ঘোষণা

আমিই মায়ের অস্তিত্ব, আমার চোখে ভাসে মায়ের স্মৃতি যা বলে শেষ হবে না

অনলাইন ডেস্ক | বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২০ | পড়া হয়েছে 74 বার

আমিই মায়ের অস্তিত্ব, আমার চোখে ভাসে মায়ের স্মৃতি যা বলে শেষ হবে না

পি. আর. প্ল্যাসিড, জাপান :

বয়স যতই বাড়ুক মায়েদের কাছে তাদের সন্তান সবসময়ই ছোট থাকে। যার প্রমাণ মায়ের কাছে আমি নিজে। মায়ের সাথে শেষ গত ডিসেম্বর (২০১৯) মাসের শুরুতে দেখা করে বিদায় নিয়ে এলাম। আসার সময় বুকে জড়িয়ে ধরে মা বলছিলেন, আর হয়তো দেখা পাবি না, আয় একটু বুকে জড়িয়ে ধরি। বলেই বললেন, ভালো থাকিস। তোদের তিনজনকে আশীর্বাদ করছি ঈশ্বর যেন তোদের মঙ্গল করেন।

এরপর জাপান ফিরে এসে মায়ের অবস্থা যে তেমন ভালো না সেকথা বাসায় ওদের বললাম পর ছেলে শুনে বলল, আমি ঠাকুরমাকে দেখতে যাবো। সাথে সাথে তার মা সিদ্ধান্ত নিয়ে টিকিট কনফার্ম করে দিল। সে জানুয়ারীতে ফিরে এসে তার মাকে বলল, ঠাকুরমা মনে হয় বেশীদিন বাঁচবে না। একথা শুনে তার মা ফোন করে কথা বলল মায়ের সাথে।

আমার অবর্তমানে যেহেতু ওরা মা-ছেলে দুজনে সবসময় ফোন করে কথা বলে তাই এবারেও কথা কি হয়েছে জানি না। শুধু বলল, তুমি যেমন বলেছ তার চেয়ে অনেক ভালোভাবে কথা বলেছে। গতবছর শেষবার যখন আমি দেশে যাই তার আগেই মায়ের স্ট্রোক করেছিল। যে কারণে কাউকেই ঠিক ভাবে চিনতে পারছিলেন না। কথাও বলতেন অগোছানো। বাচ্চাদের মত ছিল আচরণ। এটাই বলেছিলাম এসে ওদের কাছে। যে কারণে ওরা বলল, আমার কথার সাথে মার কথার মিল নেই। তখনই বলেছি এটা মনে হয় শেষ বিদায়ের আগে ভালো হওয়া। সবার সাথে ভালোভাবে কথা বলে পর বিদায় নিবেন।

তিনজনের আলোচনা কালে থাইও (আমার ছেলে) তার মাকে বলছে আর হয়তো পাবে না তাই পারলে ছুটি করে যাও দেখে আসো। সবসময় আমি দেশে জাপানের কোন টেলিভিশন চ্যানেলের কাজ নিয়ে যাই, যে কারণে মাকে বেশী সময় দেওয়া হয় না। তাই এবার ইউকী (আমার স্ত্রী) বলছিল, এবার অন্য আর কোন কাজ নিয়ে দেশে যেতে না। পুরোটাই মাকে সময় দিতে হবে।

ফেব্রুয়ারী মাস যেহেতু দেশে বই মেলা চলে তাই বললাম, তুমি মাকে সময় দিও, আমি বই মেলা করে প্রতিদিন বাড়ি থেকে আসা যাওয়া করবো। যেই কথা সেই কাজ করবো মনে করে ১২ই ফেব্রুয়ারী দেশে যাবার জন্য টিকিট কনফার্ম করা হয়। এদিকে সবকিছু গুছিয়ে নেবার পর টেলিভিশন প্রোগ্রামের জন্য একটি প্রতিষ্টান থেকে ফোন আসে আমাকে দেশে নিয়ে যাবে একটি প্রোগ্রাম করার জন্য। আমি তাদের কথা শোনার পর ভাবছি বাসায় এসে শেয়ার করবো স্ত্রী আর ছেলের সাথে। দরকার হলে দেশে কিছুদিন বেশী দিন থেকে কাজটি করতে পারলে খরচ সব উঠে যাবে।

সে সময় এক কফি হাউজে বসে লিখছিলাম। কথা শেষ করে আবার যখন লেখায় মনযোগী হলাম এর মধ্যে ফেইসবুকের ম্যাসেঞ্জারে এস এম এস এলো দেশ থেকে, মায়ের অবস্থা ভালো না, দেশে যেনো যোগাযোগ করি। সাথে সাথে ফোন করলাম ভাগিনী মিতার কাছে। সে-ই ম্যাছেজ পাঠিয়েছে তাই সে খবরটা ভালো বলতে পারবে মনে করে তাকে কল দেয়া। মিতা জানালো, আমার মায়ের অবস্থা খুব খারাপ সবাই ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়ি যাচ্ছে। কারো সাথে মা কোন কথা বলছে না। শোনার পর অন্য ভাইবোনদের ফোন দিয়ে আরো বিস্তারিত জানলাম।

আমি যে দেশে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম দেশে কাউকেই বলা হয়নি সারপ্রাইজ দেবার কথা ভেবে। মায়ের এমন দুসংবাদ শোনার পর সাথে সাথে বাসায় এসে বিষয়টি আলোচনা করে টিকিটের জন্য কথা বললাম পরিচিত এজেন্টের কাছে, রাতে বা পরেরদিন ফ্লাই করা যায় কি না তা জানার জন্য। প্রথম বলছিল কোন টিকিট নেই। তারপর কোনভাবে দেয়া যেতে পারে বলে বলল দাম অনেক বেশী। তাতেই বুকিং দিলাম।

মধ্যরাতেই আবার এস এম এস এলো মা আর নেই। মনে হলো পৃথিবী ভেঙ্গে পড়লো যেন মাথার উপর। কোন কিছু ভাবতে পারছিলাম না। সারারাত ঘুমোতে পারিনি। ছেলে আর স্ত্রী পাশে বসে আমাকে শান্তনা দেবার চেষ্টা করছিল।

পরেরদিন টিকিট শিউর পাবো মনে করে দেশে ফোন করে বললাম আমি আজই ফ্লাই করবো, লাশ যেনো আমি আসা পর্যন্ত রাখার ব্যবস্থা করা হয়। আবার যখন টিকিটের জন্য ফোন করি, তখন দাম জানালো টিকিট ম্যানেজ করা গেছে তবে দাম পরবে যে দামে আমরা আগেই টিকিট কেটেছি তার চেয়ে বেশী হবে চার গুন প্রায়। ভেবে দেখলাম, একদিন পরেই ফ্লাই করছি, এর জন্য এত দাম দিয়ে টিকিট করে যাওয়াটা বোকামী। মা বেঁচে থাকলে হয়তো গিয়ে মনকে শান্তনা দিতে পারতাম। এরপর অনেক ভেবে পরে জানিয়ে দিলাম, লাশ কবর দিয়ে দিতে। যেই কথা সেই কাজ। সবাই সিদ্ধান্ত নিয়ে লাশ কবর দিয়ে দিল।

১২ তারিখ ইউকীকে নিয়ে দেশের উদ্দেশে রওনা দিলাম। ১৩ তারিখ ঢাকা গিয়ে পৌঁছলে সেদিন আর গ্রামের বাড়ি যাই নি। ঢাকা কিছু কাজ ছিল, কাজ সেড়ে ১৪ তারিখ বাড়ি গেলাম। গিয়ে দেখি ভাইবোন সবাই বাড়িতে। নয়ভাইবোনের মধ্যে তিনজন আসতে না পারলেও লন্ডন থেকে বোন আগেই এসেছিল। সবাই বাড়িতে মায়ের জন্য সামাজিকতা যা যা করণীয় তাই করলো।

সামাজিকতা বলে কথা। ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী আমারও কিছু করণীয় ছিল যা বাড়িতে সম্পন্ন করি। গত দুইবছর আগে বাবা মারা যাবার পর থেকে বাড়িতে মা একাই থাকতেন বেশী সময়। এরমধ্যে যতবারই বাড়ি গিয়েছি মা আমাকে চা কফি বানিয়ে খাইয়েছেন। ভাত খাবার সময় হলে কি খাওয়াবেন, নিজে না খেয়ে তার ভাগের খাবারটুকুও যেন আমার প্লেটে তুলে দিয়ে বলতেন মায়ের হাতের খাবার আর তো পাবি না, খা। আমাকে একটু বেশী খাওয়াতে পারলেই যেন মায়ের শান্তি। রাত হলে কখনও মায়ের পাশে একই বিছানায় ঘুমিয়েছি।

মা মারা যাবার পর দেশে গিয়ে যে কয়দিন বাড়িতে ছিলাম, বাড়ির প্রতিটা পদেই মায়ের চেহারা চোখে ভাঁসছে। বাড়িতে গেলে সবসময় কাপড় ছাড়ার আগে মা বলতেন, এই তোর বাবার লুঙ্গিটা নে পড়, এই তোর বাবার একটা শার্ট আলমারি থেকে বের করে দিচ্ছি পড়। এই, বিছানার নিচে স্যান্ডেল আছে দিচ্ছি পড়ে নে। মানে আমি কিছু ভাববার আগেই মা বলতেন। অনেকটা অস্থির হয়ে যেতেন আমার সেবা করার জন্য। নিজে পুকুরে বড়শি দিয়ে মাছ ধরে ভেঁজে খাওয়াতেন।

জ্ঞান হবার পর থেকে মায়ের মৃত্যু পর্যন্ত যতদিন মায়ের কাছে থেকেছি প্রতিটা মূহুর্তই এখন স্মৃতির পাতা জুড়ে আছে। লিখে শেষ করা যাবে না। মা জীবিত অবস্থায়ও লিখেছি মাকে নিয়ে। আজ মা দিবস উপলক্ষে মাকে নিয়ে লিখছি। ভাবছি আবার বড় লেখা লিখবো।

এবার যেদিন বাড়ি থেকে ফিরে আসি সেদিন বুক ফেঁটে যাচ্ছিল। যেদিকে তাকাই যেন সেদিকেই মায়ের উপস্থিতি টের পাই। বাড়ির পাশে কবরস্থান। দূর থেকে মায়ের কবর দেখতে দেখতে গাড়িতে চড়ছিলাম। মায়ের কথা মনে করে বুকফাঁটা কান্না আসছিল। কান্না চাঁপা দিতে পারলেও গাল বেয়ে চোখের জল সামলানো কঠিন ছিল। চলে এলাম জাপান। আসার সময় মায়ের কিছু স্মৃতি বহন করে নিয়ে এসেছিলাম। ঘরে এসব দেখি আর মায়ের কথা ভাবী। কিছুই করার নেই। জানি একদিন আমাকেও যেতে হবে। এভাবে একদিন সবাইকেই এই চিরন্তন সত্যের পথে এগুতে হবে। মেনে নিতে হবে মৃত্যুই আমাদের জীবনের শেষ ঘটনা। যা কেউ ঠেকাতে পারে না।

আমি জানি, যতদিন বেঁচে থাকবো, মায়ের অস্তিত্ব আমার মধ্যেই বেঁচে থাকবে। আমার শরীর যে মায়েরই রক্ত দিয়ে গড়ে উঠা।

—————
পি.আর. প্ল্যাসিডঃ জাপান প্রবাসী লেখক-সাংবাদিক।

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ৪:৪২ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২০

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |