ঘোষণা

মা, তুমি ভালো থেকো, স্বর্গ থেকে তোমার সন্তানদের আশীর্বাদ করো!

চন্দন পিটার গমেজ। | সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২০ | পড়া হয়েছে 129 বার

মা, তুমি ভালো থেকো, স্বর্গ থেকে তোমার সন্তানদের আশীর্বাদ করো!

‘ফের্জী’, যার আসল নাম ইউফ্রেজী গোমেজ, এক সময়ে শুধু পরিবার-আত্মীয়স্বজন-প্রতিবেশী বা গ্রামেই নয়, পুরো হাসনাবাদ ধর্মপল্লী, এমনকি আমাদের আঠারগ্রাম অঞ্চলের অনেকের কাছেই অতি পরিচিত ছিল এই নামটি। জীবনের চলার পথে সাধ্যানুসারে চারপাশের মানুষের সেবা করা ছিল যেন তার একান্ত ব্যক্তিগত ব্রত…… কারো চিঠি লেখা, কারো হিসাব পত্র খুলে দেওয়া, কারো মৃত আত্মীয়ের সৎকার, কারো অসুস্থ পরিজনের জন্যে প্রার্থনার আয়োজন, পারিবারিক বলয়ে যে কোন উৎসব আয়োজনে বা যে কোন অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে প্রার্থনা পরিচালনা করা, কারো নতুন ঘর তৈরির সরঞ্জাম কেনা কাটার দাম দস্তুর করে দেয়া, যে কোন মানুষের বিপদের কথা শুনলে তাকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে যাওয়া, মানুষের কষ্টের মুহূর্তগুলোতে তাদের সান্তনা দিয়ে মনোবল ফিরিয়ে দেয়া, গীর্জা থেকে শুরু করে বিভিন্ন সামাজিক সংঘ সমিতির আয়োজনে যোগ দেয়া এবং সহযোগিতা করা… এমনি আরো কতভাবেই না তিনি সেবা করে গেছেন অন্তরের তাগিদে মানুষকে ভালবেসে, সমাজকে ভালবেসে- সমস্ত কিছুই যেন এই মানুষটার কর্তব্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল, এভাবেই তার অন্তরের গভীরে তিনি অনুভব করে গেছেন তার চারপাশের মানুষের জন্য। তেরো থেকে এক বছর বয়সী পাঁচ সন্তানকে ঘরে, উনুনের পাশে, মাঠে, উঠানে, নদীর পাড়ে ফেলে রেখে এই ফের্জী নামের মানুষটা পৌঁছে যেতেন সাহায্যপ্রার্থীর বাড়িতে। ক্লান্তি ছিলো না যেন কোন মুহূর্তে, কী এক অপ্রতিরোধ্য তাগিদে নিজের অসুবিধাকে তুচ্ছ করে ছুটে গিয়েছেন অন্যের সেবায়! ছেলেমেয়েদের লালন পালন ছাড়াও সংসার জীবনের প্রাত্যহিকতায় কত কিছুই যে তাকে করতে হতো… সকালে গীর্জা থেকে ফিরে বাজার হাট থেকে শুরু করে বাড়ীতে নিজেকে ব্যস্ত রেখেছেন সর্বদা- কখনো ধান সিদ্ধ করছে, কখনো খড়ের পালা তুলছে, কখনো কলই পিষছে যাঁতাকলে, কখনো গাই দোয়াচ্ছে, শমসেরের মাকে সাথে নিয়ে আবার কখনো ধান উড়াচ্ছে… সংসারের যাবতীয় কর্মযজ্ঞে নিরন্তর ব্যস্ত রেখেছেন নিজেকে। ভালবাসার টানে এ এক অদ্ভুত দায়বদ্ধতা সংসারের প্রতি… সবকিছুই যেন তাকেই করতে হবে, নতুবা শান্তি নেই। সংসার শ্রমের মাঝে নিজেকে এমনভাবে ডুবিয়ে রেখেছিলেন যে বিশ্রামের কথা ভুলে যেতেন, যেন বিশ্রাম তার প্রয়োজন নেই- সংসারের কাজের মাঝেই যেন তার আনন্দ, সেখানেই যেন তার আনন্দ ও প্রাপ্তির প্রশান্তি।
দিন শেষে আমরা- তার সন্তানেরা যখন তাকে পেতাম তাকে একান্ত আপন করে, তখন কেউ ডান বাহু, কেউ বাম বাহু দখলের চেষ্টা করছে, আর স্তন্যপায়ী ছোট ছেলেটা তখনও কুকুর ছানার মতো সুযোগের সন্ধানে আছে।সবাইকে নিয়ে ছিল তার শান্তির সংসার, তার আপন ভুবন, তার ভালবাসার আধার… সবাইকে বুকে টেনে নিয়ে ফের্জী ভাবতেন, কবে এরা বড় হবে…. হাজারো স্মৃতির ধুলো উড়িয়ে আজ আবার ভেসে উঠছে আমাদের ছোট বেলার সেই স্মৃতিগুলো, যখন আমরা সবাইক ছিলাম মায়ের আঁচলে বাঁধা। ছোটবেলার সেসব অমূল্য দিনগুলো স্মৃতিতে আজো অমলিন, উজ্জ্বল! সময়ের আবর্তে তার সন্তানেরা শৈশব-কৈশোর-যৌবন পেরিয়ে গেল আর জীবন সংগ্রামের সংসপ্তক ইউফ্রেজী গোমেজ বার্ধক্যে পৌঁছেও তার সন্তানদেরকে সাহায্য-সহযোগিতা-শুভকামনার চাদরে নিরন্তর ঘিরে রেখেছিলেন। গত ১৫ই অক্টোবর ২০১৯, এই স্নেহময়ী জননী বিশ্বসংসারের মায়া ত্যাগ করে পরপারের মহা যাত্রার শরিক হয়েছেন। আর কোন দিনও ফিরে আসবেন না আমাদের স্পর্শের সীমানায়, কিন্তু তাকে আমরা নিরন্তর স্পর্শ করে যাবো অন্তরের গভীরে যতদিন আমরা বেঁচে থাকবো। মা, তুমি ভালো থেকো, স্বর্গ থেকে তোমার সন্তানদের আশীর্বাদ করো!!!
———–
চন্দন পিটার গমেজ আমেরিকা (মেরীল্যান্ড) প্রবাসী।

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ৭:১৭ পূর্বাহ্ণ | সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |