তরাল ভাবে নিজের
এবং ভাই বোনদের লেখাপড়া স্বাস্থ্যপরিচর্যা, সামাজিক দায়ীত্বের পাশাপাশি সংসারের নানা দায়ীত্ব পালনে একদল চাকর বাকরের প্রশাসনিক কার্য্যক্রম তাকেই দেখতে হতো। বলা যায় তিনি অত্যান্ত সাহসী ও দক্ষ হয়ে উঠেন নিজ জীবন চর্চার কারণেই।
আর পারা যাচ্ছিলনা। মা-র উদ্যোগেই বেওথার উপারের আন্দারমানিক গ্রামে নানাকে ধরে বেঁধে দ্বীতিয় বিয়ে দিয়ে মা আমার নতুন নানীকে ঘড়ে আনলেন। তারপর তিনি নিজে বাবার সংসার ছেড়ে প্রস্থান করলেন আমার বাবার বাড়ীতে। আশেপাশের মেয়েরা রাত পোহালেই আমাদের বাড়ীর বিরাট বারান্দায় সারি বেধে খেজুর পাতার পাটিতে বসে কায়দা, ছিপারা, আমপারা, কোরান তেলোয়াতে লেগে যেতো। পাশাপাশি তাদের বাংলা এবং অংক শিক্ষার সাথে হোমিপ্যাথি, কবিরাজী, গাছ গাছরার রোপন, যত্ন ও অসুখ বিসুখে এসবের ব্যবহার শিক্ষা দিতেন। কুশিকাটা, সোয়েটার বুনন এমনি নানা কাজে মেয়েদের প্রশিক্ষন দিয়ে ভবিষ্যতের এক একজন গৃহিনী তৈরীর এই অভিনব উদ্যোগে বেশ উৎসাহ দেখা দিল। একদল মেয়ে ছোট্ট হোমিওপ্যাথির শিশিতে পানি ভরে কর্ক মুখে কাত করে ধরে নিজ নিয়ন্ত্রনে ফোটা বা ড্রপ ফেলার ট্রেনিং করেছে। মা একই হাতে শিশির কর্ক খুলে ঐ হাতেই কর্ক শিশির মুখে ৪০ ডিগ্রী অ্যাংগেলে ধরে কাত করে নিজ নিয়ন্ত্রনে ড্রপ বা ফোটা ফেলে মেয়েদেরকে শেখাতেন।
হোমিওপ্যাথি ওষুধ যে তরলে মিশিয়ে শিশিতে রাখা হয় ঐ তরলটি হচ্ছে ইথানল বা ইথাইল অ্যালকহল। এটা জীবানু ধ্বংসী একটি তরল। এটাকে কি ভাবে জরুরী অবস্থায় স্যানিটাইজার হিসাবে ব্যবহার করা যাবে, কোন কোন লতাপাতা, গাছ শেকরের রস জীবানু নাশক গুনের অধিকারী সেসব বিষয়েও মেয়েদের শেখাতেন তখন আমার মা। এ বাড়ীর ঐতিহ্য হিসাবে বাংলা ঘড়ে মৌলবী সাহেবের কাছে পাড়ার ছেলেদের আরবী পড়াবার চর্চা থাকলেও এ গ্রামের মেয়েদের জন্য এই সুযোগ নতুনরূপে বর্ধিত আকারে নিয়ে এলেন মা।
দু’ চার গ্রামে এক মাত্র চিকিৎসক ‘মতি ডাক্তার’। ন্যাশন্যাল পাশ দিয়ে গ্রামের কার ডাকে কোথায় কখন যাবেন? তখন রোগ নির্নয়, চিকিৎসা পত্র থেকে ওষুধ ফরমুলেশন, মিক্সচার তৈরী করা, কাগজ কেটে বোতলের গায়ে আঠা দিয়ে মাত্রা নির্ধারনের স্কেল সাটিয়ে দেওয়া, সবই মতি ডাক্তরের নিজেকেই করতে হতো।
অবস্থা চরমে পৌছতো আশ্বিন কার্তিক মাসে এবং বৈশাখ জ্যৈষ্ঠ মাসে। এই দুই মৌসুমে কলেরা, বসন্তের মত মহামারির প্রাদুর্ভাব ঘটতো প্রায় নিয়মিত। আজকের করোনার আতংকের চেয়েও ভয়াবহ অবস্থার অবতারনা হতো তখন। যে বাড়ীতে একজন আক্রান্ত হতো সে বাড়ী মোটামুটি সবাইকে শেষ করে দিয়ে কলেরা প্রস্থান করতো। বসন্ত, বিশেষ করে গুটি বসন্ত হলে তা চলতো দীর্ঘ সময় ধরে। পচা দূর্ঘন্ধ ছুটতো রোগীর গা থেকে। অতঃপর রোগীকে অন্ধ করে দিয়ে বসন্ত প্রস্থান করতো। এ অঞ্চলে প্রসূতিদের দেখার জন্য তখন কেউ ছিলো না অথচ প্রসূতির সংখ্যা এবং মা- শিশুর মৃত্যুর হার মাকে চিন্তায় ফেলে দিয়েছিলো। একটা সমাজ এমন উদাসীন কি করে হয়?
গ্রাম্য ধাত্রী যাদেরকে “চাউনী” বলা হত, স্বাস্থ্য সচেনতায় তাদের কোন জ্ঞান এবং গরজ কোনটিই ছিল না। তারাই দাপিয়ে বেড়াতো প্রসূতিদের নিদান সময়ে। গ্রামের অন্যতম দক্ষ ধাত্রী হাকির মা দাদীকে উস্তাদ মেনে তার কাছ থেকে প্রসূতি পরিচর্য্যা ও সংশ্লিষ্ট বিষয় জেনে নিজের অভজ্ঞতা ও প্রশিক্ষনকে কাজে লাগিয়ে অচিরেই তিনি তার সেবামূলক এই মিশনে তার কয়েকজন শিস্যাকে ধাত্রীর কাজে প্রশিক্ষন দিয়ে কয়েকটি টীম তৈরী করলেন। প্রত্যেকটি দলের সাথে পুরোনো সুতী সুকনো পরিচ্ছন্ন কাপড়ের পুটুলী থাকতো, আরো থাকতো হোমিও অ্যালকহল স্যানিটাইজেশনের জন্য সুকনো বাঁশের ধারালো চটা যা নারী কাটার ব্লেড হিসাবে ব্যবহৃত হতো (সে সময় হাজামরা খতনা করাতে ধাতব খুর বা চাকু পরিহার করতো কারন ধাতব চাকু বা খুর জীবানু বহন করতো)।
কোনো প্রসুতির প্রসবের সময় হলে দায়ীত্ব প্রাপ্ত টীম সেখানে হাজির হয়ে একটা পরিচ্ছন্ন পরিবেশ তৈরী করে ধীরে ধীরে প্রসব করানো হতো। পানির সংগে স্প্রীট, হোমিও অ্যালকহল, এন্টিসেপটিক গুল্মলতার রস ইত্যাদি ব্যবহার করা হতো। কখনো রোগী সংকটাপন্ন হলে কাগজে লেখা তাবিজ প্রসূতির চূলের সাথে বেঁধে দিলে প্রসব হবার সংগে সংগে তাবিজ খুলে দেবার ইন্স্ট্রাকশন বার বার বলে দিতেন। প্রসবোত্তর ব্যথা উপসমের জন্য হোমিও প্যাথিক ‘ছিনা’ বা মার প্রেসক্রাইব করা অন্য কোন ওষুধ ‘পালসিটলা’, ‘অরাম – মেটালিকম’ ইত্যাদি প্রয়োগ করতো তারা।
প্রসূতির শীগগীর সুস্থ হয়ে উঠার জন্য সাধনা ঔষধালয়ের ‘অশোকারিষ্ট’ কখনো কখনো বিলেতী প্যাটেনটেড ‘ওয়াটারবারীজ কম্পাউন্ড’ খেতে দিতো অপেক্ষাকৃত সচ্ছল প্রসুতিকে। মার আদেশ আমাদের বাড়ীতে সকলের জন্য শিরোধার্য ছিল। কোন সুপারিশ নাই। মার সব কাজে বাবার অন্ধ অনুমোদন সর্বকালের জন্য ঘোষিত নীতি এখানে কোন আপিল আদালতের অস্তিত্বও নাই।
আমরা পাঁচ ভাই চার বোনের ব্যাটিলিয়নকে একটা স্বয়ংক্রিয় নিয়মের মধ্যে বেড়ে উঠতে হয়েছে। নিজ নিজ কাপড় নিজেরা স্লেট,বই খাতা গোছানো, সময় মতো ঘুমাতে যাওয়া সবই ছিল নিয়মের অংশ। তাই আমাদের জন্য বাড়তি কোন ঝামেলা কারো জন্য তৈরী হয় নাই। বাড়ীতে কাজের লোকরদের কাজ ভাগ করা ছিল। প্রায় এক ডজন হাল সেই পরিমান বলদ, ষাঁড়, গাভী, ছাগল এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়াদি এই স্বয়ংক্রিয় সিষ্টেমে পরিচালিত হত। তবে বার কী তের রকমের ধানের বিচন ( বীজ) আলাদা করে শুকিয়ে নির্দিষ্ট ধামা, ডুলে সাজিয়ে রেখে মৌসুমে তা নির্দিষ্ট জমিতে বুনার জন্য সরবরাহ ব্যবস্থার দায়ীত্ব ছিল আমার চাচীর উপর (মালার মা), যিনি মার সংসারের ভান্ডারের দায়িত্ব সরাসরি মা-র সুপারভিশনে পালন করতেন। পালানে রবি শস্য, ওষধি, ফুলের বাগানের দায়িত্ব ছিল অন্য চাচী (বাইজার মা)-র উপর।
এমনি ভাবে অন্যান্য কাজ গুলির জন্য আলাদা আলাদা চাচি, বুবু, ফুপুদের অ্যাসাইন করা থাকতো। আজ ছোট একটা দুইটা প্রতিষ্ঠান চালাতে গিয়ে যে অবস্থা দেখি তাতে অবাক হতে হয় সেকালে মা কি ভাবে এত বড় ম্যানেজমেন্ট যর কী ভাবে পরিচালনা করেছেন তা ভেবে অবাক হই। এ ছাড়া আমাদের বাড়ীর তিন দাদার মেয়ে জামাই ভাগ্নেদের আতিথেয়তাও কেমনে কেমনে মার সংসারের উপরই চলে আসতো।
শীতের সকালে আমার চাচা, ফুপারা একে একে বারান্দায় এসে হাজির। হাজির হতেই পাটালী গুড় সাথে মুড়ি এবং শেষে একমগ করে গরম চা! দু’চার গ্রামে তখন আমাদের বাড়ীতেই চা এর প্রচলন ছিল। তাই চাচা, ফুফা, মামাদের মধ্যে যারা কোলকাতা, রেংগুন, ঢাকার সংষ্কৃতির সংস্পর্শে এসেছেন তাদের কাছে চায়ের তৃষ্ণা এক ধরনের আভিজাত্য প্রকাশের বিষয় ছিল এবং সেটা জাহির করতেই সকালের চায়ের আড্ডাটা বেশ জমতো আমাদের বাড়ীতে বিশেষত শীতের সকালে। এই ফাকে ধান সেদ্ধ, আখের রস জাল দিয়ে পাটালী গুড় তৈরী, কয়েক দিনের জমানো দুধের সর জাল দিয়ে ঘি তৈরী চলতো মার ঘনিষ্ট সুপারভিশনে।
ধান কেটে এনে পালা দিয়ে রাখা তারপর মলন দিয়ে ধানকে আলাদা করে সেদ্ধ, শুকানো এবং ভাতের, মুড়ির, পিঠার, পায়েশের, পৌলাওর ধান আলাদা আলাদা জাতের এবং আলাদা আলাদা প্রসেডিউর মেনে এ গুলোর সেদ্ধ শুকানোর ব্যবস্থা করতে হতো। তামাক, কাউন, তিল, তিশি, খেসারী, বুট, মটর, মসুরী, শর্ষে নানা চৈতালী যথা সময়ে রোপন আহরন এবং গোলাজাত করন সবই চলতো মা-র একক নির্দেশে একটা সিষ্টেমের মাধ্যমে।
এরই ফাকে ছেলে মেয়েদের পরীক্ষার ফলাফল একটু এদিক ওদিক হলে নীরব ঝড় বয়ে যেতো আমার বাবার উপর দিয়ে। তবে তা হত ইন্ডাইরেক্টলি। আমার দোষে আমি তিরষ্কৃত হচ্ছি কিন্তু তার ৭৫% প্রতিফলিত হয়ে আঁতে মৃদু আঘাত করছে আমার বাবাকে। বিষয়টি আমাদেরকে বুঝতে দিতে না চাইলেও আমরা কিছুটা বুঝতাম বাবার প্রতিক্রিয়া অনুমান করে। আমার এহেন এনারজেটিক মা হঠাৎ করেই চূপসে থমকে গেলেন বাবার প্যারালাইসিস হয়ে যাবার পর থেকে। এক সময় আমার বাবার চমৎকার স্বাস্থ্য ছিল। তিনি বডি বিল্ডার ছিলেন। মানিকগন্জ ট্রেজারীতে উড়িয়া, পশ্চিমা পুলিশদের সাথে নিয়মিত শরীর চর্চা ও ডন বৈঠক করতেন।
বাবার হিন্দু বন্ধুদের সাথে অসহযোগ আন্দোলন প্রভাবিত শরীর চর্চার আখড়ায় যাতায়াতের সুবাদে তিনি সুগঠিত স্বস্থ্যের অধিকারী ছিলেন। বাবার ৮০ বছর বয়সেও খুব একটা অসুখ বিসুখের দেখা ছিলনা। তাই ডাক্তার ওষুধের দরকার হয় নাই খুব একটা। বাবা যখন অসুস্থ্য হয়ে বিছানা নিলেন তখন কাউকে চিনতেন না। মুখে তুলে তাকে খাওয়াতে হতো। দুধ কলা গুড় না হলে থুথু করে সব খাবার ফেলে দিতেন। এক মাত্র মা-র হাত ছাড়া কারো হাতের খাবার তিনি মুখে তুলতেন না। এজন্য মা এক সময় সংসারের সব কিছু ছেড়ে দিয়ে লাগলেন বাবাকে নিয়ে। সকাল, দুপুর, বিকেলে ব্যায়াম করানো, তেল মালিশ করে বাকা হয়ে যাওয়া অংগ প্রত্যাংগ গুলি কয়েক মাসে সতেজ করে আনলেন। বাবার প্যারালাইসিস ক্রমেই ভাল হয়ে আসছিল। ব্যায়াম ছাড়াও ঝার ফুক টোটকা চলছে দিনের পর দিন। বাবা ধীরে ধীরে সতেজ হয়ে উঠতে লাগলেন। বাবা তখন আস্তে আস্তে কিছু কিছু মানুষ চিনতে শুরু করলেন। এসব দেখে মা-র উল্লাস তার চেহারা আর আচরণ দেখেই বুঝা যেতো।
এমনি করে পাঁচটি বছর এক সাধনার মধ্য দিয়ে কাটিয়ে একদিন মা নিজেই তিনি ষ্ট্রোকে আক্রান্ত হলেন। তার বাম হাত অসার হয়ে গেল। এরপর নিজেই নিজেকে নিয়ে যুদ্ধ শুরু করলেন।।বাবার পরিচর্যায় আমরা যেন কোন ত্রুটি না করি সে দিকে কড়া নজর রেখে নিজের শরীর চর্চা, ওষুধ প্রয়োগ নিজেই নিজের মত করে চালিয়ে ভাল হয়ে গেলেন। তার পক্ষাঘাতে অচল বাম হাত পরিপূর্ন সুস্থ করে ফেললেন তিনি নিজেই। এই পরিপূর্ণ সুস্থাবস্থায় একদিন আবার হার্ট ফেইলিওরের শিকার হয়ে নীরবে আমাদেরকে এবং তার নিজ হাতে গড়া সংসারটাকে ফেলে (আজ থেকে প্রায় তিনযুগ আগে) মা আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন পরপারে।
বাবা যখন বিছানায় মা তখন প্রায়ই বলতেন মাষ্টার সাহেব যতই চেষ্টা করুন আমার আগে তাকে আমি যেতে দিচ্ছিনা। আমার মা যা বলতেন তাই করে দেখাতেন। বিছানাগ্রস্থ যাত্রা পথের বাবাকে রেখে নিজেই চলে গেলেন মা। আগেই বলে ছিলাম এত ডামাডোলের মাঝে মার কথা বলবনা। কালকের ভিড়ে মাকে নিয়ে এতো কিছু বললে কে সময় পেতো আমার এ দীর্ঘ কাহিনি শোনার বা পড়ার? তাই বিলম্বে হলেও মাকে নিয়ে লিখলাম স্মৃতিচারণা।
আজ মা কে বড়ই মনে পড়ছে।

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ৭:৫৫ পূর্বাহ্ণ | বুধবার, ১৯ মে ২০২১

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |