ঘোষণা

আম্মু আমাকে বাংলাদেশের প্রথম সারির স্কুলে পড়িয়েছেন

আফফান মিতুল | সোমবার, ২৪ মে ২০২১ | পড়া হয়েছে 582 বার

আম্মু আমাকে বাংলাদেশের প্রথম সারির স্কুলে পড়িয়েছেন

“আম্মু” ডাকি আমার মাকে। কথা বলা শেখার পর থেকেই এখন পর্যন্ত মাকে “আম্মু” বলেই ডাকি। অনেক চেষ্টা করেছি “মা” সম্বোধনে ডাকতে পারিনি, বারবার মুখে চলে আসে “আম্মু” শব্দটাই। আমার আম্মু আমার পৃথিবী, আমার ইবাদত, আমার বেস্ট ফ্রেন্ড। আমার জন্ম হয়েছে ১৯৮৭ সালের ২ মার্চ, কিশোরগঞ্জের তাড়াইল থানার পুরুড়া গ্রামে। ঐ সময় আম্মুর বয়স ছিলো মাত্র ২২ বছর। একান্নবর্তী পরিবারে আম্মুর বিয়ে হয়েছে। সংসারে দাদা, দাদী, আব্বু, ২ ফুপু, ৩ চাচা সহ আরো অনেকেই থাকলেও আমার জন্মের দিন ঘরে ছিলেন শুধু আমার দাদী এবং আমার ৬ বছর বয়সী ভাই, নেহায়াতই শিশু তখন। একটি পুরুষ মানুষ ছিলেন না, এমনকি আমার বাবাও না। আম্মু “খান” বংশের মেয়ে, তখন আমার নানা মতিঝিলে পূবালী ব্যাংকে চাকুরি করেন। ছোটবেলা থেকে আম্মু প্রাচুর্য্যের মধ্যে বড় হয়েছেন, তাদের বাড়িতে বিভিন্ন ধরণের কাজ করার জন্যে ৩/৪ টা কাজের বুয়া, চাকর বাকর ছিলো। সেই আম্মুর বিয়ে হয় মধ্যবিত্ত পরিবারে যেখানে অর্থ ছিলো না কিন্তু বিদ্যা-শিক্ষা ছিলো, আমার দাদা ছিলেন তখন স্কুলের হেড মাস্টার, আমার বাবা-চাচারা তখনই গ্রাজুয়েট ছিলেন। আমার জন্মের দিন দাদা, বাবা, চাচা সবাই ঢাকায়, ফুপুরা শ্বশুর বাড়িতে। আম্মু আমার জন্মের দিন দুপুরে আমাকে ১০ মাস পেটে রাখা অবস্থায় ঘরের সব কাজ করলেন, শিলপাঠায় মশলা বাটা, রান্না করা, কুয়ো থেকে পানি উঠিয়ে এক বালতি কাপড় ধোয়া, গৃহস্থালীর সব কাজ করলেন। বিকেলে আম্মুর পেইন ওঠলো, দাদী ব্যাপারটা বুজতে পারলেন। ঘাবড়ে গেলেন দাদী, তখন তো মোবাইল ফোন ছিলো না। এমতাবস্থায় তিনি একা কি করবেন? আম্মুকে এক জায়গায় বসিয়ে দাদী দৌঁড়ে গেলেন ভাওয়াল দাদীর মাকে আনতে অর্থাৎ আমার বড় মাকে, খুব দূরে ছিলো না পুরুড়া গ্রাম থেকে ভাওয়াল গ্রামটি, হেঁটে গেলেও মাত্র ১৫ মিনিট লাগে। দাদী ও তাঁর মা ফিরলেন, দাদীর মা ১০০ টাকা দিলেন দাদীকে। ১৯৮৭ সালে ১০০ টাকা হয়তো অনেক টাকা। এই টাকা দাদী দিলেন পাশের বাড়ির ফজলু কাকুকে যাতে বাচ্চা প্রসবের কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস বাজার থেকে কিনে আনতে পারে, সেইসাথে দাদী সাথে করে নিয়ে এলেন দাঈমা খ্যাত ফজলুর মাকে। আচ্ছা, আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে সেইসময় আম্মুর দুই চোখ কি শুধু আব্বুকে খুঁজছিলো না? কিন্তু পেলো কই আব্বুকে, নানুকে, খালাকে? প্রচুর রক্তক্ষরণ হলো আম্মুর, মেঝেতো রক্তের ছড়াছড়ি। আম্মুর খুব কষ্ট হচ্ছিলো। আমার জন্মের আগের কয়েক সপ্তাহ ধরে নামাযে বসে আম্মু শুধুই মোনাজাতে বসে চেয়েছিলেন তাঁর যেন একটা ফুটফুটে কন্যা সন্তান হয়। বাচ্চা হলো ঠিকই কন্যা সন্তান না, পুত্র সন্তান হলো। আমি হলাম। আম্মু চোখ মেলে আমার দিকে তাকিয়ে প্রথমে নোটিশ করলেন আমার মাথার কোঁকড়াচুল, একই রকম কোঁকড়াচুল ছিলো আমার আব্বুর। কাকতালীয়ভাবে আম্মুর বুকে যে কালো বড় “তিল”টা আছে ঠিক সেই “তিল”টা আমার বুকেও হয়েছে একইরকম, দুইজনের গায়ের রং, হাসি একই রকম। আমি এসেছি পৃথিবীতে, আম্মুর সন্তান হয়ে না, আম্মুর বন্ধু হয়ে, আম্মুকে পৃথিবীর সকল বিপদ থেকে রক্ষা করতে, আরাম আয়েশে রাখতে। আম্মু পেটে যখন আমার অস্তিত্ব টের পেলেন, আব্বুকে জানালেন। আব্বু বাজার থেকে ঔষধ এনে দিলেন বাচ্চা নষ্ট করার। আম্মু সেই ঔষধ না খেয়ে জানালা দিয়ে ফেলে দিলেন। ঔষধ ফেলতে গিয়ে আব্বুর কাছে একদিন হাতেনাতে ধরে খেলেন আম্মু, শারীরিক নির্যাতন করলেন আম্মুকে। আব্বুর একটাই কথা এই বাচ্চা আমি চাইনা, আমার একটাই সন্তানই যথেষ্ট, আমি আর বাচ্চা চাই না কখনো। আব্বু, আম্মুর প্রথম সন্তান হয় ১৯৮১ সালের ২১ আগস্ট ঢাকার মিরপুরে, তার নাম ফয়সাল। আমি যেদিন হলাম সেই ৬ বছর বয়সী ফয়সাল ভাইয়ের জ্বর হয়েছিলো, খুব কাঁদতেছিল সেদিন। দাদী একবার আমার ভাইয়ের যত্ন করেন, আরেকবার আমার মায়ের যত্ন করেন, ডাইলেমা বলতে যা বোঝায়। জায়নামাজ থেকে আম্মু উঠতে চাইতেন না আমার জন্মের আগের কয়েকমাস, খুব চাইতেন মোনাজাতে “আমার তো একটা ছেলে আছে, এবার আল্লাহ আমাকে একটা মেয়ে দেন”। আল্লাহ্ আম্মুর এই ইচ্ছে পূরণ করেননি, এখন এই সময়ে প্রায়ই আম্মুকে বলতে শুনি, আল্লাহ্ তাঁর বান্দাদের জন্যে যা করেন ভালোর জন্যেই করেন, মেয়ে না দিয়ে আল্লাহ্ আমাকে ছেলে দিয়েছেন যে ছেলেটাই এখন আমাদের বেঁচে থাকার অবলম্বন, আমাদের সাত রাজার ধন, আমাদের আশ্রয়স্থল, আর এই ছেলেটার জন্যে আমরা গর্বিত। আর আমার আব্বু তাঁর ভূল আমার জন্মের পরপরই বুজতে পেরেছেন, সবসময়ই বলেন “আমার মিতুল, আমার জন্যে খুব লাকি, মিতুলের জন্মের পর আমার ভাগ্যের চাকা ঘুরে গেছে”। আর আমি বলি, আম্মু-আব্বু আমার সাথে থাকেন না, বরং আমি থাকি আমার আব্বু-আম্মুর সাথে। আমি আমার সমস্ত সুখ-শান্তি-সম্মান বিসর্জন দিতে রাজি আছি আমার মায়ের জন্যে, আমি আমার মাকে পাগলের মতো ভালোবাসি। শুধুই চাকরি-বাকরি করে অর্থ উপার্জন করাই আম্মু আমাকে শেখাননি, শিখিয়েছেন ঘরের সব কাজকর্মও। আমি যেমন একাত্তর টিভিতে চাকরি করে প্রতিমাসে বেতন পাই, তেমনি ৯ টা থেকে ৫ টা পর্যন্ত অফিস করেও ঘরের সবধরণের কাজ আমি করতে পারি, সেই সাথে নাটক-সিনেমায় অভিনয় করি, উপস্থাপনা করি, লেখালেখি করি, ছবি আঁকি, এইসবই হয়েছে আম্মুর কারণে। আমি সবধরণের রান্না করতে পারি, সেইসাথে ৯টা থেকে ৫টা পর্যন্ত অফিসও করতে পারি। আমার আম্মু আমাকে বাংলাদেশের প্রথম সারির স্কুল অর্থাৎ ধানমন্ডির গবর্ণমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুলে পড়িয়েছেন, সেইসাথে বাফাতে গান শিখিয়েছেন, সোহাগ ভাইয়ের কাছে নাচ শিখিয়েছেন এবং আনন্দাঙ্গণ ফাইন আর্টস অ্যান্ড স্কুলে ছবি আঁকা শিখিয়েছেন। আজ আমার ভিতরে যতটুকু শিল্পবোধ সবই আম্মুর জন্যে। ছেলে মেয়েদের শুধু পড়াশোনা করালেই হয় না, পড়াশোনার পাশাপাশি তাদের আর্ট-কালচার, শিল্পসাহিত্যেও মনোনিবেশ করাতে হয়, তানাহলে মানসিক ডেভেলপমেন্ট বাড়ে না, মনমানসিকতা অনেক সংকীর্ণ হয়। আম্মুর প্রতি রইলো শ্রদ্ধা। ভালো থেকো আম্মু।

————–
আফফান মিতুল ( অভিনেতা ও সাংবাদিক, ৭১টিভি)

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ৯:১৯ অপরাহ্ণ | সোমবার, ২৪ মে ২০২১

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |