ঘোষণা

ঐতিহাসিক মে দিবস ও জাপানের প্রথম মে দিবস উদযাপন

প্রবীর বিকাশ সরকার | শনিবার, ০১ মে ২০২১ | পড়া হয়েছে 153 বার

ঐতিহাসিক মে দিবস ও জাপানের প্রথম মে দিবস উদযাপন

আজ ১লা মে।
ঐতিহাসিক মহান মে দিবস।
জাপানের মে দিবস ভিন্নরকম।
এইদেশে গোল্ডেন উইক (Golden Week) নামে একটি দীর্ঘ জাতীয় ছুটি রয়েছে, যাকে জাপানি ভাষায় বলে ওওগাতা রেনকিউ। জাপানের জাতীয় দীর্ঘ ছুটিগুলোর অন্যতম হল এই গোল্ডেন উইক তথা সোনালি সপ্তাহ।
এপ্রিল মাসের শেষ থেকে মে মাসের ৫ তারিখ পর্যন্ত এই ছুটি হলেও সেবাখাত, পণ্যপ্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বিশেষ করে কলকারখানা, খাবারের বড় বড় দোকান, ডিপার্টমেন্ট স্টোর্স, হাসপাতাল, যোগাযোগ, গণমাধ্যম, জাদুঘর ছাড়া অফিস, আদালত ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ বন্ধ থাকে।
তবে বছর ভেদে শনিবার ও রোববারের কারণে এই ছুটি অনেক সময় ৭ থেকে ৯দিন পর্যন্ত দীর্ঘায়িত হয়ে থাকে।
এই গোল্ডেন উইকের মধ্যে পড়ে ১লা মে। আবার ৫ই মে হচ্ছে জাপানের জাতীয় শিশু দিবস বিশেষ করে বালকদের জন্য। ১৯৪৮ সাল থেকে সূচনা এই গোল্ডেন উইকের সঙ্গে শিশু দিবসের ছুটিকে জুড়ে দেয়া হয়েছে।
শিশু দিবস উপলক্ষে নানান উৎসবের আয়োজন করা হয় সারাদেশব্যাপী। যাদের বালক সন্তান রয়েছে তাদের বাড়িতে অবশ্যই সিল্ক কাপড়ে ছাপানো এবং তৈরি “কোইনোবোরি” খোলস ওড়াতে হয়। তবে সারাদেশ জুড়েই বর্ণিল ছোট ও বিশাল কোইনোবোরির খোলস ওড়ানো হয়ে থাকে। কোই নামে রুই মাছের মতো একটি মাছ জাপানে প্রাচীনকাল থেকেই রয়েছে। খালে, পুকুরে, জলাশয় এবং সমুদ্রের মাছ এটি। সুস্বাদু এই মাছ দিয়ে নানা ধরনের পদ জাপানি খাদ্যে বিদ্যমান। এই মাছটি উজান স্রোত ঠেলে উজিয়ে যায় বলে প্রাচীনকাল থেকে শিশুদের প্রবৃদ্ধির সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে আর এই থেকেই জন্ম নিয়েছে স্বতন্ত্র একটি সংস্কৃতি কোইনোবোরি বুনকা।
করোনার কারণে গত বছর যেমন গোল্ডেন উইক উপভোগ বা উদযাপিত করা যায়নি, এবারও তাই। সর্বত্র চলছে জরুরি অবস্থা। প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বেরোনো নিষেধ। সকল সমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে কেন্দ্রিয় ও স্থানীয় প্রশাসন। সাধারণত এই দীর্ঘ ছুটিতে ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন, প্রদর্শনী, ভ্রমণ এবং লক্ষ-হাজার উৎসবমুখর অনুষ্ঠানে রমরমা থাকে জাপান প্রায় সাতটি দিন ধরেই। কর্মপাগল এবং কঠোর পরিশ্রমী জাপানিদের জন্য এই গোল্ডেন উইক যে কী আনন্দের তা বলে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়!
তবে বহু জাপানি নাগরিকদের জন্য এই সোনালি সপ্তাহটি উপভোগ করা হয়ে ওঠে না। আগেই বলেছি জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে কর্মরতদের ক্ষেত্রে এই আনন্দে সামিল হওয়া যায় না। যদিও এই ছুটিটি অন্য দিন সুযোগ বুঝে পেয়ে থাকেন অনেকে।
আমার জাপান প্রবাস জীবনের ৩০ বছরের অধিক একজন পণ্যপ্রস্তুতকারী শ্রমিক হিসেবে এই মহাছুটি তথা গোল্ডেন উইকের আনন্দ উপভোগ করা সম্ভব হয়নি। চাকরি জীবনের প্রথম পাঁচটি বছর শুধু গোল্ডেন উইকের স্বাদ পেয়েছিলাম, যখন ব্যবস্থাপনা পদে ছিলাম। যেই মুদ্রণ ও প্রকাশনা প্রযুক্তি শেখার লক্ষ্যে জাপানের প্রিন্টিং কোম্পানিতে প্রবেশ করলাম আর গোল্ডেন উইকের বসন্ত আমার জীবনে আসেনি। পরিবারকে সময় দিতে পারিনি, কোথাও ঘুরতে যেতে পারিনি, ভোর বেলা বেরিয়ে যেতাম আর কাজ শেষ করে রাত ৯-১০টায় ঘরে ফিরতাম। শুধু এই দীর্ঘ ছুটির রোববার দিনটি পরিবারকে সময় দিতে পারতাম। এভাবে চলে গেছে তিন দশকের বেশি।
গতবছর করোনার কারণে চাকরি থেকে ছাটাই হওয়ার পর এখন অবসর জীবন অতিবাহিত করছি। কিন্তু এবার করোনার কারণে গোল্ডেন উইক এলেও ঘরেই থাকতে হচ্ছে।
হয়ত আর চাকরি করা হবে না বাকি জীবনে। অবসর জীবন গবেষণা আর গ্রন্থ লিখেই শেষ হয়ে যাবে। আজ মনে পড়ছে সেইসব দিনগুলোর কথা। কঠোর পরিশ্রমজাত লবণাক্ত সময়ের স্মৃতি। কিছু তুলে ধরছি।
জাপানের কলেকারখানায় কাজ করার নানা সুফল আছে। আর সেটা হল নিত্যনতুন প্রযুক্তি শেখা যায় যা কাজে লাগে। যদি সেটা কেউ ইচ্ছানুযায়ী লব্ধজ্ঞান কাজে লাগাতে চায়। যেহেতু আমার স্বপ্ন ছিল একটি উন্নতমানের তথ্যভিত্তিক কাগজ প্রকাশ করা, তাই প্রযুক্তি এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা কাজে লাগিয়েছিলাম সেই স্বাপ্নিক প্রকল্পে। যেমন মানচিত্র, কিশোরচিত্র কাগজ নিজেই তৈরি ও প্রকাশ। নিজের গ্রন্থাদির প্রচ্ছদ তৈরি, নানা রকম ডিজাইন তৈরির কাজও আমি চাকরিসূত্রে করতে পেরেছিলাম।
দ্বিতীয়ত, একটা বিশেষ সুযোগ আমার হয়েছে, বিস্তর ম্যাগাজিন ও গ্রন্থাদির প্রিপ্রেস কাজ করার ফলে প্রচুর অজানা তথ্য জানতে পেরেছি যা পরবর্তীকালে গবেষণার কাজে লেগেছে।
তৃতীয়ত, কলেকারখানায় কাজ করার সুবাদে বহু শ্রমজীবী সাধারণ জাপানি নাগরিকের সঙ্গে মেলামেশা ও বন্ধুত্ব গড়ে তোলার সুযোগ হয়েছে। তাদের মাধ্যমে জাপানের ইতিহাস, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, রীতিনীতি, চিন্তাচেতনা, ভালোলাগা, মন্দলাগা, সাহিত্য, সঙ্গীত, সেবা, ধৈর্যশীলতা, সময়ানুবর্তিতা, কর্মপ্রেম, দেশপ্রেম ইত্যাদি বিষয়ে গভীর জ্ঞান লাভ করা সম্ভব হয়েছে। শ্রমজীবী মানুষ ছাড়াও আমার সৌভাগ্য হয়েছে সর্বস্তরের প্রভাবশালী, জ্ঞানীগুণী মানুষদের সঙ্গে ওঠাবসার, কিন্তু গভীরভাবে অনুভব করেছি যে, একটি দেশ ও জাতির হৃদয়কে বুঝতে হলে তৃণমূলে কর্মরত সাধারণ মানুষের সঙ্গে মেলামেশা না করলে তা সম্ভবপর নয়।
মূলত রাজনীতিবিদ, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী এবং বড় ব্যবসায়ীরা হচ্ছে দুধের উপরের সরস্বরূপ, মূল উপাদান নিচের দুধের ভেতরে নিহিত। আর এটা সমাজের উচ্চশ্রেণীর মানুষরা খুব ভালো করেই জানেন বলে শ্রমের মর্যাদা সম্পর্কে তারা সচেতন। তাই জাপানে শ্রমের মর্যাদা এশিয়ার যেকোনো দেশের চেয়ে উত্তম ও অনুকরণীয়। তথাপি নানাবিধ বৈষম্য নেই, অসন্তোষ নেই তা বলা যাবে না। কিন্তু পরম সৌভাগ্য যে এই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি আমি হইনি কখনো। সম্ভবত জাপানি ভাষা এবং জাপানের ইতিহাস জানার কারণে সকলের সঙ্গে হার্দিক সম্পর্ক গড়ে ওঠা সহায়ক হয়েছিল। আসলে তো দেশি-বিদেশির সংঘর্ষ, ভুল বোঝাবুঝি এবং বিদ্বেষের মূলে রয়েছে সাংস্কৃতিক তারতম্য। কথায় আছে, এক দেশের গালি আরেক দেশের বুলি। এই সংস্কৃতিটা বুঝতে পারলেই আর কোনো সমস্যা থাকে না। কালাচারাল শক ঘটে না। তাছাড়া, একটি জাতির সকল সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নির্মাণ করে থাকে শ্রমজীবী সাধারণ মানুষরাই, উচ্চকোটি পরিবারগুলো নয়। এটা জাপানে খুব সহজেই ধরা পড়ে দীর্ঘকাল বসবাস করলে।
অসামান্য সব অভিজ্ঞতাও অর্জিত হয়েছে সাধারণ স্তরে কাজ করার সুবাদে। যেমন ফটো প্রিন্টিং কোম্পানিতে চাকরি করার সময় এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা শিমোনাকা ইয়াসুবুরোও (১৮৭৮-১৯৬১) সম্পর্কে জেনে বিস্মিত হয়েছিলাম! তিনি ছিলেন আধুনিক জাপানের অন্যতম স্বপ্নদ্রষ্টা তথা শিক্ষক, শ্রমিক আন্দোলন, কৃষক আন্দোলনের পথিকৃৎ এবং শান্তিবাদী নেতা। ১৯১৪ সালে প্রতিষ্ঠা করেন আধুনিক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান হেইবোনশা পাবলিশার। এরপর প্রসিদ্ধ টোকিও ইনশোকান ও ফটো প্রিন্টিং কোম্পানিও প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। জাপানে প্রথম শিশুপত্রিকা, নারী কাগজ, ২৮ খণ্ডের বিশ্বকোষ, জাপানি মহাকোষ, সংস্কৃতি মহাকোষ, জীবনীকোষসহ কালার গেক্কান তাইয়োও (মাসিক সূর্য), গেক্কান আনিমা (মাসিক জীবপ্রাণী), তোওয়োও বুনকো (প্রাচ্য গ্রন্থ) সিরিজ প্রকাশের উদ্যোক্তাও তিনি। তাছাড়া মৃৎশিল্পী হিসেবেও খ্যাতিমান ছিলেন।
শুধু তাই নয়, ১৯২০ সালে জাপানের রাজধানী টোকিওতে প্রথম মে ডে উদযাপনের সমাবেশে তিনি ছিলেন প্রধান বক্তা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপানে অনুষ্ঠিত টোকিও মিলিটারি ট্রাইব্যুনালের অন্যতম বিচারপতি রাধাবিনোদ পালের (১৮৮৬-১৯৬৭) সঙ্গে তাঁর ভাতৃবন্ধনের ইতিহাস অবিস্মরণীয় ঘটনা। বিচারপতি পাল বর্তমান বাংলাদেশের কুষ্টিয়া জেলার শালিমপুর গ্রামের সন্তান। এইসব ইতিহাস জানতে পেরে নিজেকে গৌরবান্বিত মনে করেছি। কী সৌভাগ্য আমার যে, এমন একজন মহান জাপানির প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানে আমি কাজ করার সুযোগ পেয়েছি কর্মগুণের কারণে!
শ্রমজাত কাজকে ভালোবাসলে সেই শ্রম বৃথা যায় না, অনেক বড় সম্মান বয়ে আনে যা রাজনীতিবিদ, কোটিপতি, শিল্পপতি, সরকারি আমলাদের ভাগ্যে জোটে না। যদি না সেখানে সৃজনশীল ও বিজ্ঞানের প্রতি শ্রদ্ধা না থাকে।
মহান মে দিবস অমর হোক।
টোকিও
০১/০৫/২০২১

(লেখার সাথে ছবি, জাপানে প্রথম মে দিবস উপলক্ষে সমাবেশের ছবি।)

Facebook Comments

বাংলাদেশ সময়: ১২:৪৬ অপরাহ্ণ | শনিবার, ০১ মে ২০২১

জাপানের প্রথম অনলাইন বাংলা পত্রিকা |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

ad